ডেভিড গ্রেবার অন দা ফেনোমেনন অফ বুলশিট জবস

David Graeber, left, speaks at the Maagdenhuis occupation at the University of Amsterdam in March 2015. (Wikimedia Commons / Guido van Nispen)

অনুবাদঃ তাসনীম বিন আলম

ডেভিড গ্রেবার এই প্রবন্ধটি লেখেন ২০১৩ সালে, স্ট্রাইক ম্যাগাজিনে। পরবর্তীতে এই ধারনাগুলোকে আরো বিস্তৃত করে তিনি ২০১৮ সালে ‘Bullshit Jobs: A Theory’ নামে বইটি প্রকাশ করেন। এখানে স্ট্রাইক ম্যাগাজিনে লেখা প্রবন্ধটির অনুবাদ প্রকাশিত হলো। পাশাপাশি পেঙ্গুইনকে দেওয়া গ্রেবারের সাক্ষাতকারের ছোট একটি অংশও থাকলো। 

১৯৩০ সালে জন মেয়নার্ড কেইনেস বলে গেছিলেন, এই শতকের শেষের দিকে প্রযুক্তি এতটা এগিয়ে যাবে যে ব্রিটেন বা আমেরিকার মত দেশগুলো ১৫ শ্রমঘণ্টা/সপ্তাহ অর্জনে সক্ষম হবে। সঙ্গতকারণেই বলা যায় তিনি ঠিকই ছিলেন। প্রযুক্তিগত দিক থেকে আমরা ইতোমধ্যে সেই সক্ষমতা রাখি। কিন্তু তাও এটা হয়নি। আমরা বরং প্রযুক্তিকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছি আমাদের সবার জন্য আরও বেশি কাজ তৈরিতে। এবং তার জন্য এমনসব কাজ সৃষ্টি করতে হয়েছে, যেগুলো কার্যত অর্থহীন। বিপুল পরিমাণ মানুষ, বিশেষত ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার, এমনসব কাজে তাদের পুরো শ্রমজীবন কাটায়, যেগুলোকে তারা আড়ালে অহেতুক মনে করে। এর থেকে উদ্ভূত নৈতিক ও আত্মিক ক্ষতি অত্যন্ত গভীর। এটা আমাদের সামষ্টিক আত্মার ওপর একটা ক্ষত। তবুও প্রায় কেউই এটা নিয়ে তেমন রা করে না।

ষাটের দশকেই বহুল প্রতীক্ষিত কেইনেসের সেই প্রতিশ্রুত ইউটোপিয়া কেন কখনও বাস্তবায়িত হয় নাই? আজকের দিনের বুঝ হল তিনি কনজিউমারিজমের এমন ব্যাপক বৃদ্ধির ধারণা করতে পারেন নাই। অল্প শ্রমঘণ্টা আর অধিক ভোগবিলাসের মধ্যে আমরা সামষ্টিকভাবে পরেরটাকেই বেছে নিয়েছি। এটা একটা সুন্দর নীতিগল্প প্রস্তাব করলেও, পরমুহূর্তেই টের পাওয়া যায় তা আসলে সত্য হতে পারে না। হ্যাঁ, বিশ শতকের গোড়া থেকেই আমরা অসীম সংখ্যক জব আর ইন্ডাস্ট্রি দেখে আসছি, কিন্তু তাদের খুব কমই সুশি, আইফোন বা ফ্যান্সি জুতার উৎপাদন ও বণ্টনের সাথে জড়িত।

তাহলে এইসব জবগুলো কী আসলে? এই বিষয়ে ১৯১০ আর ২০০০ সালের কর্মসংস্থানের মধ্যে তুলনা করে সম্প্রতি প্রকাশিত একটা সমীক্ষা আমাদেরকে একটা পরিষ্কার ছবি দেয়। শেষ শতক জুড়ে গৃহকর্ম, ইন্ডাস্ট্রি এবং ফার্ম সেক্টরে কাজ করা মানুষজনের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে কমে গেছে। একই সময়ে প্রফেশনাল, ম্যানেজারিয়াল, ক্লারিকাল, সেলস এবং সার্ভিস খাতে মানুষের সংখ্যা তিনগুণ হয়েছে, যা কিনা মোট শ্রমশক্তি বিবেচনায় এক-চতুর্থাংশ থেকে বেড়ে দাড়িয়েছে তিন-চতুর্থাংশে। অন্য কথায়, উৎপাদন সম্পৃক্ত জবগুলো, প্রতীক্ষিতভাবেই অটোমেটেড হয়ে গেছে ( এমনকি বৈশ্বিক বিবেচনায়ও, চীন আর ভারতের বিপুল পরিমাণ শ্রমিকদের নিয়েও মোট শ্রমিকের সংখ্যাটা পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার তুলনায় আগের মত অতো বড় নাই।)

কিন্তু পৃথিবীর মানুষের শ্রমঘণ্টা বড়রকম কমিয়ে দিয়ে তাদের নিজেদের কাজকাম, আনন্দ, ভিশন ও আইডিয়াগুলোতে সময় দেওয়ার ব্যবস্থা করার বদলে আমরা দেখছি শুধু সার্ভিস আর এডমিনিস্ট্রেটিভ খাতগুলোকে ফুলানো-ফাপানো, এমনকি ফিনান্সিয়াল সার্ভিস বা টেলিমার্কেটিঙের মত নতুন খাত সৃষ্টি অথবা কর্পোরেট ল, একাডেমিক ও স্বাস্থ্য প্রশাসন, হিউম্যান রিসোর্স ও পাবলিক রিলেশনের মত খাতগুলোর ব্যাপক বিস্তৃতি। এবং এই সংখ্যাও এইসব ইন্ডাস্ট্রিতে নিয়োজিত প্রশাসনিক, টেকনিকাল বা নিরপত্তা কর্মীদের সংখ্যাটাকে উপেক্ষা করেই, তাছাড়াও আনুষঙ্গিক অন্যান্য ইন্ডাস্ট্রি (ডগ-ওয়াশার, সার্বক্ষণিক পিজ্জা ডেলিভারি) টিকেই আছে কারণ প্রত্যেকে অন্য কোনো না কোনো কাজে ব্যস্ত।

এইগুলো হল সেইসব জব, যেগুলোকে আমি বুলশিট জব বলি।

“বুলশিট জব বলতে, আমি বুঝাই, কাজটা যে করতেছে, সেও সিক্রেটলি মনে করে যে এই কাজটার এক্সিস্টই করার কথা না। কিন্তু এমপ্লয়মেন্টের শর্ত অনুযায়ী তারে ভান করতে হবে যে এটার দরকার আছে। বুলশিট জব আর শিট জবের তফাত করাটা দরকারি। বেশিরভাগ সময় বুলশিট জব শুনলে মানুষ মনে করে এমন জব যেগুলোর বেতন ভালো না, বা কর্মক্ষেত্রে ভালো ট্রিট করে না, বা অসম্মানজনক, বা কামলা খাটায়। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই এইসব শিট জব (মাত্র উল্লিখিত ধরনের জবগুলো) বুলশিট জবের ভেতর পড়ে না। বেশিরভাগ জব যেগুলো কর্মক্ষেত্রে শোষণ করে সেগুলো হল, যেমনঃ ক্লিনার, বা মাটি কাটা শ্রমিক, বা নার্স, কাজের লোক, যাদের সাথে খারাপ ব্যবহার করা হয়ে থাকে। তারা তবুও কিছু একটা করছে। বুলশিট জব অনেকটা ঠিক তার বিপরীত। বুলশিট জবগুলোতে আপনারে অনেক টাকাপয়সা দিবে, আপনি অনেক ভালো ব্যবহার পাবেন, প্রচুর সম্মান, যেন পরিবারের সবচে সফল সদস্য। কিন্তু একই সময়ে ভেতরে ভেতরে এইটা আপনারে কুড়ে খাচ্ছে যে, আপনি আসলে কিছুই করছেন না, আপনার জবটা দুনিয়াতে না থাকলেও দুনিয়ার কিছুই হইত না, বরং হয়তো ভালো কিছু হইত।”

ডেভিড গ্রেবারের পেঙ্গুইনের সাক্ষাতকার

এইটা অনেকটা এমন যেন কেউ একজন বসে বসে এইসব অর্থহীন জব তৈরি করে যাচ্ছে শুধু আমাদের সবাইকে কাজে ব্যস্ত রাখতে। এবং এইখানেই লুকিয়ে আছে আসল রহস্য। পুঁজিবাদে এই ব্যাপারটাই হওয়ার কথা না। হ্যাঁ, সমাজতান্ত্রিক সোভিয়েতের মত রাষ্ট্রগুলোতে, যেখানে কর্মসংস্থান একইসাথে একটা অধিকার ও পবিত্র দায়িত্ব হিসেবে বিবেচিত হত, সেখানে সিস্টেম তাদের দরকার মত জব বানাত (তাই সোভিয়েতের ডিপার্টমেন্ট স্টোরে এক টুকরা গোশত বেচতে তিনজন ক্লার্কের দরকার পড়ত)। কিন্তু এই বিষয়টাই মার্কেট ইকোনমির ঠিক করার কথা। অর্থনৈতিক তত্ত্ব অনুযায়ী, একটা প্রফিট-সিকিং ফার্মের অদরকারি কর্মীর পিছে টাকা ঢালার কথাই না। কিন্তু তাও এটাই হচ্ছে। যদিও কর্পোরেশনগুলো বড় ধরনের কর্মী ছাটাই করে, তাতে চাকরি হারায় উৎপাদন, পরিবহন, মেরামত ও মেনটেনিঙে জড়িত লোকেরা; কোনো এক অদ্ভূত কারণে কেউ এসব ব্যাখ্যা করতে পারে না। বেতনভুক্ত কাগজ-ঠেলার লোকেদের সংখ্যা বাড়তেই থাকে এবং বর্ধিত সংখ্যক কর্মীরা তাদের আবিষ্কার করে এমন পরিস্থিতিতে, যেইটা এমনকি সোভিয়েতের মত সাপ্তাহিক ৪০/৫০ ঘণ্টা কাগজ ঠেলে চলার কাজও না, বরং কাগজ ঠেলার কাজ ঐ কেইনেসের ভাষ্য মত ১৫ ঘণ্টাতেই সীমাবদ্ধ, আর বাকিটা সময় তারা ব্যয় করে মোটিভেশনাল সেমিনার আয়োজন ও সেইসবে অংশগ্রহণ, নিজেদের ফেসবুক প্রোফাইল আপডেট কিংবা টিভি বক্সসেট ডাউনলোড করে। এর উত্তরটা মোটেও অর্থনৈতিক না, বরং নৈতিক ও রাজনৈতিক। শাসকশ্রেণি এটা জানে যে সুখী ও প্রোডাক্টিভ জনগণ, যাদের অবসরের অধিকার আছে, তারা  শাসনতন্ত্রের জন্য মারাত্মক হুমকি। এবং অন্যদিকে, এই বয়ান শাসকশ্রেণির জন্য অত্যন্ত সুবিধাজনক যে— কাজের অন্তর্নিহিত (ইন-ইটসেলফ) একটা ভেল্যু আছে এবং যারা সারাটা দিন নির্দিষ্ট কোনো কাজে নিজেদের সর্বাত্মকভাবে নিয়োজিত করে না, তারা কিছুই ডিজার্ভ করে না।

একবার ব্রিটিশ একাডেমিক ডিপার্টমেন্টগুলোতে প্রশাসনিক দায়দায়িত্বের অসীম বৃদ্ধি নিয়ে ভাবতে গিয়ে আমি দোযখের একটা সম্ভাব্য চিত্র কল্পনা করি। দোযখ এমন একদল ইন্ডিভিজুয়ালের সমষ্টি, যারা এমনসব কাজে তাদের সারাটা সময় ব্যয় করে, যেইসব কাজে তারা না-পারদর্শী, না সেইসব কাজ তারা পছন্দ করে। যেমন তারা কাজটা পেয়েছিল কারণ তারা ক্যাবিনেট তৈরিতে দক্ষ, কিন্তু কাজে গিয়ে দেখল তাদেরকে বিশাল একটা সময় কাটাতে হবে মাছ ভেজে। এমনও না যে কাজটার আদতেই দরকার আছে, কিংবা থাকলেও দরকার মেটাতে মাছের প্রয়োজন সামান্যই। কিন্তু তাও, তারা এই দুঃখেই বিভোর হয়ে থাকে যে তাদের কোনো কোনো সহকর্মী ক্যাবিনেটই বানাচ্ছে, আর তাই ওয়ার্কপ্লেসগুলো অল্পতেই অপ্রয়োজনীয় ও বাজেরকমভাবে ভাজা মাছে ভরে যায়, বলতে গেলে এগুলোই এই জবগুলোতে কাজ। আমি মনে করি এইটাই আমাদের অর্থনীতির মোরাল ডায়নামিক্সের একটা যথার্থ বর্ণনা।

এখন এই যুক্তি নগদে এই প্রশ্নের মুখে পড়বে যেঃ “দরকারি/অদরকারি ঠিক করে দেওয়ার আপনি কে? দরকার জিনিসটাই বা কী? আপনি নিজেই তো একজন নৃবিজ্ঞানী, সেইটা কতটা দরকারি?” (এবং অনেক পাঠকও আমার পেশাটাকেই সমাজের একটা বাজে খরচার উদাহরণ হিসেবে নিবেন।) এবং কিছু ক্ষেত্রে তা সত্যও বটে। সমাজে ভ্যালুর অবজেক্টিভ মূল্যায়ন সম্ভব না।

আমি এমন কাউকে গিয়ে বলব না যে তার পেশাটা অদরকারি, যে মনে সে সমাজের জন্য অর্থবহ কিছুই করছে। কিন্তু সেইসব লোকেরা? যারা নিজেরাই তাদের কাজকে অর্থহীন মনে করে? কয়েকদিন আগেই আমার স্কুলের এক বন্ধুর সাথে দেখা হল প্রায় বারো বছর পর। আশ্চর্যজনকভাবে এই সময়ের ভেতর সে প্রথম কিছুদিন কবিতা লেখেছে, তারপর একটা ইন্ডি রক ব্যান্ডের ফ্রন্টম্যানও ছিল। এমনকি এইটা যে সে, তা না জেনেই তার কিছু গান আমি রেডিওতে শুনেও-ছিলাম। সে ব্রিলিয়ান্ট, ইনোভেটিভ, এবং তার কাজ আসলেও সমাজের অনেক মানুষকে আনন্দ দিয়েছে, অনেকের উপকারে এসেছে। কিন্তু কয়েকটা এলবাম লস খাওয়ার পর, তার কন্ট্রাক্ট বাতিল হয়ে যায়, তারওপর ঋণের বোঝা আর একটা নবজাত মেয়েকে নিয়ে ঠেকে গিয়ে শেষমেশ,তার ভাষায়, ‘দিশাহারাদের ডিফল্ট চয়েসঃ ওকালতি’ শুরু করে। সে এখন নিউ ইয়র্কের একটা বিখ্যাত ফার্মের কর্পোরেট আইনজীবী। আমার দেখা সে-ই প্রথম যে তার পেশাকে সম্পূর্ণ অর্থহীন মনে করে এবং তার নিজের মতেই এই পেশার অস্তিত্বই থাকার দরকার নাই।

এইখানে অনেকগুলো প্রশ্ন উঠতে পারে, ওপরের এই ঘটনাটা আমাদের সমাজের ব্যাপারে কী ইঙ্গিত করে থেকে শুরু করে কেন আমাদের সমাজে প্রতিভাবান কবি কিংবা গায়কদের চেয়ে কর্পোরেট ল স্পেশালিস্টের এত ব্যাপক চাহিদা? (উত্তর হল, মাত্র ১% লোক যদি সমাজের সিংহভাগ সম্পদ, যাকে কিনা আমরা বলি ‘মার্কেটের’ নিয়ন্ত্রক হয়ে থাকে, তবে সমাজ ঐ ১% লোকের ‘প্রয়োজন’ কিংবা ‘গুরুত্বের’ সংজ্ঞানুসারেই গড়ে ওঠে)। কিন্তু তার চেয়েও বড় ব্যাপার যেটি, এসব কাজে জড়িত বেশিরভাগ লোকই এই বিষয়টা জানেন। ইন ফ্যাক্ট, নিজের কাজকে বুলশিট ছাড়া অন্যকিছু ভাবে এমন কোনো কর্পোরেট আইনজীবী আছে বলে আমার মনে হয় না। ওপরে বলা সব নতুন ইন্ডাস্ট্রির বেলায়ই তা খাটে। আমাদের সমাজে বিশাল এক পেশাদার দল আছে, যাদের সাথে পার্টিতে আলাপ হলে যদি বলেন আপনি এমন কিছু করেন যা কিনা আসলেই ইন্টারেস্টিং (যেমন ধরুন, এনথ্রোপলজিস্ট), তখন দেখবেন তারা ঐ আলাপ পুরোপুরি এড়িয়ে যেতে চাইবেন এবং একটু মদ পড়লে ঐ একই লোক তার জব কতটা পয়েন্টলেস আর স্টুপিড সে সম্পর্কে লম্বা কথা বলা শুরু করবেন।

এইখানে একটা তীব্র সাইকোলজিকাল ভায়োলেন্স চলে। কেউ একজন কীভাবে শ্রমের মর্যাদা পাওয়ার দাবি করবে, যদি সে নিজেই তার কাজের ভ্যালিডিটি খুজে না পায়? এইটা কি একটা গভীর রোষ আর দুঃখবোধের তৈরি করবে না? এবং শাসকশ্রেণির পিকিউলিয়ার চালের ফলে ঐ মাছ-ভাজা লোকদের মত করে বাকিদেরও রোষটা গিয়ে পড়বে বরং তাদের ওপর যারা প্রকৃতপক্ষে মিনিংফুল কিছু করছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমাদের সমাজে যার কাজটা যত বেশি গুরুত্বপূর্ণ, সেই তুলনায় সে ততটা  মজুরি পাবে না। আবার, যদিও অবজেক্টিভভাবে পরিমাপ অসম্ভব, তবু এইভাবে ভাবলে বুঝতে সহজ হয় যে, কোনো একটা পেশা পুরোপুরি উঠে গেলে ব্যাপারটা কেমন হত? যেমন ধরেন, নার্স, ময়লা সংগ্রহকারী বা মেকানিক এরা যদি হারিয়ে যেত, ফলাফলটা খুবই ইমিডিয়েট ও বিপর্যয়কর হত। শিক্ষক বা ডক-শ্রমিকের অনুপস্থিতিতেও আমরা ঝামেলায় পড়ব, এমনকি সায়েন্স ফিকশন রাইটার বা মিউজিশিয়ানের ছাড়াও পৃথিবীকে কল্পনা করা কষ্টকর। কিন্তু এটা স্পষ্ট না যে, সব প্রাইভেট ইকুইটি সিইও, লবিস্ট, পিআর রিসার্চার, টেলিমার্কেটার, বেইলিফ, লিগাল কনসাল্টেন্ট ভ্যানিশ হয়ে গেলে পৃথিবীর কী সমস্যা হত। (অনেকে মনে করে বরং ভালোই হত।)

এবং আরও যেটা বলার, অনেকেই মনে করে যে, এটাই হওয়ার কথা ছিল। আর রাইট-উইং পপুলিজমের এটা একটা ঘাঁটি। আপনারা এটা দেখতে পাবেন যখন শ্রমিকেরা চুক্তি নিয়ে বিরোধে লন্ডন অচল করে দিল, এই অচল করার ব্যাপারটাই তাদের কাজের গুরুত্ব বোঝায় আপনাকে, তখন ট্যাবলয়েডগুলো টিউবওয়ার্কারদের বিরুদ্ধে জনগণকে ফুসলিয়ে দিল। আমেরিকার উদাহরণ আরও স্পষ্ট, যেখানে কিনা বেতন ও সুবিধাদি বৃদ্ধির জন্য রিপাবলিকানরা জনরোষকে স্কুল টিচার আর অটো ওয়ার্কারদের দিকে ঘুরিয়ে দিল (এবং, উল্লেখ্য যে, স্কুল  প্রশাসন বা গাড়ি কোম্পানির ম্যানেজারদের দিকে না)। যেন তাদেরকে বলা হচ্ছিল “তোমরা বাচ্চাদের পড়াবা! গাড়ি বানাবা! রিয়েল জবও করবা! এবং তার পরেও মিডলক্লাস পেনশন আর হেলথ কেয়ারও চাইবা?”

কেউ যদি কাজের এমন কোনো রাজত্ব বানাত যেখানে মূলধনের ক্ষমতা বজায় থাকবে, সেখানে এরা এর বেশি আর কী করতে পারত তা বোঝা বড় মুশকিল। সত্যিকারের প্রোডাক্টিভ কর্মীরা প্রতিনিয়ত এক্সপ্লয়েটেড হয়, নিষ্পেশিত হয়।  বাদ বাকিরা হয় পৃথিবী জুড়েই অবহেলিত, কর্মহীন, আর অন্য একটা দল তেমন কিছু না করেই, শাসকশ্রেণির দায় ও দায়িত্বের পরিচয়ে, টাকাপয়সা কামাই করে যাচ্ছে—এবং বিশেষত এরাই ফিনান্সিয়াল অবতার—যারা একই সময়ে সমাজের স্পষ্ট ও সন্দেহাতীত গুরুত্বের কর্মীদের বিরুদ্ধে রোষ উৎপাদন করে। স্পষ্টতই, এই সিস্টেমটা কখনোই চিন্তাভাবনা করে বানানো হয়নি, বরং প্রায় একশ বছরের ট্রায়াল এন্ড এররের ভেতর দিয়ে এসেছে। কিন্তু প্রযুক্তিগত সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও আমাদের সবার দৈনিক ৩-৪ কর্মঘণ্টায় নেমে না আসার এটাই একমাত্র ব্যাখ্যা।

References 

Related Articles

তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (দ্বিতীয় কিস্তি)

উদারতাবাদ আর বাকস্বাধীনতার ধরণ বলা হয়ে থাকে ব্লাসফেমির বিরূদ্ধে অভিযোগ একটা...

লিপ প্লেট : ইথিওপিয়ার মুরসি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য

মুরসি জনগোষ্ঠী (মুনি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইথিওপিয়ার নিম্ন ওমো উপত্যকায় বসবাস করে। এই অঞ্চলে দশ হাজারের...

থিওরিঃ লুইস হেনরি মরগান ও এক চিলতে বিবর্তনবাদ

প্রাথমিক আলাপ নৃবিজ্ঞানের তত্ত্ব সংক্রান্ত আলাপে শুরুর দিকে যে কয়জন তাত্ত্বিকের...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (দ্বিতীয় কিস্তি)

উদারতাবাদ আর বাকস্বাধীনতার ধরণ বলা হয়ে থাকে ব্লাসফেমির বিরূদ্ধে অভিযোগ একটা...

লিপ প্লেট : ইথিওপিয়ার মুরসি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য

মুরসি জনগোষ্ঠী (মুনি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইথিওপিয়ার নিম্ন ওমো উপত্যকায় বসবাস করে। এই অঞ্চলে দশ হাজারের...

থিওরিঃ লুইস হেনরি মরগান ও এক চিলতে বিবর্তনবাদ

প্রাথমিক আলাপ নৃবিজ্ঞানের তত্ত্ব সংক্রান্ত আলাপে শুরুর দিকে যে কয়জন তাত্ত্বিকের...

থিওরি: টাইলর ও তার তত্ত্ব

নৃবিজ্ঞানের পাঠকদের জন্য এটা মোটেও একটি 'সংবাদ' নয় যে এডওয়ার্ড বারনেট টাইলর নামের এই...

কিভাবে প্রবন্ধ লিখতে হয়ঃ নৃবিজ্ঞানীদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা

‘পাবলিশ কিংবা প্যারিশ’ এই মন্ত্রবাক্য জানা একাডেমিকরা লেখালেখির দক্ষতা আর অনুশীলনের সাথে অবশ্যই পরিচিত।...