ক্যানিবালিজম: নরখাদকতা চর্চায় নৃবিজ্ঞানীদের মতবিবাদ -সাদিয়া শান্তা

উইলিয়াম এরেন্স নিউ ইয়র্কের স্টেট ইউনিভার্সিটির নৃবিজ্ঞানের একজন শিক্ষক। একদিন শ্রেণীকক্ষে পাঠদানের সময় এক ছাত্র তাঁকে প্রশ্ন করলো তিনি কেন শুধু জ্ঞাতিসম্পর্ক, রাজনীতি ও অর্থনীতির মতো বিষয়গুলো নিয়েই আলোচনা করেন? অথচ কৌতূহলোদ্দীপক বিষয় যেমন- উইচক্রাফট, ফিল্ড ওয়ার্ক বা ক্যানিবালিজম নিয়েও কেন আলোচনা করেন না? ছাত্রের মুখে এই প্রশ্ন শুনে উইলিয়াম এরেন্সের নিজের ছাত্রজীবনের কথা মনে পড়ে গেল। তিনি স্মরণ করলেন নৃবিজ্ঞান পড়াশুনার শুরুতে তাঁর চিন্তায়ও এই বিষয়গুলো খুব কৌতূহলোদ্দীপক ছিল। সেই ভাবনা থেকে তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ক্যানিবালিজম নিয়ে শ্রেণীকক্ষে একটি লেকচার দিবেন। উইলিয়াম এরেন্স গবেষণামূলক সেই লেকচারটিই পরবর্তীতে নৃবিজ্ঞানীদের মহলে মতবিবাদ সৃষ্টি করে। বিতর্কিত এই আলাপটি জানার আগে ক্যানিবালিজম নিয়ে কিছু কথা বলা যাক। 

ক্রিস্টোফার কলাম্বাস ১৪৯৩ সালে গুয়াদিলুপে অভিযানে যান। সেখান থেকে কলম্বাস স্পেনে ফিরে আসেন এবং স্পেনের রাণী ইসাবেলকে গুয়াদিলুপে বসবাসকারী ‘ক্যারট’ নামক এক গোষ্ঠীর কথা বলেন। কলম্বাস দাবী করেন ক্যারট গোষ্ঠী তাদের মধ্যে নরমাংস ভক্ষণ প্রথা চর্চা করে। এই চর্চার কথা শুনে স্পেনের রাণী ইসাবেল ক্যারট গোষ্ঠীর নরখাদকদের বন্দী করে দাস করে রাখেন এবং নরখাদকতা চর্চা নিষেধ ঘোষণা করেন। এরপর থেকে কোন দ্বীপ অঞ্চলের কোন গোষ্ঠী চাহিদা মতো স্বর্ণ খনির যোগান দিতে না পারলে কলম্বাস তাদের ‘ক্যারিব’ বলে অভিহিত করতো এবং নরখাদকতার দায়ে দাসে পরিণত করে রাখার হুমকি দিতো। সেই থেকে ক্যারিব শব্দটি ক্যানিবে হয়ে ইউরোপে এসে ক্যানিবালিজমে পরিণত হলো, যার মানে এখন আমরা বুঝি ক্যানিবালিজম বা স্বজাতিভক্ষণ।

ক্যানিবালিজম হচ্ছে এমন এক ধরনের আচরণ যেখানে কোন সদস্য তার নিজ প্রজাতির অন্য সদস্যের মাংস খেয়ে থাকে। প্রাণীজগতের প্রায় পনেরোশ প্রজাতির প্রাণী ক্যানিবাল। মাকড়সা, শার্ক, টাইগার স্যালাম্যান্ডার, পোলার বিয়ার, শিম্পাঞ্জি এমনকি মানুষের মধ্যেও ক্যানিবালিজমের প্রমাণ পাওয়া গেছে। মানুষ প্রজাতির ক্যানিবালিজমকে এন্থ্রোপোফ্যাগি (নরমাংসভক্ষণ) বলে যা নৃতাত্ত্বিক গবেষণায় একটি জটিল বিষয়।

Christopher Columbus

জীবন বাঁচানোর তাগিদে মানুষের ক্যানিবাল হয়ে উঠার ঘটনা প্রায়ই গল্প-সিনেমায় দেখা যায়।  তবে বাস্তবেও এর অহরহ উদাহরণ রয়েছে। বর্তমান সময়ের জনপ্রিয় থ্রিলার উপন্যাস ‘রবীন্দ্রনাথ এখানে কখনো খেতে আসেন নি’-এর মূল রহস্যে রয়েছে বেঁচে থাকার তাগিদে ক্যানিবাল হয়ে উঠা এক নারী চরিত্র, যাকে চিত্রিত করা হয়েছে ১৯৭২ সালে আন্দিজ পর্বতে প্লেন ক্র‍্যাশের ঘটনা অনুসারে। সেই ঘটনাটি নিয়ে হলিউড ১৯৯৩ সালে ‘Alive’ নামে একটি সিনেমাও তৈরী করে। সেখানে দেখানো হয় বিমান দুর্ঘটনায় পর্বতে আটকা পড়ে কিছু যাত্রী খাদ্য সংকট ও বেঁচে থাকার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় একটা সময় মৃত সহযাত্রীদের মাংস খাওয়া শুরু করে। ১৮২০ সালে তিমি শিকারী জাহাজ ‘এসেক্স ক্রু’ ডুবে যাওয়ার পর বেঁচে থাকা যাত্রীদের খাদ্যের অভাবে ক্যানিবাল হয়ে উঠে। একই ঘটনা ঘটে আবার ১৮২৬ সালে দ্য ফ্রান্সিস মেরী জাহাজ ডুবির পর। ১৯৪১ সালে দুর্ভিক্ষের কবলে পড়ে লেনিনিগ্রাদের কিছু মানুষের ক্যানিবাল হয়ে উঠার খবর নথিতে পাওয়া যায়৷ তবে এসব অনেক তথ্যই আমার প্রত্যক্ষদর্শীর জবানবন্দীতে লেখা নয়৷ নৃবিজ্ঞানীদের ভাষায় খাদ্য সংকটে পড়ে বাঁচার তাগিদে এভাবে নিজ প্রজাতির মাংস খাওয়াকে সারভাইভাল ক্যানিবালিজম বলে।

সাইকোএনালাইসিসের প্রবক্তা সিগমুন্ড ফ্রয়েড তাঁর ‘Totem and Taboo’ বইয়ে ওয়্যারফেয়ার ক্যানিবালিজমের কথা উল্লেখ করেছেন। এতে বিশ্বাস করা হয় শত্রুপক্ষের কাউকে হত্যা করে তার মাংস খাওয়ার মাধ্যমে শত্রুর শক্তি অর্জন করা যায় এবং এতে করে শত্রুপক্ষের শক্তির প্রতি সম্মানও জানানো হয় । ৭ম শতকে মুসলিম-কুরাইশ যুদ্ধে ওয়্যারফেয়ার ক্যানিবালিজম দেখা যায়। উহুদের যুদ্ধে হামজা ইবনে আবদুল মুত্তালিব নিহত হলে তাঁর কলিজা ভক্ষণের চেষ্টা করে কোরাইশ নেতার স্ত্রী হিন্দ বিনতে উতবাহ। লিবিয়া ও কঙ্গোর বেশ কিছু যুদ্ধেও ওয়্যারফেয়ার ক্যানিবালিজমের প্রমাণ পাওয়া যায়।

পোল্যান্ডের নৃবিজ্ঞানী ম্যালিনোস্কির মতে মানবসমাজের সবকিছুরই একটা কার্যিক দিক রয়েছে। তিনি মনে করেন ক্যানিবালিজমও এর অন্তর্গত। ফরাসি দার্শনিক মাইকেল দা মন্টেইন ক্যানিবালিজমকে ‘Cultural Relativism’ এর দৃষ্টিতে ব্যাখ্যা করেছেন। ‘Cultural Relativism’ বা ‘সাংস্কৃতিক অপেক্ষবাদ’ হচ্ছে এমন একটি ধারণা যেখানে বলা হয় কোন ব্যক্তির বিশ্বাস, মূল্যবোধ ও চর্চাগুলিকে সেই ব্যক্তির নিজস্ব সংস্কৃতির উপর ভিত্তি করেই বোঝা উচিত, অন্য সংস্কৃতির মানদন্ডের ভিত্তিতে নয়। অর্থাৎ কোন গোষ্ঠীর নরখাদকতা চর্চার প্রেক্ষিতে অন্য গোষ্ঠী তাদের সভ্যতা বা বর্বরতার মানদন্ড নির্ণয় করতে পারে না। কিন্তু ক্যানিবালিজম কি কখনো সাংস্কৃতিক চর্চার অন্তর্গত ছিল? এই নিয়ে বিতর্ক রয়েছে নৃবিজ্ঞানী, দার্শনিক ও প্রত্নতাত্ত্বিকদের মধ্যে।

Bronisław Malinowski

আমেরিকান নৃবিজ্ঞানী হেলেন রুশিয়ের নেতৃত্বে গুয়েত গুহা থেকে মিলেছে আদিম মানুষ নিয়ান্ডারথালদের হাড়। সেই হাড় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে নরমাংস ভক্ষণের প্রমাণ পাওয়া গেছে । নিয়ান্ডারথালরা ছিল আমাদের মতোই বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন মানুষ। প্রায় ৩০ হাজার বছর আগে হোমো সেপিয়েন্সদের সংখ্যা বাড়তে শুরু করলে নিয়ান্ডারথালরা ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হতে থাকে। নিয়ান্ডারথালদের মধ্যে মৃতের সংখ্যা বেড়ে যায় এবং খাদ্য সংকটে পড়ে তারা নিজ প্রজাতির মৃতদেহের মাংস খাওয়া শুরু করে। কিন্তু এই আচরণও সারভাইবাল ক্যানিবালিজমকে ইঙ্গিত করে। রিচুয়াল ক্যানিবালিজম বা সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে এর কোন প্রমাণ পাওয়া যায়না।

এবার ফিরে আসি উইলিয়াম এরেন্সের আলাপে। উইলিয়াম এরেন্স তার ছাত্রের অনুরোধে যে লেকচারটি দিয়েছিলেন সেখানে তিনি বলেন, সারভাইভাল ক্যানিবালিজমের যথার্থ প্রমাণ মিললেও রিচুয়াল ক্যানিবালিজমের কোন সরাসরি বা মোক্ষম প্রমাণ নেই। অর্থাৎ পৃথিবীর কোথাও আনুষ্ঠানিকভাবে নরখাদকতা চর্চার উপযুক্ত সাক্ষ্য প্রমাণ নেই। সর্বপ্রথম সাংস্কৃতিক চর্চা হিসেবে ক্যানিবালিজমের কথা উল্লেখ করেন ক্রিস্টোফার কলম্বাস। তিনি স্পেনের রাণীকে গুয়াদিলুপের ক্যারট গোষ্ঠীর নরখাদকতা চর্চার ব্যাপারে অবগত করেন। কিন্তু কলাম্বাসের এই দাবীও কোন সাক্ষ্য প্রমাণ ছিল না। উপরন্তু ক্যানিবালিজমের কলঙ্কের দায়ে ফেলে উপনিবেশিত গোষ্ঠীদের উপর নিয়ন্ত্রণ রক্ষা করাও ছিল উপনিবেশিকতার এক হাতিয়ার। ক্যানিবালিজমের ঘটনাগুলির তদন্ত করার সময় উইলিয়াম এরেন্স লক্ষ্য করেন কোন দল/গোষ্ঠী কখনো তার নিজের পূর্বপুরুষদের ক্যানিবাল হিসেবে দাবী করে না। গোষ্ঠীগুলো তাদের বিপক্ষ গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষদের মধ্যে ক্যানিবালিজম চর্চার দাবী করে। যেমন- চীনারা কোরিয়ানদের ক্যানিবাল দাবী করে, কোরিয়ানরা চীনাদের। আবার, আফ্রিকানরা ইউরোপীয়দের ক্যানিবাল দাবী করে, ইউরোপীয়রা আফ্রিকানদের৷ আর কিছু গোষ্ঠী নিজেদের পূর্বপুরুষের মধ্যে ক্যানিবালিজম চর্চার কথা স্বীকার করলেও তারা সুদূর অতীতের কথা বলে যার কোন ভিত্তি নেই এবং আদিম যুগের বর্বরতা কাটিয়ে সভ্য হয়ে উঠার গৌরবময় ঘটনার উপরই থাকে তাদের বর্ণনার প্রধান আলোকপাত।

অর্থাৎ প্রত্নতাত্ত্বিকরা আদিমযুগের মানুষদের ক্যানিবাল হওয়ার প্রমাণ যোগাড় করলেও তারা কেন ক্যানিবাল হয়ে উঠেছিল তা নিয়ে এখনো বিতর্ক রয়ে গেছে নৃবিজ্ঞানীদের মধ্যে। মানুষের আচার-আচরণের গ্রহণযোগ্যতার সীমানা নির্ধারণে নৃবিজ্ঞানীদের বিভিন্ন সমস্যার সম্মুখীন করে এই অমীমাংসিত বিবাদ ক্যানিবালিজম। তাই নৃতাত্ত্বিক মহলে আজও হয়ে চলছে নরখাদকতা চর্চা প্রসঙ্গে বিতর্ক-বিবাদ এবং বের হয়ে আসছে নৃবিজ্ঞানীদের নতুন নতুন মতবাদ।

Source :

1. jstor.org (article- Anthropologists suggest Cannibalism is a Myth)

2. thoughtco.com (article- Cannibalism: Archaeological and Anthropological Studies)

3. nationalgeographic.com (article- After the Plane Crash and the Cannibalism a Life of Hope)

4. mirror.co.uk (article- Cannibalism, corpses and how people survived the worst siege in history)

Related Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

2 COMMENTS

  1. Great writeup dear Sadia Shanta the Anthropologist.
    Go ahead with your excellency…the world is your and you can explain it in an Anthropological way…

  2. খুব ভালো লেখা। আরো ভালো ভালো লেখা আসুক অ্যান্থ্রোসার্কেলে।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।...

বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

'বর্জন' কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য  এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস...