আমাদের একটি বিউপনিবেশিক বাস্তুসংস্থান প্রয়োজন

অনুবাদক – তানিয়াহ মাহমুদা তিন্নি

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড একজন ফ্রেঞ্চ তাত্ত্বিক। তিনি  মনে করেন পরিবেশ ধ্বংস হওয়াটা বর্ণবাদী এবং উপনিবেশবাদী শোষণের থেকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। আমরা যেভাবে পৃথিবী দখল করে জেঁকে বসেছি সেখান থেকেই এর শুরু। সেকারণেই আমাদের ইতিহাসের বিনির্মাণ জরুরি। তাঁর বই A Decolonial Ecology ২০০৯ সালে Foundation for Political Ecology literature prize অর্জন করে। এই তাত্ত্বিক রিভ্যু প্রজেক্টের তত্ত্বাবধানে অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিনের মুখোমুখি হয়েছিলেন। কথা বলেছেন বিউপনিবেশায়নের মাধ্যমে বিকল্প বাস্তুসংস্থান গড়ে তোলার প্রয়োজন নিয়ে। ৪ জুন সাক্ষাৎকারটি ফ্রেঞ্চ ভাষায় প্রকাশিত। ২২ জুন, ২০২০ ইংরেজি ভাষান্তর দ্য গ্রীন ইউরোপীয় জার্নালে প্রকাশিত হয়।  ইংরেজি থেকে বাংলায় ভাষান্তর করেছেন তানিয়াহ মাহমুদা তিন্নি (শিক্ষক, প্রিমিয়ার ইউনিভার্সিটি)। ভাষান্তরটি প্রথম প্রকাশিত হয় নয়া দুনিয়া পত্রিকার অনলাইন ভার্সনে। 

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল যুগে আমরা সবসময় পরিবেশ ধ্বংসকারী হিসেবে মানুষের কর্মকাণ্ডকে দায়ী করি। কিন্তু আপনি দেখিয়েছেন কিভাবে এক ধরণের কাঠামোবদ্ধ চিন্তা বছরের পর বছর ধরে চলে আসা দমন-পীড়নের সম্পর্কগুলো আড়াল করে রাখে। পরিবেশ বিপর্যয় নিয়ে ইউরোপীয় ধ্যান ধারণাই কি উপনিবেশবাদকে আড়াল করে দেয়?

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড: আমিই প্রথম সামাজিক বৈষম্য এবং পরিবেশ ধ্বংস এ দুটোর মধ্যে যোগসূত্রর ব্যাপারটা তুলে ধরেছি। এগুলো হল  সামাজিক বাস্তুসংস্হান, রাজনৈতিক বাস্তুসংস্থান এবং পরিবেশ-নারীবাদের বিষয়বস্তু। কিন্তু আমি মনে করি এই বিষয়টি বর্ণবাদ এবং উপনিবেশবাদের লিগ্যাসি বহন করছে। আর এটা নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়েছে। (পরিবেশ গত ন্যায়বিচার আন্দোলন বাদ দিলে)।

পরিবেশ ধ্বংস এবং সামাজিক নিপীড়ন এদুটো সবসময় পারস্পরিক সম্পর্কযুক্ত। কিন্তু আমরা যখনি জলবায়ু সমস্যা মোকাবেলা নিয়ে কথা বলি তখন দাবিগুলো সামাজিক চিন্তা বিবর্জিত হয়। এটাই অন্যদেরকে পরিবেশগত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে উৎসাহিত করে। যেমন, দূষণ মোকাবেলা কিংবা সম্পদের ঘাটতি মেটাতে জিও-ইঞ্জিনিয়ারিং কিংবা কার্বন মার্কেটের সহায়তা নেওয়া।  

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: আপনি পরিবেশ বিপর্যয়েয় উৎস অনুসন্ধান করতে গিয়ে পঞ্চদশ শতাব্দী এবং উপনিবেশবাদী সময়ে ফিরে গেছেন। 

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড: আমরা পরিবেশ বিপর্যয়ের অনেকগুলো ঘটনা উনবিংশ এবং বিংশ শতাব্দীতে ঘটতে দেখেছি ক্রমান্বয়ে। কিন্তু বাস্তুসংস্থানগত সংকট তার আগেই শুরু হয়েছে। এটি মূলত বিশেষভাবে পৃথিবী দখল করারই ফল, অল্প কিছু মানুষের সুবিধার্থে।  পৃথিবীর উপযুক্ত বলে দাবি করা কিছু ব্যক্তির মাধ্যমেই এই দখলদারিত্ব চলমান থাকে। যেটা ক্যারিবিয়ানে শুরু হয়েছিল পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষের দিকে যখন ক্রিস্টোফার কলম্বাস আমেরিকায় পদার্পণ করে। ( যদিও এই মডেলটি এরও আগে শুরু হয়েছিল, উদাহরণস্বরূপ, মাদেইরাই)। ক্যারিবায়নরা  আধুনিক সময়ে গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছে। কারণ ইউরোপিয়ান এবং আমেরেন্ডিয়ানদের বিধ্বংসী সাক্ষাৎ পৃথিবীর “আয়তনের” এর সাথে মিলে গিয়েছিল। আমরা এখন পৃথিবীর সম্পদ পরিমাপ করতে পারি। অনেকের কাছেই এই সময়টা বিশ্বায়নের শুরু বলে পরিচিত।

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: আপনি “ঔপনিবেশিক আর্থসামাজিক জীবনধারা” এর উপর ভিত্তি করে এন্থ্রপসিন থেকে নেগ্রসিনকে আলাদা করে দেখিয়েছেন। এটা কি পুঁজিবাদী শোষণের থেকেও আলাদা?

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড:  ঔপনিবেশিককালে যে কেউ ই শোষিত হয় নি: যদিও ফ্রান্সের কৃষকরা সামাজিক নিপীড়নের শিকার ছিল কিন্তু তারপরও তারা নিজেদের “কালো” দের থেকে উচ্চতর মনে করত। ফ্রান্সের পলিটিক্যাল ইকোলোজিতে বর্ণবাদের ব্যাপারটা সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। এই পয়েন্টে এসে আমি পরিবেশ-মার্কসবাদীদের সাথে ভিন্নমত পোষণ করি। যাদের মতে পুঁজিবাদ সবকিছুর ব্যাখ্যা দিতে পারে অথবা যারা মনে করে সামাজিক বৈষম্য এবং কাঠামোগত বর্ণবাদ এক এবং অভিন্ন। যদিও উপনিবেশ স্থাপন এবং দাসত্ব পুঁজিবাদী যুক্তি দ্বারা চালিত ছিল, সর্বোপরি এই প্রক্রিয়াগুলো ঔপনিবেশিক ধ্যান ধারণায় বিভিন্ন বর্ণের মানুষ এবং পৃথিবীর বিভিন্ন স্হানের মানুষদের মধ্যে এক ধরণের শ্রেণিকরণ (হায়ারারকি) উদ্ভাবন ঘটায়।

ঔপনিবেশিক আমলে আমেরিকা ইউরোপের হস্তগত ছিল। তারা অনেকটা অংশীদারদের খুশি করার মাধ্যম হিসেবে দেখা হত এবং এটি যে কোন ধরনের রীতিনীতিকে বৈধতা দিয়েছিল। এমনকি জমির উর্বরতা রক্ষার্থে গৃহীত পদক্ষেপগুলো শেষ পর্যন্ত শোষণ-নিপীড়ন চালু রাখতেই ব্যবহৃত হত। এই জমিগুলোকে ফ্রান্সের জমির থেকে আলাদা মনে করতে হত।

এটি একটি বিধ্বংসী এবং হিংসাত্মক প্রক্রিয়া,  ঔপনিবেশিকদের দ্বারা প্রভাবিত একটি ভয়াবহ জীবনযাপনের প্রক্রিয়া। যারা অন্য মানুষদের মানুষ বলে গণ্য করত না এবং উপনিবেশের ভূমি ও মানুষ ছাড়া পরিবেশের অন্যান্য উপাদানগুলো আরও অগুরুত্বপূর্ণ ছিল যেগুলো কিনা পৃথিবীকে মানুষের বসবাসের উপযোগী করে তুলেছিল। এটাকেই আমি “ঔপনিবেশিক আর্থসামাজিক জীবনধারা ” বলি।  ঔপনিবেশিক আর্থসামাজিক জীবনধারা  পৃথিবীতে বাস করার একটা বিধ্বংসী প্রক্রিয়া যেখানে জল-জমি-মানুষ-প্রকৃতি সবকিছুকেই ঔপনিবেশিকরা নিজেদের করায়ত্তে নিয়ে আসে, শাসন করে। সেখানে ধর্ম, মেটাফিজিক্স, আইন, সংস্কৃতি ইত্যাদি আরো নানা বিষয়ের এক ধরণের ব্যাখ্যা এবং অনুশীলন তৈরি করা হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৪৮ সালে ফ্রান্সে দ্বিতীয় দফায় দাসপ্রথা এবং উপনিবেশগুলো বিলোপ করা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক ছিল। তারপরেও বিভিন্ন ধারা ব্যবহার করে পূর্বেকার দাসদের চাষাবাদে ব্যবহার করা হয়েছে এবং কৃষির উন্নয়ন সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ১৯৪৮ সালের পরেও জমির মালিকেরা ঔপনিবেশিক মডেলেই ব্যবস্হাপনা রেখে দিয়েছিল। ফলে দখলদারি মানসিকতা এবং হায়ারার্কি পূর্বের ন্যায় থেকে যায়।

 ১৫০২ সালে একজন অজ্ঞাতনামা পর্তুগিজ কার্টোগ্রাফার দ্বারা সম্পন্ন ক্যান্টিনো প্ল্যানস্ফিয়ারটি সর্বকালের অন্যতম মূল্যবান কার্টোগ্রাফিক দলিল। এটি পৃথিবীর এমন চিত্র তুলে ধরেছে যখন তা ইউরোপিয়ানদের কাছে উন্মোচিত। পঞ্চদশ শতাব্দীর শেষ এবং ষোড়শ শতাব্দীর শুরুর আমেরিকা, আফ্রিকা এবং ভারত দেখতে পাই সেখানে। এই কাজটি বর্তমানে ইটালির Biblioteca Universitaria Estense-তে সংরক্ষিত। 

বর্তমানে দাসপ্রথা ছাড়াও এই ধরণের জীবন যাপন ধারণা করা সম্ভব এবং অন্যান্য যায়গায় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। পুরো ফ্রান্স সাম্রাজ্য জুড়ে কলাচাষ, রেশমচাষ এবং খনির কাজ এভাবেই গড়ে উঠেছে। ফ্রান্সের কিছু দ্বীপের ক্লোরডেকন (কীটনাশক) দূষণের কথা যদি বলি, মাত্র ২০ বছর এটির ব্যবহারে শত বছরের ভূমি বিষাক্ত হয়ে উঠেছে এবং হাজারো মানুষকে অসুস্থ করেছে গুটিকয় মানুষের সম্পদের পাহাড় গড়তে।

আমার কাজ এটাই দেখিয়েছে যে আমরা পরিবেশগত সমস্যার প্রযুক্তিগত পাঠে আটকে পড়তে পারি। একটি রাসায়নিক যখন বিষাক্ত সেটির প্রমাণ পাওয়া যায় ,আমরা বাজার থেকে সেটি তুলে নেই। দূষণ অনেক বেশি?  আমরা তখন কোন টেকনিক্যাল সমাধান বাস্তবায়নের চেষ্টা করি। কিন্তু নিম্নবর্গের মানুষেরা শুধু বিশুদ্ধতা চান না এমনকি এ ধরণের অপরাধের বিচার চান না। ফলে পাঁচ শতাব্দী পরেও কোন অভিযোগপত্র দাখিল হয় নি। এটা আসলে ভূমি যেভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে সেই পন্থাটিই পরিবর্তন করার ব্যাপার হওয়া উচিৎ ছিল।

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: যখন আপনি নিম্নবর্গ শব্দটা বলছেন এটা দ্বারা কি বোঝাচ্ছেন? সকল শোষিত মানুষ, শ্রমিক শ্রেণি, নারী, সেক্সুয়াল মাইনোরিটি?

 ম্যালকম ফার্ডিনান্ড: আমি এই শব্দটি “নিগ্রোদের” জন্য ব্যবহার করছি।  এখনকার নিম্নবর্গ যে কোন বর্ণ বা জেন্ডারের নিগ্রো হতে পারে যারা কিনা কৃষি কাজ করে। আমরা নিগ্রো বলতে কালোই ধরে নেই : এটা স্প্যানিশ থেকে এসেছে। যেখানে এই দুটো শব্দের অর্থ একই। কিন্তু কালোরাই একমাত্র নন যারা চাষাবাদ করতে গিয়ে ভুগেছেন এবং এখনো ভুগছেন।  একজন নিগ্রো হল সে, যে কোন প্রকার স্বীকৃতি ছাড়াই অন্যের কাজ করে ।     

নিগ্রোসিন সবার মনোযোগ আকর্ষণ করতে পেরেছে যাদের জীবনীশক্তি অন্যের স্বার্থপর আকাঙ্খা পুরণেই ব্যবহৃত হয়।ফ্রান্সে কালো মানুষদের দাসত্বের ইতিহাস বহুদিন পর্যন্ত উপেক্ষিত থেকেছে। এটা এখনো সামাজিক এবং জেন্ডার বিষয়ক আলোচনায় স্হান পায়। কিন্তু কিভাবে এটি পরিবেশগত ইতিহাসের সাথেও জড়িয়ে আছে সেটা এড়িয়ে যায়। আমাদের অবশ্যই শারীরিক শোষণ এবং ভূমি শোষণ এদুটোর সংযোগ স্হাপন করতে হবে। আমরা যদি অনাধুনিক নীতি থেকে শুরু করি যে শরীর এবং ইকোসিস্টেম বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়, তাহলে আমরা বুঝতে পারব একটির ক্ষতি হলে অন্যটিরও হবে। 

এই দৃষ্টিকোণ আমাদের বুঝতে সাহায্য করবে দাসবিরোধী বিদ্রোহ আদতে উপনিবেশিক আর্থ-সামাজিক জীবনধারার বিরুদ্ধেই প্রতিরোধ। ম্যারোনেজ অর্থাৎ দাসত্ব থেকে মুক্ত হওয়া- এটাই আমার কাজের মূল কেন্দ্রবিন্দু। এটাই আরেক ধরণের জীবনপ্রণালি। ম্যারুন দাসত্বের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার থেকেও বেশি কিছু করে: তারা পৃথিবী এবং প্রকৃতির অন্যান্যদের সাথে ভিন্ন ধরণের একটা সম্পর্ক গড়ে তোলে।

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: উপনিবেশিক ব্যাপারগুলো নিয়ে নিরবতার পরিণতি কি? 

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড:  আমি এক্ষেত্রে দুটো সমস্যা দেখি। দাসপ্রথা বিলুপ্ত হওয়ার ১৫০তম বর্ষপূর্তির আগ পর্যন্ত আমরা স্বীকার করিনি কি কি হয়ে গেছে। ফ্রান্সে দাসত্ব খুবই স্পর্শকাতর একটা বিষয়। আমি যখন স্কুলগুলোতে বর্ণবাদ এবং দাসত্ব নিয়ে সচেতনতামূলক কোন সেশন করতে যাই কিছু শিক্ষক চান না আমি কালোদের নিয়ে কথা বলি। প্রেসিডেন্সিয়াল ক্যানডিডেট ফ্রাঙ্কোস ফিলন ২০১৭ সালে ঔপনিবেশিক ইতিহাস নিয়ে কথা বলতে বলেছেন, ফ্রান্স নিজেদের সংস্কৃতি আফ্রিকার সাথে শেয়ার করতে চেয়েছিল এটার জন্য অপরাধবোধে ভোগার কোন কারণ নেই। অন্যদিকে পরিবেশবাদকেও সম্পূর্ণ ভিন্নভাবে নির্মাণ করা হয়েছে যে এটা বর্ণবাদের থেকে আলাদা কিছু। এটাও সত্যি বেশিরভাগ পরিবেশবাদী এক্টিভিস্ট সাদা (তারা এটা স্বীকার করে)। 

এ কারণেই আমি বলব ঔপনিবেশিকতা সংক্রান্ত নিরবতা “দ্বিবিধ  বিভাজন” করতে সাহায্য করেছে। তারা পরিবেশ সংক্রান্ত বিষয় এবং ঔপনিবেশিক চিন্তাকাঠামো এ দুটোকে আলাদা করে ফেলেছে এবং জনগনের একটা বড় অংশকে বাইরে রেখেছে যারা কিনা পৃথিবীর অংশীদার। তারপরেও উপনিবেশে বসবাসকারী মানুষ পরিবেশ সংক্রান্ত চিন্তায় অবদান রাখতে পারে। কিন্তু এক ধরণের ব্যাখ্যা দাঁড় করানো হয়েছে যে, বর্ণবাদের শিকার মানুষ পরিবেশের ব্যাপারে আগ্রহী নয়। তারা নিজেদের বিচ্ছিনতা ধরে রাখতে পছন্দ করে। এই ধরণের বিচ্ছিনতা বর্ণবাদের শিকার মানুষদের মধ্যে অবিশ্বাসের জায়গা তৈরি করে। শুরুতেই পরিবেশ সংক্রান্ত আলাপ আলোচনা ক্ষেত্রে একটা কাল্পনিক দেওয়াল তৈরি করে অন্যদের ভুমিকা এবং অংশগ্রহণের পথে বাঁধা তৈরি করা হয়। 

 আর কি চাই? উপনিবেশিক বিভাজন মানেই হল পরিবেশ সংক্রান্ত ইস্যু অগুরুত্বপূর্ণ। আমার বই ‘অ্যা ডিকলোনিয়াল ইকোলজি’ তে আমি পরিবেশবাদ এবং বিউপনিবেশায়ন এ দুটোর মধ্যে সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করেছি। আমি দেখানোর চেষ্টা করেছি ১৪৯২ থেকে ভাঙ্গনের শুরু, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ধরিত্রীর সাথে বিকল্প সম্পর্ক গড়ে তোলার ব্যাপারে প্রস্তাব দিচ্ছেন। তাদের কণ্ঠস্বর সামনে আসছে না, অন্তত পরিবেশবাদী আন্দোলনগুলোতে তো আসছেই না। অথচ পরিবেশবাদীদের বইয়ের নানা সংকলন প্রকাশিত হচ্ছে যেখানে কোন কালো লেখকের লেখা দেখতে পাওয়া যায় না। ফলে একটা মিথ শোনা যায় যে পরিবেশবাদ শুধুমাত্র উত্তর মেরুর সাদা মানুষদের দ্বারা পরিচালিত। এই মিথ মূলত সেই মানুষদের মধ্যে প্রচলিত যারা কোন না কোন সময় উপনিবেশ অথবা দাস ছিল। 

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: আমরা কিভাবে সামাজিক ন্যায়বিচার, বর্ণবাদ বিরোধী লড়াই এবং ইকোসিস্টেম সংরক্ষণ এই বিষয়গুলো একত্রিত করে চিন্তা করব? প্রকৃতির সংজ্ঞায়ন নতুনভাবে করার মধ্য দিয়ে কি এগুলোর মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে হবে?

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড:  ইউরোপকেন্দ্রিকতা এবং পাশ্চাত্যকেন্দ্রিকতা আমাদের অন্যভাবে দেখতে বাঁধা প্রদান করে। আবার আদিবাসীদের নিয়ে আমরা রোম্যান্টিকতায় ভুগি, ‘ওহ! আমরা যদি গুয়ারানির মত জীবনযাপন করতে পারতাম!’ আমরা তাদের জীবনযাপন প্রণালি উদযাপন করতে পারব না যদি না আমরা তাদের প্রান্তিকীকরণের সামাজিক এবং রাজনৈতিক ইতিহাসকে স্বীকার না করি। এটা মনে রাখা জরুরি আদিবাসীদের আত্মহত্যার হার অন্যদের থেকে ১০ ভাগ বেশি। 

তাই তাদের দৃষ্টিকোণ থেকেই আমাদের চ্যালেঞ্জ করতে দিতে হবে, তাদের ইতিহাস এবং তারা কি চায় সেটা মনে রেখেই। এই মানুষগুলো ধরিত্রীর সাথে নিজেদের সম্পর্ক বোঝাতে কি পরিভাষা ব্যবহার করে? এভাবেই আমরা পরিবেশগত ন্যায়বিচারের দ্বিবিধ বিভাজনের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করতে পারি। উদাহরণস্বরূপ পরিবেশ ধবংসের ব্যাপারে আমরা বলি আন্তপ্রজন্ম একটা সম্পর্ক স্থাপনের কথা ( আমরা আমাদের কাজকর্মের প্রভাব সন্তানের উপর পড়বে বলে চিন্তা করি, উত্তরসূরির দায়িত্ব নেই), কিন্তু এই ব্যাপারগুলো শুধু পরিবেশবাদীদের দৃষ্টিকোণ থেকে নেই। সামাজিক এবং রাজনৈতিক দিক থেকে চিন্তা করি না। আদিবাসীদের শোষণকে স্বীকার করে ন্যায়বিচারের পাশাপাশি দাসত্বের ক্ষতিপূরণ দাবি করতে হবে। 

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: আজকের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক নীতি-নির্ধারকরা তো উপনিবেশিক ব্যাপারটাকে ঢেকে রাখতে চান… 

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড: আমাদের জরুরিভিত্তিতে পরিবেশ সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে; আমরা কেমন পৃথিবীতে বসবাস করতে চাই? আমাদের অবশ্যই বিভিন্ন সংস্কৃতি এবং বর্ণের স্বীকৃতি দিতে হবে। শুধুমাত্র প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা নিলে চলবে না। এটাকেই আমি ‘বিউপনিবেশিক ইকোলজি’ বলি। 

অরোরা শেইলো এবং লুইস রবলিন: এই প্যারাডাইম পরিবর্তনের ব্যাপারটা অনেকটা কল্পনায় পরিবর্তন হচ্ছে বলে মনে হয়। আপনার বই অনেকটা সাহিত্যের ধাঁচে লেখা। 

ম্যালকম ফার্ডিনান্ড:  আমি যদি সাহিত্যকর্মের লাইসেন্স নিয়ে থাকি তাহলে বিষয়গুলো অনুভব করানোর প্রয়োজন পড়বে শুধু প্রদর্শনের নয়। ইতিহাসবিদরা যখন বলে যে তারা বিজ্ঞানভিত্তিক কাজ করছেন তখন সংখ্যা নিয়ে কাজ করেন। কিন্তু যখন আমাদের ফ্যাক্ট থাকে তখন আমরা চিন্তা এবং অনুভব করতে চাইনা যে কি ঘটেছে। সংখ্যা নিয়ে কাজ করি, পুনঃ অনুসন্ধান করি, এভাবেই দাসপ্রথা আমাদের কাছে পৃথিবী এবং ধরিত্রীর গল্প হিসেবে ধরা দেয়। 

পৃথিবীকে স্পর্শ করার ব্যাপারটার সাথে ভালবাসা এবং ন্যায়বিচারের মত মূল্যবোধ প্রয়োজন। আমরা যদি জিজ্ঞেস করি উপনিবেশবাদ এবং দাসত্বের পর আমরা পৃথিবীকে কিভাবে গড়ে তুলব? সবাই সবার থেকে দূরে সরে থাকব এটা তো সবার উত্তর হবে না। আমার বইয়ে আমি দেখিয়েছি একদিকে কেউ কেউ জন্মভূমি থেকে পালিয়েছে তাদের উপর হওয়া অত্যাচারের কারণে অন্যদিকে কিছু মানুষ পৃথিবীতে অন্যদের অধিকার স্বীকারই করছে না। কিন্তু আমি তাদের কথাও বলেছি যারা একসাথে থাকতে চায়। শেষমেষ আমরা সবাই একই নৌকায়। 

কিন্তু পরিবেশবাদীদের কেউ কেউ নুহের নৌকার গল্পের দ্বারা ভীত। মিশেল সেরেস, একটি পেইন্টিং এর মাধ্যমে রাজনৈতিক তত্ত্ব দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছেনঃ আমরা সবাই নুহ। এটা একটা সমাজে একটি তত্ত্বের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করে যে, পৃথিবীর সাথে সম্পর্ক কেমন হবে। কিন্তু নুহের নৌকার মাধমে একটি নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ইঙ্গিত দেওয়া হয় যেটিকে আমি বিধ্বংসী মনে করি। আবার এটি নৌকায় ওঠার প্রক্রিয়ায় গুরুত্বারোপ করে যে এখানে কি হচ্ছে আমরা কিছুই জানি না। রাজনৈতিকভাবে এটির ব্যবহার সমস্যাজনক। 

বরং আমি দাসদের নৌকা পছন্দ করি, যেটি কিনা অনেক আফ্রো-বংশোদ্ভুত মানুষেরা ভাগাভাগি করছে, কারণ যদিও আমরা একই নৌকায় আছি কিন্তু সবার অবস্থা এক নয়। ঐতিহাসিকভাবে, কালোদের মধ্যে আমেরিকায় কারা রক্ষা পেয়েছিল সেটিও বেদনাদায়কঃ আমরা জানি কারা বেঁচে গিয়েছিল এবং কারা পরিত্যাক্ত হয়েছে। এমনকি আজও ঝড়ের সময় আমরা কার সাথে থাকতে পারব না সেটার ছুতা খুঁজি। 

এ কারণে তুমি নুহের নৌকা কিংবা দাসদের জাহাজ তৈরি করতে পারবে না। আমি প্রস্তাব করি একটা বিশ্ব-জাহাজ যেটি মানুষ এবং অন্যান্যদের দ্বারা পরিপূর্ণ যেখানে সবার ইতিহাসকে গুরুত্ব দেওয়া হবে। এই জাহাজ কারো হাতেই থাকবে না। সবাই পাটাতনে বসবাস করবে। 

Related Articles

তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (দ্বিতীয় কিস্তি)

উদারতাবাদ আর বাকস্বাধীনতার ধরণ বলা হয়ে থাকে ব্লাসফেমির বিরূদ্ধে অভিযোগ একটা...

লিপ প্লেট : ইথিওপিয়ার মুরসি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য

মুরসি জনগোষ্ঠী (মুনি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইথিওপিয়ার নিম্ন ওমো উপত্যকায় বসবাস করে। এই অঞ্চলে দশ হাজারের...

থিওরিঃ লুইস হেনরি মরগান ও এক চিলতে বিবর্তনবাদ

প্রাথমিক আলাপ নৃবিজ্ঞানের তত্ত্ব সংক্রান্ত আলাপে শুরুর দিকে যে কয়জন তাত্ত্বিকের...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (দ্বিতীয় কিস্তি)

উদারতাবাদ আর বাকস্বাধীনতার ধরণ বলা হয়ে থাকে ব্লাসফেমির বিরূদ্ধে অভিযোগ একটা...

লিপ প্লেট : ইথিওপিয়ার মুরসি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য

মুরসি জনগোষ্ঠী (মুনি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইথিওপিয়ার নিম্ন ওমো উপত্যকায় বসবাস করে। এই অঞ্চলে দশ হাজারের...

থিওরিঃ লুইস হেনরি মরগান ও এক চিলতে বিবর্তনবাদ

প্রাথমিক আলাপ নৃবিজ্ঞানের তত্ত্ব সংক্রান্ত আলাপে শুরুর দিকে যে কয়জন তাত্ত্বিকের...

থিওরি: টাইলর ও তার তত্ত্ব

নৃবিজ্ঞানের পাঠকদের জন্য এটা মোটেও একটি 'সংবাদ' নয় যে এডওয়ার্ড বারনেট টাইলর নামের এই...

কিভাবে প্রবন্ধ লিখতে হয়ঃ নৃবিজ্ঞানীদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা

‘পাবলিশ কিংবা প্যারিশ’ এই মন্ত্রবাক্য জানা একাডেমিকরা লেখালেখির দক্ষতা আর অনুশীলনের সাথে অবশ্যই পরিচিত।...