কেন মানসিক স্বাস্থ্য একটি রাজনৈতিক ইস্যু?

পৃথিবীর বিভিন্ন দেশেই ওয়েলফেয়ার সিস্টেমের অধীনে জনগণকে সামাজিক সুরক্ষা ও সহযোগিতা প্রদান করা হয়। কিন্তু নব্য-উদারপন্থী নীতির অধীনে বর্তমানে অনেক দেশে এই ব্যবস্থার সংস্কার করা হচ্ছে। একেই ওয়েলফেয়ার রিফর্ম বলা হয়। ওয়েলফেয়ার রিফর্মের নামে সরকার কর্তৃক জনগণের প্রতি প্রদত্ত সুবিধা হ্রাস করা হচ্ছে। এবং সাধারণ মানুষকে সরকারের প্রতি নির্ভরশীল না থেকে তথাকথিত আত্মনির্ভর হতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। ইংল্যান্ডের ওয়েলফেয়ার রিফর্ম এ্যাক্ট ২০১২–এ অনেক মানুষের আবাসন সুবিধা হ্রাস করা হয়, এবং তাদের কাজে ফিরে যেতে বাধ্য করা হয়। অথচ তাদের কাজ ও সুস্থ কর্ম-পরিবেশ প্রদানের ক্ষেত্রে সরকারের তেমন কোনো সহযোগিতা পরিলক্ষিত হয় না। এছাড়াও এই এ্যাক্টে কোনো নতুন ট্যাক্সের কথা সরাসরি উল্লেখ না থাকলেও, প্রচ্ছন্নভাবে আবাসনের ক্ষেত্রে ট্যাক্সের কথা বলা আছে। সরকারের এমন গাফেলতির ফলস্বরূপ সমাজের সাধারণ মানুষের স্ট্রেস ক্রমশ বাড়তেই থাকে ও মানসিক অবস্থা নিম্নগামী হতে থাকে। অথচ তাও মানসিক অসুস্থতাকে স্রেফ একটি মেডিকেল সমস্যা বানিয়ে রেখে তার সামাজিক ও রাজনৈতিক কারণগুলো এড়িয়ে যাওয়া হয়। এই পরিপ্রেক্ষিতে ২০১২ সালে মার্ক ফিশার তার এই আর্টিকেলটি গার্ডিয়ানে প্রকাশ করেন। এনথ্রোসার্কেলের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাহীন হক। 

“ওয়েলফেয়ার রিফর্মের সাথে আত্মহত্যার কোনো সম্বন্ধ নেই। আত্মহত্যা সম্পূর্ণভাবে একটি মানসিক ব্যাপার।” সাবেক লেবার পার্টির সদস্য  লিউক বোজিয়ারের এই কথাটার মধ্যেই Calum’s List এর মত ওয়েবসাইটের প্রতি ডানপন্থী ধারাগুলোর প্রচলিত মনোভাবের পরিচয় পাওয়া যায়। ওয়েবসাইটটির প্রতিষ্ঠাতাদের মতে, Calum’s List এর লক্ষ্য হলো “এমনসব মৃত্যুর তালিকা করা যার জন্য কিছু মাত্রায় প্রশাসন দ্বারা সংঘটিত ওয়েলফেয়ার রিফর্ম পলিসি দায়ী, এবং সেই মৃত্যুর হার কমাতে সম্ভাব্য সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালিয়ে যাওয়া।”  বোজিয়ারের ওই টুইটটি বিভিন্ন ব্লগপোস্টে জ্বলজ্বল করে টাঙানো ছিল। 

কিন্তু Calum’s List এর বিরুদ্ধে তোলা তাদের যুক্তিগুলো অনেকাংশেই ফ্রয়েডের ‘কেতলি যুক্তি’র মত (তোমার কেতলিটা আমি ধার নেই নাই। আমি কেতলিটা ধার নেয়ার আগে থেকেই ভাঙা ছিল, ফেরত দেওয়ার সময় কেতলির কোন ক্ষতি হয় নাই) তাদের যুক্তি হলো এইরকমঃ সমাজের পরিবর্তনের সাথে এই আত্মহত্যাগুলোর কোনো সম্বন্ধ নেই, সুতরাং এসবের উল্লেখ করা হচ্ছে স্রেফ সুবিধাবাদী ভাওতাবাজি। আর যদি আত্মহত্যাগুলো সামাজিক সংস্কারের কারণেও হয়ে থাকে, তাহলেও সমস্যা ঠিক ওই সংস্কারে না, বরং তার ব্যবস্থাপনায় (যেমন যাদের কাজে যাবার জন্য বাধ্য করা হচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত সহযোগিতা করা); আত্মহত্যা কোনো যুক্তিসঙ্গত কাজ না, সুতরাং এর কোনো রাজনৈতিক গুরুত্ব থাকতে পারে না। 

নির্দিষ্ট কিছু আত্মহত্যার পিছনে আসলেই নব্য-প্রণীত আইনের হাত ছিল কিনা তা নিয়ে আমি এখন তর্ক করবো না। কিন্তু আমি অবশ্যই এই উদ্ভট ধারণার বিরুদ্ধে দাঁড়াতে চাই যে, উন্নয়ন ব্যবস্থার ত্রুটি প্রদর্শনের ক্ষেত্রে আত্মহত্যা কোনো প্রমাণ বলে গণ্য হতে পারবে না। কোনো পরিকল্পনা বাস্তবায়নের ফলে ঘটিত মানুষের মৃত্যু যদি সেই প্রকল্পের ক্ষতিকর প্রভাবের প্রমাণ হয়ে না দাঁড়ায়, তাহলে আর কী হবে?

আত্মহত্যার প্রতি ও’নিলের মনোভাব খুবই অদ্ভূতরকমের জাজমেন্টাল, তার মতে “আর্থিক সংকটের মুখে পড়ে আত্মহত্যা করা কোনো যৌক্তিক সিদ্ধান্ত না; নিজের সুবিধায় টান পড়লেই আত্মহত্যা করা কোনো যৌক্তিক কাজ না”। এখানে খুবই চমৎকারভাবে তিনি মূল বিষয়টাই এড়িয়ে গেলেনঃ  মানসিক অসুস্থতায় ভোগা অধিকাংশ মানুষের জন্য যৌক্তিক চিন্তা করার ক্ষমতাই সীমিত হয়ে যেতে থাকে, এবং এইজন্যই তাদেরকে রক্ষা করতে হবে। আর যারা কাজে ফেরত যাচ্ছে তাদের পর্যাপ্ত সহযোগিতার কথা যদি বলি, সেই পর্যাপ্ত সহযোগিতার অভাবই তো প্রধান সমস্যা। Atos নামে যেই এজেন্সির দায়িত্ব ছিল পরীক্ষা করে দেখা যে দাবিদাররা আসলেই কাজে ফেরার মত অবস্থায় আছে কিনা, সেই এজেন্সির সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে অসংখ্য আবেদন করা হয়েছে। আর যারা কাজে ফিরতে যাচ্ছে, সরকার যে তাদের সাহায্য করবে তাতেও বা কীভাবে ভরসা করা যায়, যেখানে তারা  এই দায়িত্বটি A4e এর মত নিন্দিত একটি এজেন্সির হাতে দিয়েছে?

কিন্তু এখানে আসল সমস্যাটা আরো বিস্তর। এই ডানপন্থী ভাষ্যকাররা Calum’s List-কে এই বলে দোষারোপ করছেন যে, তারা নাকি মানসিক অসুস্থতাকে একটি রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে ফেলছেন, কিন্তু আসলে সমস্যা ঠিক উলটো। মানসিক অসুস্থতাকে রাজনীতির থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলা হয়েছে, ফলে আমরা এটা খুব স্বাভাবিকভাবে মেনে নিচ্ছি ডিপ্রেসন হচ্ছে এমন এক রোগ যা প্রতিকারের দায়িত্ব জাতীয় স্বাস্থ সুরক্ষা সার্ভিসের। প্রথমে থ্যাচার সরকার দ্বারা ১৯৮০ সালে প্রণীত নব্য-উদারপন্থী নীতিমালা এবং নিউ লেবার দ্বারা আরো এগিয়ে নিয়ে যাওয়া ও সর্বশেষ নব্য-উদারপন্থী নীতির নতুন নতুন সংযুক্তির ফলে স্ট্রেস খুব ব্যক্তিগত একটা বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। নব্য-উদারপন্থী সরকারের অধীনে কর্মচারীদের বেতন বাড়ছে না, তারা অগ্রহণযোগ্য কর্ম-পরিবেশ ও চাকরির নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। আজকের গার্ডিয়ান রিপোর্ট অনুযায়ী, মধ্যবয়স্ক পুরুষদের মাঝে আত্মহত্যার হার ক্রমশই বেড়ে চলছে। এবং CALM (Campaign Against Living Miserably) এর প্রধান কার্যনির্বাহী জেন পাওয়েলের মতে, এই বর্ধিষ্ণু আত্মহত্যার হারের সাথে বেকারত্ব ও অনিশ্চিত চাকরির সম্পর্ক রয়েছে। যেহেতু বর্তমান সমাজে অনিশ্চয়তা ও উদ্বেগ ক্রমশ বেড়েই চলছে, সুতরাং খুব স্বাভাবিকভাবেই মোট জনসংখ্যার একটা বিশাল অংশ দীর্ঘকালীন মানসিক যন্ত্রণায় ভোগে। কিন্তু ডিপ্রেশনকে কেবল চিকিৎসার ব্যাপার বলে মনে করাটাও একটা সমস্যা। 

শিক্ষাব্যবস্থার মতই, জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা ও অন্যান্য জনসেবাগুলোকে বাধ্য করা হয়েছে প্রশাসন দ্বারা ইচ্ছাকৃতভাবে পারস্পরিক নির্ভরতা ও নিরাপত্তা নষ্ট করার ফলে মানুষের যে সামাজিক ও মানসিক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে তা সামলাতে। যেখানে একসময় কোনো কর্মী মানসিক চাপে ভুগলে শ্রমিকসমিতির কাছে যেতো, সেখানে এখন তাদেরকে বলা হয় ডাক্তার দেখাতে, অথবা, যদি তার অতটা সামর্থ্য থাকে, তাহলে একজন থেরাপিস্টের কাছে যেতে। 

মার্ক ফিশার

এটা খুবই হাস্যকর হবে যদি আমি বলি ডিপ্রেশনের প্রতিটি কেসের জন্যই আর্থিক বা রাজনৈতিক কোনো কারণ দায়ী। কিন্তু তা সমান হাস্যকর হবে যদি কেউ মনে করে–যেমনটা আজকাল ডিপ্রেশন-সংক্রান্ত বেশিরভাগ আলাপেই ধরে নেয়া হয়–সকল ডিপ্রেশনের মূল কারণ হলো ব্যক্তি মানুষের মস্তিষ্কের রসায়ন অথবা ছোটবেলার কোনো বাজে অভিজ্ঞতা। অধিকাংশ সাইকিয়াট্রিস্ট মনে করেন ডিপ্রেশনের প্রধান কারণ হলো মস্তিষ্কের ভিতর কোনো কেমিকেল ইম্ব্যালেন্স, ওষুধ দ্বারা যার চিকিৎসা করা সম্ভব। কিন্তু বেশিরভাগ সময়ই তারা মানসিক অসুস্থতার পিছনে দায়ী সামাজিক কারণগুলো উল্লেখ করেন না।  

র‍্যাডিকেল থেরাপিস্ট ডেভিড স্মেইলের মতে, বর্তমানে প্রচলিত প্রায় সকল ধরণের থেরাপির মাঝে মার্গারেট থ্যাচারের, “সমাজ বলতে কিছু নেই, আছে কেবল ব্যক্তিমানুষ ও তাদের পরিবার” কথাটির প্রচ্ছন্ন প্রতিধ্বনি শুনতে পাওয়া যায়। শৈশবের কিছু ঘটনা ও আত্ম-উন্নয়নের বয়ান শুনিয়ে মানুষকে বোঝানো হয়-  তারা চাইলে নিজের জীবনের চাকা নিজের হাতে নিতে পারবেন। ধারণাটা হচ্ছে এমন, “আপনার বিশেষজ্ঞ থেরাপিস্ট ও কাউন্সিলরের সহযোগিতার মাধ্যমে আপনি আপনার চারপাশের দুনিয়া বদলে ফেলতে পারবেন, এটা সম্পূর্ণ আপনার উপরই নির্ভর করে। এবং এর মাধ্যমে আপনি মানসিক সমস্যার প্রতিকার পাবেন।” স্মেইল এই দৃষ্টিভঙ্গিকে বলেন “Magical Voluntarism”.

ডিপ্রেশন আমাদের বর্তমান পুঁজিবাদী সংস্কৃতিরই অন্ধকার দিক, সেটা বুঝা যায় যখন  Magical Voluntarism মুখোমুখি হয় সীমিত সুযোগের। সাইকোলজিস্ট অলিভার জেমস তার ‘The Selfish Capitalist‘ বইয়ে বলেন, “একটা পুঁজিবাদী সমাজে আমাদের শেখানো হয়, ধনীরাই হচ্ছে বিজয়ী এবং কঠোর পরিশ্রম করলে যেকোনো কারো পক্ষেই সাফল্যের শীর্ষে পৌঁছানো সম্ভব–তা তার পারিবারিক, জাতিগত ও সামাজিক পরিচয় যাই হোক না কেন। আর যদি তুমি সফল হতে না পারো, তবে তার জন্য দায়ী একমাত্র তুমি নিজেই।” এখন সময় এসেছে দায়টা সঠিক ঘাড়ে বসানোর। স্ট্রেসকে নেহাৎ ব্যক্তিগত ব্যাপার বলে মনে করা বন্ধ করতে হবে এবং বুঝতে হবে যে মানসিক অসুস্থতা একটি রাজনৈতিক বিষয়ও বটে।  

মূল লেখার লিংক

Related Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।...

বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

'বর্জন' কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য  এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস...