খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে মানব বিবর্তনে নারীর ভূমিকা

[Sapiens -এ প্রকাশিত ক্যারেন এল ক্রেমারের লেখাটি অনুবাদ করেছেন মোহাম্মদ শাহজালাল বারী] 

আলোচ্য প্রবন্ধে একজন নৃবিজ্ঞানী তুলে ধরেছেন খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ ও খাদ্য বৈচিত্র্যের বৈপ্লবিক ভূমিকার কথা। সমগ্র মানব ইতিহাসজুড়ে এই ভূমিকায় সবথেকে অবদান রেখেছে নারীরা, যা মানবজাতির টিকে থাকা ও বিকাশের ক্ষেত্রে শিকার কার্যক্রমের থেকে কোন ভাবেই কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না৷ 

দক্ষিণ-মধ্য ভেনেজুয়েলার ল্যানোস অঞ্চলে এখন বর্ষাকাল। উঁচু ভূমির সামান্য কিছু ভূমি বাদে সাভানার বিস্তীর্ণ অঞ্চল কয়েক ইঞ্চি থেকে কয়েক ফুট পানির নিচে ডুবে আছে। শিকারযোগ্য প্রাণীরা এলাকা ছেড়ে চলে গেছে, আর মাছ ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে, যাদেরকে খুঁজে পাওয়া কঠিন। তবে মাটির নিচে থাকা কন্দজাত ফসলগুলো এখন টগবগে ও পুষ্ট।

আমার স্বামী ও আমি দক্ষিণ আমেরিকার শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী পুমেদের সঙ্গে কয়েক মাস ধরে বসবাস করছি। এক সকালে ক্ষুধার্ত অবস্থায় আমরা একদল নারী ও শিশুর সঙ্গে সরু সারিতে হাঁটতে হাঁটতে যাই সেই জায়গায়, যেখানে সিক্ত, অগভীর বালু থেকে সহজেই কন্দ তোলা যায়। পাঁচ বছরের কম বয়সী ছোট ছোট মেয়েরাও তাদের নিজস্ব ঝুড়ি নিয়ে এসেছে, যেগুলো তারা আঙুলের আকারের কন্দ দিয়ে ভরবে। এই কন্দগুলী বছরের এই সময়ে তাদের খাদ্যের প্রধান উৎস।

শিবিরে ফিরে আমরা দেখি, সেদিন শিকার ও মাছ ধরতে যাওয়া পুরুষদের কারও ভাগ্য ভালো ছিল না। নারী ও শিশুরা তখন কাজ ভাগ করে নিল। কেউ খোসা ছাড়াচ্ছে, কেউ কুচি কুচি করে কাটছে, আবার কেউ সেই মূল পানিতে ভিজিয়ে রাখছে তিতকুটে ভাব দূর করতে। পরে, যখন কন্দগুলো কয়লার ভেতর নরম করে ভাজা হলো, তখন সবাই আগুনের চুলোর চারপাশে বসে খাবার ভাগাভাগি করল। এভাবে আরও এক দিনের ক্ষুধা মিটল।

আমি একজন নৃবিজ্ঞানী। শিকারি-সংগ্রাহক ও অ-বাজার অর্থনীতি ভিত্তিক সমাজে নারী ও শিশুরা যেভাবে তাদের সময় ব্যয় করে, তা-ই গত তিরিশ বছর ধরে আমার গবেষণার কেন্দ্রীয় বিষয়। কেন মানব বিবর্তনের কাহিনিতে মাংসকেই মুখ্য স্থান দেওয়া হয়েছে, আর পুরুষদেরই জীববৈজ্ঞানিক ও আচরণগত পরিবর্তনের মূল চালক হিসেবে দেখা হয়েছে, তা দশকের পর দশক আমাকে ভাবিয়েছে। আমার গবেষণা এবং অন্যান্য সহকর্মীদের কাজ সম্প্রতি প্রকাশ করেছে খাদ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াজাতকরণে নারী ও শিশুদের কেন্দ্রীয় ভূমিকা, যা প্রতিদিন, প্রতিটি আহারের মাধ্যমে গোটা সমাজকে টিকিয়ে রাখে।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

মানবজাতির খাদ্যাভ্যাস সংস্কৃতি অনুযায়ী ব্যাপকভাবে ভিন্ন হলেও খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ সর্বজনীন একটি প্রক্রিয়া। কিছু ফল, বেরি ও শাকপাতা ছাড়া পৃথিবীর প্রায় সব ঐতিহ্যবাহী খাদ্যই কোনো না কোনোভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়; ভাঙা, গুঁড়ো করা, পেটানো, ঘষা, ছাঁকা, ধোয়া, চটকানো, খোসা ছাড়ানো, মাড়াই করা, বীজ বা খোসা ফেলা, আঁশ ফেলা, কাঁটা ছাড়া, কাটা, সেদ্ধ করা, ভাজা বা অন্য কোনোভাবে রান্না করা।

যখন ঋতু অনুকূলে ছিল না, প্রিয় খাদ্য ফুরিয়ে যেত, অথবা সংঘাত কিংবা জনসংখ্যার চাপের কারণে বসবাসের এলাকা সংকুচিত হয়ে পড়তো, তখন এই অতিরিক্ত ধাপগুলো মানুষকে টিকে থাকার এক বিশেষ সুবিধা দিয়েছিল। খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ আমাদের খাদ্যতালিকাকে প্রসারিত ও বৈচিত্র্যময় করেছে, যা মানুষকে নানাবিধ পরিবেশে টিকে থাকতে ও বিকশিত হতে সাহায্য করেছে। গত তিন মিলিয়ন বছরের বিবর্তনের ইতিহাসে খাদ্যকে ছোট, সহজপাচ্য অংশে ভাঙার প্রক্রিয়া একসময় ছিল শরীরের অভ্যন্তরীণ কাজ (পরিপাকতন্ত্রের), যা পরে বহিঃপ্রক্রিয়ায় পরিণত হয়েছে। এই পরিশ্রমের ফলে মানবজাতি বহুভাবে উপকৃত হয়েছে।

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ মানব অভিযোজনের ইতিহাসে প্রাচীনকাল থেকেই বিদ্যমান 

মানুষের বহু খাদ্যই প্রক্রিয়াকরণ ছাড়া খাওয়া যায় না। অনেক সময়ই বিষাক্ত থাকে। দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, ক্যারিবীয় অঞ্চল ও আফ্রিকার প্রধান খাদ্য ক্যাসাভা (যা ম্যানিওক বা ইউকা নামেও পরিচিত) কাঁচা অবস্থায় খেলে সায়ানাইডজাত বিষাক্ত উপাদান শরীরে প্রবেশ করে। অন্য সাধারণ সবজি (বেগুন, আলু), শিমজাতীয় খাদ্য (রাজমা, রেড়ি, লিমা, কাকাও), বাদাম (তিক্ত কাঠবাদাম, তাল বাদাম) ও বীজ (সাইক্যাড বীজ, ধান) কাঁচা অবস্থায় বিষাক্ত বা তিক্ত স্বাদের হয়। কিন্তু একবার পেটানো, ভেজানো, গুঁড়ো করা, ধোয়া, গাঁজন করা বা রান্না করার পর এগুলো সুস্বাদু ও খাওয়ার উপযোগী হয়। গম, যব, ওটস ও ভুট্টা সাধারণত প্রাক্‌পরিপাক প্রক্রিয়া ছাড়া খাওয়া হয় না।

প্রক্রিয়াকরণ খাদ্যের স্থায়িত্বও বাড়ায়। ফসল না জন্মানোর মৌসুমে শিকারি-সংগ্রাহক ও কৃষিনির্ভর উভয় সমাজই সংরক্ষিত খাদ্যের ওপর নির্ভর করে। যদি মানুষ সংরক্ষণের পদ্ধতি আয়ত্ত না করতো, তাহলে পৃথিবীর অনেক অঞ্চল আজও বসবাসের অযোগ্য থেকে যেত। যারা উচ্চ অক্ষাংশ বা সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে অনেক উপরে বসবাস করে, অথবা যাদের কাছে শীতলীকরণের ব্যবস্থা আছে, তারা কিছু সময়ের জন্য খাদ্য ঠান্ডা রেখে সংরক্ষণ করতে পারে। অন্যথায় খাদ্য শুকিয়ে, লবণ দিয়ে বা ধোঁয়ায় সংরক্ষণ করতে হয় এবং তা নিরাপদ স্থানে রাখতে হয় যাতে ইঁদুর-ছুঁচো বা অন্য প্রাণী আগে না খেয়ে ফেলে।

খাদ্য নরম করা ও ভেঙে খাওয়ার এই বিবর্তনীয় উত্তরাধিকার মানব শরীরে স্পষ্ট চিহ্ন রেখে গেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে প্রাচীন হোমো পূর্বপুরুষদের পুরু, ভারী দাঁতের জায়গায় এসেছে ছোট, সূক্ষ্ম, পাতলা এনামেলযুক্ত দাঁত। শক্তপোক্ত করোটি ও চোয়ালের হাড় (যা একসময় চিবানোর পেশি ধরে রাখত) ধীরে ধীরে সূক্ষ্ম মুখমণ্ডল ও হালকা চোয়ালে পরিণত হয়েছে। আমাদের মাথা চিবানোর জন্য কম ব্যবহৃত হওয়ায় মস্তিষ্ক বৃদ্ধির জন্য জায়গা তৈরি করতে পেরেছে। আংশিক প্রাক্‌পরিপাক খাদ্য খাওয়ার ফলে বৃহৎ ও বিপুল শক্তিক্ষয়ী অন্ত্রের প্রয়োজনও কমে গেছে, যার প্রমাণ আমাদের তুলনামূলকভাবে ছোট পরিপাকতন্ত্র।

আংশিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য খাওয়া চিবানোর সময়ও কমিয়েছে। শিম্পাঞ্জিরা দিনের প্রায় অর্ধেক সময় তন্তুযুক্ত ফল চিবিয়ে খায়, যা তাদের খাদ্যের বড় একটি উপাদান। কিন্তু আধুনিক মানুষ দিনে মোট সময়ের মাত্র প্রায় ৫ শতাংশ, গড়ে ৩৫ মিনিট, চিবাতে ব্যয় করে। শিল্পোৎপাদিত ও অতিশোধিত, আঁশহীন খাদ্যের কারণে মানুষ আরো কম সময়ে খাদ্য চিবোতে পারছে।

মানুষ তাদের অস্তিত্বের বেশিরভাগ সময় শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে বাস করেছে। আজ পৃথিবীতে অল্প কয়েকটি সমাজই এখনো সম্পূর্ণভাবে আহরণ-নির্ভর জীবনযাপন করে। তবে এসব সমাজ কীভাবে বিভিন্ন পরিবেশে খাপ খাইয়ে টিকে থাকে, তা অধ্যয়ন করা বিবর্তনমূলক নৃবিজ্ঞানীদের আমাদের প্রজাতির এত বিস্তৃত ও সফল হওয়ার কারণ বুঝতে সাহায্য করে।

নারীদের সমবায়মূলক কাজ

যখন শিকারিরা মাংস নিয়ে পুমে শিবিরে ফিরে আসে, তখন উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে গোটা দলে। বিষুবরেখার কাছাকাছি বসবাসকারী বহু আহরণনির্ভর সমাজের মতোই পুমে জনগোষ্ঠীও প্রায় ৭০ জনের ছোট দলে বসবাস করে। ঋতুর পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা তাদের শিবির স্থানান্তর করে এবং নতুন করে আশ্রয়গৃহ তৈরি করে। শুষ্ক মৌসুমে যখন খাদ্য প্রচুর পরিমাণে পাওয়া যায়, তখন জীবন অনেক সহজ হয়। কিন্তু বর্ষা আসার সঙ্গে সঙ্গেই জীবনযাত্রা আমূল বদলে যায়।

প্রায় সপ্তাহে একবার শিকারিরা একটি কাইম্যান (জলচর প্রাণী), পিপীলিকাভোজী, হরিণ বা বড় পাখি নিয়ে শিবিরে ফিরে আসে। মাংস প্রোটিন ও চর্বির জন্য মূল্যবান হলেও বর্ষাকালে পুমে সমাজ মূলত উদ্ভিদের ওপর নির্ভর করে টিকে থাকে। বছরের এই অভাবের সময়ে নারী ও শিশুরাই প্রায় সম্পূর্ণরূপে মূল ও কন্দ সংগ্রহ করে, যা মোট ক্যালরির প্রায় ৮৫ শতাংশ জোগান দেয়। এ ধরনের উষ্ণ ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে টিকে থাকার প্রধান উপাদান হলো মূল, কন্দ, বীজ, শিম, বাদাম, ফল ও বেরি। পুমে নারীরা ও শিশুরা এই মৌলিক খাদ্য সরবরাহ করে এবং সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করে খাওয়ার উপযোগী করে তোলে।

সরলভাবে বললে, কোনো একক ব্যক্তির পক্ষে দিনে এত কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব নয়। উদ্ভিদ ও প্রাণী সংগ্রহ, সেগুলো প্রক্রিয়াজাত করা, পানি আনা, জ্বালানি কাঠ কাটা, কাঁচামাল জোগাড় করা, খাদ্য সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণের সরঞ্জাম তৈরি করা, পোশাক ও আশ্রয় নির্মাণ করা এবং একই সঙ্গে সন্তানদের যত্ন নেওয়া। এসব মৌলিক প্রয়োজন মেটাতে সহযোগিতা অপরিহার্য। মানুষ বয়স, দক্ষতা ও লিঙ্গ অনুযায়ী কাজ ভাগ করে নিয়ে এবং শ্রমের ফল ভাগাভাগি করে টিকে থাকতে সবচেয়ে ভালোভাবে সক্ষম হয়েছে।

এই দিক থেকে পুমে জনগোষ্ঠী অনন্য নয়। শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ একটি বহুস্তরবিশিষ্ট ক্রিয়া, যা নারী ও শিশুরা দৈনন্দিন একসঙ্গে করে থাকে। অনেক সময় শিকারি-সংগ্রাহক শিশুরা তাদের মায়েদের খাদ্য সংগ্রহ অভিযানে সঙ্গী না হয়ে শিবিরেই থেকে যায়, কিন্তু তারা নিষ্ক্রিয় নয়। ছোটবেলা থেকেই তারা একসঙ্গে বসে বাদাম ভাঙে, কন্দ ভাজে, রান্না করে, পানি বহন করে, জ্বালানি কাঠ জোগাড় করে এবং নিজেদের সরল সরঞ্জাম তৈরি করে।

সংস্কৃতি ভেদে পার্থক্য থাকলেও, আধুনিক শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে নারীরা সাধারণত দিনের প্রায় ২০ শতাংশ সময়, অর্থাৎ প্রায় তিন ঘণ্টা, খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে ব্যয় করে। অধিকাংশ সমাজেই নারী ও শিশুরাই খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের অপরিহার্য উপাদান, যেমনঃ পানি ও জ্বালানি কাঠ, সংগ্রহের দায়িত্বে থাকে। নারীরাই প্রায়শই তাদের কাজের জন্য প্রয়োজনীয় বহু সরঞ্জাম তৈরি ও মেরামত করে। উদাহরণস্বরূপ, পুমে নারীরা প্রতিদিন প্রায় দুই ঘণ্টা সময় ব্যয় করে তালপাতার তন্তু ছাড়াতে, ভারবহনের জন্য ব্যবহৃত ঝুড়ি ও বসার চাটাই বুনতে, খননকাঠ ধারালো করতে এবং লাউয়ের খোল ফাঁপা করে তৈরি করতে। কালাহারি মরুভূমির কুং নারীরাও প্রতিদিন প্রায় এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করে নিজেদের সরঞ্জাম তৈরি ও মেরামতে।


খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের বিপ্লব

খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ অতি প্রাচীন কাল থেকেই মানব অভিযোজনের  একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। প্রায় ৩.৩ মিলিয়ন বছর পূর্বের আমাদের হোমিনিন বংশধারার সবচেয়ে প্রাচীন ও পরিচিত যন্ত্রগুলোর পাশাপাশি, আরও কিছু প্রযুক্তিগত নিদর্শন স্পষ্টভাবে ইঙ্গিত করে যে, নারী ও শিশুর ভূমিকাই ছিল এই প্রক্রিয়ার কেন্দ্রে।

সর্বপ্রথম সনাক্তযোগ্য চুল্লিগুলোর (hearth) বয়স আনুমানিক ৩ থেকে ৪ লক্ষ বছর। এসব চুল্লির সঙ্গে পাওয়া পাথরের সরঞ্জাম ও ধ্বংসাবশেষ সাধারণত পুরুষদের কাজ বলে ধরে নেওয়া হয়। কিন্তু সমসাময়িক শিকারি-সংগ্রাহক সমাজে নৃবিজ্ঞানীদের পর্যবেক্ষণভিত্তিক গবেষণা ভিন্ন চিত্র তুলে ধরে: নারীরাই চুল্লির পাশে পুরুষদের তুলনায় অনেক বেশি সময় ব্যয় করে এবন্ং খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ, রান্না ও এই কাজের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম তৈরিতে তাদের ভূমিকাই বেশী। উদাহরণ স্বরূপ, পুমে সমাজে চুল্লির চারপাশে সংঘটিত কার্যক্রমের প্রায় ৮৪ শতাংশই নারীদের খাদ্য প্রক্রিয়াকরণের সঙ্গে সম্পর্কিত।

এতে প্রশ্ন জাগে, চুল্লির পাশে পাওয়া প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনগুলোর অনেকটাই কি নারীদের কাজের উপজাত নয়? দীর্ঘদিন ধরে শিকারকে কেন্দ্র করে শিকারি-সংগ্রাহক সমাজের বিবরণ দেওয়া হয়েছে, কিন্তু বাস্তবে খাদ্য প্রক্রিয়াকরণে নারীর ভূমিকাই ছিল মুখ্য। উদাহরণস্বরূপ, উত্তর আমেরিকার গ্রেট প্লেইনস অঞ্চলে হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে বসবাসকারী শিকারি-সংগ্রাহক গোষ্ঠীগুলোর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে। গ্রীষ্মের শেষের দিকে তারা বাইসন শিকারের প্রস্তুতি নিতে একত্রিত হতো। কিন্তু প্রাথমিক নৃবৈজ্ঞানিক বিবরণ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, এই শিবিরগুলোর সময়সূচি আসলে নির্ধারিত হতো বেরি সংগ্রহ ও নারীদের সমবায়মূলক কাজের প্রয়োজন অনুযায়ী।

পেমিকান, এক ধরনের উচ্চক্যালরিযুক্ত, অত্যন্ত প্রক্রিয়াজাত খাদ্যবার, যা প্রস্তুত করা হতো গলানো চর্বি, কুচি করা মাংস ও শুকনো বেরি মিশিয়ে, তৈরির মূল উপাদান ছিল বেরি। এই পেমিকান ছিল গ্রেট প্লেইনস অঞ্চলে শীতের মাসগুলোতে টিকে থাকার অপরিহার্য উপাদান। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই নিরীহ বেরিগুলোই প্রাকৃতিক সংরক্ষণ উপাদান হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। বেরি সংগ্রহে দরকার হতো বিপুল সংখ্যক নারী শ্রমিক, যারা দ্রুত ফল সংগ্রহ ও প্রক্রিয়াকরণ করতো, যাতে পাখি বা অন্য প্রাণীরা তা আগে খেয়ে না ফেলে। আজও পেমিকান অনেক স্থানে গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন খাদ্য, যদিও এখন বাজারে বিকল্প উপায়ে বেরি তৈরীর উপাদান পাওয়া যায়।

শিকারকে সাধারণত খাদ্য ভাগাভাগি, শ্রমবিভাগ, যুগল সম্পর্ক ও যৌথ সন্তান লালনের মতো সহযোগিতামূলক আচরণের মূল অনুঘটক হিসেবে দেখা হয়৷ ধারণা করা হয়, শিকার থেকে সৃষ্ট এই বৈশিষ্ট্যগুলো মানবজাতিকে অমানব প্রাইমেটদের তুলনায় এক ভিন্ন বিবর্তনীয় পথে পরিচালিত করেছে। কিন্তু শিকারের এই অগ্রাধিকার ভুলভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। আসলে, মাংসও (যদি তা পেটানো, রান্না বা কোনোভাবে নরম না করা হয়ল হাড় থেকে আলাদা করা, চিবানো ও হজম করা অত্যন্ত কঠিন।

তাই, পরেরবার যখন আপনি খাবার খেতে বসবেন, এক মুহূর্তের জন্য ভেবে দেখুন সেই খাদ্য প্রক্রিয়াকরণ বিপ্লবের কথা (নারীদের শুরু করা সেই কর্মযজ্ঞ) যা মানবজাতিকে নানা রকম খাদ্যের জগতে প্রবেশের সুযোগ দিয়েছে এবং আমাদেরকে পৃথিবীর প্রতিটি পরিবেশে টিকে থাকতে সক্ষম করেছে। 

লেখক সম্পর্কে তথ্যঃ

ক্যারেন এল. ক্রেমার একজন নৃবিজ্ঞানী, যিনি সহযোগিতা, মানব সামাজিকতা, জীবনচক্র এবং শৈশবের বিবর্তন নিয়ে গবেষণা করেন। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নিউ মেক্সিকো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পিএইচ.ডি. ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং বর্তমানে উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক হিসেবে কর্মরত। গত ৩০ বছর ধরে তিনি দক্ষিণ আমেরিকার শিকারি-সংগ্রাহক জনগোষ্ঠী সাভান্না পুমে এবং অ-বাজারি কৃষি নির্ভর জনগোষ্ঠী ইউকাতেক মায়ার সঙ্গে কাজ করে আসছেন। তাঁর গবেষণা অর্থায়ন করেছে ন্যাশনাল ইনস্টিটিউটস অব হেলথ, ন্যাশনাল সায়েন্স ফাউন্ডেশন, প্যাকার্ড ফাউন্ডেশন, মেলন ফাউন্ডেশন, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় এবং উটাহ বিশ্ববিদ্যালয়।