দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

[ফ্রাঞ্জ বোয়াসের এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করেছেন তাসনিম রিফাত।

অনুবাদকের নোটঃ ফ্রাঞ্জ বোয়াসের ‘দ্যা মেথডস অফ এথনোলজি’ নৃবিজ্ঞানের ইতিহাসের অন্যতম ক্লাসিক একটি প্রবন্ধ। বলা হয়ে থাকে, বোয়াসের লেখা সর্বাধিক পঠিত প্রবন্ধ এটি। বোয়াসের এই প্রবন্ধটি নৃবিজ্ঞানের প্রথমদিককার তিনটি চিন্তাধারার বিরোধের জায়গাটিকে স্পষ্ট করেছে। পয়লা দুই স্কুল হলো বিবর্তনবাদ আর ব্যাপ্তিবাদ। এই দুই চিন্তাধারাই তাদের নিজেদের মতো করে সংস্কৃতি আর সমাজকে বুঝতে চেয়েছে। বোয়াস মনে করতেন, উক্ত দুই চিন্তাধারাই কিছু পূর্বানুমানকে ভিত্তি হিসেবে ধরে সংস্কৃতির ফেনোমেনাগুলোকে সাজাতে চেয়েছে। বোয়াস পদ্ধতিগত জায়গা থেকেই আগের দুই চিন্তাধারার সমালোচনা করেন। প্রবন্ধের একটা পর্যায় তিনি আমেরিকান চিন্তাধারা (বোয়াসের নিজের স্কুল) কেন বিবর্তনবাদী আর ব্যাপ্তিবাদী অনেকগুলো ধারণাকে ত্যাগ করে ভিন্ন একটি অবস্থা গ্রহণ করেছে সেটি ব্যাখ্যা করেছেন। শেষদিকে তিনি আরো দুইটি প্রসঙ্গেও কথা বলেন। একটি হচ্ছে ব্যক্তির সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক, আরেকটি হলো এথনোলজিতে ফ্রয়েডের ব্যবহার নিয়ে।

যাই হোক, বোয়াসের পুরো প্রবন্ধটিই একটি নিয়মতান্ত্রিক যুক্তিতর্কের মাধ্যমে এগিয়ে গিয়েছে। এর কাঠামোটিকে ধরতে পারলে বোয়াসের অবস্থানটি সহজেই বুঝা যায়। ]

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে। গত শতাব্দীর দ্বিতীয়ভাগে বিবর্তনবাদী চিন্তার প্রভাব ছিল সবচেয়ে বেশি। স্পেন্সার, মর্গান, টাইলর, লুব্বকসহ আরো অনেক গবেষকরা সংস্কৃতির একটা সাধারণ ও অভিন্ন বিবর্তনের ধারণা নিয়ে কাজ করেছিলেন, যেটা মানবজাতির সকল অংশের ক্ষেত্রে খাটে। তবে এইক্ষেত্রে নতুন একটি ধারণা নিয়ে আসেন রাটজেল। তার জিওগ্রাফিক্যাল ট্রেইনিং তাকে সংস্কৃতির ব্যাপন (ডিফিউসন) আর মাইগ্রেশন নিয়ে ভাবতে প্রেরণা দিয়েছিল। ব্যাপ্তিবাদী চিন্তাগুলো আমেরিকায় খুব ভালোভাবে গৃহীত হয়েছিল, তবে এই ধারণা বিস্তৃতভাবে প্রয়োগ করা হয়েছিল ফয় আর গ্রায়েবনারের কাজে। পরে স্মিথ আর রিভার্সের কাজে চূড়ান্তভাবে উঠে আসে ব্যাপ্তিবাদের বিষয়গুলো। বর্তমান সময়ে ইংল্যান্ড আর জার্মানির কিছু গবেষকদের মধ্যে বিবর্তনবাদী চিন্তার বদলে মাইগ্রেশন আর সংস্কৃতির ব্যাপন –এই দুই ধারণাগুলোর ভিত্তিতেই এথনোলজিক্যাল গবেষণা করার প্রবণতা খেয়াল করা যায়। 

এই দুই ধারাকে (বিবর্তনবাদ আর ব্যাপ্তিবাদ) আরেকটু ক্রিটিকালভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায়, প্রত্যেকটাই একটা মৌলিক হাইপোথিসিসের উপর দাঁড়িয়ে আছে। বিবর্তনবাদী দৃষ্টিভঙ্গি আগে থেকেই ধরে নেয় যে- সংস্কৃতির যে ঐতিহাসিক পরিবর্তনটা হয়, তা কিছু নিদৃষ্ট নিয়ম অনুসরন করে এবং এইসব নিয়ম সব স্থানেই সমানভাবে প্রযোয্য। এই নিদৃষ্ট পথেই সব জাতি এবং সকল মানুষের মধ্যে সংস্কৃতির বিকাশ ঘটে। টাইলরের লেখা বিখ্যাত ক্লাসিক বই ‘প্রিমিটিভ কালচার’- এর ভূমিকায় এ ধারণাটিই খুব স্পষ্টভাবে উঠে এসেছে৷ তবে আমরা যদি চিন্তা করি যে বিবর্তনের হাইপোথিসিস স্বীকার করে নেয়ার জন্য আমাদেরকে সেটা আগে ঠিকভাবে প্রমাণ করতে হবে, তাহলে পুরো কাঠামোটিই এর মূলভিত্তি হারিয়ে ফেলে। এটা সত্য যে, সমান্তরাল বিকাশের চিহ্ন পৃথিবীর বিভিন্ন অংশেই দেখা যায় এবং বিচ্ছিন্নভাবে বিভিন্ন জায়গায় একই ধরনের প্রথাগুলো দেখা যায়। আবার এইধরনের মিলের ঘটনাগুলো এতো অগোছালোভাবে ছড়ানো ছিটানো যে, এদের ব্যাপনের সাপেক্ষে বুঝা সম্ভব না। এগুলোই ছিল বিবর্তনবাদী হাইপোথিসিসের ভিত্তি।  অন্যদিকে এই হাইপোথিসিস আরো ধরে নেয় যে অন্যসকল প্রাচীন সংস্কৃতির তুলনায় আধুনিক পশ্চিমা সভ্যতা সর্বাপেক্ষা উন্নত৷ এরফলে তারা আধুনিক সভ্যতার একটা অর্থোজেনেটিক (একরৈখিক) বিকাশের পথ নির্মাণ করে। তবে, আমরা যদি স্বীকার করি-ভিন্ন ভিন্ন স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন সভ্যতা এই পৃথিবীতে একইসাথে থাকে, তবে বিবর্তনবাদী হাইপোথিসিসের মধ্যে থাকা সংস্কৃতির বিকাশের সরলরৈখিক পথের ব্যাপারটি আর ধোপে টেকে না।  

একটা আধুনিক প্রবণতার আওতায় এইধরনের অনুমানগুলোকে বিরোধীতা করার মাধ্যমে পরে বিবর্তনবাদী সরল উপাখ্যানকে পরিত্যাগ করা হয়। অন্তর্নিহিত কারণের জন্যই পৃথিবীর বিকাশের ক্ষেত্রে মিল দেখতে পাওয়া যায়, এই ধারণাটিকে পরিত্যাগ করে,  এরজায়গায়, ধরে নেওয়া হয় যে নিশ্চিতভাবেই পৃথিবীর দুইটি ভিন্ন অংশে ঐতিহাসিক বিকাশের মিল থাকার কারণ মাইগ্রেশন এবং ব্যাপন। এর ভিত্তিতে একটা বিশাল পরিসরের প্রেক্ষিতে  স্থানগুলোর ঐতিহাসিক সংযোগ খুঁজে বের করার দাবি তৈরি হয়। তবে, এই তত্ত্বের জন্য প্রয়োজন সাংস্কৃতিক উপাদানগুলোর স্থিতিশীলতা, যেভাবে বিভিন্ন প্রাচীণ ট্রাইবগুলোতে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই তত্ত্বের ভিত্তি হলো পৃথিবীর বিভিন্ন দূরবর্তী অংশে একই রূপে হাজির হওয়া স্বতন্ত্রভাবে স্বাধীন এবং আলাদা সংস্কৃতির সম্ভাব্য সংযোগ। এর সূত্র ধরেই নতুন গবেষকরা গারল্যান্ডের তত্ত্ব ব্যবহার করা শুরু করেন। গারল্যান্ডের মতে, বিভিন্ন সাংস্কৃতিক উপাদানগুলো আসলে একটি কেন্দ্রীয় স্থানে উদ্ভূত হয়, এবং মানুষের মাইগ্রেশনের মাধ্যমে মহাদেশ থেকে মহাদেশে ছড়িয়ে পড়ে। 

আমার কাছে মনে হয়, যদি এথনোলজিক্যাল গবেষণা পদ্ধতিকে সংক্ষিপ্তভাবে তুলনা করা হয়, তবে বলা যায় যে দুটি তত্ত্বের অনুমিত ধারণাগুলোই প্রমাণ করে দেখানো সম্ভব না। তবে দুটির মধ্যে যেকোনো তত্ত্বকে সাংস্কৃতিক বিকাশের কেবলমাত্র একটা নির্ধারিত চিত্র খুঁজে পাওয়ার জন্যই নির্বাচন করা যায়।  

এই পদ্ধতিগুলো প্রধাণত নির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে সংস্কৃতিকে শ্রেণীকরণের মাধ্যম হিসেবে হাজির হয়৷ এই ধরনের শ্রেণীকরনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আছে, তা সত্য।  তবে এই অনুমানগুলো যে সবসময় সঠিক, তা প্রমাণ করা এই তত্ত্বগুলোর পক্ষে সম্ভব না। যেমন, পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে ডেকোরেটিভ আর্টের ক্ষেত্রে রিপ্রেজেন্টেটিভ আর জ্যামিতিক- দুই ধরনের নমুনা দেখা যায়। বিবর্তনবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে এমনভাবে এই দুটিকে শ্রেণীকরণ করা হয়, যেখানে দেখা যায় সবার আগে আসে রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর্ম। এরপরে তা থেকে ক্রমান্বয়ে বিকশিত হয়ে জ্যামিতিক ফর্ম আসে৷ ফলে এমন ধারণা জন্মায় যে একটি থেকে অপরটি এসেছে এবং ক্রমে ক্রমে রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর্ম বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে৷ পুটনাম, স্টলপে, বেলফোর, ভ্যারর্ন এবং স্টেইনেনের প্রথমদিককার লেখায় ক্রমিক পরিবর্তনের ধারণাটি ব্যবহার করা হয়েছে। আমি বলছি না যে এইধরনের বিকাশ একদমই ঘটে নাই। কিন্তু শুধুমাত্র সাধারণীকরণের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেক ক্ষেত্রেই এভাবে ঐতিহাসিক বিকাশের ঘটনা ঘটে, এমনটা মনে করা ঝামেলার। বরং কোন কোন ক্ষেত্রে উল্টোও ঘটতে পারে। যেমনঃ খুব সরল জ্যামিতিক ফর্ম থেকে রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর্মের আবির্ভাব ঘটতে পারে৷ এই দুইধরনের সম্ভাবনা নিয়েই ১৮৮৫ সালে হোমস কিছু কাজ করেছিলেন। সুতরাং, ঐতিহাসিক প্রমাণ ছাড়া এইধরনের কোন তত্ত্ব প্রতিষ্ঠা সম্ভবই না৷ 

আবার বিপরীত প্রবণতা দেখা যায় সংস্কৃতির ব্যাপন নিয়ে কাজ করা তাত্ত্বিকদের মধ্যে৷ হেইনরিখ শুর্টজ যখন উত্তর-পশ্চিম আমেরিকার ডেকোরেটিভ আর্টের সাথে মেলানেশিয়ার আর্টের সম্পর্ক নিয়ে কাজ করেন, তিনি মূলত ব্যাপ্তিবাদী প্রকল্পগুলোকেই গুরুত্ব দেন৷ দুইজায়গার উপাদানগুলিকে সাধারণ চোখে পর্যবেক্ষণ করে তিনি মনে করেছিলেন, এই দুইজায়গায় আর্টের উৎস একই।  তবে আমেরিকা আর মেলানেশিয়ার আর্টের ফর্মে যে কিছু অমিল আছে, এবং সেসব অমিলের জন্য যে অন্যান্য স্বাধীন উৎস দায়ী থাকতে পারে- সেটা তিনি এড়িয়ে গেছেন৷ এ ব্যাপারে শুর্টজ রাটজেলকে অনুসরণ করেছিলেন, যিনি অন্যান্যা সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্যের উপর ভিত্তি করে উত্তর পশ্চিম আমেরিকার সাথে মেলানেশিয়ার সংস্কৃতির মিলগুলো খুঁজে বের করার চেষ্টা করেছিলেন। 

এই দুই ধারার (বিবর্তনবাদ আর ব্যাপ্তিবাদ) উপর ভিত্তি করে ইউরোপে যখন গবেষণার কাজ চলছিল, তখন আমেরিকায় আরেকটা ভিন্ন ধারার প্রচলন শুরু হচ্ছিল।২  এই দুই ধারার সাথে আমেরিকার তাত্ত্বিকদের প্রধাণ অমিলটা হলো, নতুন এই তাত্ত্বিকরা গুরত্ব দিয়েছিলেন সংস্কৃতির গতিশীলতাকে৷ তাদের লক্ষ্য ছিল বিস্তৃত পাঠের উপর নির্ভর করে সংস্কৃতির বিশদ ব্যাখ্যা প্রদাণ করা৷ তারা দুটি অঞ্চলের সংস্কৃতির বিকাশের ধরনে সাদৃশ্য, বিশ্বব্যাপী সংস্কৃতির ছড়িয়ে পড়া (ডিফিউসন),  এবং সাংস্কৃতিক নিদর্শনগুলোর স্থিতিশীলতার ব্যাপারগুলোকে দূরে সরিয়ে দেন৷ আমেরিকান এসব এথনোলজির পদ্ধতির সাথে স্ক্যান্ডিভিয়ান প্রবণতা ও প্রত্নতত্ত্বের গবেষণাগুলোর অনেকটা মিল খুঁজে পাওয়া যায়৷ 

দূর থেকে আমেরিকান নৃবিজ্ঞানীদের কাজ দেখলে মনে হতে পারে তারা মানব সভ্যতার দার্শনিক ইতিহাসের প্রশ্নগুলো এড়িয়ে গিয়ে অনেক বেশি ডিটেইল পর্যবেক্ষনে আগ্রহী।  কিন্তু আমেরিকান প্রবণতাকে এইভাবে ব্যাখ্যা করাটা তাদের প্রতি অন্যায় করা হবে। কারণ অন্যান্য স্কলারদের চেয়ে বরং ইতিহাসের গুরুতর প্রশ্নগুলো আমরা  আরো ভালোভাবে বিবেচনা করি। আমরা কেবল ইতিহাসের যেকোন জটিল সমস্যাকে একটামাত্র সূত্র দিয়ে সমাধান করার ব্যাপারটি ত্যাগ করেছি। 

প্রথমত, সাংস্কৃতিক ইতিহাসের সমগ্র ব্যাপারটিই আমাদের কাছে ইতিহাসের মামলা হিসেবেই হাজির হয়। ইতিহাস বুঝার ক্ষেত্রে শুধুমাত্র কোন জিনিস কিভাবে কাজ করে তা জানাই গুরুত্বপূর্ণ নয়, এর উদ্ভব কিভাবে ঘটে তা জানাও দরকার। এথনোলজির ক্ষেত্রেই যদি বলি, পৃথিবীর বেশিরভাগ প্রান্তেই যেসব ঐতিহাসিক তথ্যের কথা আমরা উল্লেখ করি, সেসব বেশিরভাগই আর্কেওলজির সাহায্য ছাড়া প্রমাণযোগ্য না। আর বিভিন্ন পরিবর্তনের ব্যাপারগুলো অস্পষ্ট পদ্ধতিগুলোর সাহায্যেই মূলত বের করা হয়। যেকোনো ফেনোমেনাকে স্থির ধরেই এই ধরনের পদ্ধতিগুলোতে কাজ করে। এইধরনের পদ্ধতি কিভাবে কাজ করে  তা লোয়ির প্লেইন ইন্ডিয়ানদের মিলিটারি সমাজে নিয়ে করা কাজগুলো থেকে একটা ধারণা পাওয়া যাবে। আবার আমেরিকান মিথ নিয়ে যে আধুনিক গবেষণাগুলো হচ্ছে, তাতেও এইধরনের পদ্ধতিগুলো দেখা যায়। তবে এটা সত্য যে ইতিহাসের যেকোনো ঘটনার ক্রোনোলজিক্যাল সিকুয়েন্স সাজিয়ে একদম সঠিক তথ্য পাওয়া সম্ভব না হলেও কখনো কখনো বড় সম্ভাবনাগুলোকে খুঁজে পাওয়া সম্ভব। এবং কখনো কখনো সেসব তথ্য খাঁটিও হতে পারে। 

নতুন ধরনের পদ্ধতির প্রয়োগ শুরু হওয়ার সাথে সাথেই সেসব গবেষকরা, যারা কোন একটি সংস্কৃতির নিদৃষ্ট কিছু মানুষকে নিদৃষ্ট সময়ে পর্যবেক্ষন করে, তাদের কাছে স্থিতিশীল প্রাচীণ সমাজের  উপস্থিতি বিলীন হয়ে গেল। উল্টো সকল সাংস্কৃতিক ফর্ম একটা ক্রমাগত বয়ে চলা এবং রূপান্তরিত হওয়া জিনিস হিসেবে হাজির হলো। এটা সহজেই বুঝা যায় যে আমাদের গবেষণায় কেন সংস্কৃতির ছড়িয়ে পড়ার ব্যাপারটা প্রাধাণ্য পেলো এবং অভ্যন্তরীন শক্তির কারণে বিকাশের ধারণাটি বাতিল হয়ে গেল৷ এর বদলে এনকালচারেশনের প্রত্যেকটি ফেনোমেনাকে পর্যবেক্ষণের কাজ শুরু হলো এবং গুরুত্ব পেল ভিন্ন সংস্কৃতি থেকে আসা উপাদানগুলো কিভাবে নতুন পরিবেশে নতুন রূপ পায়- তা দেখা। অভ্যন্তরীন বিকাশের ব্যাপারটি কেন পরে আর এতো গুরুত্ব পেল না, তার কারণ এই না যে এ ধারণাটি তত্ত্বগতভাবে দূর্বল, বরং পদ্ধতিগতভাবে তা প্রমাণ করা সম্ভব না। এইকারণেই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এনকালচারারেশন প্রক্রিয়া এবং সাংস্কৃতিক কর্মকান্ডের স্বাধীণ প্রবণতার দিকে গবেষকদের দৃষ্টি বেশি যাচ্ছে।  

এই ধরনের গবেষণাপদ্ধতি গুরুত্ব দেয় প্রায় সবধরনের ফেনোমেনাকে। যেখানে প্রাকৃতিক বিজ্ঞানে আমরা কেবলমাত্র কিছু নিদৃষ্টসংখ্যক কারণ এবং তার ফলাফল নিয়ে ঘাটাঘাটি করি, সেখানে ইতিহাসের বেলায় আমাদের প্রত্যেকটা ফেনোমেনাকে একই সাথে কারণ ও ফলাফল হিসেবে বিবেচনা করতে হয়। এই কথাটি অবশ্য প্রকৃতির কিছু নির্দিষ্ট পাঠের ক্ষেত্রেও সত্য। যেমন জ্যোতির্বিদ্যার ক্ষেত্রে কোন মহাজাগতিক বস্তুর অবস্থানকে মহাকর্ষের প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করা যেতে পারে। আবার একই সময়  মহাকাশে তাদের নিদৃষ্ট অবস্থান ভবিষ্যতের পরিবর্তনগুলোকেও নির্ধারণ করে। এইধরনের সম্পর্ক আরো স্পষ্টভাবে আসে মানুষের ইতিহাসের ক্ষেত্রে। উদাহরণ দিয়ে বলতে গেলে, খাদ্যের সারপ্লাস বেশি হলে, তা জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং অবসর সময় বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। এভাবে এমনসব কাজের সুযোগ তৈরি হয়, যেসবের দৈনন্দিন জীবনে প্রয়োজন থাকে না। এভাবে জনসংখ্যা ও অবসর সময় বাড়ার কারণে নতুন উদ্ভাবন ও খাদ্য উৎপাদন আরো বাড়ানোর সুযোগও বাড়তে থাকে। এভাবে একটা পর্যায়ক্রমিক চক্র চলে। 

সংস্কৃতির ক্রমাগত পরিবর্তনকে পাঠ করতে গেলে আরেকটি সমস্যা দেখা যায়, সেটা হচ্ছে ব্যাক্তির সাথে সমাজের সম্পর্ক। এটা সত্য যে কোন ব্যক্তির  কার্যকলাপের অনেককিছুই তার সমাজ দ্বারাই নির্ধারিত হয়, তবে এও সত্য যে তার নিজের কাজও সমাজে প্রভাব ফেলতে পারে, এবং সমাজের পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে৷ এই ব্যাপারটি সংস্কৃতির পরিবর্তন পাঠের সময় অন্যতম বড় সমস্যা হিসেবে সামনে আসে। তেমনি যারা গবেষণায় ইচ্ছুক তাদের সামনে কোন ট্রাইবের সাধারণ বিশ্বাস কিংবা প্রথার নিয়মতান্ত্রিক পাঠের বদলে, ব্যক্তি কিভাবে পুরো সামাজিক পরিবেশের সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়া দেখায়, এবং কিভাবে ব্যক্তির মতের ভিন্নতা ও কাজের ভিন্নতার মাধ্যমে প্রাচীণ সমাজে বড় বড় পরিবর্তনগুলি সম্ভবপর হয়েছে- তা খুঁজে বের করার প্রকল্পও সামনে নিয়ে আসে। 

সাধারণভাবে বলতে গেলে, আমরা যে পদ্ধতিটা নিয়ে কাজ করছি তার উদ্দেশ্য হলো বর্তমান সময়ে দাঁড়িয়ে সমাজের গতিশীল পরিবর্তনকে পর্যবেক্ষণ করা। আমরা সভ্যতার একটা সাধারণ বিকাশের ধারণা দেওয়া ত্যাগ করেছিলাম৷ কারণ আমরা যদি আমাদের চোখের সামনে যা ঘটছে তা ঠিকমতো পর্যালোচনা করতে না পারি, তাহলে সভ্যতার বড় প্রশ্নের মোকাবিলাও সম্ভব না। 

মানব সভ্যতার ইতিহাস আমাদের সামনে মনস্তাত্বিক প্রয়োজনীয়তা দিয়ে আবদ্ধ একটা ঘটনা হিসেবে হাজির হয় না। বিবর্তনবাদে এই ধারণার অধীনেই একরৈখিক বিকাশের প্রসঙ্গ তোলা হয়।  তার বদলে বরং আমরা দেখতে পাই, প্রত্যেকটি জনগোষ্ঠীর তার স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে, যে ইতিহাস সে সামাজিক গোষ্ঠীর  অভ্যন্তরীন বৈশিষ্ট্য দ্বারা যেমন প্রভাবিত, তেমনি ভিন্ন সংস্কৃতি দ্বারাও প্রভাবিত।  এসব ক্ষেত্রে একইসাথে যেমন আশেপাশের সাংস্কৃতিক কেন্দ্রের সাথে সেই সংস্কৃতির ক্রমাগত পরিবর্তনের প্রক্রিয়া দেখা যায়, তেমনি অনেকসময় সংস্কৃতির বৈশিষ্ট্যগুলোর সংযোগ আরো বাড়তেও দেখা যায়। পুরো ব্যাপারটিকেই একটি সরল বিবর্তনবাদী ফ্রেমের আওতায় বুঝা সম্ভব না। বিবর্তনবাদী আর আমেরিকার দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যটা বুঝা যাবে জুনি সভ্যতা নিয়ে ফ্রাংক হ্যামিল্টন কাশিং এবং এলসি পার্সনস, ক্রোয়েবার, লেসলি স্পিয়ার প্রমুখদের কাজের তুলনা করলে। কাশিং বিশ্বাস করতেন ভূপ্রাকৃতিক পরিবেশের প্রতি জুনি জনগোষ্ঠীর প্রতিক্রিয়ার ভিত্তিতেই তাদের সংস্কৃতিকে ব্যাখ্যা করা সম্ভব, এবং এভাবেই সমগ্র জুনি সংস্কৃতির বিকাশ ব্যাখ্যা করা সম্ভব। ইন্ডিয়ান জাতি নিয়ে কাশিংয়ের গভীর জ্ঞান এবং তাদের জীবন নিয়ে তার অভিজ্ঞতা কাশিংয়ের এই ব্যাখ্যাকে জোর প্রদান করেছিল। অন্যদিকে ডঃ পার্সনস দেখিয়েছেন কিভাবে জুনি সংস্কৃতির উপর স্প্যানিশ সংস্কৃতি প্রভাব রাখতে থাকে। আর ক্রোয়েবারের কাজ তো এই ব্যাপারে একালচারেশনে প্রক্রিয়ার অন্যতম সেরা দলিল। এইক্ষেত্রে দেখা যায় মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যাগুলো মোটেই যথার্থ না, এবং ঐতিহাসিক সূত্রগুলো আমাদের সম্পূর্ণ নতুন একটা চিত্র দেখায়। জুনি কালচারের বর্তমান অবস্থার পিছনে আছে তাদের স্বতন্ত্র প্রথাগুলো (যেগুলা বেশ জটিল) এবং তার সাথে যুক্ত ইউরোপিয়ান প্রভাব। 

প্রাচীণ সমাজের ডাইনামিক্স নিয়ে পাঠ করার সময় এটাও দেখা যায়- এলিয়ট স্মিথ যেভাবে ধারণা দিয়েছেন, সেভাবে  কোন সমাজই আসলে দীর্ঘদিন স্থির থাকে না। ফলে তার এই ধারণা সকল ভিত্তি হারায়। যেখানেই প্রাচীণ সমাজ নিয়ে পাঠ করা হবে, তাকে নিরন্তর পরিবর্তনশীল  হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। এইটা মোটেই সত্য না যে, কোন প্রাচীণ জনগোষ্ঠীর কোন প্রথা হাজার বছর ধরে একই অবস্থায় থাকে। এইজন্যই এলিয়ট স্মিথের প্রস্তাব অনুসারে, প্রাচীন ভূমসাগরীয় সভ্যতার কোন প্রথা এখনো পৃথিবীর বিভিন্ন জায়গায় একই অবস্থায় দেখা যায়- এই ধারণাটি আর ধোপে টেকে না। তবে যখন সাংস্কৃতিক বিকাশের ইতিহাস ঘাটতে গেলে প্রত্যেকটা স্থানের স্বতন্ত্র বিকাশের ধরন দেখতে পাওয়া যায়, তার সাথে সাথে কিছু নিদৃষ্ট সমান্তরাল বিকাশের লক্ষণও দেখা যায়। এই একই ধরনের মিলের ব্যপারে আমরা কোন সরল সামাজিক কিংবা মনস্তাত্বিক ব্যাখ্যা দাঁড় করাতে আগ্রহী না৷ আমি আগে যে খাদ্য সরবরাহ আর জনসংখ্যার সম্পর্ক নিয়ে কথাটা তুলেছিলাম, তা এখানে একটা উদাহরণ হিসেবে দেখানো যেতে পারে। আরো কিছু উদাহরণ দেখানো যাবে, যেখানে কোন একটা সমস্যা সমাধানের কিছু নিদৃষ্ট পদ্ধতিই উপস্থিত থাকে৷ যেমন আমরা যদি বিয়ের ব্যাপারে বলি, বিভিন্ন সমাজে বিয়ে কেবল একাধিক নারী এবং একাধিক পুরুষ, একাধিক পুরুষ এবং একজন নারী, একাধিক নারী ও একজন পুরুষ কিংবা একজন নারী ও একজন পুরুষের মধ্যেই সম্ভবপর হতে পারে। কাজেই বিষয়টা হচ্ছে এই কয়েক ধরনের বিয়েব্যবস্থাই দুনিয়ার সবজায়গায় দেখা যায়, এবং এই কারণে একইধরনের বিয়ের রূপ বিভিন্ন প্রান্তে স্বাধীণভাবে গৃহীত হয়। আবার অর্থনৈতিক অবস্থা এবং মানুষের যৌন আচরণগুলো  আমলে নিলে সহজেই বুঝা যায় যে দলবদ্ধ বিবাহ (Group marriage) এবং বহুস্বামী বিবাহ (Polyandry) খুবই বিরল। একইধরনের ঘটনাই ঘটে যখন মানুষের দার্শনিক দৃষ্টিভঙ্গির কথা চিন্তা করতে যাই। আমরা যদি আইনব্যবস্থার কথা ধরি, তাহলে দেখা যাবে, আইন আসলে মনস্তাত্বিক, শারীরিক এবং  সামাজিক অবস্থার সাথে সম্পর্কিত, এটা নিছক সংস্কৃতির কোন কৃতিত্ব নয়। 

আমরা যদি ওল্ড ওয়ার্ল্ড আর আমেরিকায় ইন্ডাস্ট্রিয়াল উদ্ভাবনগুলোর সিকোয়েন্সটা দেখি, তাহলে দেখবো কিভাবে খাবার সংগ্রহ আর পাথরের ব্যবহারের পর ক্রমে ক্রমে কৃষির উদ্ভাবন, মৃৎশিল্প, এবং শেষ পর্যন্ত ধাতুর ব্যবহার চালু হয়েছে৷ অবশ্য এই উদ্ভাবনের পিছনে একটা বড় অংশ জুড়ে মানুষের প্রকৃতিকে ব্যবহার, নানা ধরনের যন্ত্রপাতি এবং তৈজসপত্রের ব্যবহারই মূল ভূমিকা রেখেছিল৷  যদিও এইক্ষেত্রে দুই মহাদেশে (ওল্ড ওয়ার্ল্ড আর নিউ ওয়ার্ল্ড) কিছু সমান্তরাল বিকাশের চিহ্ন দেখা যায়, তবে দুইজায়গায়ই একই গতিপথ খোঁজার চেষ্টা হবে ভুল। যেখানে ওল্ড ওয়ার্ল্ডে পশুপাখির পালন একদম শুরুর দিকে প্রচলিত ছিল, সেখানে নিউ ওয়ার্ল্ডে শুরু হয় অনেক অনেক পরে৷ এছাড়া এই পুরোটা সময় নিউ ওয়ার্ল্ডে কুকুর ছাড়া অন্য কোন প্রাণীকে পোষ মানানোর প্রচলণ দেখা যায় না৷ তবে পেরুতে কিছু কিছু ব্যতিক্রম দেখা যায়। সেখানে লামা পোষার প্রমাণ পাওয়া গেছে৷ 

আমি এখনো একটা আধুনিক এথনোলজির মেথডের কথা বলি নাই, যার সাথে সাইকো-এনালাইসিসের সম্পর্ক আছে৷ ফ্রয়েড তার সাইকো-এনালাইসিসের মাধ্যমে দেখিয়েছেন যে ব্যক্তির মনস্তাত্বিক অনেক কার্যকলাপ মূলত প্রাচীণ চিন্তা-ভাবনার ধরনগুলোকেই প্রকাশ করে৷  অনেক দিক দিয়ে বিবেচনা করলেই স্টাকেনের মতো সিম্বলিস্টরা, যারা মিথলজির ব্যাখ্যা খুঁজার চেষ্টা করেছেন, তার সাথে ফ্রয়েডের কাজের মিল আছে৷  রিভার্স ফ্রয়েডের অনেকগুলা ধারণা ধার করেন এবং গ্রায়েবনার আর স্মিথের আইডিয়াও কাজে লাগান। এইজন্য তার লেখায় ব্যক্তির আচরণকে বিশ্লেষণ করার ক্ষেত্রে এবং প্রাচীণ বিভিন্ন প্রথা বিনিময়ের ব্যাপারগুলো ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে একটা অদ্ভূত আর বিচ্ছিন্ন প্রবণতা দেখা যায়। 

আমি মনে করি যে, ফ্রয়েডের সাইকো-এনালাইসিসের কিছু কিছু জিনিস এথনোলজির কাজে ভালোভাবেই প্রয়োগ করা যায়৷ তবে ফ্রয়েডের একচেটিয়া ব্যবহার মানব সমাজের বিকাশ নিয়ে তেমন সুস্পষ্ট ধারণা দিতে সক্ষম না। এটা সত্য যে এর আগ পর্যন্ত কারো জীবনের প্রথম কয়েক বছরের অভিজ্ঞতার যে প্রভাবটা তার উপর পড়ে, তাকে প্রায় পুরোপুরিই অবহেলা করা হয়েছে৷ একইসাথে ব্যক্তির যৌথ স্মৃতিব্যবস্থা  তৈরি হয়ে উঠার আগেই তার  অভ্যাস ও অভিজ্ঞতা যে মানুষের সামাজিক আচরণের অনেকটা গড়ে তোলে- তাকেও তেমন গুরত্ব দেওয়া হয় নাই, আর মানুষের বিভিন্ন তথাকথিত জাতিগত বা বংশানুক্রমিক ভাবে পাওয়া বৈশিষ্ট্য আসলে যে প্রথম দিককার সামাজিক প্রক্রিয়াগুলোর সাথেই সম্পর্কিত, সেটাও এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। তবে আমরা যদি অবদমিত বাসনার তত্ত্বটি দিয়ে সবকিছুকেই বুঝতে চাই, তাহলে এর সামর্থ্যকে অতি মূল্যায়ন  করা হয় এবং নর্মাল ও এবনর্মাল ব্যক্তির মনোবিজ্ঞানের মধ্যকার সীমাবদ্ধগুলোকে আর ধরা যায়না। অন্যান্য অনেক ফ্যাক্টরও এখানে গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। উদাহরন দিলে বলা যায়ঃ সাইকোএনালিস্টরা মানুষের আচরণ অধ্যয়নের মাধ্যমে যেসব ফলাফল পায় তা ভাষার ধারনাগুলোর সাথে খাপ খায় না, বরং ভাষাগত বিশ্লেষণে অনেক বিপরীত ফলাফল পেয়ে থাকি আমরা। ভাষার ফাংশন সম্পর্কে সাধারণ শর্তগুলো এখনও পুরোপুরি আবিষ্কার হয়নি।  তবে ভাষার মধ্যে থাকা ক্যাটাগরিগুলো আমাদের এই পৃথিবীতে বিভিন্ন  ধারণাগত ক্যাটাগরিগুলো কিভাবে অবস্থান করে, তা বুঝতে অনুমোদন দেয়। আমাদের ভাষা নিয়ে যথেষ্ট জ্ঞানের অভাব থাকা স্বত্ত্বেও, আমরা এই ক্যাটাগরিগুলোকে অবজেক্টিভ হিসেবে ধরে নিতে পারি। এইভাবে ভাষার ক্যাটাগরিগুলো আমাদের চিন্তার কাঠামোও গড়ে দেয়৷ হয়তো এইসব ক্যাটাগরিগুলোর উৎপত্তি সম্পর্কে জানা সম্ভব না৷ তবে এই ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া যায় যে, ভাষার এই ক্যাটাগরির সাথে সাইকো-এনালাইসিসের বিষয়গুলোর তেমন সম্পর্ক নেই। 

সিম্বলিজমের ব্যাপারে সাইকো-এনালাইটিক থিওরির কাজগুলো নিয়েও বিস্তর সন্দেহ আছে। আমরা জানি যে দর্শনের সকল ক্ষেত্রেই সিম্বল বিশ্লেষণের খুবই গুরুত্বপূর্ণ জায়গা আছে৷ তবে শুধু প্রাচীণ জীবনব্যবস্থা নিয়ে না, দর্শন কিংবা ধর্মতত্ত্বের ক্ষেত্রেও, এইধরনের সিম্বলের বিশ্লেষণগুলো নির্ভর করে যিনি এই বিশ্লেষণটি করছেন তার সাবজেক্টিভ আইডিয়ার উপর। বাইবেলের  প্রতীকি বিশ্লেষণের সময় যেমন সেটা সেই ধর্মতাত্ত্বিকদের নিজস্ব প্রবণতার উপরই নির্ভর করে, ঠিক একই ব্যাপার ঘটে সাইকো-এনালাইসিসের ক্ষেত্রেও। এইক্ষেত্রে এইধরনের প্রতীকি বিশ্লেষণের ক্ষেত্রে যে ফলাফলটা আসে, তা গবেষকের নিজস্ব বয়ানের উপরই নির্ভর করে। কারণ তার নিজের কেন্দ্রীয় ধারণা অনুসারেই তিনি ফেনোমেনাগুলোকে সাজিয়ে থাকেন। এইজন্যই এইধরনের কাজের ক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের ব্যাখ্যা তৈরি হতে পারে।  

মনোবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অগ্রগতিগুলোকে আমরা অবশ্যই স্বাগত জানাবো, তবে একমাত্র এই অগ্রগতিকেই এথনোলজিকাল পদ্ধতির অগ্রগতির সাথে গুলিয়ে ফেললে চলবেনা। কারণ এথনোলজিকাল পদ্ধতির ক্ষেত্রে শুধুমাত্র নিদির্ষ্ট ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের অগ্রগতি দিয়ে সামাজিক ঘটনাবলির ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করা যায়না। যেসব সামাজিক ঘটনাবলি ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত হয় এবং সাবজেক্টকে যেভাবে তারা প্রভাবিত করে তা শুধুমাত্র ব্যক্তিকেন্দ্রিক মনোবৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে করা ব্যাখ্যাসমূহের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।  

তারপরও আমরা মনস্তাত্বিক পদ্ধতির সবধরনের বিকাশকেই স্বাগত জানাই। তবে এথনোলজির ক্ষেত্রে ব্যক্তির মনস্তত্ত্ব, বিভিন সামাজিক ফেনোমেনাকে দেখার একটা ঐতিহাসিকভাবে নির্ধারিত ও একরৈখিক পদ্ধতির ব্যবহার করা সম্ভব না৷ 

টীকা

১. ডেকোরেটিভ আর্ট বলতে বুঝানো হয় যেসব শৈল্পিক কাজের বস্তুগত ব্যবহারযোগ্যতাও আছে৷ যেমন, নকশী কাঁথা। ডেকোরেটিভ আর্টের ক্ষেত্রে রিপ্রেজেন্টেটিভ ফর্মে বিভিন্ন প্রাকৃতিক বিষয়ের হুবহু অনুকরণ করা হয়। যেমনঃ প্রাচীণ সমাজের মানুষদের আঁকা বিভিন্ন গুহাচিত্র। এইসময়ে  বেশ জটিল ধরনের রিপ্রেজেন্টেটিভ আর্টও দেখা গেছে। আর জ্যামিতিক ফর্মের ক্ষেত্রে বাস্তবের অনুকরণের চেয়ে জ্যামিতিক আকৃতিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

২. বোয়াসের চিন্তাধারা ছিল Historical Particularism এবং Cultural Relativism স্কুলের অধীনে। এই দুটি স্কুলই আমেরিকার নৃবিজ্ঞানে প্রথম গড়ে উঠে। বোয়াস এই চিন্তাধারার অন্যতম প্রধান ব্যক্তিত্ব ছিলেন। এর আগ পর্যন্ত নৃবিজ্ঞানে বিবর্তনবাদ ও ডিফিউসনিজম (ব্যাপ্তিবাদ) প্রধাণ চিন্তাধারা হিসেবে ছিল। পরে এদের পরিত্যাগ করে অনেক আমেরিকান নৃবিজ্ঞানীরা। তাদের চিন্তার প্রধাণ বিষয় ছিল, প্রত্যেক সংস্কৃতিই স্বতন্ত্র, এবং তাদের বিবেচনা করতে হবে সেই সংস্কৃতির  নিজস্ব মানদন্ড অনুযায়ী। প্রত্যেক জাতিরই আলাদা স্বতন্ত্র ইতিহাস আছে৷ সেই ঐতিহাসিক যাত্রাও তাদের নিজস্ব সাংস্কৃতিক ও পারিপাশ্বিক জায়গা থেকেই বুঝতে হবে।   

৩. সেইসময়কার Historical Particularism স্কুলের চিন্তকদের প্রধাণ লক্ষ্য ছিল যেকোন সংস্কৃতির গতিশীলতাকে বুঝতে পারা। এইজন্য বোয়াসরা তাদের পর্যবেক্ষণকে নিদৃষ্ট কোন তাত্ত্বিক কাঠামোতে বিবেচনা করতে পছন্দ করতেন না।         

Related Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।...

বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

'বর্জন' কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য  এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস...