দীপেশ চক্রবর্তীর ‘নারী, আড্ডা এবং জনসংস্কৃতি’
এই লেখাটি সাব অল্টার্ন ঐতিহাসিক দীপেশ চক্রবর্তীর ‘Provincializing Europe’ বইয়ের ক্ষুদ্র একটি অংশ থেকে অনূদিত। লেখাটির শিরোনাম ছিল, ‘Women, adda, and public culture’ । এনথ্রোসার্কেলের জন্য লেখাটির অনুবাদ করেছেন সারোয়ার রাফি। নিচে যে স্কেচগুলো ব্যবহার করা হয়েছে, তা দীপেশের বই থেকেই সংগৃহীত।
আধুনিক আড্ডা যেসব স্থানে হয়- বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষার্থীদের হল, আধুনিক সাহিত্যিক আলাপ, রেস্তোরাঁ, চায়ের দোকান, কফিহাউজ এবং পার্ক, এগুলো কি সব পুরুষ অধ্যুষিত ?
বাংলা সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সাহিত্য সমালোচক মানসী দাশ গুপ্তা জোর দিয়েছিলেন যে, আড্ডায় জনপরিসরে কথা বলা বা খাওয়াদাওয়ার মতো যেসব কাজের মধ্য দিয়ে একটি গোষ্ঠীবদ্ধ থাকার ভাব তৈরি হয়, সেক্ষেত্রে পুরুষদের আড্ডায় নারীদের অংশগ্রহণে ঐতিহ্যগতভাবেই একটা বাঁধা থাকে । নারীরা উনবিংশ শতাব্দীর মধ্যবিত্ত সম্প্রদায়ের মানুষদের মর্যাদা রক্ষার ধারণা মেনে চলার কারণে তাদের আড্ডা থেকে দূরে থাকতে হতো। প্রথমত, এটা মনে রাখা উচিত যে ব্রিটিশ শাসিত ভারতের আগে ও পরে নারী এবং পুরুষদের কর্মক্ষেত্র আলাদা হয়ে যাওয়ার মাধ্যমে, নারীদের নিজস্ব এক আড্ডার ঢঙ তৈরি হয় এবং সেই তৈরি হওয়ার ধারাবাহিকতায় এখনো তারা আড্ডার চর্চা করে যাচ্ছে। তবে স্থানের দিক দিয়ে আড্ডাগুলো ব্যতিক্রমই, নারীরা যেসব স্থানে জড়ো হয় সেখানেই আড্ডাগুলো হয়। এই আলাপ থেকে সামাজিক পরিসরের ভাগ হওয়ার জায়গাটিও ধরা পড়ে। ১৯৯০ সালে প্রকাশিত হওয়া ‘কলকাতার আড্ডা’ বইতে নারীদের অবদানের পাশাপাশি সেখানে ‘নারীদের আড্ডা’ নামে একটা প্রবন্ধও ছিলো। কলকাতায় এবং বড় শহরগুলোর সাথে যোগাযোগ আর কাজের খাতিরে প্রতিদিন ট্রেনে চড়ে নারীদের যাতায়াত করতে হত এবং সেখানে নারীদের জন্য আলাদা কামরাগুলোতে তাদের নিজস্ব আড্ডার ধরণ গড়ে ওঠেছিলো।
কিন্তু বিংশ শতাব্দীতে মধ্যভাগে পুরুষের আড্ডার ব্যাপারটি বাস্তবিকভাবে নারী এবং পুরুষের পরিসরগুলো আলাদা হয়ে যাওয়ার ব্যাপারটিকেই নির্দেশ করে। নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ চট্টোপাধ্যায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ করেছিলেন, “আড্ডার সাধারণ শত্রু হলো নারীরা”। এই বক্তব্যটিকে যতটা নারীবিদ্বেষী মনে হয়, ঠিক ততটাও নয়। তিনি আসলে লিঙ্গ সমস্যার ব্যাপারটিকে একটি ত্রুটি হিসেবে তুলে ধরেছিলেন এবং আড্ডার কাঠামোতে নারীরা যে একটা নিচু অবস্থানে চলে যায় সেটাই সহানুভূতির সহিত প্রকাশ করেছিলেন। তিনি আরো বলেছেনঃ ”আড্ডার সবচেয়ে বড় ত্রুটি হলো এটা পুরুষদেরই একটা অন্তরঙ্গ পৃথিবী। তবে এই দূর্বলতাই আবার আড্ডাকে টিকিয়ে রাখে। একটা আড্ডা ভেস্তে যায় যদি কোনো নারী ১০ কিউবিটের মধ্যেও চলে আসে… প্রতিটা বিবাহিত নারীই আড্ডাকে বিষাক্ত চোখে দেখে। কারণ ওদের আড্ডাধারী স্বামীর জন্যে বসে থাকতে হয় এবং নিঃশব্দ রাতের বেলায় তার জন্যে অপেক্ষা করে থাকতে হয় । প্রতিটা স্বামীকেই আড্ডা হতে ফিরে আসলে এই প্রশ্নের(মজার ছলে) সম্মুখীন হতে হয়ঃ ‘ অবশেষে আড্ডা শেষ হলো, তাই নয় কি?”
আড্ডার প্রতি স্ত্রীর (কল্পিত) এমন বিরাগ, পৃথিবী এবং এই শব্দের মধ্যে, পার্থিব দায়িত্ববোধের মধ্যে, চাহিদা নিয়ন্ত্রিত টুকিটাকি কাজের মধ্যে এবং স্বামীর আনন্দ এবং কথাবার্তার মধ্যে একপ্রকার সাংস্কৃতিক বৈপরীত্য সৃষ্টি করে। আড্ডাধারীর ভূমিকার কথায় বলা যায়, যে কিনা আড্ডায় সকলকে ধরে রাখে, সে সকল গৃহস্থালি ও সামাজিক দায়িত্বকে উপেক্ষা করে। প্রচণ্ড হিউমার এবং আইরনিসমেত নৃপেন্দ্রকৃষ্ণ একজন আদর্শ আড্ডাধারী সম্পর্কে বলেছিলেন ,
“প্রতিটা আড্ডায় একজন মূল থাকে, যাকে আড্ডাধারী বলা যায়…সে হচ্ছে আড্ডার সৌর কেন্দ্র, তাকে ঘিরেই আড্ডা বসে।আড্ডাধারী লোকটি তার জগতে একটা স্থির বিন্দুর মতো, যে অক্লান্ত। তার কোনো অফিসের তাড়া নেই, কোনো বিয়ের দাওয়াতে যাওয়ার তাড়া নেই, কোনো সভায় বক্তব্য দেওয়ার অবকাশ নেই, সিনেমা দেখতে যাওয়ার ঘোর নেই, শালীর বিয়েতে কাজ করবার বাধ্যবাধকতা নেই, বউয়ের ভাইয়ের ছেলের অন্নপ্রাশনে যাওয়ার জো নেই, দার্জিলিং, পুরী কিছুই নেই, তার একমাত্র কাজ হচ্ছে এখানেই বসে থাকা আর… আড্ডা দেওয়া। কলকাতার রাস্তা পানির নিচে চলে যেতে পারে, অথবা রাস্তার পিচ সূর্যের তাপে গলে যেতে পারে, জাপানিরা কয়েকটা বোমা ছুঁড়ে মারতে পারে ,তবে প্রতিটা আড্ডাবাজেরা নিশ্চিতভাবে এটা জানে যে আড্ডায় কমপক্ষে সেরকম একজন ব্যক্তি উপস্থিত থাকবে। আর সে ব্যক্তিটি হলো আড্ডাধারী।”
এটাই কিন্তু পুরো গল্প নয়। ঐতিহাসিক হিসাবে, ১৮৫০ সালের দিকে নারীদের শিক্ষা এবং জনজীবনে প্রবেশ করার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিলো৷ এর ফলে একটা পরিবর্তন এসেছিলো। সামাজিক জীবনে নারী এবং পুরুষদের আলাদা হয়ে যাওয়া এবং বিবাহের নতুন আদর্শের প্রচলন শুরু হওয়ার ব্যাপারটাই পরশুরামের (রাজশেখর বসু) ব্যাঙ্গাত্মক গল্প ‘দ্বান্দ্বিক কবিতা’র বিষয়বস্তু ছিল, যা ১৯৫৭ সালে প্রকাশিত হয়েছিলো। ‘দ্বান্দ্বিক কবিতা’ নামটি বাঙালির মুখস্থনির্ভর মার্কসবাদচর্চা নিয়ে একটি বিদ্রুপাত্মক নাম ছিলো। এই সমগ্র গল্পটাই একটা আড্ডায় বর্ণিত হয়। গল্পটার চরিত্র ছিলো ধূর্জটি এবং তার বউ শঙ্করি। ধূর্জটি গণিত পড়ায়, কিন্তু সে তার জীবন উৎসর্গ করেছে কল্পিত দেশের অজানা, অচেনা এক কল্পিত নারীকে নিয়ে প্রেমের কবিতা লিখে, যে বাঙ্গালি রোমান্টিসিজম রবীন্দ্রনাথের মারফতে শুরু হয়েছিল। বলার প্রয়োজন নেই, পুরুষদের প্রেমের অভিব্যক্তির চর্চা যেভাবে অজানা,অচেনা কল্পিত নারীকে ঘিরে গড়ে উঠেছিল, সেটাই আবেগ-অনুভূতির সাথে দৈনন্দিন জীবনের দূরত্বের দিকটি প্রতিফলিত করতো। বিয়ের পর বসুর গল্পের নায়ক ধূর্জটি এই প্রচলিত ঐতিহ্য থেকে সরে আসে । সে কিছুদিন তার স্ত্রীকে উদ্দেশ্য করে এই সমস্ত কাব্যিক ভালোবাসা, প্রেমের অভিব্যক্তি প্রকাশ করে, কিন্তু শীঘ্রই হতাশায় এই চেষ্টা ছেড়ে দেয়। কারণ সে খুঁজে পায় তার কাব্যিক উদ্দীপনার তুলনায় স্ত্রী শঙ্করির অধিক আগ্রহ তাদের কোলে আসা সদ্যজাত শিশুটির প্রতি। ধূর্যটি অবশ্য ফের তার কাল্পনিক প্রেমিকার উদ্দেশ্যে কবিতা লিখতে শুরু করে অন্যদিকে শঙ্করি নিজেকে গৃহস্থালির কাজেই আবদ্ধ রাখে।
যদি বসুর গল্প এখানেই শেষ হয়ে যেতো তবে এটাকে উনবিংশ শতাব্দীর গৃহজীবন এবং আধুনিক প্রকাশমুখী পুরুষের মধ্যকার চিন্তার বিরোধের বর্ণনা হিসেবে উল্লেখ করতে কোনো বাঁধা থাকতো না। একজন পুরুষ যে কিনা তার সাহিত্যিক উচ্চকিত বোধ শুধুমাত্র তার পুরুষ বন্ধুদের জন্যই জমা করে রাখে এবং তার স্ত্রীর সাথে বজায় রাখে ব্যবহারিক ও গৃহস্থালি সম্পর্ক। কিন্তু গল্পটা এখানেই শেষ হয়নি। কারণ বসু এমন এক সময়ে লিখেছিলো যখন সাহিত্য একইসাথে নারীদেরও জীবনের অংশ ছিলো। তাই গল্পে আবির্ভাব হয় বিশাখার, যে কিনা ভার্সিটি থেকেই শঙ্করির বান্ধবী ছিল। সে এসে শঙ্করির মনে চিন্তার উদ্রেক ঘটায়। তাকে একদিন বলেঃ
“তোমার স্বামী, যাই হোক, একজন বিখ্যাত কবি…তুমি কী আমাকে বলতে পারো ,সে যে প্রেমের কবিতাগুলো লিখে এগুলো কার জন্যে লিখে? নিশ্চয়ই তোমার জন্যে নয়, যদি তাই হতো তবে সে নিশ্চয়ই ‘আমার অচেনা প্রেমিকা, যার সাথে আমি স্বপ্নে মিলেছি’’ এমনটা লিখতো না।”
শঙ্করি জবাবে বলে, “সে কারো জন্যে কবিতা লেখে না। কবিরা কল্পনাপ্রিয় মানুষ, তারা স্বপ্নে এমন একজনকে কল্পনা করে এবং তাকে ঘিরেই কবিতা লেখে।”
-…তোমার তাতে রাগ হয় না?
– আমার তাতে কিছু আসে যায় না।
-…তোমাকে পরে পস্তাতে হবে…এখনই কিছু করো।
– তুমি কি করতে বলো?
– এটাই যে তুমিও ওর মতোন এমন কোনো কাল্পনিক যুবককে কল্পনা করে কবিতা লিখবে।
শঙ্করি কখনোই কবিতা লেখেনি, তবুও বিশাখা তাকে নিজের জন্যে কবিতা লিখতে প্ররোচিত করে। শীঘ্রই শঙ্করির একটা কবিতা ম্যাগাজিনে ছাপে। কবিতাগুলো সম্বোধিত হয় “রেড চীনের যুদ্ধরত যুবক” অথবা “পাখতুনিস্তানের তরুণ যুবক”নামেঃ
তোমার লোম-অরণ্যের বুকে আমাকে টেনে নাও
বাণের মতোন অই দুই হাতে জাপটে ধরো,
ভেঙ্গে দাও বুকের পাঁজর
পিষে ফেল, পিষে ফেল আমাকে
একদিন ধূর্জটির বন্ধু তাকে বলেঃ শোন ধূর্জটি, শঙ্করি দেবী তোমার স্ত্রী নয়? কি খাসা কবিতাই না তিনি লিখছেন… সবখানে আলোচনার ঝড়। মনোবিজ্ঞানী প্রফেসর ভর বলেন, ‘এটা হলো লিবিডোর বুনো আচরণ।’ পরবর্তীতে ধূর্জটি এবং শঙ্করির মধ্যকার কথোপকথন হয়তো উনবিংশ শতাব্দীর হিসাবে বেমানান। ধূর্জটি বলে,
“কি সব আজেবাজে লিখছো? লোকে বলাবলি করছে।”
শঙ্করি বললো, “ওদেরকে বলতে দাও। এগুলো ভালো বিক্রি হচ্ছে, আরেকটা বই প্রেসে দিয়েছি।”
ধূর্জটি মাথা নাড়িয়ে বললো, “আমি তোমাকে বলছি এইসব কিছু আর চলতে পারে না।”
“এটা হাস্যকর। তুমি লিখলে কোনো দোষ নেই অথচ আমি লিখলেই যত দোষ!-
…কেন তুমি এইসমস্ত জঞ্জাল লিখছো?”
“তুমি তোমাকে আমার সাথে তুলনা করছো? যদি কোনো পুরুষ কাল্পনিক নারীকে কল্পনা করে লিখে তবে তাতে সব ঠিক আছে, কিন্তু একজন নারী লিখলেই যত খারাপ হয়।”
“আচ্ছা ঠিকাছে, তুমি কবিতা লেখা বন্ধ করে দিবে এবং সমস্ত বই পুড়িয়ে ফেলবে, আর আমিও তাই করবো।”
সমস্যা সমাধানে অক্ষম হয়ে, ধূর্জটি তারপর কবিতা লেখা ছেড়ে দেয় এবং এলজেব্রার বই লিখতে শুরু করে অন্যদিকে শঙ্করি শুধু রবিবারের পত্রিকার ম্যাগাজিন শাখায় রান্নার রেসিপি লেখার সিদ্ধান্ত নেয়।
বসুর এই গল্পে শুধু আধুনিক জনজীবনে পুরুষদের স্পেস এবং নারীদের স্পেসের পুরোপুরি ধ্বংসের ব্যাপারটাই ওঠে আসেনি। তার সাথে সাথে, আড্ডার খোশগল্পের মধ্যেই একজন নারীর জনজীবনে প্রবেশের মধ্য দিয়ে যে বিরোধ তৈরি হয় তাকে বাঙ্গালি কিভাবে মোকাবিলা করে তাও উঠে আসে। কিন্তু তারপরও এই প্রশ্নের কোনো উত্তর নেই যে, লিঙ্গ পৃথকীকরণের যে অর্ন্তনিহিত নীতি তা কেন এখনো জনজীবনে চলতে থাকবে।
বাঙালি আধুনিক বিপরীতকামিতা চর্চার একটা জটিল অংশ হলো জনজীবনে পুরুষ ও নারীদের মধ্যকার বন্ধুত্বের ব্যাপারটি। সাহিত্য সমালোচক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায় প্রত্যক্ষ উপলব্ধি করেছেন, ইউরোপিয়ান রোমান্টিক বন্ধুত্বের ধারণা এবং বৈশ্বিক অনুভবের জায়গা আমাদের নিজস্ব ইতিহাসে পুরুষ-নারীদের মধ্যে জায়গা জায়গা না পেয়ে, শুধু পুরুষদের মধ্যেই আসন গড়ে তুলেছিলো এবং এই বন্ধুত্বের পরিসরকে আরো বড় এবং তীব্র করে তুলেছিলো। তিনি বলছেনঃ
“আমাদের খিল আটা প্রকৃতির সামাজিক ব্যবস্থায়, বিষমকামী বন্ধুত্বের বিপরীতে পুরুষদের মধ্যে বন্ধুত্বই ছিল প্রধান, এবং এটাই ছিল একমাত্র উন্মুক্ত পথ যেখানে বাঙ্গালি পরিবারে বাইরে থেকে কেউ প্রবেশ করার বিপ্লবটা ঘটিয়ে ফেলতে পারে। শুধুমাত্র বন্ধুত্বের দোহাই অথবা কাউকে ক্লাসমেটের পরিচয় দিয়েই ভিন্ন পরিবারের মধ্যে থাকা বাঁধা ডিঙিয়ে কেউ ঘরে ভেতরে প্রবেশ করতে পারে এবং অন্তরঙ্গ হওয়ার সুযোগ পেতে পারে। নারী এবং পুরুষের মধ্যে মেলামেশার সুযোগ যত সংকীর্ণ , ততই বিস্তৃত একজন পুরুষের সাথে পুরুষের জন্যে বন্ধুত্বের সুযোগ। এই কারণে বাঙালি উপন্যাসগুলোতে [পুরুষের মধ্যে] অধিক বন্ধুত্ব পাতানোর ব্যাপারগুলো দেখা যায়- এতে অধিকাংশ সময়ে বন্ধুত্বের সংকটগুলোও অনুরাগের ক্রিয়-প্রতিক্রিয়ায়, নিরাপত্তাবোধ এবং একই সময়ে এমন বন্ধুত্বের মধ্যে প্রতিযোগিতার তীব্র বাসনার উদ্ভব থেকে”
তবে এটা শুধু উনবিংশ শতাব্দীর জন্যেই সত্য নয়। ১৯৬০ এর দশকেও কমিউনিস্ট আর্টিস্ট দেবব্রত মুখোপাধ্যায়ের কাছে কলেজ স্ট্রিট কফি হাউজে ছেলেদের সাথে মেয়েদের একসাথে আড্ডা দিতে দেখা খুব বিরল ব্যাপার ছিলো। তিনি বলছেনঃ
“মেয়েরা কফি হাউজে শুধু দুপুরের আড্ডাতেই আসত। কিন্তু তারা সংখ্যায় খুব কম থাকতো। সেইসময় নির্দিষ্ট কিছু দলের ছেলেরা একটা নির্দিষ্ট মেয়েকে কেন্দ্র করেই রোজ আড্ডা দিতো। আমরা, আড্ডাধারীরা যারা কোনো মেয়ের সঙ্গ ছাড়াই আড্ডা দিতাম, তারা ওদেরকে দেখে কিছুটা ঈর্ষা অনুভব করতাম। আমরা সেই মেয়ের নাম দিয়েছিলাম ‘মক্ষীরাণী’। একদিন আমি তার স্কেচ এঁকে ফেলেছিলাম।” (স্কেচ নং ৩)
কিছু জটিল কারণের জন্যে বাঙালি আধুনিকতায় পারিবারিক এবং আড্ডার মধ্যে যে বিপরীত কাঠামো অবস্থিত তা পুরোপুরি অতিক্রম করে যেতে পারেনি। হেনরি লেফেব্রে যা বুঝিয়েছে তা যদি আমি আরো শক্ত আইরনি দিয়ে বলি তবে আমাকে বলতে হয়, সাহিত্যিক আধুনিকতা ও তার সরব উপস্থিতি স্কুল, বিশ্ববিদ্যালয়, কফি হাউজ, বইয়ের দোকান ইত্যাদি এবং তাতে নানান উপস্থিতিদের মাধ্যমে সমলিঙ্গের আড্ডা দেওয়ার পরিসর বাড়াতে, গভীরতায় নিতে এবং আধুনিকায়নের ক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলো। তার সাথে সাথে নারীদেরকেও এরমধ্যে অংশগ্রহণ করতে সম্মতি যুগিয়েছিলো। তবে এই আড্ডার পুরুষালি বৈশিষ্ট্য কখনো যায়নি। এর মাঝেও বিপরীতকামী পুরুষেরা যুক্ত হয়ে সাহিত্যিক ভাষায় নিজেদের অভিব্যক্তি প্রকাশের চেষ্টা করে যাদের জন্যে লেফেব্রে থেকে ধার করে আনা ‘ফ্যালিক সলিট্যুড’ শব্দটি উপযুক্ত। গোকুল নাগ এবং দীনেশ দাশের মতোন ‘মানুষ’দের কথা বলা যায় যারা কিনা তাদের বৈশ্বিক স্বপ্নের ভিতরে বাঙালি নারীদের কদাচিৎই যুক্ত করেছিলো।

Pingback: প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা | Anthro Circle- নৃবিজ্ঞান বিষয়ক বাংলা সাইট