ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান কী?
[Sapiens -এ প্রকাশিত লেখাটি অনুবাদ করেছেন সাকিফ বায়েজিদ আহসান]
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা ভাষাকে এমনভাবে অধ্যয়ন করেন, যার মাধ্যমে প্রকাশ পায় মানুষ কীভাবে নিজেদের যোগাযোগের ধরন ও আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে মানব সংস্কৃতি, ইতিহাস, রাজনীতি, পরিচয় এবং অন্যান্য বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান ভাষা, সংস্কৃতি এবং সমাজের মধ্যে বিদ্যমান সম্পর্ককে বিশ্লেষণ করে।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা ভাষাকে একটি সামাজিক কর্মকাণ্ডের রূপ হিসেবে বিবেচনা করেন। অন্যভাবে বললে, আমরা অনুসন্ধান করি কীভাবে ভাষা মানুষের সাংস্কৃতিক বিশ্বাস, সম্পর্ক এবং পরিচয় গঠন ও টিকিয়ে রাখার অন্যতম উপায় হিসেবে কাজ করে। প্রকাশের মাধ্যম এবং প্রকাশভঙ্গিমা হিসেবে ভাষা মানব অভিজ্ঞতার অধিকাংশ দিকের গাঠনিক উপাদান হিসেবে কাজ করে। আমরা যে সর্বনাম ব্যবহার করি তা থেকে শুরু করে আমরা যে রাজনৈতিক বক্তব্য শুনি, সব জুড়েই আছে ভাষা।
যেহেতু ভাষা ও সংস্কৃতি পরস্পরকে প্রভাবিত করে, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা ব্যাকরণিক গঠন ও যোগাযোগের প্রক্রিয়াগুলো বিশ্লেষণ করার মাধ্যমে বোঝার চেষ্টা করেন ভাষা কীভাবে চিন্তাকে গঠন করে। এমনকি সূক্ষ্ম ভাষাগত সিদ্ধান্ত, যেমন : একটি শব্দের আগে “the” ব্যবহার করা বা না করাও মানুষের ধারণা, স্মৃতি ও বিবেচনাবোধকে প্রভাবিত করতে পারে। মানুষ দৈনন্দিন জীবনে যেভাবে ভাষা ব্যবহার করে ও শেখে, তা সৃজনশীলতা, উপলব্ধি এবং শিখন প্রক্রিয়ার উপরেও উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলে।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান আরও অনুসন্ধান করে কীভাবে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ভাষার ব্যবহার তার সামাজিক জীবনের প্রতিফলন ঘটায়, তা সৃষ্টি করে এবং তার রূপান্তর ঘটায়। মানুষ ভাষা সম্পর্কে যেসব বিশ্বাস, ধারণা বা বক্তব্য প্রকাশ করে, তা তাদের মূল্যবোধ, সামাজিক নিয়ম এবং রাজনৈতিক অবস্থানেরই প্রতিফলন। সুতরাং, ভাষা একটি প্রতিফলনের মাধ্যম, যা ব্যবহার করে মানুষ সামাজিক ও রাজনৈতিক মতাদর্শ নিয়ে মন্তব্য করে এবং সেগুলোকে পরিচালিত করে। ভাষার যোগাযোগের ধরন ও ভাষা সম্পর্কিত বিশ্বাসকে অধ্যয়ন করলে তা সমাজে বিদ্যমান ক্ষমতার কাঠামো ও বৈষম্যগুলো চিহ্নিত করতে সাহায্য করে।
পরিশেষে, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান অনুসন্ধান করে কীভাবে ভাষা এবং অন্যান্য চিহ্নসমূহ, যেমন : পোশাক ও প্রসাধন – আমাদের বিশ্বাস, যোগাযোগের ধরন ও শ্রেণিবিন্যাসমূলক ধারণা সম্পর্কে জানান দেয়। এই শাখাটিকে সেমিওটিকস (semiotics) বলা হয়, যা ভাষাকে অন্যান্য সাংস্কৃতিক উপাদান থেকে আলাদা কিছু হিসেবে না দেখে, বরং অর্থ সৃষ্টি ও পার্থক্য বোঝার প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে বিবেচনা করে।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান হলো নৃবিজ্ঞানের চারটি প্রধান শাখার একটি। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানেও প্রশিক্ষিত হতে পারেন এবং নানা বিষয় নিয়ে কাজ করেন, এর মধ্যে আছে বর্ণ, লিঙ্গ, রাজনীতি, অর্থনীতি, জলবায়ু ও পরিবেশ, গণমাধ্যম, স্বাস্থ্য, আইন এবং সংঘাত। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান ক্ষেত্রটি ভাষাতত্ত্বের (linguistics) কিছু নির্দিষ্ট শাখার সঙ্গে তত্ত্ব, পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুর মিল রাখে (ভাষাতত্ত্ব হলো একটি বৃহত্তর শাস্ত্র, যা ভাষার সব দিক নিয়ে কাজ করে)। একইভাবে, কিছু ভাষাবিজ্ঞানীও ভাষার ব্যবহারকে প্রেক্ষাপটভিত্তিক অনুসন্ধান করেন, যেমন : কীভাবে কোনো সমাজে ভাষার ব্যবহার ভিন্ন হয় বা তুলনামূলকভাবে স্বল্প সময়ের মধ্যে পরিবর্তিত হয়।
তবুও ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান একটি স্বতন্ত্র শাখা। এর অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা এথনোগ্রাফিক (ethnographic) পদ্ধতি ব্যবহার করে মানুষ কীভাবে দৈনন্দিন জীবনে ভাষা ব্যবহার করে তা অধ্যয়ন করেন। এছাড়াও, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা ভাষাকে একটি সামগ্রিক (holistic) দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেন। তারা মনে করেন ভাষা সমাজের প্রতিষ্ঠান, নেটওয়ার্ক ও সামাজিক সম্পর্ক দ্বারা গঠিত হয় এবং এগুলোকেও ভাষাকে প্রভাবিত করে। অর্থাৎ তারা ভাষাকে তার চারপাশের বৃহত্তর সামাজিক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেন।
ভাষাগত নৃবিজ্ঞানীরা ভাষাকে কীভাবে অধ্যয়ন করেন?
ভাষা প্রায়ই অবচেতনভাবে কাজ করে আমাদের চিন্তা, বিশ্বাস ও আচরণকে অবচেতনভাবে প্রভাবিত করে। সমাজে সক্ষমভাবে অংশ নিতে হলে মানুষ দৈনন্দিন জীবনে তার ভাষার ব্যবহার নিয়ে অতিরিক্ত সচেতন হয়ে থাকতে পারে না। কিন্তু ভাষার যেসব দিক সম্পর্কে মানুষ সবচেয়ে কম সচেতন, সেগুলোই মানুষের দৃষ্টিভঙ্গিকে সবচেয়ে বেশি প্রভাবিত করে। এজন্যই ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন পদ্ধতিগত কৌশল ব্যবহার করে বক্তব্য, লেখা, সাংকেতিক ভাষা, অঙ্গভঙ্গি ও দেহের গতিবিধিতে নিহিত নিয়ম ও ধরন বিশ্লেষণ করেন। তারা পর্যবেক্ষণ করেন কীভাবে ব্যাকরণ, ভাষার ব্যবহার এবং ভাষা সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস ও ধারণা পরস্পরের সঙ্গে আন্তঃক্রিয়া করে।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত এথনোগ্রাফিক পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যার মাধ্যমে তারা অংশগ্রহণ ও পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে যোগাযোগের ধরন এবং সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বিশ্লেষণ করেন। এই পদ্ধতিগুলো সাধারণত নথিবদ্ধকরণের উপর নির্ভর করে, যেমন মাঠকর্মের নোট (fieldnotes) লেখা, অথবা অডিও ও ভিডিওর মাধ্যমে ভাষা ব্যবহারের রেকর্ড রাখা।কিছু ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী মানুষের সাক্ষাৎকার নেন, যাতে বোঝা যায় ভাষা সম্পর্কিত তাদের চর্চা ও বিশ্বাস কীভাবে রাজনীতি ও সমাজকে প্রভাবিত করে। অন্যরা গবেষণা বা গণনাগত পদ্ধতি ব্যবহার করেন, যাতে দেখা যায় ব্যাকরণিক গঠন বা লিপি-ব্যবস্থা কীভাবে মানব চিন্তা ও জ্ঞানকে প্রতিফলিত ও প্রভাবিত করে।
সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের মতো ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানও মূলত সমসাময়িক ঘটনাগুলো নিয়ে কাজ করে। তবে কিছু ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী আর্কাইভাল (archival) পদ্ধতিও ব্যবহার করেন, যাতে বোঝা যায় বর্তমান সমাজভাষাগত (Sociolinguistic) রূপগুলো কীভাবে ঐতিহাসিকভাবে পরিবর্তিত হয়েছে বা হতে পারতো। কিছু গবেষক দীর্ঘমেয়াদি গবেষণাও পরিচালনা করেন যাতে সময়ের সঙ্গে ভাষার সামাজিকীকরণ (socialization) কীভাবে ঘটেছে, তা বোঝা যায়। সামাজিকীকরণ বলতে বোঝায় নবিশরা কীভাবে কথ্য ভাষা, সাংকেতিক ভাষা, বা ইঙ্গিতভিত্তিক যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক ও যোগাযোগমূলক দক্ষতা অর্জন করে। এই গবেষণাগুলো অনুসন্ধান করে কীভাবে মানুষের জীবনকালে পরিচয় ও ভাষা পুনরুৎপাদিত ও বিকশিত হয়।
কিছু ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী ভার্চুয়াল জগৎ এবং ডিজিটাল পরিসরও অধ্যয়ন করেন, যাতে বোঝা যায় নতুন মাধ্যম, তথ্যপ্রযুক্তি এবং যোগাযোগ প্রযুক্তি কীভাবে মানুষের যোগাযোগের ধরন ও ভাষা ব্যবহারে প্রভাব ফেলে। এর উদাহরণ হতে পারে মানুষ কীভাবে সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্ম, স্মার্টফোন, বা ভার্চুয়াল মিটিং প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে ভাষার মাধ্যমে যোগাযোগ করে এবং অর্থ তৈরি করে, তার বিশ্লেষণ করা ।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা কোন বিষয়গুলো অধ্যয়ন করেন?
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কাজ করেন, তবে যে সাধারণ দিকটি লক্ষ্য করা যায় সেটা হলো : যোগাযোগের বহু কার্য ও দিক রয়েছে। কথ্য, লিখিত এবং সাংকেতিক ভাষা কেবল বস্তু, ক্রিয়া বা ধারণা চিহ্নিত ও বর্ণনা করার জন্য নয়। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহ থাকে অনুলেক্ষিত (non-referential) কাজ বা এমন কাজগুলোতে, যা দেখায় ভাষা শুধুমাত্র তথ্য আদান-প্রদান ছাড়াও, কীভাবে প্রেক্ষাপট বা পরিস্থিতি অনুযায়ী অর্থ তৈরি করে।
উদাহরণস্বরূপ, তারা ভাষা কীভাবে সাংস্কৃতিকভাবে বিভিন্ন ধরনের হয় তা বিশ্লেষণ করতে পারেন। যেমন লোককাহিনী (folklore), পৌরাণিক কাহিনী (myth), হাস্যরস (humor), পরচর্চা (gossip), বক্তৃতা (oratory), গল্পকথা (narrative) ইত্যাদি। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা কথ্য শিল্পকর্ম, যেমন : কবিতা কীভাবে তৈরি হয় তাও অধ্যয়ন করেন। গল্প বলার ধরন এবং আচার অনুষ্ঠানকে (ক্ষেত্রবিশেষে সঙ্গীতও যোগ হয়) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ভাষা যেমন নিয়মভিত্তিক, তেমনি সৃজনশীলও।
অনেক ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীর প্রধান আগ্রহের জায়গা ভাষা ও পরিচয়ের মধ্যকার সম্পর্ক। ভাষার রূপ এবং ব্যবহার লিঙ্গ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ, সামাজিক শ্রেণি, বয়স এবং যৌন অভিমুখের সূচক নির্দেশক হিসেবে কাজ করে। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা বিশ্লেষণ করেন কীভাবে ভাষার মাধ্যমে পরিচয় প্রকাশ পায় এবং বিপরীতভাবে ভাষা কীভাবে প্রতিষ্ঠিত পরিচয়ের শর্ত, যেমন পুরুষ ও নারীকে চ্যালেঞ্জ করতে পারে। এই গবেষণা পরিচয়কে সৃজনশীল নির্মাণ (creative construction) এবং বিবদমান ক্ষেত্রে (site of contestation) হিসেবে দেখায়, এটি স্থির ও অপরিবর্তনীয় বলে ধরে নেওয়া হয় না।
অন্যান্য গবেষণা বহুভাষিক (multilingual) প্রেক্ষাপটে হয়ে থাকে, যাতে বোঝা যায় কীভাবে একটি ভাষা এবং তার ব্যবহারকারীরা অন্যান্য ভাষার সংস্পর্শে আসার সঙ্গে সঙ্গে পরিবর্তিত হয়, হোক তা ঔপনিবেশিকতা, অভিবাসন, বা অন্যান্য ধরনের বৈশ্বিক বিনিময়। প্রায়শই, মানুষ কীভাবে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় স্থানান্তরিত হয়- এর পিছনে তার মনোভাব ও পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।”কোড-সুইচিং” (code-switching) এবং “ট্রান্সল্যাঙ্গুয়েজিং” (translanguaging) এর উদাহরণ, এবং বিশ্বের বিভিন্ন স্থানে বিভিন্ন ক্রিয়োল (creole) ও পিজিন (pidgin) ভাষার উদ্ভবের ঘটনাগুলো দেখায় মানুষ কীভাবে জটিলভাবে একাধিক ভাষা সিস্টেম একত্রিত করে ব্যবহার করে এবং বিভিন্ন ভাষিক ব্যবস্থার মধ্যে অবস্থান করে। বহুভাষিকতার উপর গবেষণা অনুযায়ী, অধিকাংশ মানব সম্প্রদায়ই সর্বদা ভাষাগতভাবে বৈচিত্র্যময়।
কিছু ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী অনুসন্ধান করেন কীভাবে জাতিরাষ্ট্রের মতো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান ভাষার সাথে জাতীয়তাবাদকে জুড়ে দেয়। কিছু জাতি-রাষ্ট্র এই বিশ্বাসকে সমর্থন করে যে, জাতীয় ঐক্য একটি নির্দিষ্ট ভাষা ব্যবহারের উপর নির্ভরশীল, আবার অনেক রাষ্ট্র বহুভাষিক নীতি গ্রহণ করে। এই গবেষণাগুলো প্রায়ই দেখায় কীভাবে শিক্ষা, আইন ও স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানগুলো নীতি প্রণয়ন এবং ভাষার “সঠিক” মানদণ্ড তৈরি করে বৈষম্যকে উসকে দেয়। আবার কিছু গবেষণা দেখায় মানুষের সক্রিয় ভূমিকা কীভাবে ভাষার ব্যবহার করে এই বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করে।
অনেক ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী সংখ্যালঘু ভাষিক গোষ্ঠীর সদস্যদের সঙ্গে কাজ করেন, যাতে তাদের সংযুক্ততা এবং পরিচয়ের অভিজ্ঞতা বর্ণনা ও বিশ্লেষণ করা যায়। কেউ কেউ তুলনা করেন কীভাবে শিশুরা
স্কুলে, বাড়িতে বা অন্যান্য পরিবেশে পূর্বপুরুষদের ভাষা (heritage languages) এবং কর্তৃত্বশালী ভাষা শেখে ও ব্যবহার করে। কেউ কেউ নথিবদ্ধ করেন কীভাবে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শেখা ও ব্যবহারের মধ্যে পরিবর্তন আসার কারণে ভাষার পরিবর্তন হয়।
কিছু ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী সম্প্রদায়ের নেতাদের সঙ্গে কাজ করেন অথবা সরকারি কর্মকর্তা ও অন্যান্য গবেষকদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন বিপন্ন ভাষা পুনরুদ্ধারের জন্য। ভাষা ডকুমেন্টেশনের কাজে সহায়তা করতে ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা প্রায়ই স্থানীয় বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে কাজ করেন, যাতে নির্দিষ্ট ভাষাভাষী সম্প্রদায়ের জন্য গুরুত্বপূর্ণ গল্প এবং কথ্য ঐতিহ্য (Oral Traditions) রেকর্ড করা যায়।
ভাষাতত্ত্ব (Linguistics) ও ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান (Linguistic Anthropology)-এর মধ্যে পার্থক্য কী?
ভাষাতত্ত্ববিদরা সাধারণত ভাষাকে একটি নিয়মবদ্ধ ও স্থির কাঠামোগত ব্যবস্থা হিসেবে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা ভাষাকে সামাজিক জীবনের অংশ হিসেবে বিশ্লেষণ করেন। বাস্তবে এর অর্থ কী? যেখানে ভাষাতত্ত্ববিদরা প্রায়ই উপাত্তের জন্য বক্তাদের কাছ থেকে নির্দিষ্ট শব্দ, বাক্যাংশ বা ভাষাগত উদাহরণ সংগ্রহ করেন, সেখানে ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা ভিন্ন পন্থা অবলম্বন করেন। তারা দৈনন্দিন প্রেক্ষাপট বা স্বাভাবিক পরিবেশে বক্তৃতা, লেখা, অঙ্গভঙ্গি ও সাংকেতিক ভাষা রেকর্ড করেন। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান দুটি ভাষাতাত্ত্বিক উপশাখার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত- প্রয়োগমূলক ভাষাতত্ত্ব এবং গুণগত (বা আন্তঃক্রিয়ামূলক) সমাজভাষাতত্ত্ব। এই উপশাখাগুলো সমাজে ভাষা ব্যবহারের সামাজিক অর্থ বিশ্লেষণ করে এবং সামাজিক বৈষম্য ও প্রাতিষ্ঠানিক চর্চা নিয়ে আগ্রহ দেখায়। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীদের মতোই, প্রয়োগমূলক ও গুণগত ভাষাতত্ত্ববিদরাও মানুষের পরিচয়কে স্থির বা অপরিবর্তনীয় নয়, বরং অভিনীত (performed) বা ভাষাতাত্ত্বিক অনুশীলনের মাধ্যমে গঠিত ও পরিবর্তনশীল বলে মনে করেন। এই দৃষ্টিভঙ্গি পরিমাণগত সমাজভাষাতত্ত্বের থেকে আলাদা, কারণ সেখানে মূলত বিশ্লেষণ করা হয় কীভাবে ভাষাগত গঠনগুলো স্থির চলক, যেমন : বর্ণ, লিঙ্গ, বা শ্রেণির সঙ্গে সম্পর্কিত। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান আর্কিওলিঙ্গুইস্টিকস (archaeolinguistics) এবং ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব (historical linguistics) উপশাখাগুলোর সঙ্গেও ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত, যেগুলো সময়ের সঙ্গে ভাষার পরিবর্তন নিয়ে গবেষণা করে। তবে এই দুটি শাখা মূলত ভাষা পরিবার পুনর্গঠন নিয়ে আগ্রহী। অপরদিকে ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান অধিক মনোযোগী ভাষা সম্পর্কে মানুষের বিশ্বাস কীভাবে ভাষার গঠন ও ব্যবহারের ধরন পরিবর্তন করে, তা বিশ্লেষণে। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত বর্তমান বা সাম্প্রতিক অতীতের তথ্য নিয়ে কাজ করেন, কারণ তথ্য সংগ্রহের ক্ষেত্রে সাধারণত সময়ের সীমাবদ্ধতা থাকে।তবে কিছু গবেষক আর্কাইভ ও সাহিত্যিক দলিল ব্যবহার করে অতীতের নির্দিষ্ট সময়কাল, যেমন : ঔপনিবেশিকতা বিস্তারের যুগে ভাষা সম্পর্কে বিদ্যমান বিশ্বাসের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বিশ্লেষণ করেন।
কীভাবে একজন ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী হওয়া যায়?
সাধারণত একজন পেশাদার ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানী হতে হলে নৃবিজ্ঞানে ডক্টরাল ডিগ্রি (Ph.D.) অর্জন করতে হয়। গড়ে একজন শিক্ষার্থীর ছয় থেকে আট বছর সময় লাগে একটি পিএইচডি প্রোগ্রাম সম্পন্ন করতে। প্রথম তিন থেকে চার বছর সাধারণত তত্ত্ব, গবেষণাপদ্ধতি এবং ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান ও সম্পর্কিত ক্ষেত্রের বিভিন্ন বিষয়ে কোর্স সম্পন্ন করতে হয়। এর মধ্যে থাকতে পারে — ধ্বনিবিজ্ঞান (phonology), ধ্বনিতত্ত্ব (phonetics), রূপতত্ত্ব (morphology), বাক্যতত্ত্ব (syntax), সমাজভাষাতত্ত্ব (sociolinguistics) এবং ঐতিহাসিক ভাষাতত্ত্ব (historical linguistics)। ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা সাধারণত যে অঞ্চলে নিবিড়ভাবে গবেষণা (in-depth research) করবেন, সেই নির্দিষ্ট ভৌগোলিক এলাকার ইতিহাস ও সমসাময়িক সমাজ সম্পর্কে বিশদ জ্ঞানার্জন করেন। তারা প্রায়ই সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের সংশ্লিষ্ট বিষয়, যেমন আইন, পরিবেশ অধ্যয়ন, ও চিকিৎসা নৃবিজ্ঞান সম্পর্কিত কোর্সও নেন। তাছাড়া, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা এক বা একাধিক ভাষা শেখেন, যা তারা ফিল্ডওয়ার্কে (field research) ব্যবহার করেন। কোনো কোনো ক্ষেত্রে, যদি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় ভাষার কোর্স না থাকে, তবে তারা ব্যক্তিগত শিক্ষকের সহায়তা নিয়ে সেই ভাষা শেখেন। কোর্সওয়ার্ক সম্পন্ন করার পর এবং প্রস্তুতি যাচাইয়ের জন্য একাধিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে, শিক্ষার্থীরা সাধারণত এক থেকে দুই বছর ফিল্ডে গবেষণা পরিচালনা করে। এরপর তারা সংগৃহীত যোগাযোগের রেকর্ড (interactions) লিখে নেন (transcribe), সংগৃহীত তথ্য কোডিং করেন এবং গবেষণার ফলাফল বিশ্লেষণ করে একটি বই-আকারের গবেষণাপত্র (dissertation) রচনা করেন। এই গবেষণাপত্র সফলভাবে উপস্থাপন (defend) করার পর শিক্ষার্থীরা নৃবিজ্ঞানে পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন এবং এরপর তারা শিক্ষাক্ষেত্র বা অন্যান্য ক্ষেত্রে বিভিন্ন চাকরির জন্য আবেদন করতে পারেন।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা কী ধরনের চাকরি করেন?
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা একাডেমিক ও নন-একাডেমিক- উভয় ক্ষেত্রেই কাজ করতে পারেন।
একাডেমিক চাকরি :
শিক্ষাক্ষেত্রে তারা সাধারণত কমিউনিটি কলেজ, লিবারেল আর্টস কলেজ, এবং গবেষণা বিশ্ববিদ্যালয়ে কাজ করেন। এই পদগুলো হতে পারে – টেনিউর-ট্র্যাক (tenure-track) : স্থায়ী চাকরির পথ সুগম করে।
নন-টেনিউর ট্র্যাক (non–tenure track) : চুক্তিভিত্তিক, তবে নবায়নের সুযোগ থাকতে পারে। প্রফেসররা সাধারণত ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান, সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞান, ও ভাষাতত্ত্ব বিষয়ের প্রাথমিক (introductory) এবং উচ্চতর কোর্সগুলো পড়ান। শিক্ষাদানের পাশাপাশি তারা তাদের একাডেমিক সম্প্রদায়ের সেবা প্রদান করেন এবং সক্রিয় গবেষণা কর্মসূচি (research agenda) বজায় রাখেন। তাদের পুরো কর্মজীবন জুড়ে তারা সাধারণত— প্রবন্ধ ও বই প্রকাশ,গবেষণা প্রকল্পের জন্য অনুদান (grant) লেখা,নতুন গবেষণা পরিচালনা, এবং সম্মেলনে (conference) উপস্থাপনাকরে থাকেন।
অন্যান্য ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা শিল্পক্ষেত্র বা সরকারি খাতে চাকরি করেন। তাদের সাধারণত নির্দিষ্ট অঞ্চলের ওপর গভীর জ্ঞান এবং ভাষাগত দক্ষতা থাকে, যা তাদের এসব ক্ষেত্রে আকর্ষণীয় প্রার্থী করে তোলে।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানীরা বিভিন্ন ধরনের কাজে যুক্ত থাকতে পারেন, যেমন—
সোশ্যাল মিডিয়া ও তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারের ধরন নিয়ে গবেষণা, দ্বিভাষিক শিক্ষা (bilingual education) সম্পর্কিত নীতিনির্ধারণে সহায়তা কিংবা সম্পূর্ণ নতুন ভাষা উদ্ভাবন, যেমন ‘স্টার ট্রেক’ এর বিখ্যাত ‘ক্লিংগন’ ভাষা তৈরি করা।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান কেন গুরুত্বপূর্ণ?
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান হলো একমাত্র একাডেমিক শাখা, যা ভাষাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অর্থবহ উপায়ে ব্যবহারের দিকটি বিশ্লেষণ করে। এটি লক্ষ্য করে কে, কখন, কোথায়, কীভাবে এবং কার সাথে যোগাযোগ করছে, যার মাধ্যমে মিথস্ক্রিয়ার একটি সামগ্রিক ও সূক্ষ্ম ধারণা পাওয়া যায়। নৃবিজ্ঞানের অন্যান্য শাখার মতোই ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞানও দেখায় মানুষ কীভাবে বিভিন্ন উপায়ে জীবিকা নির্বাহ করে, সংগ্রাম করে ও নিজেদেরকে প্রকাশ করে।
ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান ব্যাখ্যা করে কীভাবে বিভিন্ন বাচন বা লেখনভঙ্গি, অথবা সংকেত ব্যবহারের ধরন ব্যক্তিগত পরিচয় ও সম্প্রদায় গঠন করে এবং একইসঙ্গে রাজনীতি, অর্থনীতি, আইন ও সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে প্রভাবিত করে। ভাষার ব্যবহার প্রজন্মান্তরে পরিবর্তন আনতে পারে, আবার কখনো সংস্কৃতিকে স্থিতিশীল রাখতেও ভূমিকা রাখে। ভাষা সম্পর্কে প্রচলিত বিশ্বাস ও ক্ষমতার সম্পর্ক বিশ্লেষণের মাধ্যমে ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান বৈষম্যকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ দেয়।
আজকের দ্রুত পরিবর্তনশীল বিশ্ব, যেখানে সামাজিক আন্দোলন, অভিবাসন, নতুন প্রযুক্তি ও পরিবেশগত সংকট প্রতিনিয়ত মানবজীবনকে প্রভাবিত করছে, সেখানে ভাষার ভূমিকাও পরিবর্তিত হচ্ছে। এসব পরিবর্তন অনেক সময় যোগাযোগের প্রচলিত ধারণাকে নাড়া দেয় এবং নতুনভাবে কথা বলা, লেখা ও সংকেত ব্যবহারের ধারা তৈরি করে, যা কিছু মানুষকে বিচ্ছিন্ন করতে পারে বা নতুনভাবে অন্তর্ভুক্তও করতে পারে।
সুতরাং, ভাষাতাত্ত্বিক নৃবিজ্ঞান আমাদের শেখায় মানুষ কীভাবে ভাষার মাধ্যমে তাদের সামাজিক জগৎ তৈরি, রূপান্তর ও অর্থপূর্ণ করে তোলে।
