এনথ্রোসার্কেলে এবার প্রকাশিত হলো নৃবিজ্ঞানী ক্রোয়েবারের ‘Eighteen Professions’ লেখাটির অনুবাদ। লেখাটি অনুবাদ করেছেন মাহমুদুর রহমান খান। অনুবাদটির সাথে এনথ্রোসার্কেলের সম্পাদনা দলের একটি ভূমিকা যুক্ত করা হয়েছে। 

ক্রোয়াবারের মূল প্রবন্ধটির নাম ‘Eighteen Professions’। এখানে Proffesions বলতে কোন পেশা নয়, বিষয় বুঝানো হয়েছে। বোয়াসের হাত ধরে আমেরিকায় প্রতিষ্ঠা পাওয়া ‘ঐতিহাসিক নির্দিষ্টতাবাদ‘ বা Historicial Particularism’ ধারার তাত্ত্বিক ছিলেন ক্রোয়েবার। তিনি মনে করতেন নৃবিজ্ঞান হলো সাংস্কৃতিক ইতিহাস। তার এই লেখায়ও মূলত উঠে এসেছে নৃবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে কিভাবে ইতিহাসকে পাঠ করা প্রয়োজন, তার উপায়। তিনি এইক্ষেত্রে বোয়াসের  ‘চার ক্ষেত্র (Four Field)’ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানকে জীববিজ্ঞান ও অন্যান্য শাখা থেকে আলাদা করেন।  ক্রোয়েবার মনে করতেন জীববিজ্ঞান, মনোবিজ্ঞান বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের বিভিন্ন নিয়ম-কানুন ইতিহাস বুঝার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়, ইতিহাসকে বুঝতে হবে খোদ ইতিহাসের সাপেক্ষে।  

এইক্ষেত্রে আরেকটি বিষয় গুরত্বপূর্ণ। ফ্রাঞ্জ বোয়াস মনে করতেন সংস্কৃতিতে ব্যক্তির ভূমিকা আছে; অর্থাৎ ব্যক্তি সংস্কৃতিতে প্রভাব রাখতে পারে। ক্রোয়েবার এইক্ষেত্রে বিপরীত মত প্রদান করেন। ব্যক্তির সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়ে ক্রোয়েবারের ধারনা অনেকটা স্পেন্সার আর ডুর্খেইমের কাছাকাছি। ক্রোয়েবার মনে করতেন, সংস্কৃতি হচ্ছে সার্বভৌম, সে ব্যক্তিমানুষের বাইরে অবস্থিত এক কাঠামো। তার গতি নিজস্ব৷ এদিক দিয়ে ইতিহাসকে বুঝার ক্ষেত্রে ক্রোয়েবার মহামানব তত্ত্বকেও (Great man theory) বাতিল করেন। সেইসময়কার অনেক ইতিহাসই কোন বিখ্যাত ব্যক্তির জীবনি আশ্রয় করে লেখা হতো। যেমন কেউ যদি ভারতবর্ষের স্বাধীনতার ইতিহাস কেবলমাত্র মহাত্মা গান্ধী বা কংগ্রেসকে আশ্রয় করে লেখে, ক্রোয়েবার নিশ্চয়ই সেটা বাতিল করে দিতেন। কারণ ক্রোয়েবার মনে করেন, ইতিহাস, সভ্যতা কিংবা সংস্কৃতির নিজস্ব গতি আছে৷ তা কোন ‘মহৎ ব্যক্তির’ উদ্দেশ্যের উপর নির্ভরশীল নয়৷ 

এই লেখায় ক্রোয়েবার প্রকৃতির সংস্কৃতির সম্পর্ক নিয়েও লেখেন। তার মতে, প্রকৃতি (কিংবা জলবায়ু) সংস্কৃতিকে আকার দেয় না। বরং, সংস্কৃতির বিশাল কাঠামোর মধ্যে প্রকৃতি অন্যান্য উপাদানের সাথে সংযুক্তই থাকে কেবল; সংস্কৃতিকে পরিবর্তন সে করে না৷  সেইসময় প্রকৃতির সাথে সংস্কৃতির সম্পর্ক দেখাতে গিয়ে কেউ বলেন উত্তর ইউরোপের মানুষ বেশি পরিশ্রমী, কারণ তাদের প্রতিকূল পরিবেশের সাথে লড়াই করতে হয়৷ ক্রোয়েবার এইধরনের ব্যাখ্যাকে যথার্থ মনে করতেন না৷ 

ক্রোয়েবারের এই লেখার ক্ষেত্রে আরেকটা বিষয় পরিষ্কার করে নেওয়া দরকার৷ এখানে ক্রোয়েবার সভ্যতা বলতে সংস্কৃতিও বুঝিয়েছেন। ক্রোয়েবারের লেখায় সভ্যতা আর সংস্কৃতি খুব কাছাকাছি। 

নৃবিজ্ঞানে বোয়াস এবং তার অনুসারীদের অন্যতম বড় অর্জন ছিল বর্ণবাদকে খারিজ করা। এই লেখায়ও ক্রোয়েবার মানুষের বর্ণ কিংবা বংশগতির সাথে যে সংস্কৃতির তেমন কোন সম্পর্ক নেই, সে কথা উচ্চারণ করেন। এইক্ষেত্রে বোয়াস আর ক্রোয়েবারদের আরেকটা অবস্থানও উল্লেখ করা দরকার, সেটা হলো ‘সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদ‘ (Cultural Relativism)। 

ক্রোয়েবার মনে করতেন, সংস্কৃতি অনুসারে কোন জাতি বা গোষ্ঠী বেশি উন্নত বা কম উন্নত হয় না। প্রত্যেকটা সংস্কৃতিকে তার নিজের মানদন্ড অনুযায়ীই পাঠ করতে হবে, সে অনুযায়ীই তাকে ব্যাখ্যা করতে হবে৷ এইক্ষেত্রে তিনি ফ্রয়েডের একটি মন্তব্যকেও আক্রমন করেন। ফ্রয়েড মনে করতেন, অরণ্যচারী সমাজের একজন প্রাপ্তবয়স্ক ব্যক্তির বুদ্ধিমত্তা ইউরোপের একটি শিশুর সমান।  এই ব্যাখ্যাকে তিনি ভুল হিসেবে উল্লেখ করেন। 

ক্রোয়েবারের এই লেখাটি সংস্কৃতি নিয়ে পুরো বোয়াসীয় ধারার নৃবিজ্ঞানের মূল জায়গাগুলি উঠে এসেছে৷ তারা মনে করতেন, সংস্কৃতিকে কোন নির্দিষ্ট সূত্র কিংবা একক কারণ দিয়ে বুঝা সম্ভব নয়৷ সংস্কৃতি নিজেই নিজের কারণ৷ 

পরবর্তীতে ক্রোয়েবারের সমালোচনা হয় সংস্কৃতিকে অনেক বেশি মানসিক প্রক্রিয়া আকারে দেখার জন্য। ক্রোয়েবারের  ধারণায় সংস্কৃতির অভ্যন্তরীন বিষয়গুলোর সম্পর্ক কিভাবে সংস্কৃতিকে আকার প্রদান করে তার উল্লেখ নাই, বলা হয় সংস্কৃতি নিজেই নিজেকে আকার দেয়৷ মানুষের জীবনপ্রণালীর সকলকিছুই কী তাহলে একীভূতভাবে সংস্কৃতি? অর্থাৎ সংস্কৃতির উপাদান যেমন নানা প্রথা আর প্রতিষ্ঠানকে যদি আলাদাভাবে চিহ্নিত না করে একীভূতভাবে সংস্কৃতি হিসেবে দেখা হয়, তাহলে সংস্কৃতির একটা হাওয়াই ব্যাখ্যা তৈরি হওয়ার প্রবণতা দেখা দেয়৷ কেননা সংস্কৃতি নিজেই একটি ধারণা, একে দেখা যায় না, ছোঁয়া যায় না। 

যাই হোক, এই লেখাটি এনথ্রোসার্কেলের পাঠকদের সংস্কৃতি বিষয়ক বোঝাপড়ায় বিশেষ অবদান রাখবে বলে আশা করি৷ হ্যাপি রিডিং।

বর্তমানে নৃবিজ্ঞানের দুইটি দিক যেগুলো লক্ষ্য ও পদ্ধতিগত দিক থেকে বিরোধী ভাবাপন্ন। একটি শাখা হল জীববৈজ্ঞানিক ও মানসিক এবং অপরটি হলো সামাজিক বা ঐতিহাসিক।

তৃতীয় একটি বিশেষ শাখা রয়েছে যা শারীরিক ও সামাজিক ঘটনাসমূহের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করে। এখনও নৃবিজ্ঞানের সীমা নির্ধারিত না হওয়ায় হলিডে রিসোর্টের মত যে কেউ তার কাজের প্রয়োজনমতো নৃবিজ্ঞানকে ব্যবহার করছে। অবশ্য শীঘ্রই এই সীমা নির্ধারিত হবে এবং অগ্রগতি লাভ করবে। নাম অপরিবর্তিত থাকলেও শারীরিক নৃবিজ্ঞান ইতিমধ্যেই সীমানা চিহ্নিত করেছে। বাকি যা হাতে আছে তা কেবল বিজ্ঞান থেকে ইতিহাসের পরিধি আলাদা করা।

ঐতিহাসিক নৃবিজ্ঞান , ইতিহাস এবং সমাজবিজ্ঞান কে ‘ইতিহাস’ হিসেবে বর্ণনা করা হয়। জৈবিক নৃবিজ্ঞান এবং মনস্তত্ত্ব জীববিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত।

১. ইতিহাসের লক্ষ্য হলো সমগ্র সভ্যতার সাপেক্ষে সামাজিক ঘটনা (fact) সমূহের কারণ সম্পর্কে জানা। 

সভ্যতা বলতে সভ্যতাই নির্দেশ করে, সভ্যতার ঝোঁক বা আকস্মিকতা নির্দেশ করেনা। সম্পর্ক হলো বাস্তব ঘটনা; ঘটনার কারণ নয়।

২. ইতিহাসের পাঠ কেবল মানুষের কার্যক্রম নিয়ে হতে পারে,  ব্যক্তিমানুষ নিয়ে নয়।

কোনো ব্যক্তি নয় বরং তাদের কাজের প্রকৃতি, কাজের ফলাফল প্রভৃতি হল ঐতিহাসিক অনুসন্ধানের বিষয়বস্তু। 

৩. সভ্যতা যদিও মানুষের দ্বারাই প্রবাহিত হয় ও অস্তিত্বশীল থাকে এবং মানবজীবনের একটি অংশ, তবুও সে নিজেই একটা স্বতন্ত্র সত্তা । সভ্যতা নিজেই জীবনের বাইরে আলাদা একটা গঠন আকারে, এর নিজের মধ্যেই বিরাজ করে। 

ইতিহাস সভ্যতা উৎপাদনের ‘এজেন্সি’ নিয়ে চিন্তা করেনা, করে খোদ সভ্যতা নিয়েই। কারণসমূহ (Causes) নিয়ে ভাবা মনোবিজ্ঞানীদের ব্যাপার। স্বতন্ত্র ব্যক্তি যাদের মাধ্যমে সভ্যতা বয়ে চলে তাদের সাথে ‘সভ্যতার সত্তা’র কোনো সম্পর্ক নেই, এমনকি সম্মিলিত ব্যক্তিসমষ্টির সাথেও নেই। মানুষের দ্বারাই সভ্যতার চাষ হলেও এটি স্বাধীন বা স্বয়ংসম্পূর্ণ। গোষ্ঠীর মানুষের  চিন্তার প্রক্রিয়া আসলে নির্দিষ্ট ক্ষেত্রে ব্যক্তির বিশেষ মানসিক উদ্দীপনার সাপেক্ষে প্রতিক্রিয়ার সমষ্টি। সামষ্টিক মনস্তত্ত্ব চূড়ান্তভাবে স্বতন্ত্র ব্যক্তি মনস্তত্ত্বের মাধ্যমে বিশ্লেষণযোগ্য, যেমনটা জৈব মনোবিজ্ঞান ও শরীরবিদ্যায় বিশ্লেষণযোগ্য। কিন্তু ইতিহাস এমন সব উপাদান নিয়ে কাজ করে যা অবশ্যই সামষ্টিক এবং অবিচ্ছিন্নভাবে সামাজিক। ইতিহাস মানুষ বা প্রাণীর সাথে সভ্যতার সম্পর্ক নিয়ে উদ্বিগ্ন নয়, বরং সভ্যতার মধ্যকার আন্তঃসম্পর্ক নিয়ে আগ্রহী। অসভ্য মানুষ বলতে কিছু নেই। আর যদি থেকেও থাকে তা নিয়ে ঐতিহাসিকদের মাথাব্যথা নেই। এমনকি সভ্য মানুষ নিয়েও ইতিহাস মাথা ঘামায়না; এর কাজের ক্ষেত্র সভ্যতা -যার মূল উপাদান মানুষ, কিন্তু এজন্য সভ্যতার উপস্থিতি অনিবার্য।

 ৪. মানুষের একটা নির্দিষ্ট মানসিক কাঠামো ইতিহাসবেত্তারা অবশ্যই ধরে নিতে পারেন, তবে তা সামাজিক ঘটনার বিশ্লেষণ হিসেবে  হাজির করা যায় না। 

ইতিহাসবেত্তা তার নিজের জন্য সামাজিক ঘটনাবলীর সাপেক্ষে মানুষের চিন্তা এবং এর সাথে তাদের মনস্তাত্ত্বিক ক্রিয়াকলাপের সরাসরি প্রাসঙ্গিকতার ব্যাখ্যা গ্রহণ করতে পারেন। তবে এসব ব্যাখ্যা সাধারণত জৈবিক মনোবিজ্ঞানীদের প্রণীত সূত্রের বাহিরে থাকে এবং তাৎক্ষণিকভাবে নিজের দেয়া ব্যাখ্যায় পরিণত হয়।  এসব কারণে এগুলো অগুরুত্বপূর্ণ বলে বিবেচিত হতে পারে। সভ্যতার বোঝাপড়া কোন মনোবিজ্ঞানীকে সাহায্য করবে কি করবে না তা পরবর্তীতে নির্ধারণের ব্যাপার।

৫. সহজাত সংস্কারগুলো সামাজিক ঘটনাগুলোর নীচে প্রোথিত থাকে। কিন্তু ইতিহাস দ্বারা এটি বিচার বা মোকাবিলা করা সম্ভব না। 

যেখানে প্রবৃত্তি সামাজিক ঘটনায় প্রকাশ হতে শুরু করে সেখানেই ইতিহাসের শুরু। 

৬. ব্যক্তির আলাদা কোন ঐতিহাসিক মূল্য নেই। 

ঐতিহাসিক সিলসিলা গুরুত্বপূর্ণ উপাদান। তেমনি ঐতিহাসিক কিছু ব্যক্তির কাজও গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু তাদের নাটকীয়, অকল্পনীয় বা আত্মজৈবনিক বর্ণনা – এগুলো জীবনি বা কাল্পনিক শিল্প; অথবা বড়জোড় মনস্তত্ত্বের অংশ; মোটেই ইতিহাস নয়।

৭. ভূগোল অথবা জৈবিক পরিবেশ হলো সভ্যতা দ্বারা ব্যবহৃত উপাদান; সভ্যতাকে ব্যাখ্যা করা বা রূপদান করার কোন কারণ নয়। 

সভ্যতাই সভ্যতার প্রতিক্রিয়া। ঐতিহাসিকদের দৃষ্টিতে ভূগোল সভ্যতার উপর ক্রিয়া করে না, বরং সভ্যতা ভৌগোলিক পরিস্থিতিসমূহকে সংযুক্ত করে। যেমন ধরা যাকঃ কৃষিব্যবস্থা, আবহাওয়ার পরিস্থিতি অনুযায়ী নিজেই নিজেকে পরিবর্তিত করে। এখানে এটি আবহাওয়ার কারণে ঘটে না। কৃষিকাজের বিষয়ে বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে সভ্যতাকে আর যে যে ক্ষেত্রগুলো প্রভাবিত করে, সে সবের সাপেক্ষে বুঝতে হবে। 

৮. সভ্যতার বাহক হিসেবে মানুষের সকল প্রজাতি ও বর্ণের অকাট্য পরিচয় ও সমতা ইতিহাসবেত্তাকে নির্ণয় করতে হয়।

পরিচয় শুধু প্রমাণ বা খারিজ করার কোন বিষয় নয়। গবেষণাকালীন পর্যবেক্ষণে  এটি প্রতিষ্ঠিত থাকে বা সীমিত হয়৷ ঐতিহাসিক ও সামাজিক প্রভাব প্রতিটি বর্ণ ও গোষ্ঠীতে জৈবিক ও বংশানুক্রমে ঘনিষ্ঠভাবে জড়িয়ে থাকে যে আলাদাভাবে এদের প্রভাব বোঝা যায় না। এ বিষয়ের সমস্ত মতামত প্রাপ্ত প্রমাণসমূহের উদ্দেশ্যমূলক ব্যাখ্যা মাত্র।

জীববিজ্ঞানীরা যেসব মানুষ নিয়ে কাজ করে তাদের অবশ্যই কিছু বংশগত পার্থক্য ধরে নেন এবং প্রায়শই জৈবিক ঘটনাকেই একমাত্র অস্তিত্বশীল টিকে থাকার কারণ হিসেবে ব্যাখ্যা করেন। অপরদিকে এসব পার্থক্যের ধারণা প্রতিষ্ঠিত ও সঠিকভাবে ব্যাখ্যা করার পূর্ব পর্যন্ত  সেসবের অস্তিত্ব নেই বলে ইতিহাসবেত্তারা ধরে নেন। তারা এই ধারণাগুলো নিয়ে পরিষ্কার না হলে,  তাদের কাজ ইতিহাস ও জীববিজ্ঞানের জগাখিচুড়ি হয়ে যাবে।

৯. ইতিহাসে বংশগতির ধারণার বিশেষ কোন ভূমিকা নেই।

ব্যক্তির জায়গা থেকে বংশগতির পার্থক্য অবশ্যই আছে, কিন্ত তা ইতিহাসের বিষয়বস্তু নয়, কেননা সেটা ব্যক্তিনির্ভর। মানবগোষ্ঠীর বংশগত পার্থক্য শেষ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠিত হতে পারে। কিন্ত ভৌগলিক অবস্থা যেমন সভ্যতা দ্বারা প্রভাবিত হিসেবে বিবেচিত হয়, খোদ সভ্যতার কারণ নয়- বংশগতিকেও এভাবেই দেখতে হবে।  

১০. নির্দিষ্ট বংশগতীয় বৈশিষ্ট্য  অর্জনের ব্যাপারটি জীববিজ্ঞান আর ইতিহাসের জায়গা থেকে একটি ভ্রান্তি। 

জীববিজ্ঞানের অনুসন্ধানে হয়তো এই সরল ব্যাখ্যা বাতিল হয়ে যেতে পারে; তবে জীববিজ্ঞানের অনুসন্ধানে  যেহেতু এই বংশগতির ক্রিয়াকলাপ পুরোটা এখনো খোলাসা হয় নাই,কাজেই ব্যাপারগুলো গুলিয়ে ফেললে হবে না।    বোঝাপড়ার এই পর্যায়ে বলা যায়,  বংশগতীয় বৈশিষ্ট্য অর্জনের ব্যাপারটিকে যারা ইতিহাসের সাথে এক করে দেখেন, তারা হয় সামাজিক চিন্তার পরিসরে জীববিজ্ঞানকে ঢুকিয়ে গুলিয়ে ফেলেন নাহয় ইতিহাসকেই জীববিজ্ঞানে পরিণত করতে চান।  

১১. প্রাকৃতিক নির্বাচন ও বিবর্তনের জৈব কারণ সমূহ সভ্যতাকে প্রভাবিত করেছে,  এমনটা বলা যাবে না। জৈব বিবর্তনের প্রক্রিয়া বস্তুগতভাবে সভ্যতাকে প্রভাবিত করছে বা করেছে,  তা এখনো প্রমাণিত হয়নি। সভ্যতা স্পষ্টতই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়কে ধারণ করে যা কার্যত সম্পূর্ণরূপে প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে  অনুপস্থিত এবং যা যেকোনো ধরণের প্রাকৃতিক নির্বাচন প্রক্রিয়াকে অসার করে দেয়। 

প্রাগৈতিহাসিক প্রত্নতত্ত্ব নিশ্চিত করে যে সভ্যতা মানুষের জৈবিক সত্তার বস্তুগত পরিবর্তনের সাথে একাকার না হয়ে গভীরভাবে পরিবর্তিত হয়েছে। জৈবিক বিবর্তনের সাথে সভ্যতার সম্পর্ক শেষ পর্যন্ত বৃহৎ বা স্বল্পাকারে প্রমাণিত হতে পারে, জৈবিক ধরণ ও সভ্যতার গঠনের মধ্যে অবশ্যই একটি যোগসূত্র স্থাপন করা দরকার। 

১২. কথিত “বর্বর” প্রাণী এবং মানুষের মধ্যকার কোন রূপান্তর প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করা না।  সকল মানুষ সম্পূর্ণ সভ্য। সমস্ত প্রাণী অসভ্য, কারণ তারা সভ্যতাকরণ প্রক্রিয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়। সার্বজনীনভাবে দুইয়ের মধ্যে  সংযোগের ক্ষেত্রে যেসব শর্তের অস্তিত্ব আছে বলে ধারণা করা হয়, তা এখনো সম্পূর্ণ অজ্ঞাত। এটি কখনো জানা গেলে তা ইতিহাসবেত্তাদের কাছে কেবল ইতিহাসের নতুন একটি পাঠই হবে । ইতিহাসবেত্তাদের কাছে উঁচু সভ্যতা বা নিচু সভ্যতা বলতে কিছু নেই। সময়, স্থান ইত্যাদি অনুক্রমের ভিত্তিতে সভ্যতাকে সাজানো সবসময়ই বিভ্রান্তিকর এবং মূল্যহীন। 

আধুনিক ইউরোপীয় শিশুর সাথে প্রাপ্তবয়স্ক বর্বরের তুলনা খুবই অস্পষ্ট এবং এটি ঐতিহাসিকভাবে বা জৈবিকভাবে সঠিক মূল্যায়ন নয়। 

১৩. সামাজিক প্রজাতি, আদর্শ সংস্কৃতির ধরণ বা পর্যায় বলে কিছু নেই। ইতিহাসে সামাজিক প্রজাতি জৈব প্রজাতির এক ভ্রান্ত তুলনা। পছন্দমত কিছু নির্বাচিত ঘটনার ভিত্তিতে সভ্যতার পর্যায়ক্রমের ধারাটি বিশ্বাসযোগ্য করা হয়েছে।

১৪. প্রাচীন চেতন (Primitive mind) বলে কিছু নেই, কেবলমাত্র সভ্যতাই বিরাজমান। 

কেবলমাত্র ব্যক্তিরই চেতন থাকে। মানুষ যখন একে অন্যের উপর প্রতিক্রিয়া প্রকাশ করে, তার একটা শারীরবৃত্তীয় ব্যাপার থাকে। সভ্যতার অন্দরে কোন একক জাতিগত বা সামাজিক অস্তিত্বের ধারনাটি  জীববৈজ্ঞানিকভাবে একটি শারীরবৃত্তীয় ঘটনা আকারে দেখা যায়। ঐতিহাসিকভাবে এটি অচল। 

১৫. ইতিহাসে পদার্থ-রাসায়নিক বিজ্ঞানের মত কোন সূত্র নেই। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সভ্যতার প্রকাশিত আইন সমূহ কোনো পরম ব্যাপার নয়। ইতিহাসে বিজ্ঞানের সূত্র সমূহের মত এর বিকল্প নাও থাকতে পারে। ইতিহাসের ক্ষেত্রে সূত্র থাকার ব্যাপারটি অস্বীকারের প্রয়োজন নেই বরং স্বীকার করা লাগতে পারে। কিন্ত এটাই চূড়ান্ত না।

১৬. ইতিহাস অপরিহার্য শর্ত নিয়ে কাজ করে, কারণ নিয়ে নয়। সভ্যতার ঘটনাসমূহের কোন প্রভাব নয়, বরং এটি ঘটনার পরম্পরা। জীববিজ্ঞান থেকে উদ্ধৃত যান্ত্রিক কার্যকারণের নীতিগুলো ব্যক্তিগত ও সামষ্টিক মনোবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। ইতিহাসে প্রয়োগ করাতে এটি মনোবিজ্ঞানে রূপান্তরিত হয়। সভ্যতার উপাত্তসমূহ যান্ত্রিক কার্যপদ্ধতিতে পরিমাপ করার একগুঁয়েমি – পাঠ্য হিসেবে ইতিহাসের অস্তিত্বকে অস্বীকার করা শামিল। ঐতিহাসিক ঘটনার একমাত্র উত্তরসুরী আগের কোন  ঐতিহাসিক ঘটনাই। 

১৭. ইতিহাসের কার্যকারণ সম্পর্ক পরম কারণমূলক (Teleological) । 

মানসিক কারণসমূহ যান্ত্রিক। ইতিহাসের ক্ষেত্রে মনোবিজ্ঞান হলো অনুমানমূলক, প্রমাণযোগ্য না। শত শত উদাহরণের মাধ্যমে মানবমনের মৌলিক কাঠামো দেখানো ইতিহাস পাঠের ক্ষেত্রে নিস্ফল প্রচেষ্টা। সভ্যতা হয়ে উঠার প্রক্রিয়াকে যদি সভ্যতার সম্পর্কিত জ্ঞানের ফলাফল হিসেবেই দেখা হয়, তবে তাকে অবশ্যই যান্ত্রিক ব্যাখ্যার বাইরে গিয়ে দেখতে হবে। পরম কারণমূলক বলতে আমরা এখানে ধর্মতত্ত্বের জায়গা থেকে দেখবো না। ইতিহাসের ক্ষেত্রে পরম কারণবাদ হলো  কোন ঐতিহাসিক ঘটনার সাথে অন্য ঐতিহাসিক ঘটনার সম্পর্ক। এই কার্যকারণ সম্পর্ক অবশ্য এখনো মানুষের অজানা। 

 ১৮. মোটামুটিভাবে, জৈবিক, মনস্তাত্ত্বিক বা প্রাকৃতিক বিজ্ঞানের মতবাদ এবং পদ্ধতিগুলো ইতিহাসের জন্য কার্যকর নয়, ঠিক যেভাবে ইতিহাসের ফলাফল ও মতবাদগুলোকে  জীববিজ্ঞান চর্চায় উপেক্ষা করা হয়। 

বেশীরভাগ জীববিজ্ঞানীরা এই তত্ত্ব স্পষ্টভাবে অনুসরণ করেছেন, ফলস্বরূপ তারা সফল হয়েছেন। তাদের এই সফলতা ইতিহাসবেত্তাদের, বিশেষ করে সমাজবিজ্ঞানী, নৃবিজ্ঞানী ও তাত্ত্বিকদের তাদের নিজস্ব পদ্ধতি অনুসরণ না করে জীববিজ্ঞানীদের অনুকরণ করতে প্ররোচিত করেছে।

1 COMMENT

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here