মেয়ার ফোর্টেস ও তার চিন্তা

[এনথ্রোসার্কেলে ক্রিয়াবাদী তাত্ত্বিক মেয়ার ফোর্টেস নিয়ে লিখেছেন খান মাহমুদ।]

ক্রিয়াবাদী ধারার শেষ পর্যায়ের তাত্ত্বিক মেয়ার ফোর্টেস। যে কারণে তাকে বলা হয় পরবর্তী ক্রিয়াবাদী বা Late Functionalist । ফোর্টেস ১৯০৬ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্রিজ টাউনে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবা এবং মা ছিলেন ইউরোপ থেকে পালিয়ে আসা রাশিয়ান ইহুদী দম্পতি। মেয়ার ফোর্টেস কেপ টাউন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। নৃবিজ্ঞানের প্রভাবশালী তাত্ত্বিক হলেও তার পড়াশোনা ছিলো মূলত মনোবিজ্ঞানে। ১৯৩০ সালে ইউনিভার্সিটি অফ লন্ডন থেকে তিনি মনোবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৩১ সাল থেকে তিনি লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সে ম্যালিনোস্কির কিছু সেমিনারে যোগ দিতে শুরু করেন। একই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার্লস সেলিম্যানের কাছ থেকে নৃবিজ্ঞান বিষয়ক প্রশিক্ষণও গ্রহণ করেন। রেমন্ড ফার্থ, রেডক্লিফ ব্রাউনও সেইসময়ে ফোর্টেসের উপর বিশেষ প্রভাব রেখেছিলেন। প্রথমদিকে ম্যালিনোস্কির অধীনে কাজ করলেও পরবর্তীতে তার কাজে র‍্যাডক্লিফ ব্রাউনের প্রভাব বেশী দেখা যায়। অর্থাৎ, ফোর্টেস ছিলেন কাঠামোবাদী ক্রিয়াবাদ ধারার তাত্ত্বিক। 

ব্রিটেনে সেই সময় সামাজিক নৃবিজ্ঞানের ধারা গড়ে উঠেছিলো কাঠামোবাদি ক্রিয়াবাদকে আশ্রয় করে। ফোর্টেস ছিলেন সে ধারার তাত্ত্বিক। তিনি আফ্রিকার জ্ঞাতি সম্পর্ক এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের উপর অভিজ্ঞ ছিলেন। আশান্তি এবং ট্যালেন্সিদের উপর করা মাঠকর্মের উপাত্তই ছিলো তার মূল ভিত্তি। মনোবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি সামাজিক আচরণের মনস্তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ করতেন যা তার কাজের গ্রহণযোগ্যতা বাড়িয়ে দিয়েছিল। ফোর্টেস এবং ইভান্স প্রিচার্ডের করা কাজ রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলো। ১৯৪০ সালে ফোর্টেস ও ইভান্স প্রিচার্ডের সম্পাদনায় “African Political Systems” প্রকাশিত হয়। এই বইটি ব্রিটেনের প্রথম প্রজন্মের রাজনৈতিক নৃবিজ্ঞানীদের তাত্ত্বিক ভিত্তি নির্মাণ করে দিয়েছিল।   এই বইটি ছিল আফ্রিকার রাজনৈতিক  ব্যবস্থা নিয়ে বিভিন্ন গবেষকের ৮ টি নিবন্ধের সংকলন। এর আগ পর্যন্ত আফ্রিকার রাজনৈতিক কাঠামো নিয়ে নিয়মতান্ত্রিক কাজের প্রচলন তেমন ছিল না। মেয়ার ফোর্টেস আর ইভান্স প্রিচার্ডের লক্ষ্য ছিল আফ্রিকার বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যবস্থা নিয়ে একটি বিস্তারিত, তুলনামূলক ও বিশ্লেষণমূলক পাঠ হাজির করা। সেইসময় ক্রিয়াবাদীদের মধ্যে আফ্রিকা বিষয়ক গবেষণার যে প্রবণতা তৈরি হচ্ছিল , তার সাথে কাঠামোবাদী ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধন ঘটেছে এই বইতে। এই বইয়ের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে আফ্রিকার সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক ব্যবস্থার কেন্দ্রে  জ্ঞাতিসম্পর্কের প্রভাবকে পর্যালোচনা করেন। এইক্ষেত্রে ইভান্স প্রিচার্ড ও মেয়ার ফোর্টেস আফ্রিকায় দুইধরনের সমাজের কথা বলেন:  কেন্দ্রীভূত সমাজ আর অকেন্দ্রীভূত সমাজ। এই দুই সমাজে কিভাবে জ্ঞাতিসম্পর্ক প্রভাব রাখে তার উপর গুরত্বারোপ করেন তারা। 

নৃবিজ্ঞানে মেয়ার ফোর্টেসের মৌলিক অবদান “Descent Theory” বা বংশধারা তত্ত্ব। মূলত ইভান্স প্রিচার্ড নৃবিজ্ঞানে বংশধারা তত্ত্ব নিয়ে কাজ শুরু করেছিলেন। ফোর্টেস এই কাজকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন। এছাড়াও তুলনামূলক ধর্মতত্ত্ব নিয়েও তিনি কাজ করেছেন। 

জীবনের বেশিরভাগ সময় তিনি শিক্ষকতা করেছেন। লন্ডন স্কুল অফ ইকনমিকস, অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজ এবং কিংস কলেজে নৃবিজ্ঞানে অধ্যাপনা করেছেন। ১৯৮৩ সালে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। 

ক্রিয়াবাদ সম্পর্কিত আলোচনা পূর্বেই লিখা হয়েছে। এজন্য সরাসরি মেয়ার ফোর্টেসের আলোচনা শুরু করছি। সংক্ষেপে বলে রাখি, ক্রিয়াবাদীরা সমাজকে দেখেন আন্তঃসম্পর্কিত জালের মত। সমাজকে বুঝার জন্য জালের মত ছড়িয়ে থাকা সমাজের বিভিন্ন অংশকে বুঝতে হবে। ম্যালিনোস্কির ধারার ক্রিয়াবাদ জোর দেয় ব্যক্তির চাহিদার উপর। তার মতে সমাজের প্রতিষ্ঠান ব্যক্তির দৈহিক ও মনস্তাত্ত্বিক চাহিদা পূরণের জন্য কাজ করে। আর র‍্যাডক্লিফ ব্রাউনের কাঠামোবাদী ক্রিয়াবাদ মনে করে সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ সামাজিক সংহতি রক্ষার জন্য কাজ করে। অর্থাৎ, ব্যক্তির জায়গায় তিনি কাঠামোকে গুরুত্ব দিয়ে তার তত্ত্ব দিয়েছিলেন। 

বংশধারা তত্ত্ব

জ্ঞাতি সম্পর্কের অধ্যয়ন নৃবিজ্ঞানের শুরু থেকেই গুরুত্ত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়। মর্গান জ্ঞাতি সম্পর্কের উপর বিশেষ জোর দিয়েছিলেন। কিন্তু র‍্যাডক্লিফ ব্রাউনের পূর্বের সমস্ত পাঠই ছিলো ‘ইগো’ বা ব্যক্তি সাপেক্ষে। কাঠামোবাদী ক্রিয়াবাদী নৃবিজ্ঞানীরা জ্ঞাতি সম্পর্কের সামাজিক পাঠ শুরু করেন। কোন সমাজে জ্ঞাতিত্ব কীভাবে সমাজকে টিকিয়ে রাখে তা অনুসন্ধান করার চেষ্টা করেন। এই তত্ত্বের ভাবনায় ছিল একদিকে নির্দিষ্ট স্থানের সাপেক্ষে জ্ঞাতিত্বের সম্পর্ক নির্ণয় এবং পরিবার ও বৃহৎ সামাজিক পরিসরে গোষ্ঠীগুলোর ভূমিকা নির্ণয়। মেয়ার ফোর্টেস বলেন, অকেন্দ্রীভূত সমাজে গোষ্ঠীর সদস্যপদ ছাড়া কোন ব্যক্তির আইনি বা রাজনৈতিক অবস্থান থাকে না; অর্থাৎ গোষ্ঠীর প্রেক্ষিতেই ব্যক্তির আইনি ও রাজনৈতিক অবস্থান নির্ণীত হয়৷ র‍্যাডক্লিফ ব্রাউনের পরে ইভান্স প্রিচার্ড, মেয়ার ফোর্টেসরা মূলত আফ্রিকায় কাজ করেন এবং সেখানের প্রাপ্ত তথ্য থেকে এই তত্ত্বের ভিত্তি নির্মাণ করেন। ১৯৪০-১৯৬০ সাল পর্যন্ত প্রায় বিশ বছর বংশধারা তত্ত্ব বেশ প্রভাবশালী ছিল৷ এই তত্ত্বের একটি মূল বিষয় ছিল সমাজে রক্তের সম্পর্ক কীভাবে কাঠামোবদ্ধ হয় তা বুঝার চেষ্টা করা।

বংশধারা

বংশধারা হলো প্রজন্মের ধারা। পূর্ববর্তী প্রজন্মের সাথে বর্তমান প্রজন্মের সম্পর্ক চিহ্নিত হয় এর মাধ্যমে। এটি নির্ধারিত হয় ব্যক্তি বা ইগোর মাতা বা পিতার সাপেক্ষে। মায়ের দিক থেকে নির্ধারিত হলে মাতৃসূত্রীয় এবং বাবার দিক থেকে হলে পিতৃসূত্রীয় বংশধারা। যেকোন একদিক থেকে নির্ধারিত হয় বলে একে “Unilineal Descent System” বা “একরৈখিক বংশধারা” বলা হয়। ফোর্টেস এর উপর জোর দিয়েছিলেন। 

ফোর্টেস জ্ঞাতি সম্পর্ককে সমাজের মূল উপাদান হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তার মতে রাজনৈতিক ও  ধর্মীয় পরিচয় পরিবর্তনের সুযোগ থাকলেও জ্ঞাতি বা বংশ পরিচয় অপরিবর্তনীয় এবং অনিবার্য। যেকারণে এটি অন্য যেকোন প্রতিষ্ঠান থেকে স্বতন্ত্র ভাবে বিরাজ করে। নিজের মাঠকর্মের উপাত্তের আলোকে তিনি দেখিয়েছেন আফ্রিকার যেসব অঞ্চলে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান অনুপস্থিত সেখানে একরৈখিক বংশধারার নীতি সমাজ কাঠামোতে ধারাবাহিকভাবে কার্যকর থাকে। 

Complementary Filiation

Complementary Filiation হলো ব্যক্তির বংশধারা গোষ্ঠীর বিপরীত ধারার সাথে সম্পর্কিত অধিকার, বাধ্যবধকতা এবং অনুভূতির সমাহার। অর্থাৎ, পিতৃসূত্রীয় বংশধারার সাপেক্ষে মাতৃসূত্রীয় ধারা হল ব্যক্তির Complementary Filiation । যে সমস্ত সমাজে একরৈখিক বংশধারা অনুসরন করা হয়, সেসব সমাজে বিপরীত দিকের আত্নীয়দেরও স্বীকৃতি দেওয়া হয়; যদিও তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বংশধারা গোষ্ঠীর সদস্য নয়। যেমন কোন ট্রাইবের মধ্যে যদি পিতৃসূত্রীয় সমাজ থাকে, তবে বিশেষ করে মায়ের ভাই তথা মামা কিংবা নানা-নানীর সাথে গুরুত্বপূর্ণ সামাজিকভাবে স্বীকৃত সম্পর্ক দেখা যায়। একইভাবে মাতৃসূত্রীয় সমাজে চাচা কিংবা দাদা-দাদীর সাথে এমন সম্পর্ক বিরাজ করে।

এক্ষেত্রে দেখা যায় ব্যক্তি তার নিজের বংশধারা থেকে যে ধরণের সম্পদ ও পদমর্যাদা পায়, তার Complementary Filiation থেকে ভিন্ন ধরণের সম্পদ ও পদমর্যাদা লাভ করবে। পিতৃসূত্রীয় সমাজে ব্যক্তি পিতার দিক থেকে স্থাবর সম্পদ, সম্মান ও পদমর্যাদা লাভ করে থাকে; অন্যদিকে মায়ের দিক থেকে সে বিভিন্ন ঐতিহ্যগত হাতিয়ার বা অলংকারাদি পেয়ে থাকে। 

Descent বা বংশ জোড় দেয় ব্যক্তির সাথে পূর্বপুরুষের সম্পর্ককে। Complementary Filiation গুরত্ব দেয় আত্মীয়তার সামাজিক বন্ধনকে। এই ব্যাপারটির গুরত্ব ভালোভাবেই পরিলক্ষিত হয় ট্যালেন্সিদের সমাজে। মেয়ার ফোর্টেস দেখান, স্বার্থ,অধিকার, বিশ্বস্ততা প্রভৃতি আসলে পরিপূরকভাবে মাতৃ ও পিতৃসূত্রে বিরাজ করে। গোষ্ঠীগুলোর যৌথতার পেছনে কেবলমাত্র বংশধারার নীতি নয়, Complementary Filiation-ও ভূমিকা রাখে। 

ক্রিয়াবাদ ফোর্টেসের সময়েই গুরুত্ব হারাতে শুরু করে। তা সত্ত্বেও ফোর্টেস ক্রিয়াবাদে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। তার Complementary Filiation তত্ত্বের পূর্বে ক্রিয়াবাদ কেবল আনুষ্ঠানিক বংশধারা নিয়েই কাজ করতো। মনে করা হতো প্রজন্ম থেকে প্রজন্মের উত্তরাধিকারই জ্ঞাতির ক্রিয়া। ফলে জ্ঞাতিসম্পর্ককে কেবলমাত্র একটা সামাজিক সংগঠনের একক ধরা হতো। ফোর্টেসই প্রথম জ্ঞাতি সম্পর্কের বিপরীত দিকটি উন্মোচন করেন।