কেন নৃবিজ্ঞান গুরত্বপূর্ণ?

[Easa ব্লগে প্রকাশিত ‘Why Anthropology Matters’ লেখাটি অনুবাদ করেছেন আবদুল্লাহ হেল বুবুন]

নৃবিজ্ঞানকে প্রায়শই বর্ণনা করা হয় ‘অপরিচিতকে পরিচিত’ এবং ‘পরিচিতকে অপরিচিত’ করার কলা হিসেবে। এই জ্ঞানশাস্ত্র ‘বিজ্ঞানের মাঝে সবচেয়ে মানবিক’ এবং ‘মানবিকের মাঝে সবচেয়ে বৈজ্ঞানিক’ (এরিক উল্‌ফ) বলেও অভিহিত হয়েছে। নৃবিজ্ঞানকে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী, তাদের সমাজ ও সাংস্কৃতিক জগতের তুলনামূলক অধ্যয়ন বলা হয়। নৃবিজ্ঞান একইসাথে মানব বৈচিত্র ও বিচিত্র মানুষের মাঝে যা সর্বজনীন তা অনুসন্ধান করে।

দীর্ঘকাল যাবত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান বহুদূরবর্তী প্রান্তিক স্থান এবং অক্ষর পরিচয়হীন ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান সমূহে অন্তর্ভুক্ত নয় এমন ছোটো আকারের সমাজ অধ্যয়নের সাথে জড়িত ছিল। যদিও মানব বৈচিত্রের অধ্যয়ন সবচেয়ে ছোটো থেকে সবচেয়ে বড় সমাজ এবং সবচেয়ে সরল থেকে সবচেয়ে জটিল সমাজের সাথে যুক্ত। বর্তমান সময়ের অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানী স্বীকার করেন যে, সাম্প্রতিক বিশ্বের সকল সমাজ অভিবাসন, জলবায়ু পরিবর্তন, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও বিভিন্ন ধ্যান-ধারণার বহুজাতিক প্রচলনের মতো জটিল প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত। বিশ শতকের ইউরোপীয় ও আমেরিকান নৃবিজ্ঞানীরা যখন মেলানেশিয়া ও আফ্রিকার মতো দূরবর্তী স্থানগুলোতে (তখনকার দিনের মানদণ্ডে) ভ্রমণ করেছে, তখন তাদের স্থানীয় বা নেটিভদের দৃষ্টিকোণ (পয়েন্ট অব ভিউ) উপলব্ধি করতে অনেক সংগ্রাম করতে হয়েছে। তেমনিভাবে, সমকালীন নৃবিজ্ঞানীরা নিজেদের উঠোন থেকে শুরু করে বহুদূরের স্থান, যেখানেই তাদের গবেষণা কার্যক্রম পরিচালিত করুক না কেন , তাদের অনুসন্ধানের ক্ষেত্রকে যতোটা সম্ভব বুঝতে চেষ্টা করে। এর পরে নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন মানবগোষ্ঠী যেভাবে নিজ দুনিয়াকে অনুধাবন করে এবং সে অনুযায়ী কাজ করে, তা বিবৃত করে। এই প্রক্রিয়ারও উদ্দেশ্য নেটিভ বা স্থানীয়দের দৃষ্টিকোণ বুঝতে পারা। তবে এখন কোনো একটি ইউরোপীয় ব্যয়ের হিসাব অথবা প্রশান্ত মহাসাগরীয় দ্বীপগুলোর জাতিগত রাজনীতির ভূমিকা নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কেন্দ্রীয় বিষয় হতে পারে।

প্রথম প্রজন্মের নৃবিজ্ঞানীরা যেসব প্রশ্ন উত্থাপন করেছিলেন, সেসব প্রশ্নের বেশ কিছু নতুন উপায়ে নয়া নৃবিজ্ঞানীদের এখনও ব্যস্ত রেখেছে । সাধারণত নৃবিজ্ঞানীরা, মানুষ হওয়া বলতে কি বোঝায়, একটি সমাজ কিভাবে গঠিত হয় এবং ‘আমরা’ ধারণাটির অর্থ কী, এই ধরনের প্রশ্নোত্তরে মনোনিবেশ করেন। অতীতের মতো হালের নৃবিজ্ঞানীরাও সমকালীন সমাজে জ্ঞাতিসম্পর্কের গুরুত্ব বিশ্লেষণ করেন। ক্ষমতা ও রাজনীতি, ধর্ম ও বিশ্ব-দর্শন এবং লিঙ্গ ও সামাজিক শ্রেণি সম্পর্কে প্রশ্ন তোলেন। তবে সাম্প্রতিক কালে তারা ক্ষুদ্র সমাজে পুঁজিবাদের প্রভাব ও আদিবাসী গোষ্ঠীগুলোর সংস্কৃতি রক্ষার সংগ্রাম নিয়ে কাজ করছেন। এগুলো হালের নৃবৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানের কয়েকটি ক্ষেত্র মাত্র।

বিভিন্ন তাত্ত্বিক ঘরানা এবং অঞ্চল ও প্রসঙ্গ বা বিষয় ভেদে আগ্রহে পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের কলাকৌশল একটি টুলবক্স গড়ে ওঠে, যা এই জ্ঞানশাস্ত্রে প্রশিক্ষিত সকলেই ব্যবহার করেন। নৃবিজ্ঞান প্রকাশ্যে ব্যক্ত করে না যে, এই জ্ঞানশাস্ত্র মানবজাতির সামনে উপস্থিত সকল সমস্যা সমাধান করতে সক্ষম। এই জ্ঞানশাস্ত্র এর অনুশীলনকারীদের এমন দক্ষতা ও জ্ঞান প্রদান করে যা উপযুক্ত ও প্রাসঙ্গিক উপায়ে জটিল প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হতে তাদেরকে সক্ষম করে তোলে। সামাজিক ও সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান অধ্যয়নের মৌলিক পরিভাষাগুলো হলো সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকবাদ, এথনোগ্রাফি, তুলনা এবং পটভূমি।

সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ

নৃবিজ্ঞান অন্য জনগোষ্ঠীর মূল্যবোধের ঠিক বেঠিক ফয়সালা করতে যায় না। এই জ্ঞানশাস্ত্র  অনুশীলনকারীরা বিভিন্ন সমাজকে ‘অনুন্নত’ থেকে ‘উন্নত’ অনুক্রমেও সাজায় না। এর অর্থ এই না যে, মানুষ যা কিছু করে সে সম্পর্কে নৃবিজ্ঞানীরা যেকোনো  ধরণের অভিমত ব্যক্ত করা থেকে বিরত থাকে। উদাহরণস্বরূপ, অল্পসংখ্যক নৃবিজ্ঞানীই ‘সংস্কৃতি’-র নামে পরিচালিত সহিংসতা বা বৈষম্যকে উপেক্ষা করে। মানুষের ক্রিয়াকলাপ, সেই ক্রিয়াকলাপ নিয়ে মানুষের নিজেদের বোঝাপড়া এবং মানুষের ব্রহ্মাণ্ডবোধ; এই বিষয়গুলো অধ্যয়নের গুরুত্বই বেশি দেখা যায় পেশাদারী ও বৈজ্ঞানিক নৃবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে।

সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ নামে পরিচিত এই দৃষ্টিকোণ বিভিন্ন সংস্কৃতিকে তাদের স্বীয় মানদণ্ডে অধ্যয়ন করার জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ পদ্ধতিগত উপকরণ। এই দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী, সব সমাজ একে অপরের থেকে গুনগতভাবে ভিন্ন ও প্রত্যেক সমাজেরই নিজস্ব আভ্যন্তরীণ বিধান রয়েছে। ঠিক একারণেই বিভিন্ন সমাজকে উন্নত-অনুন্নত অনুক্রমে সাজানো বিভ্রান্তিকর। উদাহরণস্বরূপ, সাক্ষরতা ও বার্ষিক আয়ের ক্ষেত্রে কোন সমাজ নিজেদের একটি তালিকার সর্বনিম্ন ধাপে খুঁজে পেতে পারে। তবে এই তালিকা সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক হয়ে দাঁড়াবে যদি ঐ সমাজের বই ও অর্থ সম্পর্কে কোন আগ্রহই না থাকে। সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদী কাঠামোর অধীনে কেউ এই যুক্তি দিতে পারে না যে, যে সমাজ বেশী গাড়ি ব্যবহার করে, সেই সমাজ কম গাড়ি ব্যবহারকারী সমাজ থেকে উত্তম বা স্মার্টফোন ও জনসংখ্যার অনুপাত জীবনযাত্রার মানের একটি গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশক।

সমাজকে নিরপেক্ষ মানদণ্ডে উপলব্ধি করার নৃবৈজ্ঞানিক প্রচেষ্টায় সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকবাদ অপরিহার্য। সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকবাদ একটি মেথোডোলজিক্যাল টুল, কোন নৈতিক আদর্শ নয়। অপর জনগোষ্ঠীর দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ না করে এবং তাদের দ্বারা সংঘটিত অন্যায়কে উপেক্ষা না করেও ঐ সব জনগোষ্ঠীকে নিখুঁতভাবে অধ্যয়ন করা সম্ভব। নৃবিজ্ঞানী ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ যেমন বলেছেন, “কাউকে বোঝার জন্য একেবারে তার মত হয়ে ওঠা অপরিহার্য নয়।”

এথনোগ্রাফির ক্ষমতা

নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ মেথোডোলজিক্যাল টুল হলো এথনোগ্রাফি বা মাঠকর্ম, যা নৃবিজ্ঞানে তথ্য সংগ্রহের প্রধান মাধ্যম। এথনোগ্রাফিক মাঠকর্ম  মূলধন সাপেক্ষ নয়, আবার শ্রম সাপেক্ষও নয়– এথনোগ্রাফি একটি মিতব্যয়ী বিষয় । গবেষণাক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানীরা দৃশ্যত কিছু না করেই তাদের অধিকাংশ সময় কাটান, আসলে এথনোগ্রাফি সময় সাপেক্ষ। গবেষণাক্ষেত্রে নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত এক থেকে দুই বছর কাটান। এটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ এথনোগ্রাফিক পদ্ধতির উদ্দেশ্য হলো গভীর জ্ঞান অর্জন ও একটি জনগোষ্ঠীর সামাজিক-সাংস্কৃতিক জগৎ সম্পর্কে সঠিক বোঝাপড়া তৈরি করা। এই উদ্দেশ্য অর্জনে তাদের স্থানীয় ভাষা শিখতে হয় এবং যতো বেশী সম্ভব ততো স্থানীয় কার্যক্রমে অংশ নিতে হয়।

নৃবিজ্ঞানীরা গুনগত সমাজবিজ্ঞানের মতো (যা নিবিড় সাক্ষাতকারের উপর নির্ভরশীল) সাক্ষাতকারকে তথ্য সংগ্রহের প্রধান পদ্ধতি মনে করে না। যদিও সাক্ষাতকার একটি উপকরণ হিসেবে তাদের টুলবক্সে স্থান দখল করে। বরং তারা অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে। এই সময়ে নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত গবেষণাক্ষেত্রে মানুষের সাথে সময় কাটায়, তাদের সাথে কথা বলে, মাঝে মাঝে প্রশ্ন করে এবং যতোটা পুঙ্খানুপুঙ্খ রূপে সম্ভব সেভাবে স্থানীয়দের জীবন প্রণালী সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করে। নৃবিজ্ঞানীরা মানুষকে ব্যবহার করে অন্য মানুষদের অধ্যয়ন করে। এই প্রক্রিয়ার সফলতা নিশ্চিত করার জন্য গবেষককে তার অধ্যয়নরত জনগোষ্ঠীর সাথে ব্যক্তিগত পর্যায়ে পরিচিত হতে হয়, তাদের সাথে বারবার দেখা করতে হয় এবং যদি সম্ভব হয়, মাঠকর্ম চলাকালীন তাদের সাথে বসবাস করতে হয়। এই কারণে এথনোগ্রাফিক উপাত্ত উচ্চ গুনমান সম্পন্ন হয়। যদিও এই উপাত্তকে প্রায়শই পরিমাণগত ও ঐতিহাসিক উপাত্ত দ্বারা সম্পূরণ করতে হয়। কারণ অংশগ্রহণমূলক পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে নৃবিজ্ঞানীরা যে সংখ্যক মানুষের জীবনযাত্রা অধ্যয়ন করে, তা খুব সীমিত।

এথনোগ্রাফিক পদ্ধতি একজন নৃবিজ্ঞানীকে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর এমন এমন দিক উম্মোচনে সক্ষম করে তুলতে পারে যা অন্য পদ্ধতি ব্যবহারকারীদের পক্ষে সম্ভব নয়। উদাহরণস্বরূপ, নৃবিজ্ঞানীরা ইউরোপীয় নয়া-নাজিদের জীবন দর্শন; আফ্রিকার অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতির ক্রিয়া এবং নরওয়ের মানুষ কেন যা শিকার করে থাকে, সেটা থেকে বেশী পরিমাণ খাবার নষ্ট করে প্রভৃতি বিষয় অধ্যয়ন করেছেন। নিজেদের বিশদ এথনোগ্রাফিক মেথোডে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণ, অংশগ্রহণ ও কথোপকথন একত্রিত করে অন্য গবেষকদের থেকে নৃবিজ্ঞানীরা এইসব ঘটনা বা ফেনোমেনার (এবং এরকম আরো) অধিক পুঙ্খানুপুঙ্খ ও সূক্ষ্ম বর্ণনা দিতে পারে। নৃবিজ্ঞানীদের ঐ সব মানুষদের সাথে বিশ্বাস স্থাপন করতে হবে যাদেরকে তারা বুঝতে চায়। তবেই অধ্যয়নরত জনগোষ্ঠী সচেতনভাবে হোক বা না হোক তাদের জীবনযাত্রার এমন দিক প্রকাশ করবে যা তারা একটি প্রশ্নমালা হাতে ধরে রাখা একজন সাংবাদিক অথবা সামাজিক বিজ্ঞানীকে বলবে না। এথনোগ্রাফিক গবেষণা সময়বহুল হওয়ার এটি অন্যতম একটি কারণ।

তুলনামূলক পদ্ধতির সংকট

মানব অবস্থা সম্পর্কে নতুন অন্তর্দৃষ্টি ও নৃবিজ্ঞানের নতুন তাত্ত্বিক অগ্রগতি প্রায়শই তুলনামূলক পদ্ধতি থেকে জন্ম নেয়। এই পদ্ধতি বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভূমণ্ডলের মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য এর নিয়মানুগ অনুসন্ধান করে।  এই পদ্ধতি শ্রমসাধ্য, কঠিন এবং কখনো কখনো তাত্ত্বিকভাবে সমস্যাজনক হলেও নৃবিজ্ঞানীরা সবসময়ই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ উপায়ে তুলনা করে। জ্ঞাতিসম্পর্ক, লিঙ্গ, অসাম্য, পরিবার, জাতি ও ধর্মের মতো সাধারণ পরিভাষাগুলো ব্যবহারের মাধ্যমে নৃবিজ্ঞানীরা মৌনভাবে এটা অনুমান করে নেয় যে, এই বর্গগুলো বিভিন্ন সমাজে তুলনীয় তাৎপর্য বহন করে, যদিও খুব কম সময়েই তাদের তাৎপর্য হুবহু একই রকম হয়। বিভিন্ন সমাজ ও সংস্কৃতির মধ্যকার সাদৃশ্য ও বৈসাদৃশ্য অনুসন্ধানের মাধ্যমে নৃবিজ্ঞানীরা সমাজ এবং মানব অস্তিত্বের প্রকৃতি সম্পর্কে সর্বজনীন অন্তর্দৃষ্টি লাভ করতে পারে।

বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক কল্পনাকে উদ্দীপ্ত করার অতিরিক্ত দক্ষতা রয়েছে তুলনামূলক পদ্ধতির। যে সমাজ লিঙ্গ সমতা নিশ্চিত করে, টেকসই পরিবেশ বজায় রাখে এবং শান্তিপূর্ণ; সেই সমাজ নিজের উৎকর্ষতার কারণেই একটি বিশদ ও আকর্ষণীয় গবেষণার বিষয় এবং একইসাথে এই গবেষণা অন্যান্য সমাজে পলিসি ও সংস্কারের ক্ষেত্রে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করতে পারে। পৃথিবীতে চলমান বিভিন্ন সমস্যা সমাধান করার ক্ষেত্রে, একটি নিরপেক্ষ ও নিস্পৃহ পদ্ধতি অবলম্বন করে উত্থাপিত প্রশ্নসমূহ দ্বারা পরিচালিত তাত্ত্বিক গবেষণা অনেক সময় ব্যবহারিক গবেষণার থেকে বেশি কার্যকরী ভূমিকা পালন করতে পারে। নৃবিজ্ঞানীরা যখন বিভিন্ন জাতিগত জটিল কিন্তু একইসাথে শান্তিপূর্ণ সমাজ অধ্যয়ন করেন, তখন তারা সহাবস্থানের বিভিন্ন মডেলের সন্ধান দেন। যা পৃথিবীর সর্বত্রই পলিসি নির্মাণ ও চর্চার জন্য প্রাসঙ্গিক হতে পারে। তারা অনেক সময় অভাবনীয় অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন জ্ঞান নিয়ে হাজির হয়, যা আসলে প্রচলিত ধ্যানধারণার একেবারে বিপরীতে। যেমন: ইন্টারনেট পরিবারের সদস্যদের বিচ্ছিন্ন না করে পারিবারিক বন্ধন শক্তিশালী করতে পারে, নিজ ধর্মের চর্চা অভিবাসীদের ইউরোপীয় সমাজে একীভূত হওয়ার ক্ষেত্রে কোন বাঁধা নয় এবং কৃষকরা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তগ্রহণের দিক থেকে প্রাচীনপন্থী তো নয়ই, বরং তারা ক্ষেতমালিকদের থেকে অধিক যৌক্তিক।

তুলনামূলক পদ্ধতির মূখ্য উদ্দেশ্য উন্নয়ন, মানবাধিকার ও পরিবেশগত ভারসাম্যের দিক থেকে সমাজকে ধাপে ধাপে সাজানো না। কিন্তু এর মানে এই না যে, এই ধরণের সমস্যা সমাধানে নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞান অপ্রাসঙ্গিক। বরং, নৃবৈজ্ঞানিক তুলনার নিরপেক্ষ ও সুস্থির পদ্ধতি এমন জ্ঞান উৎপাদন করে যা পলিসি তৈরির ক্ষেত্রে বিশ্বাসযোগ্য ভিত্তি হিসেবে কাজ করতে পারে। 

যা পরিমাপ করা যায় না

নৃবিজ্ঞানীরা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের পদ্ধতিকে ঘিরেই ফিল্ডওয়ার্ক ও তুলনা সম্পাদন করেন, কিন্তু একইসাথে তারা পটভূমি, সম্পর্ক ও সংযোগ নিয়েও কাজ করে। সবচেয়ে ক্ষুদ্র যে ইউনিট নৃবিজ্ঞানীরা অধ্যয়ন করে তা কোন পৃথক ব্যক্তি নয়, বরং সেটা হলো দুইজন ব্যক্তির মাঝে সম্পর্ক। সংস্কৃতি সেটাই যা যোগাযোগকে সম্ভব করে তোলে; সংস্কৃতি তাই মানুষের পারস্পরিক মিথস্ক্রিয়ায় সক্রিয়, তাদের মনের মধ্যে নয় এবং সমাজ হলো বিভিন্ন সম্পর্কের একটি জাল। অনেকাংশে আমরা যা তা হলো অন্যদের সাথে আমাদের সম্পর্কের ফল, যা আমাদেরকে তৈরি করে ও জীবিকার নিশ্চয়তা দেয় এবং যা আমাদের মূল্যবোধ ও মতামতকে দৃঢ় করে অথবা চ্যালেঞ্জ করে। একারণে আমাদের বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে তাদের পরিপূর্ণ সামাজিক পটভূমিতে অধ্যয়ন করতে হবে। মানুষকে বোঝার জন্য নৃবিজ্ঞানীরা বিচিত্র পরিস্থিতিতে তাদেরকে অনুসরণ করেন এবং যেমনটা তারা প্রায়ই বলে থাকেন, মানুষ কী বলে সেটা শোনাই যথেষ্ট না। মানুষ কী করে, সেটাও পর্যবেক্ষণ করতে হবে এবং তাদের কর্মের বৃহত্তর তাৎপর্য বিশ্লেষণ করতে হবে।

নৃবিজ্ঞানীদের সূক্ষ্ম পদ্ধতি ব্যবহার তাদেরকে অদৃশ্যকে দৃশ্যমান করতে সক্ষম করে তোলে – তা সেইসব মানুষের কথা হোক যা অন্যথায় শোনা যায় না অথবা উচ্চ মর্যাদার লোকদের মধ্যে অনানুষ্ঠানিক নেটওয়ার্ক। যে লেখক ২০০৮ সালের ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইসিস ঘটার বহু আগেই তা ভবিষ্যদ্বানী করেছিলেন তিনি হলো গিলিয়ান টেট; প্রকৃতপক্ষে নৃবিজ্ঞানে তার প্রশিক্ষণের কারণে এই সাংবাদিক ফাইন্যান্সিয়াল এলিটরা জনগনকে যা বলছে তার আড়াল থেকে উপলব্ধি করতে সক্ষম হয়েছিলেন তারা আসলে কী করছে।

জটিল বিষয়কে সহজ করে উপস্থাপনের একটি শক্তিশালী প্রলোভন সবসময়ই থাকে, বিশেষ করে একটি ইনফর্মেশন সোসাইটিতে। জ্ঞান উৎপাদন ও প্রচারে স্পষ্টতা ও প্রাঞ্জলতা অবশ্যই কাম্য, কিন্তু যেমনটা আইনস্টাইন বলেছিলেন, ‘যতোটা সম্ভব সহজ করুন, কিন্তু তার থেকে সহজতর নয়।’ অনুরূপভাবে, নৃবিজ্ঞানীরা মানব প্রকৃতির সরলীকৃত বর্ণনার বিরোধীতা করে এবং এটা স্বীকার করে নেয় যে, জটিল বাস্তবতার পিছনে বিভিন্ন জটিল কারণ থাকতে পারে। নৃবিজ্ঞানীদের কাছে জীবন, সংস্কৃতি ও সমাজের সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ কিছু বিষয়  তা যা পরিমাপ করা যায় না। এর মানে এই না যে, এইসব বিষয়ের অস্তিত্ব নেই। প্রেমের অস্তিত্বগত মূল্য, বিশ্বাসের সামাজিক গুরুত্ব বা দস্তয়ভস্কির উপন্যাসের শক্তি নিয়ে খুব কম লোকই সন্দেহ করবে; তবুও এর কোনটিই গণনা ও পরিমাপ করা যায় না। মানুষের দুনিয়াকে বুঝতে হলে গুনগত গবেষণা ও ব্যাখ্যা জরুরী।

নৃবিজ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা

যে ধরণের জ্ঞান নৃবিজ্ঞান প্রদান করে তার গুরুত্ব আমাদের কোলাহলপূর্ণ বিশ্বায়িত যুগে অপরিহার্য; যেখানে বিভিন্ন পটভূমির মানুষ অভূতপূর্ব উপায়ে একে অপরের সাথে ঘনিষ্ঠ সংযোগে আসে। পর্যটন ও ব্যবসা থেকে শুরু করে অভিবাসন ও সাংগঠনিক কার্যের মতো বিবিধ প্রেক্ষিতে এই সংযোগটি ঘটে।

প্রকৌশল শাস্ত্র ও মনোবিজ্ঞানের মতো নৃবৈজ্ঞানিক শিক্ষা বৃত্তি বা পেশা মূলক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা কেন্দ্রে অধ্যাপনা ও গবেষণা ছাড়া শ্রম বাজারে নৃবিজ্ঞানীদের জন্য খুব কম রেডিমেড স্থান রয়েছে। এর ফলে ইউরোপের অধিকাংশ নৃবিজ্ঞানী প্রাইভেট ও পাব্লিক সেক্টরে বিবিধ পেশার সাথে যুক্ত, যেখানে তারা নৃবিজ্ঞান অধ্যয়ন থেকে লব্ধ নির্দিষ্ট দক্ষতা ও জ্ঞান প্রয়োগ করে এবং নিয়োগকর্তাদের কাছে জটিলতা বুঝতে পারার সক্ষমতা, বৈচিত্র সম্পর্কে সচেতনতা, বুদ্ধিবৃত্তিক বহুমুখীতা ইত্যাদি নৃবৈজ্ঞানিক দক্ষতা ও জ্ঞানের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। নৃবিজ্ঞানীরা সাংবাদিক, উন্নয়ন কর্মী, সরকারি কর্মচারী, কনসাল্টেন্ট ও তথ্য কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করে; এছাড়া তারা জাদুঘর, বিজ্ঞাপন সংস্থা, কর্পোরেশন ও এনজিও-তে বিভিন্ন কর্মে নিয়োজিত।

বহুবিধ কারণে নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞান সমসাময়িক পৃথিবীকে বুঝতে সাহায্য করতে পারে।

প্রথমত, আমাদের সময়ে বিভিন্ন সাংস্কৃতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সংযোগ ব্যাপকহারে বৃদ্ধি পেয়েছে। বৈশ্বিক মধ্যবিত্তের জন্য লং-ডিসট্যান্স ভ্রমণ পূর্বের থেকে আরো অনেক প্রচলিত, আরো নিরাপদ ও আরো সস্তায় পরিণত হয়েছে। উনবিংশ শতকে পাশ্চাত্যের খুব ছোট একটা অংশই অন্যান্য দেশে ভ্রমণ করতো ( যখন তারা অন্য দেশে যেতো, অধিকাংশ সময়ে সেটা ছিলো একমুখী টিকিটে)। এমনকি ১৯৫০ এর দশকেও অপেক্ষাকৃত সচ্ছল পশ্চিমারা বিদেশে ছুটি কাটাতো না। গেলো কয়েক দশকে এই প্যাটার্নে পরিবর্তন এসেছে। যারা অস্থায়ীভাবে বিভিন্ন দেশের মাঝে চলাচল করে, তাদের সংখ্যা নাটকীয়ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তৈরি হয়েছে একটি ঘনিষ্ঠ যোগাযোগঃ ব্যবসায়ী, উন্নয়ন কর্মী ও পর্যটকরা সচ্ছল দেশগুলো থেকে গরীব দেশে ভ্রমণ করে, এক বা দুই প্রজন্ম আগের সময় থেকে আজকের দিনে  আরো অনেক বেশী পশ্চিমারা বিভিন্ন ‘এক্সোটিক’ স্থান ঘুরে বেড়ান।

যখন সচ্ছল দেশগুলোর নাগরিকরা বর্ধিষ্ণু সংখ্যায় ও নতুন পরিস্থিতিতে পৃথিবীর বিভিন্ন অংশ ভ্রমণ করছেন, তখন একটি বিপরীতমুখী প্রবাহও চলমান, যদিও অধিকাংশ সময়ে ভিন্ন কারণে। প্রধানত জীবনযাত্রার মান ও সুযোগ-সুবিধায় উল্লেখযোগ্য পার্থক্য থাকার কারণে অ-পশ্চিমা দেশগুলোর লক্ষ লক্ষ জনগণ ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও পৃথিবীর অন্যান্য সমৃদ্ধ অংশে পাড়ি জমিয়েছেন। এই গতিবিধি পশ্চিমা জীবনে চিন্তা ও কাজ করার বিভিন্ন নতুন উপায় নিয়ে হাজির হয়েছে। এক প্রজন্ম আগে কোন পশ্চিমা  নাগরিকের দক্ষিণ এশিয়ার রান্নার সুবাস এবং সংগীতের সুর আস্বাদ করতে ভারতীয় উপমহাদেশে ভ্রমণ করতে হতো। কিন্তু এখন পৃথিবীর যেকোনো মহাদেশে মোটামুটি আকারের যেকোনো শহরে বৈশ্বিক সাংস্কৃতিক ভিন্নতার বিভিন্ন টুকরা ও খণ্ড অংশ যে কেউ উপভোগ করতে পারে। এর ফলে অন্যান্য সংস্কৃতি সম্পর্কে আগ্রহ বেড়েছে এবং সাংস্কৃতির ভিন্নতার গুরুত্ব কি, তা বোঝা রাজনৈতিক কারণে জরুরী হয়ে উঠেছে। সমসাময়িক ইউরোপে ধর্মীয় সংখ্যালঘু অধিকার, হিজাব, স্কুলে ভাষা নির্দেশনার মতো বহুসংস্কৃতিবাদ সম্পর্কিত বিভিন্ন ইস্যু বিতর্কের কেন্দ্রীয় বিষয়। শ্রমবাজারে জাতিগত বৈষম্য দূর করার জন্য এফার্মেটিভ অ্যাকশান গ্রহণের কথা বলা হচ্ছে। এগুলোর মতো আরো অনেক প্রাসঙ্গিক ইস্যু সাংস্কৃতিক ভিন্নতাকে বিচক্ষণতার সাথে মোকাবেলা করার জরুরী প্রয়োজনীয়তার সাক্ষ্য বহন করে। ইউরোপের বর্তমান শরনার্থী সংকট শুধু (যা কখনো কখনো নিষ্ঠুর ও নাটকীয়) পৃথিবীর বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর ক্রমবর্ধমান সংযুক্ততার কথা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়না, একইসাথে এই সংকট নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞানের বর্ধিষ্ণু গুরুত্বেরও একটি স্মারক।

পৃথিবী অন্যান্য উপায়েও সংকুচিত হচ্ছে। ফলাফল ভালো বা খারাপ যাইহোক না কেন, স্যাটেলাইট টেলিভিশন, সেলফোন নেটওয়ার্ক এবং ইন্টারনেট তাৎক্ষণিক যোগাযোগ সম্ভব করে তুলেছে। দূরত্ব এখন আর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের ক্ষেত্রে কোন বাঁধা নয় এবং নব্য কায়দার খন্ডাঞ্চল মুক্ত সামাজিক নেটওয়ার্ক, এমনকি ‘ভার্চুয়াল সম্প্রদায়’ও বিকশিত হচ্ছে। একই সময়ে, মানুষের কাছে ব্যবহারযোগ্য তথ্যের পরিমাণ এখন অনেক বেশী। অর্থনীতিরও ক্রমবর্ধমান বিশ্বায়ন ঘটছে। গত কয়েক দশকে সংখ্যা, আকার ও অর্থনৈতিক তাৎপর্যের দিক থেকে বহুজাতিক কোম্পানি গুলোর নজিরবিহীন সম্প্রসারণ ঘটেছে। বিংশ শতকের সবথেকে প্রভাবশালী উৎপাদন পদ্ধতি পুঁজিবাদ একবিংশ শতকে এসে প্রায় বিশ্বজনীনতা লাভ করেছে। রাজনীতির ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক বিভিন্ন ইস্যু এজেন্ডা নির্ধারণ করে দিচ্ছে। যুদ্ধ ও শান্তি, পরিবেশ ও দরিদ্রতার মতো বিভিন্ন ইস্যুর ব্যাপ্তি এতোই বিস্তর যে এবং এতো বেশী বহুজাতিক সংযোগ রয়েছে যে এইসব ইস্যু একটি মাত্র রাষ্ট্রের প্রচেষ্টা দ্বারা সন্তোষজনকভাবে সমাধান করা সম্ভব নয়। মহামারী এবং আন্তর্জাতিক সন্ত্রাসবাদও বহুজাতিক সমস্যা যা একমাত্র আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমেই উপলব্ধি ও মোকাবেলা করা সম্ভব। পূর্বের অপেক্ষাকৃত পৃথক সামাজিক-সাংস্কৃতিক দুনিয়ার ক্রমবর্ধমান একীভবন এই সত্যের স্বীকৃতি দেয় যেঃ শ্রেণি, সংস্কৃতি, ভূগোল ও সুযোগের লভ্যতা দ্বারা বিভক্ত মানবতা মৌলিকভাবে অভিন্ন।

সংস্কৃতি পূর্বের যেকোনো সময়ের চেয়ে বর্তমানে অনেক দ্রুত পরিবর্তিত হয় এবং এটা প্রায় সর্বত্রই লক্ষণীয়। পশ্চিমে জীবনযাত্রার প্রচলিত রূপ নিশ্চিতভাবে রূপান্তরিত হচ্ছে। স্থিতিশীল একক পরিবার এখন আর জীবন যাপনের সামাজিকভাবে গ্রহণযোগ্য একমাত্র উপায় নয়। ফ্যাশন ও সংগীতের সাথে জড়িত ইয়ুথ কালচার ও ট্রেন্ডস এতো দ্রুত পরিবর্তিত হয় যে বয়স্ক ব্যক্তিরা তা অনুসরণ করতে গিয়ে সমস্যায় পড়ে; আমাদের চোখের সামনে খাদ্যাভাস পরিবর্তিত হচ্ছে, বৃহত্তর বৈচিত্র আসছে বিভিন্ন দেশের খাদ্যে; ধর্মনিরেপেক্ষতা (সেকুলারিজম) দ্রুতগতিতে সমাজে ধর্মের ভূমিকায় পরিবর্তন এনেছে এবং উল্টোটাও ঘটছে; মিডিয়ার ব্যবহার সম্পূর্ণরূপে বহুজাতিক। এগুলো এবং অন্যান্য পরিবর্তন এখন কিছু প্রশ্ন করাকে জরুরী করে তুলেছেঃ ‘আমরা আসলে কারা?’, ‘আমাদের সংস্কৃতি কী… এবং এমন একটি ‘আমাদের’ কথা বলা যাদের একটি ‘সংস্কৃতি’ আছে, কি আদৌ অর্থপূর্ণ?’, ‘৫০ বছর আগে এখানে যারা বাস করতো তাদের সাথে আমাদের কি কি সাদৃশ্য রয়েছে এবং ওইসব মানুষদের সাথে আমাদের কী সাদৃশ্য রয়েছে যারা এই সময়েই আমাদের থেকে সম্পূর্ণ পৃথক একটি স্থানে বাস করে?’ এবং ‘এটা বলা কী এখনো সমর্থনযোগ্য যে আমাদের প্রাথমিক আনুগত্য জাতিরাষ্ট্রের প্রতি না অন্যান্য ধরণের সম্পর্কগুলোও সমানভাবে বৈধ বা আরো গুরুত্বপূর্ণ?’

গত কয়েক দশকে সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে অভূতপূর্ব কৌতুহল তৈরি হয়েছে, যা ক্রমবর্ধমানভাবে একটি প্রয়োজনীয় বিষয় হিসেবে অভিহিত হচ্ছে। অনেকেই মনে করেন, যে লোকজ স্বতন্ত্রতার উপর তারা নির্ভর করতো তা বিশ্বায়ন, পরোক্ষ  উপনিবেশবাদ এবং বাইরের অন্যান্য শক্তির দ্বারা হুমকীর মুখে পড়েছে। এর প্রতিক্রিয়ায় তারা প্রায়শই যা তাদের কাছে স্বীয় সংস্কৃতির অদ্বিতীয় অংশ তা শক্তিশালী করতে বা সংরক্ষণ করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যালঘু বিভিন্ন সংগঠন তাদের সদস্যদের জন্য বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অধিকার দাবী করে; কিছু ক্ষেত্রে রাষ্ট্র আইন প্রণয়নের মাধ্যমে পরিবর্তনের প্রক্রিয়া ও বাহ্যিক প্রভাব ধীর করা বা প্রতিরোধ করার চেষ্টা করে। তবুও অন্যান্য ক্ষেত্রে কতৃত্বপূর্ণ সংখ্যাগুরু শ্রেণি ক্ষমতাহীন সংখ্যালঘুদের অঙ্গীভূত করা বা বর্জন করার চেষ্টা করে।

ইউরোপীয় সাংস্কৃতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচয় ইউরোপীয় দর্শনের একটি সুদীর্ঘ ও গভীর ইতিহাসের কাছে ঋণী। বর্তমানে আমাদের সময়ে নৃবিজ্ঞান থেকে শেখা বা অর্জিত দৃষ্টিভঙ্গি দর্শন এর মতোই অপরিহার্য। নৃবিজ্ঞান পৃথিবী এবং সাংস্কৃতিক মিশ্রণ, সংযোগ ও বিবাদের বৈশ্বিক ঘুর্ণন সম্পর্কে আমাদেরকে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দান করতে পারে, কিন্তু এই শাস্ত্র নিজেদের সম্পর্কেও আমাদের গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান দান করতে পারে। গ্যোটে একবার বলেছিলেন, ‘যে ব্যক্তি কোন বিদেশী ভাষা জানে না, সে নিজের ভাষা সম্পর্কেও কিছু জানে না।’ যদিও নৃবিজ্ঞানের কেন্দ্রীয় বিষয় অপরকে অধ্যয়ন, চূড়ান্তরূপে এই শাস্ত্র ‘সেল্ফ’ (self) সম্পর্কেই আমাদের জানায়। কারণ, নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞান আমাদেরকে বলতে পারে যে, আমাদের থেকে প্রায় কল্পনাতীতভাবে ভিন্ন জীবনও অর্থপূর্ণ ও মূল্যবান; সবকিছুই ভিন্ন হতে পারতো; একটি ভিন্ন পৃথিবী সম্ভব; এমনকি যেসব মানুষকে আমাদের থেকে একেবারেই আলাদা মনে হয় তারাও আসলে আমাদেরই মতো। মানুষ হওয়া বলতে কী বোঝায়, এই চিরন্তন কথোপকথনে নৃবিজ্ঞান অংশ নেয় এবং এইসব মৌলিক প্রশ্নের উত্তরে রক্ত-মাংস যোগায়। নৃবিজ্ঞান সত্যি সত্যিই একটি কসমোপলিটান জ্ঞানশাস্ত্র, কারণ এই শাস্ত্র নির্দিষ্ট কোন জীবনযাত্রার উপায়কে অন্যান্য জীবনধারার উপর প্রাধান্য দেয় না। অন্যদিকে, নৃবিজ্ঞান চিরন্তন মানব সংকটগুলোর বিভিন্ন সমাধান বর্ণনা করে এবং এদের কার্যকারিতা তুলনা করে। এদিক থেকে নৃবিজ্ঞান অদ্বিতীয় রূপে একবিংশ শতকের জ্ঞান প্রদান করে, যা একটি গ্লোবালাইজড দুনিয়ার সাথে বোঝাপড়ায় আসার জন্য গুরুত্বপূর্ণ, প্রকৃত ও কল্পিত সাংস্কৃতিক বিভাজনের মাঝে পারস্পরিক বোঝাপড়া ও শ্রদ্ধা তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় এবং এই জ্ঞানশাস্ত্র শুধু ‘মানবিকের মাঝে সবথেকে বৈজ্ঞানিক ও বিজ্ঞানের মাঝে সবথেকে মানবিক’ -ই না, এটা মৌলিক বিজ্ঞানের মাঝে সবথেকে উপকারীও।

মূল লেখার লিংক

Related Articles

পরিবেশ প্রশ্নে নৃবৈজ্ঞানিক ভাবনা

১  শুরুর আলাপ চলুন, প্রথমেই দুইটা বিষয়ের ফয়সালা করা যাক। তারপর ধীরেধীরে...

এথনোমিউজিকোলজিঃ পরিচয়, ইতিহাস ও পদ্ধতি

ভূমিকা  নির্দিষ্ট ভাষাসূত্রে আবদ্ধ কোন নির্দিষ্ট নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও সাংগীতিক পরিসরকে...

সামাজিক বিবর্তনবাদ

বিভিন্ন জ্ঞানশাস্ত্রে সাধারণত 'তত্ত্ব' ও 'তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি'- এই দুইয়ের মাঝে ফারাক টানা হয়৷ তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বলতে সাধারণত কোন...
- Advertisement -

Latest Articles

পরিবেশ প্রশ্নে নৃবৈজ্ঞানিক ভাবনা

১  শুরুর আলাপ চলুন, প্রথমেই দুইটা বিষয়ের ফয়সালা করা যাক। তারপর ধীরেধীরে...

এথনোমিউজিকোলজিঃ পরিচয়, ইতিহাস ও পদ্ধতি

ভূমিকা  নির্দিষ্ট ভাষাসূত্রে আবদ্ধ কোন নির্দিষ্ট নৃগোষ্ঠীর সংগীত ও সাংগীতিক পরিসরকে...

সামাজিক বিবর্তনবাদ

বিভিন্ন জ্ঞানশাস্ত্রে সাধারণত 'তত্ত্ব' ও 'তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি'- এই দুইয়ের মাঝে ফারাক টানা হয়৷ তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গি বলতে সাধারণত কোন...

কেন নৃবিজ্ঞান গুরত্বপূর্ণ?

নৃবিজ্ঞানকে প্রায়শই বর্ণনা করা হয় 'অপরিচিতকে পরিচিত' এবং 'পরিচিতকে অপরিচিত' করার কলা হিসেবে। এই জ্ঞানশাস্ত্র 'বিজ্ঞানের মাঝে...

থিওরিঃ ম্যালিনস্কি

বিংশ শতকের নৃবিজ্ঞানে অন্যতম শক্তিশালী ধারা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলো “ক্রিয়াবাদী” ধারা। মূলত বিবর্তনবাদীদের দেয়া সংস্কৃতির ঐতিহাসিক বিবর্তনের...