সঙ্গীত কি আমাদের দারিদ্র্য ও অসমতার বোঝাপড়ায় প্রভাব রাখতে পারে?

[ডেভিড লুইস নৃবিজ্ঞানের একজন অধ্যাপক। তাঁর গবেষণার আগ্রহের জায়গা দক্ষিণ এশিয়ার রাজনৈতিক অর্থনীতি, এনজিও ও সুশীল সমাজ, গ্রামীণ উন্নয়ন ইত্যাদি। এর পাশাপাশি তিনি একজন মিউজিসিয়ানও। নৃবিজ্ঞানী ডেভিড লুইস কর্তৃক London School of Economics (LSE) -কে দেওয়া সাক্ষাৎকার অবলম্বনে লেখাটির অনুবাদ করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এসভি আনোয়ার আহমেদ।]

সঙ্গীত এবং উন্নয়ন অধ্যয়নের মধ্যে কী মিল রয়েছে? এই প্রশ্নে ডেভিড লুইস বলছেন, “আপনি যা ভাবছেন তার চেয়ে মিল অনেক বেশি।” ডেভিড লুইসের মূল কাজের জায়গা হল সামাজিক পরিবর্তনে গানের প্রভাব অনুসন্ধান করা।

আপনি সর্বশেষ কখন গান শুনেছিলেন? সম্ভবত আজকে সকালে রেডিওতে। অথবা গতকাল সুপারমার্কেটে যখন আপনি বাজার করছিলেন। সম্ভবত সম্প্রতি হাঁটার সময় আপনি হেডফোন ব্যবহার করেছিলেন অথবা সম্ভবত এখন আপনি অনলাইন ব্রাউজ করার পাশাপাশি কোনো প্লেলিস্ট শুনছেন।

অধ্যাপক ডেভিড লুইস বলেন, “সঙ্গীত খুবই বিস্তৃত একটি বিষয়। এটি আমাদের চারপাশ জুড়ে রয়েছে এবং এটি সকল সমাজ ও সামাজিক গোষ্ঠীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নির্মাণ করে।”

প্রফেসর লুইস তাঁর সহকর্মী প্রফেসর ডেনিস রডগার্স (গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট, জেনেভা) এবং প্রফেসর মাইকেল উলককের (বিশ্বব্যাংক এবং হার্ভার্ড) সাথে সাহিত্য এবং চলচ্চিত্রের পাশাপাশি সঙ্গীত এবং আন্তর্জাতিক বিকাশ সহ মানবিক অধ্যয়নের মধ্যকার সম্পর্ক বিষয় নিয়ে দীর্ঘ ১৫ বছর ধরে কাজ করছেন।

সম্প্রতি রোহিংটন মিস্ত্রির “A Fine Balance” নামক অত্যন্ত চমৎকার উপন্যাসটি পড়ে হঠাৎ আলোচনা করার সময় তাঁরা বুঝতে পেরেছিলেন যে সামাজিক বিজ্ঞানীরা প্রায়শই দারিদ্র্য এবং বৈষম্য সম্পর্কিত বিভিন্ন বোঝারপড়ার নির্মাণ ও প্রকাশে কথাসাহিত্যের মান এবং শক্তিকে অবমূল্যায়ন করেন। ফলে তাঁরা জনপ্রিয় সংস্কৃতি এবং উন্নয়ন সম্পর্কিত বিষয়াদির মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন।

"সঙ্গীত সমাজের চেহারাকে প্রতিফলিত করে এবং অন্যান্য সমস্তকিছুকেও। সঙ্গীত মানুষকে অবহিত এবং সংহত করে, তবে একইসাথে এটি অবশ্য আমাদের বিভক্তও করতে পারে।" 
বব ডিলান কীভাবে উন্নয়ন অধ্যয়নের জগতে অন্তর্দৃষ্টি দিতে পারেন?

অধ্যাপক লুইস এবং তাঁর সহকর্মীরা তাঁদের গবেষণাপত্রে সঙ্গীতকে প্রতিরোধে, উন্নয়ন হস্তক্ষেপ, সকলকিছুর বাজারায়ন এবং বিদেশী সহায়তা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্রশ্নে জনসাধারণের বোঝাপড়া গঠনে সহায়তা করার একটি শক্তি হিসাবে বিবেচনা করেছেন।

প্রফেসর লুইস বলেন “নৃবিজ্ঞানের ভিত্তিভূমিতে দাঁড়িয়ে আমি জ্ঞানের বিভিন্ন প্রণালীগুলো, সামাজিক এবং সাংস্কৃতিক বিকাশের দিকগুলি বুঝতে আগ্রহী।” লুইস আরো জানান যে তিনি গান শুনতে যেমন পছন্দ করেন তেমনি গান তৈরি করতেও ভালোবাসেন।

এই গবেষণাপত্রে গুরত্বারোপ করা একটি দিক হল ‘প্রতিবাদ’ হিসাবে সঙ্গীতের ভূমিকা, যেটি এমন একটি ফর্ম যা দীর্ঘকাল ধরে সামাজিক পরিবর্তনের জন্য আহবান জানিয়েছে এবং পরিবর্তনকে প্রতিফলিত করেছে। ১৯৪০-এর দশকে আফ্রিকায় বিউপনিবেশায়ন সংগ্রাম তীব্র হওয়ার সাথে সাথে ঘানার “high life” নৃত্য সঙ্গীত দৃশ্য ক্বামে নক্রুমাহ’র আত্ম-নির্ধারণের আন্দোলনে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছিল। ১৯৬০-এর দশকে বব ডিলান, জোয়ান বায়েজ এবং জন লেননের মতো শিল্পীরা পশ্চিমে যুদ্ধবিরোধী আন্দোলনের অংশ হয়েছিলেন। বর্তমানে সেনেগালের “Geji Hip Hop” নারীদের সম্মিলিতভাবে লিঙ্গ সহিংসতা প্রতিরোধের একটি প্লাটফর্ম।

লেখকরা দেখান ১৯৭০-এর দশকে কিভাবে যুক্তরাজ্যের “Rock Music” বর্ণবাদ আন্দোলনের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন- যেখানে বর্ণবাদ বিরোধী বার্তা প্রচারের জন্য মঞ্চ সঙ্গীত, ভ্রাম্যমাণ উৎসব, ভ্রমণ বা সফরের মাধ্যমে শিল্পীরা একত্রিত হয়েছিলেন এবং তাঁরা সংহতির রাজনীতি তৈরিতে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠেছিলেন। এই আন্দোলন উত্তর বিশ্ব (Global North) থেকে “Punk Rock” এর উদীয়মান ঐতিহ্যগুর সাথে দক্ষিণ বিশ্বের রেগে সঙ্গীতকে যুক্ত করেছিল এবং প্রতিরোধের বিভিন্ন উপ-সংস্কৃতিগুলিকে সংহত করতে কার্যকর ভূমিকা রেখেছিল।

১৯৮০-এর দশকের পরবর্তী সময়ের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আন্দোলনগুলো মূলত এই ভিত্তিকে পুঁজি করে গড়ে ওঠেছিল এবং যেটি মানুষকে বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন করেছিল; যেমন ১৯৮৮ সালে লন্ডনে বর্ণবাদবিরোধী কর্নসার্টে নেলসন ম্যান্ডেলাকে তাঁর সত্তরতম জন্মদিনের শ্রদ্ধা জানানো হয়।

প্রতিরোধের শিল্পঃ সঙ্গীত কিভাবে সংহতির রাজনীতি ছড়িয়ে দিতে পারে?

অধ্যাপক লুইস বলতে চান যে প্রতিবাদী সঙ্গীত কেবল এমন এক মাধ্যম নয় যার মাধ্যমে সংহতির রাজনীতি প্রকাশ করা যায়, এর পাশাপাশি এটি এমন একটি প্রণালীও যার মাধ্যমে বৈষম্য এবং অবিচার বিষয়ক ধারণাগুলিকে ব্যাপক মানুষের কাছে সহজে পৌঁছে দেয়া সম্ভব হতে পারে।

প্রকৃতপক্ষে, তিনি (প্রফেসর লুইস) মনে করেন যে রাজনৈতিক সঙ্গীত তাঁর প্রথম জীবনে বেশ প্রভাব ফেলেছিল। “Rock Against Racism”-এর মতো আন্দোলন ছিল বিশ্ব সম্পর্কে শেখার এক দারুণ উপায় এবং এই ধরণের আন্দোলন গঠনমূলক রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়া এবং বিশ্ব নাগরিক হওয়া বলতে সত্যিকার অর্থে আসলে কী বোঝায় তা নিয়ে চিন্তাভাবনা করতে শেখার জন্য কার্যকরী ছিল।”

সাম্প্রতিক সময়ে ট্রাম্পবিরোধী এবং ব্রেক্সিট বিরোধী সুরগুলির জনপ্রিয়তা অর্জনের সাথে সাথে কিন্তু অশান্ত রাজনৈতিক পরিস্থিতির সময়ে প্রতিবাদী সঙ্গীত একটি অসাধারণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। রাশিয়ান নারীবাদী “Punk Collective Pussy Riot” নিয়মিত পুতিনের শাসনকে সমালোচনা করা গানকে শিরোনাম করছে।

"The Concert for Bangladesh" সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কিন্তু আপনি দেখবেন যে কিভাবে এটি বাংলাদেশকে ‘তৃতীয় বিশ্বের’ ক্ষুধা ও বিপর্যয়ের এক স্থান হিসাবে অত্যন্ত বাজেভাবে নির্মিত করেছিল।" 

প্রতিবাদী সঙ্গীত সাধারণত রাজনৈতিক বার্তাপ্রদাণের সাথে যুক্ত হলেও গবেষক দলটি সেই ঐতিহ্য এবং তহবিল সংগ্রহের উদ্দেশ্যে সঙ্গীত ব্যবহারের মধ্যে একটি সাধারণ পার্থক্য তৈরি করে।

প্রাক্তন বিটলস গায়ক জর্জ হ্যারিসন এবং ভারতীয় সঙ্গীতশিল্পী রবি শঙ্কর আয়োজিত “The 1971 Concert for Bangladesh” এর মতো সঙ্গীতানুষ্ঠানগুলো মূলত তহবিল এবং সংস্থান জোগাড় করার জন্য পরিচালিত হয়েছিল। তবে গবেষকরা দেখতে পেয়েছেন যে কনসার্টটি আন্তর্জাতিক সংহতির প্রগতিশীল বার্তাগুলি প্রকাশ করা এবং কনসার্টের পাশাপাশি অনাহারী মানুষের চিত্রগুলি তুলে ধরার চেষ্টা করলেও সেই সংকটের পিছনে লুকিয়ে থাকা অন্তর্নিহিত কাঠামোগত বা রাজনৈতিক অবস্থার সাথে জড়িত হতে তাঁরা (সঙ্গীতশিল্পীরা) ব্যর্থ হয়েছিলেন।

প্রফেসর লুইস উল্লেখ করেন “Concert for Bangladesh” বাংলাদেশের রাজনৈতিক ও মানবিক ইস্যু সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে একটি সাংস্কৃতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ছিল; তবে একইসাথে আপনি এটিও দেখতে পাচ্ছেন যে কিভাবে এটি সেই দেশকে অন্যায্যভাবে ক্ষুধা ও বিপর্যয়ের স্থান, নিষ্ক্রিয় স্টেরিওটাইপ করা, ‘তৃতীয় বিশ্বের’ বিবরণে পরিণত করা এবং “Live Aid” মতো আরও সন্দেহজনক বিভিন্ন অনুষ্ঠান বা উদ্যোগগুলোকে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছিল।”

আর্ট ফর্ম হিসাবে জনপ্রিয় সংস্কৃতিকে সামাজিক পরিবর্তনের প্রচারক ও বাণিজ্যিক পণ্য -এই উভয় দিক দিয়ে বিবেচনা করার যে ঝামেলা তা নিয়ে গবেষকরা চিন্তা করতে আগ্রহী। “সঙ্গীত সমাজের চেহারাকে প্রতিফলিত করে এবং অন্যান্য সমস্তকিছুকেও। সঙ্গীত মানুষকে অবহিত ও সংহত করে; তবে একইসাথে এটি অবশ্য আমাদের বিভক্তও করতে পারে।”

সঙ্গীত সংযোগ তৈরি করতে এবং বাধা ভেঙে ফেলার ক্ষমতা রাখে 

এটি বিবেচনা করেই অধ্যাপক লুইস ‘বিশ্ব সঙ্গীত’-এর উদাহরণ টেনে আলোচনা করেন, যেটি ১৯৮০-এর দশকে তৈরি হওয়া একটি মার্কেটিং বিভাগ। এবং একদিকে তিনি এটাও বলতে চান যে এই শ্রেণীকরণ আসলে অপশ্চিয়া সমাজের সংস্কৃতিকে পণ্যায়িত করেছে। তবে এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে নতুন বোঝাপড়া এবং ধারণার সংস্পর্শ প্রদাণের মাধ্যমে সঙ্গীত সাংস্কৃতিক আদান-প্রদানের সুবিধা দেয়ার ক্ষমতা রাখে। তবে লুইস এও বলেন যে এসব দ্বন্দ্বগুলি সর্বদাই বিদ্যমান থাকবে।

হেনরি ওয়েডসওয়ার্থ লংফেলোয়ের বিখ্যাত লাইনটির কথা বলা যায়- “সঙ্গীত মানবজাতির সর্বজনীন ভাষা”, গবেষকরা বলেন যে সঙ্গীত বাধা ভেঙে ফেলতে এবং আবেগ এবং সংহতি প্রকাশের মাধ্যমে মানুষকে অর্থপূর্ণভাবে যোগাযোগ করতে সক্ষম করে তোলে। আশঙ্কাময় এবং অনিশ্চিত সময়ে; সম্ভবত সঙ্গীতই এমন জিনিস, যা আমাদের একত্রিত করতে পারে।

মূল লেখা

Related Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

লেভিস্ত্রসের চিন্তা ও পুরাণের কাঠামোগঠন

ক্লদ লেভিস্ত্রস নৃবিজ্ঞান মহলে এক অন্যতম পুরোধা ব্যক্তিত্ব। নৃবিজ্ঞানে ভাষাতত্ত্ব ও কাঠামোবাদ তত্ত্বের সাথে তার নাম জড়িয়ে আছে।...

প্রথম বছর পূর্তি এবং কিছু নির্বাচিত লেখা

১৩ নভেম্বর ২০২০ সাল,এনথ্রোসার্কেল পূর্ণ করেছে তার পথচলার এক বছর। এক বছর আপনাদের যতটুকু ভালোবাসা আমরা পেয়েছি তা সত্যিই আশার অতীত...

জেমস ফ্রেজার ও তার তত্ত্ব

জেমস ফ্রেজার ১৮৫৪ সালের ১ লা জানুয়ারি স্কটল্যান্ডের গ্লাসগোতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি গ্লাসগো ইউনিভার্সিটি...

দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।...

বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

'বর্জন' কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য  এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস...