তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (প্রথম কিস্তি)

[তালাল আসাদেরবাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ লেখাটি নেওয়া হয়েছে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Is Critic Secular? Blasphemy, Injury, and Free Speech’ বইটি থেকে। এই লেখাটিতে তালাল আসাদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ক্রিটিক আর প্রাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে নতুনভাবে দেখতে চেয়েছেন। লেখাটি এনথ্রোসার্কেলের জন্য অনুবাদ করেছেন সাদিয়া শান্তা। এই অনুবাদটি কয়েকটি কিস্তিতে এনথ্রোসার্কেলে প্রকাশিত হবে। আজকে প্রকাশিত হল প্রথম কিস্তি]

বহু বছর ধরে ইউরোপ-আমেরিকায় বাকস্বাধীনতা আর এর উপর হুমকি নিয়ে আলাপ আলোচনা হয়ে আসছে। বিশেষ করে যখন ইসলাম ধর্মের প্রকাশ্য সমালোচনা হয় তখন মুসলিমরা একে ‘ধর্ম অবমাননা’ হিসেবে অভিহিত করে। সাম্প্রতিক ঘটনাটি ছিল ডেনমার্কে নবী মোহাম্মদের কার্টুন কেলেঙ্কারি (scandal) নিয়ে। সালমান রুশদীর ঘটনার প্রায় দেড় দশক পরে আবারো ইউরোপ ও বাইরের মুসলিমদের মধ্যে ব্লাসফেমি নিয়ে হুমকির ব্যাপারটি মাথা চাড়া দিয়ে উঠেছে, যার ফলে তারা ধর্মনিরপেক্ষতার স্বাধীনতা খর্ব করার চেষ্টা করছে। অথবা, সেরকমটাই আমাদের বুঝানো হয়েছে। এই ঘটনার ফলে একদিকে যেমন ক্রুদ্ধ বিক্ষোভ, প্রতিবাদ এবং সহিংসতা ছিল, অন্যদিকে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ও বিভিন্ন নীতির উপর ভিত্তি করে দেওয়া বিবৃতিও ছিল। ইউরোপীয় সমাজে মুসলিম অভিবাসীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়ার হুমকি প্রসঙ্গে ও ইসলামপন্থীদের সাথে ‘বৈশ্বিক ভীতি’র একটি যোগসাজশ তৈরীতে এই বিষয়টিকে বড় পরিসরে আলোচনা করা হয়। ওয়ার্ল্ড ট্রেড সেন্টারে হামলা ও লন্ডনের বোমা হামলার ঘটনার পর ডেনমার্কের কার্টুন কেলেঙ্কারির ঘটনাটিতে আরো বিস্তৃতভাবে এই আলোচনা উঠে আসে: পশ্চিমাদের (ইউরোপীয়দের) ‘সন্ত্রাসের বিরূদ্ধে লড়াই’ নামক দ্বন্দ্বটিকে অনেকেই বিবেচনা করে ইসলাম ও ইউরোপ- এই দুই সভ্যতার অন্তর্মুখী শত্রুতার অংশ হিসেবে। ইসলামিক গবেষক ও পন্ডিতরা এই মৌলিক বিরোধিতাকে উপেক্ষা করায় ডেনমার্কের প্রেস ও রাজনীতিবিদরা তাদের সমালোচনা করতে শুরু করে। এখানে বিতর্কিত বিষয়টি ছিল- ইসলামিক পন্ডিতরা ইচ্ছাকৃতভাবে সভ্যতার অন্তর্মুখী শত্রুতার প্রসঙ্গটি এড়িয়ে গেছেন, যেখানে ইসলামকে কেবল বৈশ্বিক অখণ্ডতায় একটা বাঁধা হিসেবেই দেখা হয় না বরং ‘সম্ভাব্য নিরাপত্তা হুমকি’ হিসেবেও চিহ্নিত করা হতে পারে।

নবীর কার্টুন কেলেঙ্কারির বিষয়ে মুসলিম এবং অমুসলিমদের মধ্যে যে মনোভাব দেখা গিয়েছিল তা বাস্তবিকই স্মরণীয়। যাই হোক, এই প্রবন্ধটি সেসব মনোভাব প্রসঙ্গে আমার আত্মসমর্থন নয়, কিংবা- সমালোচনাও নয়। এটি ধর্মনিরপেক্ষ মুক্ত সমাজে ধর্মসংক্রান্ত ধারণা বা ব্লাসফেমির ক্ষেত্র সম্বন্ধে ভাববার একটা প্রচেষ্টা। এবার আমি বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে ‘ব্লাসফেমি’ বিষয়টি নিয়ে ভাবতে চাই এবং একে উদারনৈতিক ইউরোপের নৈতিক ও রাজনৈতিক সমস্যার দানা বাঁধার সাথে তুলনা করে দেখতে চাই। সুতরাং আমাকে ইসলামী চিন্তা-ভাবনা, নীতি-নৈতিকতা চর্চা ও ব্যবহারের যতোটা ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করতে হবে, তার চেয়ে বেশি ব্যাখ্যা করতে হবে আধুনিক ধর্মনিরপেক্ষ যে সমাজে আমরা বসবাস করি তার অবস্থা প্রসঙ্গে।

সভ্যতার দিশাচিহ্ন হিসেবে ব্লাসফেমি

ড্যানিশ কার্টুন কেলেঙ্কারির প্রেক্ষাপটে ইউরো-আমেরিকানরা যে দ্বন্দ্ব দেখেছে তা ছিল পাশ্চাত্য ও ইসলামের মধ্যে, যেখানে একদিকে ছিল গণতন্ত্র, ধর্ম নিরপেক্ষতা ও যুক্তির পাল্লা এবং অন্যদিকে ছিল ধর্ম, কর্তৃত্ব, অত্যাচার ও সহিংসতার পাল্লা। ব্লাসফেমির ধারণাটি পরিষ্কারভাবেই পরের পাল্লাতে অবস্থান করে। কিন্তু ধর্মনিরপেক্ষতাবাদীরা একে দেখেছে গণতান্ত্রিক নীতি দ্বারা প্রতিশ্রুতিবদ্ধ স্বাধীনতার উপর বাকস্বাধীনতার একটি প্রতিবন্ধক হিসেবে  ও পাশ্চাত্য সংস্কৃতিকেন্দ্রিক একটি বিষয় হিসাবে। ২০০৬ সালে পোপ বেনেডিক্ট রিজেনবার্গে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি খ্রিস্টান সভ্যতা ও ইসলামী সভ্যতার বিরোধিতার উপর জোর দেন। তিনি বলেন, খ্রিস্টান ধর্মানুযায়ী গ্রীকদের যুক্তির সাথে বাইবেল বিশ্বাসীরা একমত হয়। কিন্তু ইসলাম ধর্মের অনুসারীরা যুক্তিতে বিশ্বাসী নয় বলে সহিংসতাকে উস্কে দেয়।

বলা হয়ে থাকে বাকস্বাধীনতা গণতন্ত্রের কেন্দ্রস্থল। পোপ বেনেডিক্ট এবং ড্যানিশ কার্টুন কেলেঙ্কারির সমর্থকদের সাথে সামঞ্জস্য রেখে এমনটি দাবী করা হয় যে, খ্রিষ্টান ধর্মের মূলে রয়েছে গণতন্ত্র, কিন্তু ইসলাম ধর্ম গণতন্ত্র বিরোধী। এমন একটি বিস্তৃত বিশ্বাস আছে যে খ্রিস্টানধর্ম গণতন্ত্র ধারণ করতে সক্ষম কেননা খ্রিস্টান সমাজে চার্চ এবং রাষ্ট্র দুটি আলাদা সত্ত্বা। ধর্মগুলোর উদ্ভব নিয়ে সচরাচর যেসব ধারণা পোষণ করা হয়, বাস্তবে বিষয়টি আরো জটিল। খ্রিস্টান ধর্মের সূত্রপাত কবে হয়? অথবা ইসলামের? এটা অবশ্যই ভুলে যাওয়া চলবে না যে বাইজাইন্টাইনের স্টেট-চার্চে কেন্দ্রীয় খ্রিস্টান মতবাদ সূত্রবদ্ধ করা হয়েছিল, এমনকি মধ্যযুগ জুড়েও তা তৈরি করা হয়েছিল এবং এর জন্যে লড়াই করা হয়েছিল। সেইসময় ধর্মীয় কর্তৃত্ব ও রাজনৈতিক কর্তৃত্বের সম্পূর্ণ বিচ্ছেদ ছিল না। যে রাজনৈতিক বৈষম্য ছিল তাও সাধারণত বৈধ হিসাবে বিবেচিত ছিল। এটা বলার অপেক্ষা রাখে না যে খ্রিস্টানরা এই বৈষম্য বা অসমতার পক্ষে ছিল এবং তাদের বিরোধীরা ছিল সবসময়ই অ-খ্রিস্টান। এ বিষয়ে সব ঐতিহাসিকগণই জানেন যে সম-অধিকারের সংগ্রাম ছিল আদর্শগতভাবে এবং সামাজিকভাবে বেশ জটিল।

সম্প্রতি রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ফুকুয়ামাসহ বহু ইউরোপীয়-আমেরিকানরা  খ্রিষ্টানদের ‘মানুষের সর্বজনীন মর্যাদা’র মতবাদটিকে (দ্য ইউনিভার্সাল ডিগনিটি অফ ম্যান) পশ্চিমাদের অনন্য সম্পদ হিসেবে দাবী করার জন্য খ্রিষ্টান ধারনাগুলোর মধ্যে ‘রাজনৈতিন সমতা’র ধারণা তালাশ করার মাধ্যমে গণতন্ত্রের সাথে এর সম্পর্ক দেখানোর চেষ্টা করেছেন। মধ্যযুগীয় লাতিন ভাষায় ‘ডিগনিটাস’ (dignitas) বলতে উচ্চ পদের বিশেষাধিকার ও স্বাতন্ত্র্যকে বুঝানো হতো, সকল মানুষের সম-অধিকারকে নয়। যদিও খ্রিষ্টধর্মে বৈশ্বিকভাবে আধ্যাত্মিক মূল্যের (ইউনিভার্সাল স্পিরচুয়াল ট্রুথ) একটি ধারণা রয়েছে (যেমন রয়েছে ইসলামে), তবুও তা সামাজিক ও রাজনৈতিক অসমতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। উনিশ শতকের কিছু প্রভাবশালী লেখক (উদাহরণস্বরূপ, জর্জ গোর্ট) খ্রিষ্টান মতবাদ অনুসারে নয়, বরং ধ্রুপদী গ্রীক থেকে আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণার সন্ধান ও চর্চা করতে শুরু করেছিল। প্রাক-খ্রিষ্টান এথেন্সে নিশ্চয়ই সমতার একটি ধারণা ছিল। হয়তো তা ছিল সীমিত, নাগরিকের অধিকার এবং প্রাথমিকভাবে গণতন্ত্রের চর্চা যা রাজনৈতিক ফোরামে স্বাধীনভাবে কথা বলার অধিকারকে অন্তর্ভুক্ত করেছিল, কিন্তু তাতে ‘মানুষের সর্বজনীন মর্যাদা’র কোন ধারণা ছিল না। ইউরোপীয় খ্রিষ্টীয় জগতে ধীরে ধীরে, ক্রমাগত সংঘাতের মাধ্যমে,  অনেক অসমতা দূর করা হয়েছিল, গীর্জার কর্তৃত্বের বদলে ধর্মনিরপেক্ষ কর্তৃত্ব প্রতিস্থাপিত হয়েছিল।

তালাল আসাদের বই ‘জেনেওলজিস অফ রিলিজিয়ন’- এর প্রচ্ছদ

খ্রিস্টান ধর্মের ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ প্রসঙ্গে বিভিন্ন লেখকদের প্রচলিত গল্পগুলোর মধ্যে মার্সেল গশেটের একটি গল্প বহুল উদ্ধৃত উদাহরণ হিসবে ব্যবহৃত হয়। গল্পটি হল, খ্রিস্টান এমন এক ধর্ম যার থেকে ধর্মনিরপেক্ষ মানবতাবাদের ফুল ফুটে উঠে এমন একটি প্রক্রিয়ায়,যার মাধ্যমে নিজের আধ্যাত্মিক ঝোঁকটাকে উৎখাত করে একটি পার্থিব স্বায়ত্তশাসনের ধারণা আসতে থাকে, যেটা কিনা এখন পশ্চিমা গণতান্ত্রিক সমাজের মূল (ধর্মীয় পাঁকে আটকে থাকা মুসলিম সমাজের বিপরীত চিত্র এটি)। সকল ধর্মের মধ্যে কেবলমাত্র খ্রিস্টান ধর্মই গণতান্ত্রিক পৃথিবীর জন্ম দেয়; কেবলমাত্র খ্রিস্টান ধর্মই শৃঙ্খলামুক্ত মানব সমাজ তৈরী করে। যেখানে অন্য সব ধর্মীয় বিধানেই মানুষের অধিকার বঞ্চিত হওয়ার বিষয়টি লক্ষ্য করা যায়, সেখানে এর  বিপরীতে যে অনন্য ধর্ম এসব বিধানের উর্ধ্বে তা হলো খৃষ্ট ধর্ম। পবিত্র খৃষ্ট ধর্ম বর্ণীত মানব জাতির মুক্তির (পাপ মোচন) আখ্যান রচনায় যীশু খৃষ্টের আবির্ভাব, স্বর্গীয় নীতিমালা প্রণয়ন, তার মৃত্যু এবং স্রষ্টার যোগ্য প্রতিনিধি হিসেবে পুনর্জীবিত হওয়ার সাথে পশ্চিমা খৃষ্ট ধর্মীয় বয়ান অনুসারে ইশ্বরের (divine parent) প্রতিনিধি মানব রুপে পার্থিব জগতে অবতরণ ও ধর্মনিরপেক্ষ সর্বজনীন উৎকর্ষতা সাধনের  বিশেষ মিল পাওয়া যায় । এভাবে অতীন্দ্রিয়তাবাদ ( Transcendence) আমাদের মুক্ত পৃথিবীতে, ধর্মনিরপেক্ষ ‘ইউরোপীয় সভ্যতায়’ রয়ে গেলেও, এখন এটি একটি ভিন্নমাত্রা বহন করে । সান্তিয়াগো জাবালা ইউরোপ আমেরিকার দর্শনের পোস্টমেটাফিজিক্যাল প্রবণতা সন্ধানের মাধ্যমে একে কিছুটা আলাদাভাবে রাখেন। জাবালার মতে, ধর্মনিরপেক্ষতা কেবল খ্রিষ্টীয় অতীত থেকে প্রসূত নয়, বরং খ্রিষ্টোত্তর (post christian) সময়েও (ইউরোপীয় সভ্যতায়) এটি খ্রিষ্টধর্মের স্থায়ী উপস্থিতির সাক্ষ্য-প্রমাণ।

উক্ত রাজনৈতিক বাতাবরণের উপস্থিতিতে, যেখানে ইতিহাসের পত্তন থেকেই খ্রিষ্টধর্মের সাথে ইসলাম ধর্মের সংঘর্ষ বিদ্যমান, সেখানে আমরা কিভাবে ধর্মের আখ্যানগুলোর ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করবো যা কিনা স্বতন্ত্র ইউরোপ সভ্যতার অভ্যুত্থানকে সবিস্তারে বর্ণণা করে? রাজনৈতিক আলোচ্য বিষয়ের (Political discourse) অংশ হিসেবে এই গল্প কিংবা ধর্মীয় আখ্যানগুলো একটি ইউরোপীয় সত্ত্বাকে জাহির করে যা ইসলামিক সভ্যতার বিপরীতে অবস্থিত। তাদের যুক্তির তাৎপর্য এই যে, ইসলামিক সভ্যতায় ‘গণতান্ত্রিক ঐতিহ্যের’ অনুপস্থিতি দেখা যায়। আর গনতন্ত্রের অনুপস্থিতির মাধ্যমেই ব্লাসফেমি নিয়ে মুসলমানদের যে দমনমূলক প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় তার ব্যাখ্যা করা সম্ভব এবং স্বাধীনতার অনন্য গুরুত্ব উপলব্ধি করতে মুসলিমরা কেন অক্ষম তাও ব্যাখ্যা করা সম্ভব। আপাতদৃষ্টিতে এই যুক্তিকে মনে হচ্ছে স্বত:সিদ্ধ। কিন্তু আসলেই কি তাই?

সামাজিক বিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে, ‘ইউরোপীয় সভ্যতা’র অন্তর্ভুক্ত মানুষজন শ্রেণী, জাতীয়তাবাদ এবং ধর্মীয় পরিচয়ে সম্পূর্ণভাবে পৃথক। এই পৃথকীকরণের ফলে সৃষ্ট অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-সংঘাতে তারা প্রায়শই দ্বিধাবিভক্ত। এমতাবস্থায় দেখা যায় যুদ্ধরত দল একে অপরকে আক্রমণ করার জন্য বিভিন্ন জন-বক্তৃতায় সমালোচনা করার একই রকম নীতি অনুসরণ করে, এমনকি কোন কোন দল মুসলিম দেশগুলোর রাজা-রাজপুত্রের  সাথে মৈত্রী স্থাপনেও কুণ্ঠা বোধ করে না। স্বাধীনতা, সমতা বা সুস্থিত বিন্যাসের নামে পশ্চিমের গণযোগাযোগ (Public communication) ব্যবস্থাকে সেন্সরিং করে গণতান্ত্রিক প্রবণতাকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। আমেরিকা, এশিয়া, আফ্রিকায় (এবং যেসব ইন্ডিজেনাস গোষ্ঠীর উপর ইউরোপীয়রা শাসন করেছে, নিপীড়ন করেছে তাদের কাছেও) ইউরোপীয় শাসনে থাকা দেশগুলোর সমগ্র ইতিহাস আসলে  ইউরোপের সভ্যতারই ইতিহাস। এ এক অখন্ড ইতিহাস। হান্নাহ আরেন্ডট এই বিষয়ে আলাপ তুলেছিলেন যে, ইউরোপের ফ্যাসিজমের বিকাশ ঘটাতে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদের বর্ণবাদ নীতির প্রয়োজন ছিল। এখন ‘গণতন্ত্র’ এবং  ‘বাকস্বাধীনতা’কে ইউরোপীয় সভ্যতায় সহজাতভাবে অন্তর্ভুক্তকরণ আর বিপরীত দিকে ‘বৈষম্য’ এবং ‘নিপীড়ন’কে ইসলামিক সভ্যতায় অন্তর্ভুক্তিকরণের মাধ্যমে ঠিক কী দাবী করা হচ্ছে তা বোধগম্য নয়।

সত্যিকার অর্থে, ‘গণতান্ত্রিক’ প্রতিষ্ঠানগুলো মধ্যপ্রাচ্যের তুলনায় পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতেই দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত।১০  পশ্চিমা আইন-কানুন খরিদ করার আগে মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশগুলোতে সর্বজনীন সাম্যতার ধারণা নিয়ে আইনি ব্যবস্থা নির্মিত হয়নি। কিন্তু উক্ত বিষয়টি যা কিনা সর্বজনীনতা বিরোধী ও সামাজিক অবক্ষয়ের কারণ, তা নিয়ে না ভেবে আমরা হয়তো আরো গভীর ভাবে অনুসন্ধান করবো উদারনৈতিক সমাজে সর্বজনীন স্বাধীনতার ধারণাটি হাজির হওয়ার ব্যাপারটি নিয়ে। এভাবে প্রত্যেক নাগরিকের বদলিযোগ্যতা (Substitutability, যেখানে ধরে নেওয়া হয় একজন ব্যক্তি সর্বদাই অন্য আরেকজন ব্যক্তির নিখুঁত বিকল্প) উদারনীতি রাজনীতি ও অর্থনীতিতে স্বাধীনতার ধারণার সর্বজনীনকরণের ক্ষেত্রে একটা কেন্দ্রীয় বিষয় হয়ে উঠে। নির্বাচনী রাজনীতির গণনায় প্রত্যেক নির্বাচক/ভোটারকে একক ভাবে গণনা করা হয় এবং অন্য যে কোন ভোটারের সমকক্ষ হিসেবে ধরা হয়। কোন ভোটারের মূল্য অন্য ভোটারের চেয়ে কমও নয়, বেশিও নয় এবং ভিন্নও নয়। প্রতিটি নাগরিকের এই রাজনৈতিক প্রক্রিয়ায় (নির্বাচনে) অংশগ্রহণের যেমন অধিকার রয়েছে, তেমনি অন্য সবার মতো রাজনৈতিক মত প্রকাশেরও স্বাধীনতা আছে। ভোটের মাধ্যমে সম্মতির চেয়ে উদারনৈতিক গণতন্ত্রে বদলিযোগ্যতার বিষয়টি (Substitutability) অধিক গুরুত্বপূর্ণ, যা থেকে পশ্চিমা সরকারগুলি তাদের বৈধতা প্রাপ্তির কথা বলে। কারণ নির্বাচনী সম্মতি অর্জন এখানে বদলিযোগ্য ভোট গণনার উপর নির্ভরশীল।

এই বদলিযোগ্যতা (Substitutability) নির্বাচনী রাজনীতির সাধারণ নীতিমালার চেয়েও বেশি কিছু । এটা এক ধরনের সামাজিক প্রক্রিয়া যা আমলাতান্ত্রিক নিয়ন্ত্রণ ও দক্ষতার সাথে বাজারব্যবস্থা পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ- এবং এই উভয়ই ব্যক্তিস্বতন্ত্রকে সরলীকরণ করার এবং রুদ্ধ করার উপায়। একারণেই আধুনিক পুঁজিবাদী সমাজে চিন্তাধারা এবং তা উপস্থাপনের পরিসংখ্যানগত পদ্ধতিগুলো (Statistical modes) যেমন- গড়, অনুপাত, প্রবণতা ইত্যাদির ভিত্তিতে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কৌশল গঠনের  ব্যাপারটি এতো গুরুত্বপূর্ণ। বিষয়টি এমন যে, প্রতিটি ব্যক্তিস্বত্বার রয়েছে সমান মর্যাদা এবং তাই তারা একে অপরের বদলে প্রতিস্থাপিত হতে পারে। তবে সে ব্যাপারটি ব্যক্তির স্বকীয় মর্যাদার উদার চেতনা (Liberal notion) ক্ষুণ্ণ হতে সাহায্য করে। কেননা প্রতিটি ব্যক্তিসত্তাকে বদলিযোগ্য হিসেবে ধরে নেওয়ার মাধ্যমে ব্যক্তির অনন্য স্বকীয়তাকে অস্বীকার করা হয়। তাই আমরা যখন গণতন্ত্রের পশ্চিমা মানদন্ড ব্যবহার করি, ‘মুক্ত ইউরোপ সভ্যতা’ তখন চরম অসঙ্গতিপূর্ণ রূপে স্পষ্ট হয়ে উঠে।

এই লেখায় ‘উদারনীতিবাদ’ (Liberalism) শব্দটি ব্যবহার সম্পর্কে কিছু কথা বলে রাখা দরকার: এ ব্যাপারটি আমি অবগত যে,উদারনীতিবাদ একটি জটিল ঐতিহাসিক প্রথা যা নিয়ে লক (John Locke), মিল (John Stuart Mill) বা রওলস (John Rawls), একেকজন একেকধরণের মত দিয়েছেন; এই ব্যাপারে মিল খুঁজে পাওয়া যায় না উত্তর আমেরিকার উদারনীতির ইতিহাসের সাথে ইউরোপের, বা দক্ষিণ ভূখণ্ডের এমন কোন স্থানের যেখানে কিছুটা হলেও উদারতাবাদ চর্চিত হয়। উদারনীতির ধারণা কেবলমাত্র শাস্ত্রীয় গ্রন্থেই খুঁজে পাওয়ার জিনিসই নয়, এবং এটি পশ্চিমের অন্যান্য ঐতিহ্যের সাথে সাংঘর্ষিক। প্রাথমিক অবস্থায়, উদারনৈতিক রাজনীতি সমস্ত কর্তৃত্ববাদী ক্ষমতাকে পুরোদমে  চ্যালেঞ্জ করেছিল। কিন্তু এখন তা বৈশ্বিক শক্তির সাথে আবদ্ধ: শান্ত, স্থির এবং যৌক্তিক একটি বিষয়। বিতর্কের জায়গা হিসেবে  উদারনীতিবাদ তার সমর্থনকারীদের একটি সাধারণ রাজনৈতিক এবং নৈতিক ভাষা সরবরাহ করে যাতে তারা সমস্যাগুলি চিহ্নিত করতে এবং সামাধান করতে পারে। যেমন ব্যক্তির স্বায়ত্তশাসন, বিনিময়ের স্বাধীনতা (অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক), রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার সীমাবদ্ধতা, আইনের শাসন, জাতীয় মুক্তি এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার মতো ধারণাগুলি সেই জায়গার অন্তর্ভুক্ত, অন্তত যখন বিষয়গুলোর অর্থ বিতর্কিত নয়। উদারনৈতিক তাত্ত্বিকরা একে (উদারনীতিবাদ) সঙ্গত ও সমন্বিত করে উপস্থাপন করার চেষ্টা করে, কিন্তু উদারনৈতিক ভাষার  অসঙ্গতি এবং অস্পষ্টতার জন্যই স্বআখ্যায়িত (self styled)  উদারপন্থীদের সাথে তাদের বিরোধীদের বিতর্ক সম্ভবপর হয়ে উঠে। এইভাবে উদারপন্থা এসব আধুনিকদের কিছু শব্দভান্ডার সরবরাহ করে যা বেশ কিছু পাপ-পূণ্যের হিসাব আড়াল করে। আমেরিকান সরকারের রাজনৈতিক সমালোচনার ফলে ‘স্বাধীনতা’ শব্দটি নিজেই বিভিন্ন দৃষ্টিকোণ থেকে সন্নিবেশিত হয়েছে। আমি সেই সমাজকেই ‘উদারনৈতিক’ বলবো যেখানে এই শব্দভান্ডার ব্যবহার করে রাজনৈতিক এবং নৈতিক যুক্তি নির্ধারণ করা হয়েছে। উদারনীতি বিরোধী প্রথা গুলো আমাদের দেখিয়ে দেয় যে এ দ্বন্দ্বগুলি প্রতিটি দেশ বা সভ্যতার উদারপন্থা এবং এর বিরোধী প্রবণতার মধ্যে খুব একটা দেখা যায় না (বেশ ক’জন লেখকের সাম্প্রতিক প্রস্তাব অনুযায়ী)। দ্বন্দ্বগুলি বরং বিতর্কিত প্রথা হিসেবে উদারতাবাদে সহজাতভাবেই অন্তর্ভুক্ত। এবং একদিকে তা যেমন আপাতদৃষ্টিতে স্বাধীন, অন্যদিকে তা স্পষ্টতই দমনকারী।

বাক স্বাধীনতার সর্বজনীন অধিকার গণতন্ত্রের কেন্দ্র এবং ‘গণতন্ত্র’ ও ‘স্বাধীনতা’ পশ্চিমা সভ্যতার কেন্দ্র। তাই কি? ‘সভ্যতা’ দ্বারা অভিজাত চেতনা (গুণগত) গড়ে তোলার ধারণাটি ‘গণতন্ত্র’ দ্বারা সর্বজনীন সমতা (পরিমাণগত) গড়ে তোলার ধারণার সাথে খাপ খায়? এই প্রশ্নটি উনিশ শতকে ব্রিটেনে উত্থিত হয়েছিল। ব্রিটেনে তখন ভোটাধিকারের আওতা বাড়ানোর বিষয়ে বিতর্ক শুরু হয়। জন স্টুয়ার্ট মিল তখন প্লুরাল ভোটিং (যে ভোটিং সিস্টেমে নির্দিষ্ট কিছু মানুষ একাধিক ভোট দিতে পারে) ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন, যাতে  শিক্ষিত (Elite) শ্রেণীর ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ শ্রমিক শ্রেণীর ভোটের সাথে ভারসাম্য রক্ষা করতে পারে।১১ কিন্তু সমস্যাটি অমীমাংসিত থেকে যায়। দার্শনিক পর্যায়ে অনেক সমাধান রয়েছে, তবে তার জন্য কিছু পরিমাণ বিশ্বাস, সৌজন্যতা এবং স্বনির্ভরতা গণতন্ত্রের জন্য প্রয়োজনীয় হয়ে উঠে। এই কারণে সান্তিয়াগো জাবালা ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ প্রসঙ্গে মনে করেন যে এইক্ষেত্রে এটা একটা পথ দেখায়ঃ

“জন ডিউই চমৎকারভাবে এই যুক্তি দিয়েছিলেন  যে, আমরা সেই মূহুর্তেই সম্পূর্ণ রাজনৈতিক পরিপক্কতা (Political maturity) অর্জন করি যখন আমরা কোন অধিবিদ্যাগত চর্চা (Metaphysical culture) ছাড়া, অলৌকিক শক্তির উপর বিশ্বাসের চর্চা ছাড়া সফল হতে পারি। শুধুমাত্র ফরাসি বিপ্লবের পরেই মানুষ তার নিজের ক্ষমতা ও শক্তির উপর আস্থা রাখতে শিখেছিল; যে ধর্ম ব্যক্তির নিজের উপর তাকে আস্থা রাখতে শেখায়, সেই ধর্মকে জন ডিউই “Religion of love” বলে আখ্যা দিয়েছেন যা “Religion of fear” এর সম্পূর্ণ বিপরীত। কারণ গণতন্ত্রে পুরোপুরিভাবে অংশগ্রহণকারী নাগরিকের অবস্থা থেকে একে কার্যত পৃথক করা সম্ভব।”১২

এখানে জোর দেওয়ার মত একটি বিষয় হচ্ছে  ফরাসী বিপ্লব আধুনিক বিশ্বের মধ্যে কেবল সংহতি, গণতন্ত্র এবং স্বাধীনতার ধারণাগুলি প্রবর্তনই করেনি, বিপ্লবী সৈনিকরা বিজয়ের মাধ্যমে স্বাধীনতা ও ভ্রাতৃত্ববোধ বিস্তার করারও চেষ্টা করেছিল। ফরাসি বিপ্লব যুদ্ধ, জাতীয়তাবাদ, বর্ণবাদ এবং গণহত্যাকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়ে বিশ্বজুড়ে আধুনিক সাম্রাজ্যবাদের যুগকে উন্মোচিত  করেছিল। এই সবই ‘খ্রিষ্টীয় ইউরোপের’ ইতিহাসের অংশ। একে পশ্চিমা ইতিহাসের সমগ্র ভাবার্থ বা মূলমন্ত্র (Essence) ধরে নেওয়া অযৌক্তিক হলেও, তা অবশ্যই এর একটি অংশ। সুতরাং এটা কি তার উত্তরাধিকারের অংশ নয়? বিশিষ্ট দার্শনিক রিচার্ড রর্টি সাম্য ও স্বাধীনতার গণতান্ত্রিক মূল্য উল্লেখ করে ‘The Europe mission civilizatrice’ ধারণাটির পুনর্বাসনের বিষয়ে কথা কথা বলেছেন।১৩ কিন্তু ‘ইউরোপীয় মূল্যবোধ’ সত্যিকার অর্থে কী উপস্থাপন করে তা কে সিদ্ধান্ত নেবে, কিভাবে সেগুলি প্রয়োগ করা হবে, অসম শক্তির বিশ্বে বাস্তবে তারা কী অর্জন করবে সে সম্পর্কে তিনি কোন ব্যাখ্যা দেননি। সাম্প্রতিক ভাষ্যমতে দেখা যায়- উদার গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রীরা সামরিক বা অর্থনৈতিক, যেকোনো ভাবেই নিজদেশি ও ভিনদেশী দূর্বল মানুষদের অধিকার বঞ্চিত করতে সক্ষম।

নোটঃ

১. ২০০৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর ডেনমার্কের সংবাদপত্র জিলান্ডস পোস্টেনে নবী মোহাম্মদের বেশ কিছু ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশিত হয়। মুসলিমরা সেসব ব্যঙ্গচিত্রকে নবী মোহাম্মদের অপমান হিসেবে দেখে। যার ফলে ইউরোপসহ সর্বত্র প্রতিক্রিয়া ও বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে।

২. পশ্চিম প্রেসগুলো ব্যঙ্গচিত্রের প্রতিক্রিয়ায় মুসলিমদের অযৌক্তিক সহিংসতা ব্যাপক অর্থে তুলে ধরেছে, কিন্তু মুসলিমরা ইউরোপে, বিশেষ করে ডেনমার্কে যে রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে বসবাস করে তার কোন উল্লেখ করেনি। ড্যানিশ গবেষকের মতে, ডেনমার্কের কতিপয় রাজনৈতিক দলের সম্মানীয় সংসদ সদস্যরা ২০০১ সালের নির্বাচনে জাতীয় মিডিয়ায় এই বিবৃতিগুলো দিয়েছেনঃ “মুসলিমরা আমাদের হত্যা করার জন্য কেবল সঠিক সময়ের অপেক্ষায় আছে” (মোগেন্স কেমরি, প্রোগ্রেস পার্টি); “কিছু মানুষ কেবল ধর্মের কারণে  নিরাপত্তার ঝুঁকি হয়ে দাঁড়ায়, যার কারণে তাদেরকে তখন অন্তরীণ শিবিরে পাঠাতে হবে” (ইংদল সোরেনসেন, লিবারেল পার্টি); “যদি আপনি এই সমস্যাগুলো [মুসলিম সংস্থা সম্পর্কিত] থেকে বেরিয়ে আসার জন্য আইন তৈরী করেন, তবে মনে রাখবেন এটা ঐতিহাসিক নিয়ম যে আপনি পুরনো গর্ত ভরাট করতে না করতেই  ইঁদুরেরা সর্বদা নতুন গর্ত আবিষ্কার করে” (পল নিরুপ রাসমুসেন, সোশাল ডেমোক্রেটিক পার্টি)। উদ্ধৃত ডেনমার্কের নৃবিজ্ঞানী পিটার হার্ভিকের “ডেনমার্কে নতুন জাতীয়তাবাদের উত্থান, ১৯৯২-২০০১”, ‘ইউরোপ ও তার বাইরের নতুন জাতীয়তাবাদ: সামাজিক নৃতত্ত্বের দৃষ্টিভঙ্গিতে’, মার্লাস ব্যাংক্স ও আন্দ্রে গিংগ্রিচ (অক্সফোর্ড, ২০০৬)।

৩. “ড্যানিশ ব্যঙ্গচিত্রের বিরূদ্ধে দীর্ঘ সহিংসতা প্রদর্শনের মাধ্যমে ইসলামপন্থীরা তাদের শত্রুদের নিজেদেরই দেশে ভয় দেখানোর এক ধারাবাহিক প্রচেষ্টা চালায়” বিবৃতিটি লিখেছেন জর্জ প্যাকার, নিউ ইয়র্কার এর একজন স্টাফলেখক; “বিশ্বাসের লড়াইঃ উদার আন্তর্জাতিকতাবাদ কি বাঁচানো যায়?” নিউ ইউর্কার, ১০ই এবং ১৭ই জুলাই, ২০০৬, পৃষ্ঠা: ৯৫-৯৬।

৪. “উদাহরণস্বরূপ, সম্প্রতি ড্যানিশ প্রেস ও রাজনীতিবিদের এক অংশ যুক্তি দেখিয়েছেন যে ইসলামিক  পন্ডিতরা রাজনৈতিক প্রতিনিধি হিসেবে কাজ করছেন কারণ তারা সচেতনভাবে নির্দিষ্ট কিছু বিষয় উপেক্ষা করে গেছেন; যেমন- সামাজিক প্রক্রিয়াগুলি, যেখানে ইসলামকে দেখা যায় সম্ভাব্য নিরাপত্তা ঝুঁকি ও সংহতিকরণের পথে বাঁধা হিসেবে”; “From Research on Islam Repotioned” থেকে, ড্যানিশ গবেষণা নেটওয়ার্ক ফোরামের পৃষ্ঠপোষকতার আয়োজন করা সমাবেশের জন্য  বিবৃতি, কোপেনহেগেন বিশ্ববিদ্যালয়, ১৪-১৫ই মে, ২০০৭। এবং তা সত্ত্বেও ২০০৭ সালে প্রকাশিত সন্ত্রাসবাদ সম্পর্কিত ইউরোপোলের প্রথম প্রতিবেদন অনুসারে দেখা যায় যে, ২০০৬ সালে ইউরোপীয় ইউনিয়নে সংঘটিত ৪৯৮টি সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মধ্যে কেবলমাত্র একটি কার্যক্রমের জন্য দায়ী ছিল ইসলামপন্থীরা। এর মধ্যে সর্বাধিক সংখ্যক ঘটনা ঘটে বাস্কু বিচ্ছিন্নতাবাদীদের দ্বারা, এবং যার একটি হামলায় কেবল প্রাণহানি ঘটে। তা সত্ত্বেও সন্ত্রাসবাদের অভিযোগে গ্রেফতারকৃত অর্ধেকের বেশি সংখ্যক ছিল মুসলিম। ইউরোপের প্রায় সমস্ত গণমাধ্যমগুলো এই জরিপগুলো এড়িয়ে গিয়েছে, বিপরীতে তখন তারা ব্যস্ত ছিল “ইসলামের হুমকি” নামক খেলায়। আশ্চর্য! এই বিচ্ছিন্ন নীরবতাকে একজন কিভাবে বিবেচনা করবে?

৫. Lecture of the Holy Father, ‘Faith, Reason, and the Univeristy: Memories and Reflections,” সেপ্টেম্বর, ২০০৬, রেগেন্সবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়, জার্মানী: (http://www.vatican.va/holy_father/benedict_xvi/speeches/2006/september/documents/hf_ben-xvi_spe_20060912_university-regensburg_en.html) বিপরীতে, বিশিষ্ট ক্যাথলিক দার্শনিক চার্লস টায়লর “খ্রিষ্টান ও গ্রিক দর্শনের মধ্যবর্তী সেতুহীন উপসাগর” প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, তাঁর বই ‘দ্য সেক্যুলার এইজ’ এর ভূমিকা দ্রষ্টব্য (ক্যাম্ব্রিজ, এমএ, ২০০৭)।

৬. ফ্রান্সিস ফুকুয়ামা, ‘The End of History and the Last Man) পুনর্মূদ্রিত সংস্করণের পর (নিউ ইয়র্ক, ২০০৬)। আমেরিকার অধার্মিক উত্তরাধুনিক দার্শনিক ও ইতালির খ্রিষ্টান উত্তরাধুনিক তাত্ত্বিকের মধ্যকার কথোপকথন দ্রষ্টব্য, যেখানে উভয়ই খ্রিষ্টধর্ম ও গণতন্ত্রের মৌলিক সম্পর্কের বিষয়ে সহমত প্রদর্শন করে: রিচার্ড রর্টি এবং গিয়ানি ভাত্তিমো, ‘দ্য ফিউচার অফ রিলিজিওন’, সান্তিয়াগো জাবালা (নিউ ইয়র্ক, ২০০৫)।

৭. জর্জ গ্রোতে, ‘গ্রীসের ইতিহাস’ (History of Greece) (লন্ডন, ২০০১)।

৮. মার্সেল গশেট, ‘The disenchantment of the world: A political history of religion’, চার্লস টায়লর (প্রিন্সটন, ১৯৯৭)।

৯. সান্তিয়াগো জাবালার রচনা দ্রষ্টব্য, “A Religion without Theist or Atheist”, যা রর্টি ও ভাত্তিমোর আলাপকে তুলে ধরেছে, ‘ফিউচার অফ রিলিজিয়ন’, পৃষ্ঠা-২।

১০. মধ্যপ্রাচ্য অবশ্যই ইসলামী দুনিয়া (দ্য ওয়ার্ল্ড অফ ইসলাম) কিংবা মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশের  সমতুল্য নয়। কেননা বেশিরভাগ মুসলিম বাস করে মধ্যপ্রাচ্যের বাইরে। কিন্তু তা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যের কল্পনায় “ইসলামের কেন্দ্রীয় ভূমি” হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যের মুসলিম দেশগুলোকেই ধরা হয়, ঠিক যেমনভাবে “খ্রিষ্টাধর্ম” বলতে লাতিন খ্রিষ্টানধর্ম ধরা হয় কিন্তু মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ দেশে অবস্থানরত খ্রিষ্টান সম্প্রদায়গুলো বিবেচনায় আসেনা।

১১. জন স্টুয়ার্ট মিলের  ‘Representative Government’ দ্রষ্টব্য, অধ্যায়: ৮ (১৮৬১), ‘Three essays’ (লন্ডন, ১৯৭৩)।

১২. জাবালা, “A Religion without Theist or Atheist”, পৃষ্ঠা-৬।

১৩. রর্টি ও ভাত্তিমো, ‘ধর্মের ভবিষ্যৎ’ (Future of Religion), পৃষ্ঠা-৭২।

Related Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।...

বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

'বর্জন' কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য  এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস...