আমরা যে খাবার খাই তা কেন ভাবনার বিষয়ঃ বন্দনা শিবা

বন্দনা শিবা একজন পরিবেশকর্মী যিনি খাদ্য সার্বভৌমত্বের ধারনাটিকে জনপ্রিয় করে তুলেছেন। ইকোফেমিনিজম বা পরিবেশ নারীবাদ নিয়ে তার গুরত্বপূর্ণ কিছু কাজ আছে। বিবিসিকে দেওয়া তাঁর এই সাক্ষাতকারটি এনথ্রো সার্কেলের জন্য অনুবাদ করেছেন এসভি আনোয়ার আহমেদ

তাঁকে,বন্দনা শিবা,”Gandhi of grain”, “GMO বিরোধী আন্দোলনের “rock star” এবং “eco-warrior goddess” নামে ডাকা হয়। ৪০ বছরের অধিক সময় ধরে বন্দনা শিবা পদার্থবিদ থেকে পরিবেশবিদ এবং খাদ্য অধিকার কর্মী হয়ে বড় পরিসরের কৃষি নিয়ে কাজ করছেন। তিনি মনে করেন, যেসব জিনিস আমাদের বিশ্বকে দারুণভাবে বিচিত্র রাখে, অর্থাৎ আমাদের অনন্য সাংস্কৃতিক এবং রন্ধনসম্পর্কীয় ঐতিহ্যকে সংরক্ষিত রেখেই আমরা আমাদের বিশ্ব থেকে ক্ষুধা দূর করতে পারি এবং বিশ্বকে নিরাপদ রাখতে সাহায্য করতে পারি।

সর্বোপরি, শিবা প্রবলভাবে বিশ্বাস করেন, আমরা যে খাদ্য খাই তা ভাবনার বিষয়। খাদ্য আমাদের শারীরিক, সাংস্কৃতিক এবং আধ্যাত্মিকতাভাবে আমরা ঠিক কে সেটা তৈরি করে। বিশ্বজুড়ে বৃহত্তর খাবারের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করা, খাবারের স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণ এবং স্থানীয় কৃষকদের বীজ পাওয়ার অধিকারগুলো নিশ্চিত করার মধ্য দিয়ে শিবা আমাদের এটা মনে করিয়ে দিতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ যে “খাবার এবং সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের মুদ্রা” এবং সেজন্যে আমরা একটি ছাড়া (খাবার এবং সংস্কৃতি) আরেকটিকে চিন্তা করতে পারি না।

সম্প্রতি আমরা শিবার সাথে আলাপ করেছি। আমরা তাঁর ভারতীয় হিমালয়ে বেড়ে ওঠা, কিভাবে জৈব বৈচিত্র‍্য স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণে সাহায্য করে এবং ভ্রমণকারীরা কিভাবে বিশ্বকে আরো সুন্দর করতে কাজ করতে পারে সে সম্পর্কে জানতে তাঁকে বিভিন্ন প্রশ্ন জিজ্ঞেস করেছি।

প্রশ্নঃ পেশা জীবনের দীর্ঘ সময় দেশীয় মানুষদের পক্ষে (ঐতিহ্যগত চর্চা এবং প্রাকৃতিক আরোগ্য) কাজ করার পর কেন আপনি মনে করছেন যে বর্তমান দুনিয়ায় এসব বিষয় (খাদ্য এবং সংস্কৃতি) বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ?

শিবাঃ পৃথিবী এবং দেশীয় সম্প্রদায়গুলোর প্রতি আমার উৎসর্গ এবং সেবা শুরু হয়েছিল ৫ দশক আগে “Chimpko Movement” এর সাথে সাথে। যেকোনো সময়ের তুলনায় এখন বিশ্বকে এবং দেশীয় সংস্কৃতিকে রক্ষা করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, ৫’শ বছরের উপনিবেশ এবং জীবাশ্ম জ্বালানি-ভিত্তিক শিল্পায়ন ইতোমধ্যে আমাদের ধ্বংসের দিকে নিয়ে গিয়েছে৷ দেশীয় জনগোষ্ঠী (Indigenous Community) প্রকৃতির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণভাবে বসবাস করতো, তাঁরা পৃথিবীকে সম্মান করতো এবং তার সীমাবদ্ধতাগুলোকেও। এই ধ্বংসের যুগে আমাদের বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে তারা (দেশীয় জনগোষ্ঠী) আমাদের শিক্ষক।

প্রশ্নঃ এই বছর একটি অভূতপূর্ব বছর। ঠিক কোন বিষয়গুলো আপনি ভারতের দেশীয় জনগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে লক্ষ্য করেছেন যেগুলো আপনার এই বিশ্বাসকে শক্তিশালী করেছে যে খাদ্য এবং সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের মুদ্রা?

শিবাঃ গতকাল আমার এলাকা হিমালয় থেকে নারীরা নাভদানয়া (Navdanya) এসেছিল একটি বাজরা উৎসবের জন্য। সবুজ বিপ্লব (যেটা কিনা ভারতের কৃষি উৎপাদনকে ১৯৬০-১৯৭০-এর দিকে বৈপ্লবিক করেছিল) তাদের “অনগ্রসর” এবং “আদিম” শস্য হিসেবে আখ্যা দিয়েছিল। কিন্তু তারা (ফলন) ১০ গুণ কম পানি খরচ করেও ১০ গুন বেশি পুষ্টি উৎপাদন করে। লকডাউনের সময় নাভদানয়ায় কয়েকজন সদস্য আমাকে ফোন করে বলতেছিলেন যে লকডাউন সত্ত্বেও তাঁরা “Gardens of Hope” শুরু করেছিলেন তাঁদের পরিবার এবং সম্প্রদায়কে খাদ্য সরবাহের জন্য।

খাদ্য এবং সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের মুদ্রা। এবং যখন আমরা রোগ এবং মৃত্যুতে নিমজ্জিত, তখন একটি জীবন্ত খাদ্য সংস্কৃতিই পারে আমাদের জীবনের পথে আলো দেখাতে।

প্রশ্নঃ আপনি একজন খাদ্য সার্বভৌমত্বের সমর্থক এবং জোরালো কণ্ঠস্বর। আপনার খাদ্য সার্বভৌমত্বের সংজ্ঞা কী এবং আপনি কিভাবে অনুভব করেন যে খাদ্য সার্বভৌমত্ব বিশ্বের জীব বৈচিত্র‍্য উন্নত করতে এবং স্থানীয় সংস্কৃতি সংরক্ষণে সাহায্য করতে পারে?

শিবাঃ আমার কাছে খাদ্য সার্বভৌমত্ব হচ্ছে জীবন, জীবিকা এবং স্বাস্থ্যের ওপর সার্বভৌমত্ব৷ আমরা পরস্পরযুক্ত। সেজন্য খাদ্য সার্বভৌমত্ব হচ্ছে অন্যান্য জীবন গঠনের সাথে সহ-সৃষ্টির একটি পরিবেশগত প্রক্রিয়া। এটি শুরু হয় বীজ সার্বভৌমত্ব দিয়ে; সেটি হচ্ছে জীবন্ত বীজ রক্ষা ও ব্যবহার করা। এটি ভূমি এবং মাটির যত্নের সাথে জড়িত। আমরা যদি মাটি গঠনে যত্নশীল না হই, তাহলে আমাদের আর খাদ্য সার্বভৌমত্ব থাকে না।

খাদ্য সার্বভৌমত্ব হচ্ছে জৈব কৃষি ভিত্তিক এবং রাসায়নিক উপাদান ও বিষকে এড়ানো। খাদ্য সার্বভৌমত্বের সাথে জ্ঞানের সার্বভৌমত্ব, অর্থনৈতিক সার্বভৌমত্ব এবং রাজনৈতিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্নও যুক্ত।

প্রশ্নঃ ভারতে কোন উপায়গুলো চর্চা হচ্ছে বলে আপনি পর্যবেক্ষণ করেছেন?

শিবাঃ আমি ১৯৮৪ সালে পাঞ্জাবে “সবুজ বিপ্লব” এর ওপর পড়াশোনা করেছিলাম এবং আমি ১৯৮৭ সালে জৈবপ্রযুক্তির ওপর একটি অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়েছিলাম। আমরা বীজ রক্ষা দিয়ে শুরু করেছিলাম; যেই আন্দোলনকে ১৯৯১ সাল থেকে নাভদানয়া বলে ডাকা হচ্ছে। ১৫০ সম্প্রদায়ের বেশি মানুষের জন্য বীজ ব্যাংক তৈরি হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে স্থানীয় বীজ স্থানীয় সংস্কৃতিতে অভিযোজিত হয়ে প্রচুর পুষ্টি এবং প্রানবন্ততা সরবরাহ করছে। আমরা ১০ লক্ষের বেশি কৃষককে রাসায়নিকমুক্ত, জৈব বৈচিত্র‍্য ভিত্তিক জৈব কৃষির প্রশিক্ষণ দিয়েছি। কৃষকেরা পুষ্টি উৎপাদন ক্ষমতা দ্বিগুণ বৃদ্ধি করেছে এবং যেজন্য তাঁদের আর রাসায়নিক আর অনবায়নযোগ্য বীজের পেছনে টাকা নষ্ট করতে হচ্ছে না৷ তাঁরা পণ্য উৎপাদনমুখী কৃষকদের চেয়ে ১০ গুণ বেশি উপার্জন করছে।

প্রশ্নঃ হিমালয়ের বেড়ে ওঠা কিভাবে আপনাকে খাদ্য এবং বাস্তুসংস্থান সম্পর্কে আগ্রহী হতে উদ্বুদ্ধ করলো?

শিবাঃ কারণ আমি হিমালয়ে বেড়ে ওঠেছিলাম এবং চিপকো‘র (Chipko) একজন স্বেচ্ছাসেবী ছিলাম। আমি জৈব বৈচিত্র‍্যের মূল্য শিখেছি। আমি এই শিক্ষাকে পাঞ্জাবে (যেখানে সবুজ বিপ্লব আরোপিত হয়েছিল) কেন সহিংসতার সূত্রপাত হলো সেটা বুঝতে প্রয়োগ করেছিলাম। আমি “The violence of the Green Revolution” নামে একটি বই লিখেছি এবং খাদ্য ও কৃষির জন্য একটি অহিংস ব্যবস্থা নির্মাণে অঙ্গীকার করেছি। ১৯৮৪ সাল থেকে আমি এগুলোই করেছি।

আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে শিল্প-ঔপনিবেশিক পশ্চিম ছিল যান্ত্রিক মন, এক-ফসলী চাষের মন। আমি মনের জৈব বৈচিত্র‍্যধর্মী চাষ এবং আমাদের খাদ্য ও খামারের জৈব বৈচিত্র‍্য পুনর্জাত করতে শুরু করেছিলাম।

প্রশ্নঃ আপনি কয়েক দশক ধরে “বীজ সংরক্ষণ” এবং “বীজ স্বাধীনতা” নিয়ে কথা বলে আসছেন। কেন এসব অনুশীলন গুরুত্বপূর্ণ এবং ভারতে আপনার সংগঠন (নাভদানয়া) কিভাবে এই বিষয়ের উন্নতিতে কাজ করছে?

শিবাঃ বীজ জীবনের উৎস। বীজ খাদ্যের উৎস। খাদ্য স্বাধীনতা রক্ষা করতে আমাদের অবশ্যই বীজ স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে হবে।

আমরা যে প্রথম কাজটা করেছি সেটা হচ্ছে “কমিউনিটিভিত্তিক বীজ ব্যাংক” তৈরি করা, যেটি বীজকে সাধারণ পণ্য হিসেবে পুনরূদ্ধার করে এবং বীজের বিশেষ সুবিধা প্রতিহত করে৷ ১৫০ এর অধিক “কমিউনিটিভিত্তিক বীজ ব্যাংক” তৈরি করা হয়েছে, যেগুলো কৃষকদের অধিক পুষ্টিকর শস্য উৎপাদনে সাহায্য করছে এবং তাঁদের হাতে পরিবেশের সাথে খাপখাওয়া বীজ রয়েছে যেগুলো জলবায়ু পরিবর্তন এবং জলবায়ু বিপর্যয় মোকাবেলা করতে সক্ষম।

আমি আইন তৈরিতে সাহায্য করেছি যেটি উদ্ভিদ, প্রাণী এবং বীজ যে মানুষের উদ্ভাবন নয় সেটি স্বীকৃতি দেয়। আমরা Biopiracy, জৈব বৈচিত্রের বিশেষ সুবিধা এবং দেশীয় জ্ঞানের জন্য মামলা লড়েছি। আমরা অংশগ্রহণমূলক গবেষণার মধ্য দিয়ে দেখিয়েছি যে, আপনি যখন রাসায়নিকের পরিবর্তে জৈব বৈচিত্র‍্যকে গুরুত্ব দিবেন এবং পরিমাপের ক্ষেত্রে Yield Per Acre এর পরিবর্তে Nutrition Per Acre ধরবেন, তখন আপনি বিশ্ব জনসংখ্যার দ্বিগুণ মানুষের জন্য যথেষ্ঠ পুষ্টি উৎপাদন করতে পারবেন।

নতুন গবেষণা বলছে যে, দেশজ বীজে কারখানাজাত উচ্চ ফলনশীল বীজের চেয়ে অনেক বেশি পুষ্টি থাকে। এবং কারখানাজাত বীজ পুষ্টির দিক থেকে শূন্য এবং সম্পূর্ণভাবে বিষ।

প্রশ্নঃ আপনি অনেকবার উল্লেখ করেছেন যে বিশ্বের অধিকাংশ খাদ্যই নারীরা উৎপাদন করে থাকেন৷ কেন বিশেষভাবে নারীদের জন্য খাদ্য সার্বভৌমত্ব প্রাসঙ্গিক?

শিবাঃ আমি ৪ দশকের অধিক সময়ের গবেষণা ও কাজ থেকে এটা উপলব্ধি করেছি যে বিশ্বের অধিকাংশ কৃষকই নারী। তাঁরা খাদ্যকে পুষ্টি হিসেবে উৎপাদন করে, পণ্য হিসেবে নয়। তাঁরা খাদ্যকে স্বাস্থ্যের জন্য উৎপাদন করে, রোগের জন্য নয়। যুদ্ধ, দুর্ভিক্ষ, বন্যা এবং খরার মধ্যেও তাঁরা তাঁদের বীজ ও খাদ্যের স্মৃতিকে জীবন্ত রেখেছে।

নারীদের বিশ্বকে, বিশ্বের জৈব বৈচিত্র‍্য এবং আমাদের স্বাস্থ্য ও পুষ্টিকে পুনরায় বাঁচিয়ে তোলার জন্য নেতৃত্ব দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।

প্রশ্নঃ বিশ্বজুড়ে কোন সংস্কৃতির মানুষেরা জৈব খাদ্যের (Organic-food) দিকে অগ্রসর হতে পারে?

শিবাঃ সব দেশজ (Indigenous) সংস্কৃতিই জৈব খাদ্য সংস্কৃতির ধারক৷ অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীরা ৬০ হাজার বছর ধরে চাষ করছে। ভারত ও চীনের ক্ষুদ্র কৃষকেরা ৪ হাজার বছর ধরে কৃষক ছিলেন।

স্যার আলবার্ট হোয়ার্ড (Sir Albert Howard) (যাঁকে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য ১৯০৫ সালে ভারতের কৃষি উন্নয়নের কাজের জন্য পাঠিয়েছিল) ভারতের চাষীদের কাছ থেকে “জৈব খাদ্য কৃষি” শিখে পশ্চিমের কৃষি উন্নয়ন করেছিল। তিঁনি তাঁর “An Agricultural Testament” লেখায় ভারতের দেশীয় অনুশীলন কতটা ভালো ছিল তা দেখান এবং এক্ষেত্রে তিঁনি ভারতীয় চাষীদের তাঁর শিক্ষক হিসেবে নিয়েছিলেন।

প্রশ্নঃ আপনি ২০ টিরও অধিক বইয়ের লেখক। এবং আপনি আপনার অন্যতম বিখ্যাত বইয়ের মধ্য দিয়ে “Earth Democracy” নামক একটি পদ উদ্ভাবন করেছেন। এটি আসলে কী বোঝায় এবং ভ্রমণকারীরা কিভাবে এটি অনুশীলন করতে পারে?

শিবাঃ ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং শিল্পায়ন চারটি মিথ্যা প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে পৃথিবী এবং দেশীয় সংস্কৃতিকে ধ্বংস করেছে।

প্রথমত, আমরা প্রকৃতি থেকে বিচ্ছিন্ন এবং আমরা প্রকৃতির অংশ না। দ্বিতীয়ত, এই প্রকৃতি হচ্ছে মৃত জিনিস, যেটা কিনা শিল্প শোষণের কাঁচামাল ছাড়া আর কিছু নয়। তৃতীয়ত, দেশীয় সংস্কৃতি হচ্ছে নিচু ও আদিম, এই সংস্কৃতিগুলোর স্থায়ী উপনিবেশনের প্রকল্পের সভ্যকরন মিশনের মধ্য দিয়ে সভ্য হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। চতুর্থত, বাইরের প্রভাব এবং ব্যবস্থাপনার ভেতর দিয়ে এই প্রকৃতি ও সংস্কৃতির উন্নতি হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। সবুজ বিপ্লব (Green Revolution), জিএমওএস (GMOs), জীন সম্পাদনা (Gene editing) এর মতো বিষয়গুলো এই মিথ্যা প্রতিষ্ঠার গভীরে প্রোথিত।

আমি “Earth Democracy” তে দেখিয়েছি যে, বিশ্বায়ন অনিয়ন্ত্রিত বানিজ্য এবং অপ্রচলিত অসীম লোভ তৈরি করেছে, যেটি আমাদের অর্থনৈতিক গণহত্যার দিকে নিয়ে যাচ্ছিল। কোটিপতি এবং কর্পোরেশনের অর্থে চালিত “নির্বাচনী গণতন্ত্র” মানুষের গণতন্ত্র, মানুষের জন্য গণতন্ত্র, মানুষের দ্বারা গণতন্ত্র থেকে কর্পোরেশন দ্বারা পরিচালিত একটি রাজনৈতিক ব্যবস্থায় পরিণত হয়েছে, যেটি আদতে এখন কর্পোরেশনের, কর্পোরেশনের জন্য এবং কর্পোরেশন দ্বারা। এবং এটি অভাব ও প্রতিযোগিতা তৈরি করে সাংস্কৃতিক যুদ্ধ তৈরি করেছিল।

তো, আমি “Earth Democracy” পদটি বিকশিত করেছি আমার দর্শন ও অনুশীলনের ওপর ভিত্তি করে, যেটি বলে আমরা পৃথিবীর অংশ এবং মানুষের স্বাধীনতা ও কল্যাণ অন্যান্য প্রজাতির ওপর নির্ভর করে। আমরা অন্যান্য প্রজাতি থেকে উচ্চতর নয়, আমরা আন্তঃপ্রজাতি (Inter-being) ৷ মানবকেন্দ্রিক দৃষ্টিভঙ্গি (Anthropocentrism) হচ্ছে একটি হিংস্র নির্মাণ।

“Earth Democracy” আমাদের জীবন যাপনের অযোগ্য অর্থনীতি, সংস্কৃতি এবং মৃতপ্রায় গণতন্ত্র থেকে জীবন্ত অর্থনীতি, জীবন্ত সংস্কৃতি ও বিশ্বের দিকে নিয়ে যায়, যেটি তার প্রাচুর্য ভাগাভাগি করে এবং সীমাবদ্ধতাকে সম্মান করে।

প্রশ্নঃ আপনি আফ্রিকা, এশিয়া, দক্ষিণ আমেরিকা এবং ইউরোপ জুড়ে তৃণমূল পর্যায়ের সংগঠনগুলোকে সাহায্য করেছেন এবং বিশ্বজুড়ে বিভিন্ন অনুষ্ঠানে কথা বলেছেন। তো, এসব অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে আপনি কোন বিষয়গুলো সাধারণ সমস্যা হিসেবে পর্যবেক্ষণ করেছেন যেটি স্থানীয় খাদ্য ও সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কযুক্ত?

শিবাঃ আমরা উপনিবেশবাদ দ্বারা বিভক্ত। আমরা লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, শ্রেণী দ্বারা বিভক্ত। তবে আমরা পৃথিবীর অংশ এবং খাদ্য হচ্ছে জীবনের মুদ্রা ৷ যে খাদ্য ব্যবস্থা বিশ্বের সাথে যুদ্ধে রয়েছে সেই খাদ্য ব্যবস্থা আমাদের দেহের সাথেও যুদ্ধে রয়েছে।

বিশ্বজুড়ে, বিশেষভাবে এই অতিমারীর সময়, একটি বিষয়ে মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে যে আমরা যে বহু শক্তির মধ্য দিয়ে জীবন যাপন করছি সেগুলোর শিকড় মূলত অন্যায্য, টেকসইহীন শিল্প-বিশ্বায়িত খাদ্য ব্যবস্থা। এবং এসব সঙ্কটের সমাধান মূলত স্থানীয়, জৈব বৈচিত্র‍্য, বিষমুক্ত, রাসায়নিকমুক্ত খাদ্য ব্যবস্থা হতে পারে, যেটি সকল জীবের জন্য পুষ্টি বৃদ্ধি করে এবং একইসাথে এটি পরিবেশগত ক্ষতিও কমায়।

প্রশ্নঃ আপনি যখন ভ্রমণকালে খাদ্যগ্রহণ করেন তখন কিভাবে নিশ্চিত হন যে সেগুলো স্থানীয় এবং একটি টেকসই উপায়ে উৎপাদন করা হয়েছে এবং ভ্রমণকারীদের জন্য ঠিক কী পরামর্শ দিবেন যাঁরা একইধরনের কাজ করতে চান?

শিবাঃ যখন বৈশ্বিক ভ্রমণ সম্ভব ছিল, আমি হয় স্থানীয় কৃষকদের কাছ থেকে খাবার খেতাম নাহয় উপবাস থাকতাম। যখন থেকে লকডাউনে ভ্রমণ বন্ধ হয়েছে, আমি স্থানীয় খাদ্যকে সমৃদ্ধ করার চেষ্টা করছি এবং “Grow your Health” স্লোগানে একটি আন্দোলন শুরু করেছি।

প্রশ্নঃ সেসব ভ্রমণকারীর জন্য আপনার কী পরামর্শ থাকবে যাঁরা বিশ্বকে একটি সুন্দর জায়গা হিসেবে তৈরি করতে চায়, কিন্তু ঠিক কোথা থেকে শুরু করতে হবে জানে না?

শিবাঃ এক্ষেত্রে আমরা যে খাদ্যগ্রহণ করি সেটা একটা বড় অবদানের জায়গা হতে পারে। সচেতনভাবে খাদ্যগ্রহণ কিংবা খাদ্য নির্বাচন একটি বড় অবদানের জায়গা। যেটা আমাদের মনে রাখা দরকার সেটা হচ্ছে খাদ্য হচ্ছে জীবনের মুদ্রা। যখন আপনি কারখানাজাত খাদ্য ব্যবস্থায় অংশগ্রহণ করছেন, তখন আপনি আসলে জীবনের চক্রকে ভেঙে ফেলতে অংশগ্রহণ করছেন।

প্রক্রিয়াজাত খাদ্য থেকে দূরে থাকুন, বিশুদ্ধ খাদ্যগ্রহণ করুন। সকল অজ্ঞাত খাদ্য যেটি কোথা থেকে উৎপাদন হয়েছে সে ব্যাপারে আপনি ওয়াকিবহাল না, সেগুলোকে এড়িয়ে চলুন। সকল জীবই জীবন্ত, সকল জীবই সংবেদী। খাদ্যগ্রহণ হচ্ছে অন্যান্য জীবের সাথে কথোপকথন বা যোগাযোগ। অজ্ঞাত খাদ্য এই যোগাযোগ এবং আমাদের সুস্বাস্থ্যকে ব্যাহত করে।

প্রশ্নঃ এখনো কোন বিষয়গুলো আপনাকে একটি সুন্দর বিশ্বের জন্য আশা দেয়?

শিবাঃ আশা আমাদের জীবনের বাইরের কোনো জিনিস না, আশা জীবনধারণেরই একটি প্রণালী। আমি আমার প্রতিটি চিন্তা ও কাজেই আশার চর্চা করি।

মূল লেখার লিংক

Related Articles

তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (দ্বিতীয় কিস্তি)

উদারতাবাদ আর বাকস্বাধীনতার ধরণ বলা হয়ে থাকে ব্লাসফেমির বিরূদ্ধে অভিযোগ একটা...

লিপ প্লেট : ইথিওপিয়ার মুরসি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য

মুরসি জনগোষ্ঠী (মুনি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইথিওপিয়ার নিম্ন ওমো উপত্যকায় বসবাস করে। এই অঞ্চলে দশ হাজারের...

থিওরিঃ লুইস হেনরি মরগান ও এক চিলতে বিবর্তনবাদ

প্রাথমিক আলাপ নৃবিজ্ঞানের তত্ত্ব সংক্রান্ত আলাপে শুরুর দিকে যে কয়জন তাত্ত্বিকের...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (দ্বিতীয় কিস্তি)

উদারতাবাদ আর বাকস্বাধীনতার ধরণ বলা হয়ে থাকে ব্লাসফেমির বিরূদ্ধে অভিযোগ একটা...

লিপ প্লেট : ইথিওপিয়ার মুরসি জাতিগোষ্ঠীর ঐতিহ্য

মুরসি জনগোষ্ঠী (মুনি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় ইথিওপিয়ার নিম্ন ওমো উপত্যকায় বসবাস করে। এই অঞ্চলে দশ হাজারের...

থিওরিঃ লুইস হেনরি মরগান ও এক চিলতে বিবর্তনবাদ

প্রাথমিক আলাপ নৃবিজ্ঞানের তত্ত্ব সংক্রান্ত আলাপে শুরুর দিকে যে কয়জন তাত্ত্বিকের...

থিওরি: টাইলর ও তার তত্ত্ব

নৃবিজ্ঞানের পাঠকদের জন্য এটা মোটেও একটি 'সংবাদ' নয় যে এডওয়ার্ড বারনেট টাইলর নামের এই...

কিভাবে প্রবন্ধ লিখতে হয়ঃ নৃবিজ্ঞানীদের জন্য একটি দিকনির্দেশনা

‘পাবলিশ কিংবা প্যারিশ’ এই মন্ত্রবাক্য জানা একাডেমিকরা লেখালেখির দক্ষতা আর অনুশীলনের সাথে অবশ্যই পরিচিত।...