সহিংসতার একাল সেকাল

[লিখেছেন শেখ সাদিয়া আক্তার]

চব্বিশের জুলাই আন্দোলনে বাংলাদেশ ২.০ নিয়ে জেন-জি’র যে স্বপ্ন গড়ে উঠেছিল, পরবর্তীতে আইন-শৃঙ্খলা পরিস্থিতির অস্থিতিশীলতায় তাতে অস্বস্তি তৈরী হয়। ঘটনাটি সেসময়েরই – যখন বাংলাদেশ মবের মুল্লুক হয়ে উঠেছিল। লঞ্চ যাত্রায় দুই নারী প্রকাশ্যে মব আক্রমণের শিকার হয়। মবের দাবী, নারী দুজন লঞ্চের কেবিনে “অনৈতিক কার্যকলাপ” করছিল। যে যুবকের আহবানে সেদিন মব জেগে উঠেছিল, তিনি নিজেকে অভিযুক্ত নারীদের “ভাই” হিসেবে নৈতিক দায়িত্ব পালন করতেই নারীদের প্রহার করে “শাসন” করতে চিয়েছিলেন বলে জানান। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পরবর্তীতে ভিডিওটি ভাইরাল হলে নেটিজেনদের প্রতিক্রিয়াতে বৈচিত্র্য দেখা যায়। কেউ কেউ যুবকটিকে “নারী নিপীড়ক” হিসেবে চিহ্নিত করেন; অনেকে আবার এই মবকে “অবাধ্য” নারী নিয়ন্ত্রণের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা হিসেবেই দেখেন।

মব এক ধরনের সহিংসতা। মব ছাড়াও সমাজে নানা রকম সহিংসতা দেখা যায়। যেমন- মারামারি, খুন, নৈরাজ্য ইত্যাদি। ডেভিড রিচেস সহিংসতার সংজ্ঞা দিয়েছেন এভাবে – “এটি হলো এক ধরনের ক্ষমতা প্রদর্শন। সহিংসতাকারী ব্যক্তি অন্যের উপর শারীরিক আঘাত হানার কার্ক্রমকেম যুক্তিসম্মত বলে মনে করে” (Riches, 1986:8)।

ইনগো শ্রোডার এর মতে, সহিংসতা মানুষের কোন সহজাত প্রবৃত্তি নয়। এটি সাংস্কৃতিকভাবে প্রোথিত একটি বিষয় (Schröder, 2001:4)। অর্থাৎ, সংস্কৃতিভেদে মানুষের সহিংসতার কারণ ও ধরণ ভিন্ন ভিন্ন হবে। আবার ক্ষমতা সম্পর্কের সাথেও সহিংসতার সম্পর্ক রয়েছে। ক্ষমতাবানদের যুদ্ধ বাঁধানোর রাজনীতি নিয়ে ক্রোয়েশিয়ার বিখ্যাত ঔপন্যাসিক দুব্রাভকা উগ্রেসিক মন্তব্য করেছেন, “যুদ্ধ হলো এক টুকরো মজাদার কেক, যার ভাগ সবাই চায়।”

সহিংসতার বিবর্তন

যুদ্ধ-সহিংসতা নিয়ে নৃবিজ্ঞানীদের আগ্রহ বেশ পুরনো। অনেকের মতে, এটি মানুষ প্রজাতির প্রাকৃতিক নির্বাচনে টিকে থাকার কৌশল। আদিম কাল থেকেই মানুষে মানুষে সহিংসতার প্রমাণ মিলেছে। তবে এর কারণ নিয়ে রয়েছে নানা মুনীর নানা মত। কারো কারো মতে, মানুষ ক্ষমতা প্রদর্শনে সহিংস হয়ে উঠে। কেউ কেউ বলেন, সামাজিক বৈষম্য মানুষকে সহিংস করে তোলে।

প্রাচীন গ্রীসে সহিংসতা ছিল সর্বব্যাপী। এটি ছিল দৃশ্যমান, প্রদর্শনীয়, ও শারীরিক বলপ্রয়োগের বিষয়। সেকালে শাসকরা সাধারণত সহিংসতার মাধ্যমে তাদের ক্ষমতা প্রদর্শন করতো। ধরে নেয়া হতো, যে শাসক যতো নৃশংসতা প্রদর্শন করবে, সে ততো ক্ষমতাবান। যেমন- ট্রয় যুদ্ধে স্পার্টার রাজা ও একিলিসের নৃশংস হামলা ও সহিংসতার মাধ্যমে দুই রাজ্যের ক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়। এছাড়াও গিলোটিনে প্রকাশ্যে মৃত্যুদন্ড দেয়ার মাধ্যমে জনসাধারণের সামনে শাসকের ক্ষমতা প্রদর্শন করা হতো। একইভাবে, রোমান সাম্রাজ্যেও সহিংসতা ছিল প্রদর্শনীয় বিষয়। যেমন- গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধ। এর মাধ্যমে সমাজে শুধু শাসকের ক্ষমতা প্রদর্শনই হয় না; গ্ল্যাডিয়েটর যুদ্ধের ময়দান একইসাথে জনসমাগম ঘটায় যা সামাজিক যোগাযোগ ও শাসক-শাসিতের মিলনস্থল হিসেবে কাজ করে।

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সহিংসতা হয় অদৃশ্য। এখানে মৃত্যূদণ্ড আর প্রকাশ্যে কার্যকর করা হয় না। আধুনিক রাষ্ট্রে যে শাসকের সহিংসতা যতো অদৃশ্য হয়, সে শাসককে ততো কূটনৈতিক, যোগ্য, ও ক্ষমতাবান মনে করা হয়। যেমন- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র পরিচালিত গুয়াতানামো কারাগার। কিংবা, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে হাসিনা সরকার পরিচালিত ‘আয়নাঘর’। এসব গুপ্ত কারাগারে বন্দীদের উপর সহিংসতা চালানো হয় যা কখনো বাইরে প্রকাশিত হয় না। এমনকি বন্দীদের তথ্য বা কারাগারের অবস্থান সম্পর্কেও সাধারণ মানুষকে অবহিত করা হয় না। ফলে শাসকের সহিংসতা হয়ে উঠে অদৃশ্য – যা আধুনিক রাষ্ট্র-ব্যবস্থায় তার ক্ষমতা প্রয়োগকে নিশ্চিত করে।

অর্থাৎ, প্রাক-আধুনিক যুগ থেকে আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় সহিংসতার যে মৌলিক পরিবর্তন হয়েছে তা হলো দৃশ্যমান থেকে অদৃশ্যমান হয়ে উঠা। অদৃশ্য সহিংসতার মধ্যে আরো আছে – ডিজিটাল সহিংসতা, সাইবার-যুদ্ধ, কিংবা কাঠামোগত সহিংসতা। কাঠামোগত সহিংসতা পরিচালিত হয় রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, বা প্রাতিষ্ঠানিক অসমতা থেকে। কাঠামোগত সহিংসতার ফলে রাষ্ট্রের বা প্রতিষ্ঠানের সকল সদস্য এমন একটি কাঠামোতে আবদ্ধ হয়ে যায় যেখানে তারা সমান সুবিধা পাওয়া থেকে বঞ্চিত হয়।

মনোবিজ্ঞানী সিগমুন্ড ফ্রয়েডের মতে, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষ অভ্যন্তরীন মনোজাগতিক সহিংসতায় আক্রান্ত (psychological internalization of violence) (Han, 2018:7)। ডুর্খেইমের “আত্মহত্যা” তত্বের মতো ফ্রয়েড দাবী করেছেন, আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় মানুষের সহিংস মনোভাব প্রকাশ্যে দেখা যায় না। তবে তা নিজের মনস্তত্ত্বে প্রভাব ফেলে। যার ফলে সহিংসতার প্রবণতা ব্যক্তির নিজের দিকেই ধাবিত হয়। তিনি আরো বলেছেন, প্রতিযোগিতামূলক এই পুঁজিবাদী সমাজে, যেখানে সবাই অর্জন ও সফলতার পেছনে দৌড়ায়, সেখানে মানুষ বাইরের উপাদান শোষনের চেয়ে বরং নিজেকে শোষণ করাটা সহজ মনে করে। ঠিক যেমন পুঁজিবাদী ব্যবস্থায় উৎপাদন বাড়াতে শ্রমিকের শ্রমকে অধিক শোষণ করা হয়। একইভাবে পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে মানুষ সহিংসতা প্রকাশ করতে না পেরে তা নিজের মনস্তত্ত্বে প্রেরণ করে এবং নিজের সাথে সহিংস হয়ে উঠে।

সহিংসতার ধরন এভাবে কালভেদে, সমাজভেদে পালটেছে। বর্তমান সমাজে সহিংসতা কিভাবে ফাংশন করে তার একটা তাত্ত্বিক বিশ্লেষণ এবার করা যাক।

সমাজে সহিংসতার ক্রিয়াবাদী ব্যাখ্যা

প্রবন্ধটির শুরুতে উল্লেখিত লঞ্চে ঘটা নারীর উপর সহিংসতা পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার নিত্য-দিনের ঘটনা। সমাজতাত্ত্বিক জোহান গ্যালটাং-এর ত্রিমাত্রিক সহিংসতার তত্ত্ব দিয়ে ঘটনাটি একটু ব্যাখ্যা করা যাক।

জোহান গ্যালটাং (১৯৩০-২০২৪) একজন নরওয়েজিয়ান সমাজতাত্ত্বিক। তিনি শান্তি-প্রতিষ্ঠা নিয়ে অধ্যয়ন করেছেন এবং একইসাথে শান্তি-গবেষণা প্রতিষ্ঠান (Peace Research Institute) এর একজন অন্যতম পুরোধা। গ্যালটাং-এর “শান্তি” বিষয়ক আলোচনা মোটাদাগে যুদ্ধবিরতি কিংবা যুদ্ধবিহীন অবস্থাকে বোঝায়। আর যুদ্ধবিহীন অবস্থা নিয়ে আলাপ করতে গেলে দ্বন্দ্ব-যুদ্ধ-সহিংসতার প্রশ্ন চলে আসে প্রথমেই। নৃবিজ্ঞানী ক্লদ-লেভিস্ত্রসের বাইনারি অপোজিশন বা দ্বৈত-বিপরীতবাদের ধারণা দিয়ে যুদ্ধ বনাম শান্তির এই আলাপটিকে বোঝা যায়। সেই আলাপ পেয়ে যাবেন লেভিস্ত্রসের স্মরণে লেখা এই প্রবন্ধটিতে – লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন । ফিরে আসি গ্যালটাং এর আলোচনায়। সহিংসতার প্রশ্নে গ্যালটাং একটি ত্রিমাত্রিক তত্ত্ব হাজির করেছেন – যা তিন ধরনের সহিংসতার মধ্যে একটা আন্তঃসম্পর্ক স্থাপন করে। যেমন- প্রত্যক্ষ সহিংসতা, কাঠামোগত সহিংসতা, সাংস্কৃতিক সহিংসতা। প্রত্যক্ষ সহিংসতা ইঙ্গিত করে শারীরিক আঘাতকে। উল্লেখিত লঞ্চের ঘটনায় যেমন নারীকে প্রহার করার বিষয়টি। কাঠামোগত সহিংসতা বলতে বোঝায় সমাজে বিদ্যমান অসমতা ও নিপীড়নের ব্যবস্থাকে। যেমন- পিতৃতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় নারীর উপর লিঙ্গীয় সহিংসতা। আর সাংস্কৃতিক সহিংসতার মধ্যে আছে আদর্শগত ও মূল্যবোধজনিত ধারণা যা উপরের বাকি দুই ধরনের সহিংসতাকে বৈধতা দেয়। যেমন- “ভাই” হিসেবে নারীকে প্রহার করার চর্চা যা কোন কোন সাংস্কৃতিক মূল্যবোধ দ্বারা বৈধতা পায় – যে মূল্যবোধ আবার সমাজের ক্ষমতা কাঠামোর উপর ভিত্তি করে গড়ে উঠে।

লঞ্চে মব দ্বারা নারী নিপীড়নের এই ঘটনাটি দ্বারা গালটাং এর ত্রিমাত্রিক সহিংসতার তত্ত্ব বাস্তবে কিভাবে কাজ করে তা স্পষ্ট বোঝা যায়। এখানে নারীর উপর শারীরিক প্রহার দ্বারা প্রত্যক্ষ সহিংসতা বোঝা যায় যা আবার পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থার কাঠামোগত সহিংসতায় প্রোথিত। একইসাথে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যখন নারীর উপর চড়াও হওয়া মবকে নৈতিক দায়িত্বের আবরণ দিয়ে বৈধতা দেয়া হয়, তখন সহিংসতার সাংস্কৃতিক রূপও স্পষ্ট হয়ে উঠে। এইভাবে সহিংসতার তিনটি ধরন একইসাথে কাজ করে সমাজে বিদ্যমান বৈষম্যকে স্থায়ী করে।

প্রকৃতি বনাম সংস্কৃতির দ্বন্দ্বে সহিংসতার কারণ অনুসন্ধান

এবার আসি সহিংসতা কেন হয় এই “আলাপে”। কেননা নৃবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী হিসেবে সহিংসতা কেন হয় – এই প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোন “উত্তর” এর আমি পক্ষপাতিত্ব নই।
আদিম কাল থেকেই মানুষ প্রজাতির মাঝে সহিংসতার ঘটনা চলমান। অনেক তাত্ত্বিক যুক্তি দিয়ে থাকেন, খাদ্য কিংবা সম্পদের ভাগ নিশ্চিত করতে ও প্রাকৃতিক নির্বাচনে শ্রেষ্ঠতা প্রমাণ করতে মানুষ সহিংস হয়ে উঠে। তার বিবর্তনীয় ধারাবাহিকতায় আদিম সমাজের মানুষের মাঝেও সহিংস হয়ে ওঠার প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়।

কিন্তু, ফরাসি নৃবিজ্ঞানী পিয়েরে ক্লসত্রে (১৯৩৪-১৯৭৭) এর মতে, আদিম সমাজে যেসব সহিংসতা ও নৈরাজ্য দেখা যেতো সেগুলো খাদ্যসামগ্রী কিংবা সম্পদের অভাব থেকে হতো না। বরং, সেসব সহিংসতার পেছনে ছিল গুঢ় রাজনৈতিক উদ্দেশ্য; আর তা হলো রাষ্ট্র গঠন ঠেকিয়ে রাখা (Han, 2018:15)। অর্থাৎ, রাষ্ট্র গঠন ঠেকিয়ে রাখতেই আদিম সমাজে সহিংসতা ঘটতো। এর একটা উদাহরণ হলো – যুদ্ধ।
রাষ্ট্র এক-কেন্দ্রিক ক্ষমতার জন্ম দেয়। অন্যদিকে, যুদ্ধ-বিগ্রহের মাধ্যমে ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ ঘটে। ফলে ক্ষমতার এক-কেন্দ্রীকরণ ঠেকিয়ে রাখতে আদিম সমাজে যুদ্ধ-বিগ্রহের মতো সহিংস ঘটনা ঘটতো। ক্লসত্রে তার বই ‘আর্কিওলোজি অব ভায়োলেন্স’ এ কিছু আমাজোনিয় গোষ্ঠীর কথা বলেছেন যারা কিনা আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ-বিগ্রহ চর্চা করে। সেসব যুদ্ধ হয় খুব সংক্ষিপ্ত ও নিয়ন্ত্রিত। সেসব যুদ্ধ চলে প্রতীকী লড়াই এর মধ্য দিয়ে। আর সেই লড়াইয়ের মূলে ভূমি, খাদ্য, কিংবা সম্পদের ভাগাভাগি কারণ হিসেবে কাজ করে না। বরং এর মধ্য দিয়ে দলগুলোর মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করা হয়। ফলে একইসাথে এই লড়াই এক-কেন্দ্রিক ক্ষমতা অর্থাৎ রাষ্ট্র ব্যবস্থা গঠনেও বাধা দেয়।

ক্লসত্রে তার বইয়ে মূলত সমাজব্যবস্থার বিবর্তনবাদী তত্ত্ব (আদিম-বর্বর-সভ্য)- এর বিপরীতে যুক্তি দিয়েছেন। তার যুক্তি মতে, সমাজ একরৈখিক বিবর্তনের ধারাবাহিকতা মেনে বিশৃঙ্খল ও নৈরাজ্য অবস্থা থেকে সভ্যতার দিকে অগ্রসর – ব্যাপারটি তেমন নয়। কোন কোন সমাজ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবেই যুদ্ধ ও নৈরাজ্যের আশ্রয় নেয়, কেবল ক্ষমতার কেন্দ্রিকরণ তথা রাষ্ট্র গঠন ঠেকিয়ে রাখতে।

সহিংসতার রাজনীতি

কিন্তু প্রশ্ন হলো, যুদ্ধ-সহিংসতার ডাকে কেন সবাই সাড়া দেয়? কেন রাষ্ট্রের সবাই একটা যুদ্ধে জীবন বাজি রেখে হামলে পড়ে? কোন কোন তাত্ত্বিক মনে করেন, এর কারণটা মানুষের কল্পনা ও স্মৃতিতে নিহিত। মানুষ তার অতীত আর স্মৃতিতে কিছু বয়ান ধরে রাখে যা তাদের ভবিষ্যৎ যুদ্ধে উদ্বুদ্ধ করে। এছাড়াও যুদ্ধ-সহিংসতার ডাক যারা দেন, তারা কিছু কল্পনার ভিত নির্মাণ করেন। যেমন – ন্যায়-অন্যায়ের আলাপে প্রতিশোধ জাগানিয়া কিছু নির্দিষ্ট বয়ান প্রচার করে বেড়ানো, সামরিক শক্তির প্রদর্শন, নির্দিষ্ট কিছু স্থাপত্যের প্রদর্শন ইত্যাদি মানুষকে কোন কোন ক্ষেত্রে ঐক্যবদ্ধ করে অন্য কোন ঐক্যবদ্ধ শক্তির বিপরীতে যুদ্ধ করতে উদ্বুদ্ধ করে। ক্যাম্পবেল এর মতে, এই সকল বয়ান প্রচার হয় সাধারণত দুই ভাবে। প্রথমত, রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গ (যারা সরাসরি সহিংসতার সাথে জড়িত) তাদের দ্বারা কিছু একপাক্ষিক বয়ান প্রচার হয়, যা যুদ্ধ-সহিংসতাকে প্রত্যক্ষভাবে উষ্কে দেয়। দ্বিতীয়ত, মিডিয়া ও বিদ্যায়তনিক মাধ্যম যা সহিংসতার বার্তা ধারণ ও প্রচার করে পরোক্ষভাবে উষ্কে দেয়।

ক্যাম্পবেলের এই আলাপের একটি উদাহরণ হলো শেখ মুজিবুর রহমানের ৭ই মার্চের ভাষণ। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ-পাকিস্তান যুদ্ধকালীন পরিস্থিতিতে এই ভাষণ স্বাধীনতার ডাক ও প্রতিরোধের বয়ান হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। পরবর্তীতে, বিশেষকরে শেখ হাসিনা সরকারের শাসনামলে ভাষণটি সহিংসতার জাতীয়তাবাদী বয়ান হিসেবে কাজ করে যা বারবার প্রচার করার মাধ্যমে পাকিস্তানের বিরূদ্ধে বাংলাদেশের মানুষের মাঝে যুদ্ধাংদেহী মনোভাব গড়ে উঠে।

তবে মজার ব্যাপার হলো, সহিংসতা একদিকে যেমন দলে-দলে, জাতিতে-জাতিতে বিভাজন তৈরী করে, একইভাবে তা দলের মধ্যে বা জাতিগত চেতনায় ঐক্য প্রতিষ্ঠা করে। সহিংসতা “নিজ” ও “অপর” এর ধারণাকে মজবুত করে। এর ফলে দলে-দলে ভেদাভেদ হলেও আন্তঃদলীয় সম্পর্ক মজবুত হয়।

আবার মব সহিংসতার ক্ষেত্রেও এই দলীয় ও আদর্শগত পরিচয় মুখ্য ভূমিকা পালন করে। যখন কোথাও মব হয় (যেমন উপরে উল্লেখিত লঞ্চের ঘটনাটি), তখন বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই মানুষ মূল ঘটনা সঠিকভাবে না জেনেই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে। প্রথমত, মবের ভিড়ে ব্যক্তির স্বতন্ত্র পরিচয় প্রকাশিত হওয়ার কোন ঝুঁকি না থাকায় তারা ভুক্তভোগীর উপর সহজেই আক্রমণাত্মক হতে পারে। দ্বিতীয়ত, যা/যারা মব পরিচালিত করছে তার/তাদের সাথে দলগত ও আদর্শগত সহাবস্থান নিশ্চিত করার জন্যও অনেকে মব সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ে।
যেমন- ভেনিজুয়েলার ইয়ুপকা জনগোষ্ঠী দলগত পরিচয় নির্মাণে সহিংসতার আশ্রয় নেয়। সহিংস কর্মকান্ড এমনকি ক্যানিবালিজম (এক্ষেত্রে নিজ গোত্রের মৃত ব্যক্তির মাংসভক্ষণ) চর্চার মধ্য দিয়ে তারা তাদের সামাজিক-সাংস্কৃতিক পরিচয় নির্মাণ করেন। আবার, কোন কোন ক্ষেত্রে উপনিবেশিক শাসকরাও সহিংস ঘটনা দ্বারা “নিজ” ও “অপর” এর ধারণায় রেখা টানতো। উপনিবেশিত গোষ্ঠীকে “সহিংস” হিসেবে চিহ্নিত করা এবং তাদের ঐতিহ্যগত ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক চর্চাকে “সহিংস” বলে প্রচার করা উপনিবেশিক শাসকদের একটি সাধারণ প্রবণতা ছিল। কেননা এই চিহ্নিতকরণের মাধ্যমে তারা সেই গোষ্ঠীকে শাসন করার বৈধতা পেয়ে যেতো। তাদেরকে “বর্বর”, “অসভ্য” জাতি থেকে “সভ্য” জাতিতে পরিণত করার বৈধতা পেত।
অন্যদিকে, উপনিবেশিক অভিজ্ঞতা ও সামাজিক বৈষম্য থেকেও কোন কোন জাতি সহিংস হয়ে উঠে। যেমন- উপনিবেশকালে বহিরাগত শাসকের আগমণ, তাদের বৈষম্যমূলক শাসনকার্য, ও তাদের বিতাড়িত করার তাড়না থেকে কোন কোন জাতি সহিংস হয়ে উঠে। তারা নিজেদের মুক্তির জন্য, সামাজিক বৈষম্য দূর করতে, কিংবা দারিদ্র্য ও হতাশাগ্রস্ত হয়ে মানুষ সহিংস কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়ে। ইনগো শ্রোডার যেমন দেখিয়েছেন, আপাশে জাতিগোষ্ঠী তাদের উপনিবেশকালীন অভিজ্ঞতা দ্বারা সহিংসতায় উদ্বুদ্ধ। ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা তাদের সহিংস করে তুলেছে, যার ফলে এখন সঙ্কটময় পরিস্থিতে তারা সমস্যার সমাধান হিসেবে সহিংস পন্থা বেছে নেয়।

নৃবিজ্ঞানী হিসেবে সহিংসতার আপেক্ষিক বিশ্লেষণ

বিবর্তনবাদী ব্যাখ্যা মতে, আন্তঃদলীয় কোন্দল কিংবা সহিংসতাকে প্রাকৃতিক নির্বাচন বা বিবর্তনে টিকে থাকার কৌশল হিসেবে দেখা হয়। এই ধারণার প্রবক্তা জর্জ সিমেল। তিনি প্রথম যুক্তি দেন, সহিংসতার মাধ্যমে দলগতভাবে প্রাকৃতিক নির্বাচন ঘটে। যে দল সহিংসতায় জয় লাভ করে, সে-ই “যোগ্যতম” হয়ে প্রাকৃতিক নির্বাচনে জয়ী হয়।
তবে যেকোন সহিংসতার ঘটনার নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ বেশ দুরূহ ব্যাপার। সহিংসতার ঘটনায় সাধারণত তিন ধরনের এজেন্ট দেখা যায়। সহিংসতাকারী, সহিংসতার শিকার, ও সহিংসতার সাক্ষী বা পর্যবেক্ষণকারী। যখন ঘটনা লিপিবদ্ধ হয়, বা ইতিহাস থেকে সংগ্রহ করে পুনরায় প্রচার করা হয়, তখন সেই লিপিবদ্ধকারী বা প্রচারকারীর পক্ষপাতিত্ব চলে আসে। এই পক্ষপাতে একাধিক প্রভাব কাজ করে। যেমন- বর্ণনাকারীর আদর্শ, বিশ্বাস, বর্ণনার সময়কাল ও রাজনৈতিক অবস্থা, বর্ণনার টার্গেট অডিয়েন্স ইত্যাদি। আফ্রিকান নৃবিজ্ঞানী হেইকি বেরেন্দ এর মতে, সহিংসতা ঘটনাকালে একজন গবেষকের পক্ষেও নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ সম্ভব নয়। কেননা, সেসময় উপস্থিত সকলেই নৈতিকতার প্রশ্নে ও আবেগ দ্বারা পরিচালিত হবে।

তবে, তিনি একটি চতুর্থ এজেন্টের কথাও উল্লেখ করেছেন – ব্যাখ্যাকারী। সহিংসতার অভিজ্ঞতাকে পূর্বের তিন এজেন্ট পক্ষপাতিত্বভাবে লিপিবদ্ধ বা বর্ণনা করলেও সেই বর্ণনার ব্যাখ্যাকারী পক্ষপাতহীনভাবে তা বিশ্লেষণ করতে পারেন। কোন কোন ক্ষেত্রে দেখা যায় সহিংস ঘটনা ঘটার মুহূর্তে সকলে আবেগতাড়িত হয়ে কিছু করলে কিংবা বললেও, পরবর্তীতে ঘটনার পরিমন্ডলের বাইরে থেকে নিরপেক্ষ ও সামগ্রীক দৃষ্টিভঙ্গি বজায় রেখে সেই ঘটনার ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ কিরা যায়।

নৃবিজ্ঞানে সহিংসতাকে কোন বিচ্ছিন্ন ঘটনা মনে করা হয় না। নৃবিজ্ঞানীদের মতে, সহিংসতা একটি প্রতীকী ঘটনা। কোন সমাজে ঘটা সহিংসতার পেছনে সেই সমাজের মানুষের আদর্শ, বিশ্বাস, ঐতিহ্য ও সামাজিক-সাংস্কৃতিক বিন্যাস কাজ করে বলে মনে করা যায়। অন্য কোন সমাজের নীতিগত মানদন্ডে সেই সহিংসতাকে “অযৌক্তিক” বা “অপ্রয়োজনীয়” মনে হতে পারে। তবে যাদের মাঝে সহিংসতা ঘটছে তাদের দৃষ্টিকোণ থেকে এটি অর্থবহ হয়ে থাকে। তাই নৃবিজ্ঞানে যেকোন সহিংসতাকে সেই সমাজের মানদন্ড দিয়ে বিশ্লেষণ করার কথা বলা হয়। যেমন- ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার সহিংসতা।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রতিনিয়ত খবর চাওড় হয়। ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিয়ে নেটিজেনদের মনোভাব এমন যে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মানুষ মাত্রই সে মারামারি করবে, সহিংসতায় জড়াবে। তবে গতানুগতিক এই ধারণার বাইরে সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম যে জিনিসটা এড়িয়ে যায় তা হলো সহিংসতার মাঝে “ঐক্য”। যেকোন দলগত সহিংসতায় আগে দলীয় ঐক্য প্রয়োজন। তা না হলে একই দলের প্রত্যেক সদস্য দলগত পরিচয়ে সহিংসতায় জড়াতে পারেনা। এক্ষেত্রে ব্রাহ্মণবাড়িরায় সহিংসতার কারণ অনুসন্ধানে আমি আবার ক্লস্ত্রের শরণাপন্ন হই। গতানুগতিক কিংবা স্টেরিওটিপিক্যাল ধারণার বাইরে গিয়ে এর ক্রিয়াবাদী দিকটি অনুসন্ধান করি। আর ক্রিয়াবাদী দৃষ্টিভঙ্গি অনুসারে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সহিংসতা এলাকাভিত্তিক মানুষের ঐক্যবদ্ধতা, ক্ষমতার সামঞ্জস্যকরণ ও সামাজিকীকরণকে নির্দেশ করে। এই সহিংসতা মানুষের দলীয় পরিচয়কে পুনঃপ্রতিষ্ঠিত করে ও দলগত অন্তর্ভুক্তির স্বাদ দেয়।

তবে কোন কোন তাত্ত্বিকের মতে, সমাজে ক্ষমতার এক-কেন্দ্রীকরণ প্রতিষ্ঠিত হয়ে গেলে সহিংসতার উদ্দেশ্যের পরিবর্তন ঘটে। শুরুতে সহিংসতা দলগত পরিচয়কে নিশ্চিত করলেও একটা সময় দেখা যায় ক্ষমতাবানরা সমাজের সাধারণ মানুষকে সহিংসতায় উস্কে দেয়। মার্শাল ফোক যেমন বলেছেন, “রাজায় রাজায় যুদ্ধ শেষ; এখন যুদ্ধ জনতায় জনতায়”। এই কৌশলের মাধ্যমে রাষ্ট্র বা কর্তৃপক্ষ সমাজের উপর নিয়ন্ত্রণ চর্চা করে। যেমন – আধুনিক রাষ্ট্র ব্যবস্থায় দেশের সাধারণ মানুষের কাছে বিদেশী শত্রু চিহ্নিত করে দেওয়া ও তাদের নিরাপত্তা বা প্রতিরক্ষার স্বার্থে সামরিক শাসন ব্যবস্থা গড়ে তোলা। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রের একটা নির্দিষ্ট গোষ্ঠির হাতে সহিংস কর্মকান্ড পরিচালনাকে বৈধ করে দেওয়া হয়। ফলে, পুলিশ কিংবা সেনাবাহিনী যখন আইন-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে রাষ্ট্রে সহিংসতা চালায়, রাষ্ট্রের মানুষ তা আইনসংগত বলে মেনে নেয়। এর ফলে, রাষ্ট্র-কর্তৃক সহিংসতাকে আর ক্ষতিকর কর্মকান্ড বলে মনে হয় না ধরে নেওয়া হয়, এতেই রাষ্ট্র ও রাষ্ট্রের মানুষের মঙ্গল। অন্যদিকে, একই ধরনের সহিংসতা যখন রাষ্ট্রের অন্য কোন নাগরিক করে তখন তাকে বিপদজনক ও অন্যায়কারী হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে পার্বত্য চট্টগ্রামে সেনা মোতায়নের বিষয়টি এই আলাপে্র প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। পার্বত্য চট্টগ্রামে আদিবাসীদের বসতি। রাষ্ট্র নিরাপত্তার দোহাই দিয়ে সেখানে সেনা মোতায়ন করে রেখেছে ও বিভিন্ন সময় সহিংসতা চালিয়েছে। একই সহিংসতার ঘটনায় রাষ্ট্রীয় এজেন্সি বৈধতা পায়; আর আদিবাসী নাগরিক পায় রাষ্ট্র-দ্রোহিতার আখ্যা।

এভাবেই আদিমকাল থেকে সহিংসতার সাথে ক্ষমতা ও রাষ্ট্রের (কিংবা কর্তৃপক্ষের) পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রয়েছে। কখনো এর ধরন পালটেছে; কখনো পালটেছে রূপ। কখনো কর্তৃপক্ষ প্রত্যক্ষভাবে সহিংসতা চালিয়েছে; কখনো জনসাধারণের মাধ্যমে সমাজে সহিংস ও অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। আবার, সহিংস পরিস্থিতি একইসাথে সমাজ পরিবর্তনেও ভূমিকা রেখেছে। ফলে সহিংসতাকে একটি অবধারিত বিষয় ধরে নিয়েই সমাজভেদে এর ক্রিয়াবাদী দিকটি বিশ্লেষণ করা জরুরী। নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিভঙ্গিকে কাজে লাগিয়ে সমাজভেদে এর আপেক্ষিক বিশ্লেষণ আমাদের নিরপেক্ষ ব্যাখ্যা এনে দিতে পারে।

শেষ করছি আবার লঞ্চে মবের হাতে নারী নিপীড়নের ঘটনাটি দিয়ে। নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে, আওয়ামী সরকার পতনের পর গত এক বছরে বাংলাদেশে নারীর প্রতি যে সকল সহিংসতা ঘটেছে তার জন্য শুধু আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর অস্থিতিশীল অবস্থা দায়ী নয়। এর শিকড় গেঁথে আছে বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায়, এর ধর্মীয়-সামাজিক আদর্শ ও মূল্যবোধে। গ্যালটাং এর তত্ত্ব অনুসারে, বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা বুঝতে হলে এর ত্রিমাত্রিক বিশ্লেষণ প্রয়োজন। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতা হয়তো প্রত্যক্ষভাবে নারীর প্রতি সহিংসতা রোধ করবে। কিন্তু কাঠামোগত ও সাংস্কৃতিক সহিংসতা রোধে বাংলাদেশের পিতৃতান্ত্রিক কাঠামোর ভিত নাড়াতে হবে।

তথ্যসূত্র

Claustres. P. (1977). ‘The Archaeology of Violence: war in primitive societies’, in P. Clastres (ed.) Archaeology of Violence, New York: Semiotext(e).
Han, B. (2018). Typology of Violence. Massachusetts Institute of Technology.
Riches, D. (1986) ‘The phenomenon of violence’, in D. Riches (ed.) The Anthropology of Violence, Oxford: Basil Blackwell.
Schröder, I. W. & Schmidt, B. E. (2001). ‘Introduction: violent imaginaries and violent practice’, in Anthropology of Violence and Conflict, Routledge, London and New York.