বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

[শকুন্তলা ব্যানাজির লেখা লন্ডন স্কুল অফ ইকোনমিক্সের ব্লগে প্রকাশিত ‘Cancel Culture and Historical Silencing’ প্রবন্ধটি এনথ্রোসার্কেলের জন্য অনুবাদ করেছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী এসভি আনোয়ার আহমেদ।]

‘বর্জন’ কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য 

এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস আগে ইংল্যান্ড দলের তরুণ কৃষ্ণাঙ্গ খেলোয়াড়দের বিরুদ্ধে বর্ণবাদী জনবিদ্বেষের দাবানল ছড়িয়ে পড়েছিল, যার ফলে বর্ণবাদী ভক্তদের ম্যাচ থেকে ‘নিষিদ্ধ’ করে দেয়ারও আহ্বান জানানো হয়েছিল। ঠিক একই সময়ে আমার সহকর্মী পল ডোলানের ডাক-র‍্যাবিট পডকাস্টে “বাকস্বাধীনতা” শিরোনামে একটি পর্বের আলোচনায় আমি অংশগ্রহণ করেছিলাম। উক্ত আলোচনা চলাকালীন সময়ে, আমরা বারবারই “বর্জন সংস্কৃতি” শব্দযুগল ব্যবহার করছিলাম। কখনও সেটি রাজনৈতিক কালা কানুনের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া সেন্সরশিপ অর্থ হিসেবে, কখনও আবার আন্ডারডগ বা বঞ্চিতদেরকে বাতিল করে দেয়ার অর্থে। এই শব্দযুগল অর্থাৎ বর্জন সংস্কৃতি বা কেউ কেউ বলবে এটিকে নিন্দা চর্চা, এর  ইতিহাস এবং প্রয়োগ নিয়ে একটি আক্রমনাত্মক বিতর্কে জড়িয়ে পড়ছিলাম আমরা। আলোচনাটি বেশ বিস্তৃত হয়ে উঠলেও, এটি কেবলমাত্র একটি বরফখন্ডের উপরিভাগই ছিল বটে, অন্যদিকে আমাদের আলোচ্য বিষয়, অর্থাৎ বাকস্বাধীনতার রাজনীতিকরণ এবং ডানপন্থী ও বিভিন্ন ডানপন্থী সংগঠনের দ্বারা এই বাকস্বাধীনতার ধারণাকে বিতর্কিত করে তোলার যে রাজনৈতিক পায়তারা, সেটি নিয়েও আলাপটি বেশিদূর আগানো যায়নি।

কারা জনসম্মুখে কথা বলার অধিকার পাবে এবং কী কী শর্ত মেনে সেই অধিকার চর্চা করা যাবে এই সম্পর্কিত বিতর্কগুলোর ক্ষেত্রে সবসময়েই অধিক সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়। কারন এই ব্যাপারগুলো একেবারেই রাজনীতির কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু এবং কীভাবে আমরা আমাদের সমাজকে সাজাবো সেই বিষয়টির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। অতএব, বর্জন বা বাতিল করে দেয়ার ব্যাপারটির বৈধতা নিয়ে যে মুর্হুমুহু প্রশ্নের উত্থাপন হয়ে থাকে (অথবা লিসা নাকামুরার ভাষায় বলতে গেলে “সাংস্কৃতিক বর্জন”), তা নিয়ে অবাক হবার কিছু নেই। এছাড়াও, বাতিল হয়ে যাওয়া কিংবা বর্জিত হওয়া নিয়ে ভীতি ও উদ্বেগও ক্রমবর্ধমানভাবে ব্যাপক আকার ধারণ করে চলেছে।

তবে এত হট্টগোলের ভেতরেও, ‘বর্জন করা’ বলতে কী বুঝায় তা নিয়ে কেউই একমত হতে পারছে না। যদিও বর্জন করা ব্যাপারটি বেশ কিছুবছর ধরেই আমাদের গণমন্ডলে চর্চিত হয়ে আসছে। বিশেষ করে ২০১৯ সনে Vox পত্রিকা এ নিয়ে একটি বিস্তারিত লেখা ছাপিয়েছিল। তবে ক্যান্সেল কালচার বা বর্জনের সংস্কৃতি সবথেকে বেশি নজর কেড়েছিল ২০১৭ সন বা এর কিছু সময় পর থেকে। যখন ডানপন্থী রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বরা এই ব্যাপারটি নিয়ে রাজনৈতিক পায়তারা শুরু করে এবং একই সময়ে #MeToo আন্দোলনও চোখের পড়ার মত গজিয়ে উঠেছিল। এই পর্যায়ে ডিজিটাল কালচার বিশেষজ্ঞ পিপা নরিসের একটি সংজ্ঞাকে স্মরণ করা যেতে পারেঃ

” ‘সাংস্কৃতিক বর্জন’ প্রত্যয়টিকে বিস্তৃত অর্থে সামাজিক নিয়ম লঙ্ঘনের দরুণ কাউকে একঘরে করে দেয়ার তৎপরতা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা যেতে পারে। আরও নিদির্ষ্ট করে বলতে গেলে, “কোন বিশেষ জনব্যক্তিত্ব কিংবা কোম্পানিসমূহ দ্বারা সংঘটিত আপত্তিকর বা আক্রমনাত্মক কর্মকাণ্ডের জন্য তাদের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহার ও তাদেরকে বর্জনের চর্চাকে বোঝানো যেতে পারে” [Lizza, 2020]। এই চর্চাটি অনেকটা পণ্য বর্জনের রাজনৈতিক কৌশলের মতই… যা রাজনৈতিক এক্টিভিজমের ক্ষেত্রে অহরহ লক্ষণীয়।”   

তবে সামাজিক প্রথাসমূহ কখনোই স্থায়ী কিছু নয়। প্রায়শই সামাজিক প্রথার অন্তরালে অমানবিক, হিংস্র আচার ও আচরণসমূহ নিহিত থাকতে পারে। বর্জনের সংস্কৃতিকে বুঝতে গেলে, এর পেছনে রাজনীতিকে ব্যাখ্যা করতে গেলে- দমনপীড়ণের ইতিহাস, আন্দোলন বানচাল, শ্রমিকশ্রেণির সংগঠনসমূহকে নস্যাৎ করে দেয়া, আন্দোলনের ওপর গুলি চালানো, জলকামান ও টিয়ার গ্যাসের উৎপাত ইত্যাদি বিবিধ কায়দা, যা গণতান্ত্রিক আন্দোলনকারী, এক্টিভিস্ট এবং হুইসেল ব্লোয়ারদের বিপরীতে ব্যবহার করা হয়, সেগুলোর সাথে সংযুক্ত করে এই বর্জনের সংস্কৃতির বিশ্লেষণ বেশি জরুরী। রাষ্ট্রযন্ত্রের বিবিধ অঙ্গ, যেমন মিডিয়া, আইনের হাত এবং রাষ্ট্রপক্ষীয় গুন্ডারা প্রায়শই অধিকার সচেতন এক্টিভিস্টদের ওপর যে হামলা চালিয়ে থাকে, সেটিকে এই ক্যান্সেল কালচার বা বর্জন সংস্কৃতি নামক শব্দটির সাথে যুক্ত করা হয় না। কিছুদিন আগে, ইন্ডিয়ার মিডিয়াতে যখন যৌন নিপীড়কদের বিরুদ্ধে সাড়াশি অভিযান চলেছিল এবং তাদেরকে বর্জন করা হচ্ছিল; তখন আমি এই বিষয়টিকে কীভাবে দেখি সেটি জানতে চাওয়া হয়েছিল। আর এই বিষয়টিকে আমি কীভাবে দেখতে পারি সেটি নিশ্চিত হওয়ার জন্যই আমি পুরোনো ইতিহাস ঘাটা শুরু করলাম। অর্থাৎ, অতীতের যেসব বয়কট কেন্দ্রিক আন্দোলন বা বর্জন আন্দোলন হয়েছিল, সেগুলোর উদ্দেশ্য ও অর্জন খতিয়ে দেখা, কারন বিশ্লেষণ করা। বিশেষ করে দক্ষিণ আফ্রিকায় এপার্থিড বা মুক্তির আন্দোলন উল্লেখযোগ্য। 

দমনপীড়ণের ইতিহাস- জাতপ্রথা, উপনিবেশিকতা, দাসপ্রথা এসবের বিরুদ্ধে বিউপনিবেশিক আন্দোলন, সিভিল রাইট্‌স মুভমেন্ট ইত্যাদি বিষয় নিয়ে বোঝাপড়ার মাধ্যমে অন্তত এটুকু ইঙ্গিত পাওয়া যায় যে, এসব বিতর্ক ও আন্দোলনের পেছনে প্রায়শই বাস্তব রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তি কাজ করে থাকে। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায়, এই বর্জন সংস্কৃতির উৎপীড়ন সংঘটনকারীরা ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক কিংবা অত্যাচারিত জনগোষ্ঠির সদস্য হয়ে থাকে; অথবা একইসাথে প্রান্তিক ও অত্যাচারিত। এর মানে এই নয় যে, তারা ভুল বা তারা দোষী, বরং এটি ঐতিহাসিকভাবে তাদের মধ্যে অন্তর্নিহিত ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশকেই বৈধতা প্রদান করে মাত্র।

অন্যদিকে, ক্রিস প্রাট, জেরেমি ক্লার্কসন এবং লরেন্স ফক্সদের মত রাঘব বোয়াল সেলিব্রেটিদের বিরুদ্ধে “বর্জিত হওয়ার” ব্যাপারটি নিয়ে যখন মিডিয়া সরগরম হয়ে উঠেছিল; তখন তাদের সহকর্মীরা এই বিষয়গুলোকে চেপে যাওয়ার জন্য অনুরোধ করেছিল। এছাড়াও, বর্জন সংস্কৃতির দ্বারা কোনঠাসা এসব সেলিব্রেটিদেরকে যখন ব্যক্তিগত পরিমন্ডলে এসব নিয়ে প্রশ্ন করা হয়ে থাকে, তারা যে ভাষা ও আচরণ এর মাধ্যমে অন্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে তার হিসেব চাওয়া হয়; তখন এরা খুব কমই স্বীকার করেন যে তারা এমনটিই করতে চেয়েছিলেন। অল্প সময়ের মধ্যেই গণমাধ্যম ও সামাজিকভাবে নেতিবাচক প্রচারের গেরাকলে ফেঁসে যাবার পর, অনেক রাঘব বোয়ালরাই তাদের  ইজ্জত রক্ষার্থে আইনী ও নানাবিধ পন্থার আশ্রয় নেন। বেশিরভাগ সময়েই দেখা যায়, এর ফলে বরং তারা আরও বিখ্যাতই হয়ে ওঠেন এবং আরও ভাল ভাল কাজের সুযোগ উন্মোচিত হয়ে যায় তাদের সামনে। এই ধরনের পরিহাসমূলক ফলাফলকে ড্যানিয়েল বাটলার নামাঙ্কিত করেন “ডগ হুইসেল” বলে। রাঘব বোয়ালদের কাত করতে গিয়ে পুরো ব্যাপারটিই শেষ পর্যন্ত চোরের মা এর বড় গলা’র মত একটি ব্যাপারে পরিণত হয়। অর্থাৎ, ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর দ্বারা কম ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর টুটি চেপে ধরে কণ্ঠ রোধ করার যে প্রবণতা, সেটি কিন্তু ইতিহাসে একেবারে নতুন কিছু নয়।

বহুমাত্রিক প্রত্যয়টির একটি রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট 

২০২০ সালে, “Black Lives Matter ” বিক্ষোভ যখন উত্তাল পর্যায়ে, যেখানে ক্ষমতাসীন ব্যক্তিদের পক্ষ থেকে ‘সম্মিলিত আত্ম-প্রতিফলনের’ মতো কিছু একটা আহ্বান করা উচিত ছিল, তখন হার্পারের পত্রিকা তথাকথিত বর্জন সংস্কৃতির বিপদগুলির জন্য শোক প্রকাশ করে একটি খোলা চিঠি প্রকাশ করেছিল। স্বাক্ষরকারীদের মধ্যে কেউ কেউ আগে অবশ্য সামাজিক ন্যায়বিচারের কারণকে সমর্থন করেছিল, যেটি কিনা চিঠিটিকে কিছু বাহ্যিক বৈধতা দিয়েছিল। ‘অসম শাস্তি’ এবং ‘বিতর্কের নিষেধাজ্ঞা’ বিষয়ে সর্বনাশী বক্তব্যে পূর্ণ চিঠিটি ডানপন্থী বক্তৃতার একটি প্রধান অসঙ্গতিপূর্ণ বাক্যালংকারে পরিণত হয়েছিল; এবং এই ধারণাটি তৈরি হয়েছিল যে বামপন্থীদের স্ব-উদাসীন এবং জেগে ওঠা বিভিন্ন উদারপন্থীদের একটা সেন্সরীয় বাহিনী (কখনও কখনও সম্মিলিতভাবে যাকে বলা হয় সোশ্যাল জাস্টিস ওয়ারিয়র্স বা এসজেডব্লিউ) প্রকৃত দেশপ্রেমিকদের অধিকারে হস্তক্ষেপ করছে।

স্পষ্টভাবে বলতে গেলে, মানুষকে তাদের মতামত, পছন্দ এবং/অথবা তাদের পোশাকের জন্য কাজ থেকে নিষিদ্ধ করার সংস্কৃতি অত্যন্ত সাধারণ; যেহেতু কর্মক্ষেত্রে বোরখা পরা ব্যক্তিরা চাকরি হারাচ্ছেন বা  তাঁরা ফ্রান্সে বিতর্কের কেন্দ্রে রয়েছেন এবং যাঁরা ফিলিস্তিনিদের জন্য ন্যায়বিচার পেতে চেষ্টা করছেন তাঁরা গণমাধ্যমে রাজনৈতিক বিরোধীদের দ্বারা নির্মমভাবে লজ্জিত হয়ে থাকেন এবং এমনকি তাঁদের বিরুদ্ধে “Prevent In the UK”-এর মাধ্যমে পুলিশে রিপোর্ট করা হয়। তথাপি, সাধারণত যখন নিষিদ্ধ করার আহ্বানগুলি নাগরিক অধিকার এবং রাজনৈতিক শুদ্ধতার সাথে যুক্ত হয় তখন অবশ্য ‘মব-মানসিকতা’, ‘অনলাইন লিঞ্চিং’ এবং ‘সামাজিক মৃত্যু’ এর মতো হাইপারবোলিক বাক্যাংশগুলি দিয়ে ঐতিহাসিকভাবে নিপীড়িত এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর প্রতি পক্ষপাতমূলক কথা ও কর্মের জন্য বিভিন্ন সেলিব্রিটিদের বা রাজনীতিকদের জবাবদিহি করতে বলা হয়। হার্পারের চিঠিটি অবশ্য সমালোচিতও হয়েছিল, বিশেষত পণ্ডিত এবং মন্তব্যকারীদের কাছ থেকে, যাঁদের ক্ষমতা কাঠামো নিয়ে অনেক গভীর বোঝাপড়া এবং সেন্সরশিপ, বৈষম্য এবং ঘৃণার ইতিহাস সম্পর্কেও গভীর ধারণা ছিল।

সর্বদাই কিছু গোষ্ঠীর কণ্ঠরোধ করার ঐতিহাসিক চর্চা 

‘বাতিল সংস্কৃতি’ বা “বর্জন সংস্কৃতি”- এর বিরোধপূর্ণ উৎপত্তিস্থলের সবচেয়ে সংক্ষিপ্ত এবং অভিগম্য অংশগুলির মধ্যে একটি হল ”Aja Romano 2021”-এর বাতিল সংস্কৃতির দ্বিতীয় তরঙ্গ; ধারণাটি যেভাবে বিভিন্ন মানুষের কাছে বিভিন্ন জিনিস বোঝানোর জন্য বিকশিত হয়েছে। রোমানো লক্ষ্য করছেন যে যখন সর্বজনীন এবং ব্যক্তিগত বক্তৃতার সীমানা সবসময়ই প্রতিযোগিতামূলক ছিল, সম্প্রতি আরও অনেকেই  যাঁরা ঐতিহ্যগতভাবে জনসাধারণের বক্তৃতা এবং বিতর্ক থেকে বাদ পড়েছেন তাঁরা কথা বলছেন, উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এবং শতাব্দীর বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্তদের কাছ থেকে অধিকার দাবি করতে শুরু করেছেন। যদি আমরা একটি ঐতিহাসিকভাবে প্রান্তিক এবং নিপীড়িত গোষ্ঠীর হয়ে থাকি, যদি আমরা কৃষ্ণাঙ্গ হই অথবা প্রাথমিকভাবে সাদা নেতৃত্বাধীন জাতিতে অন্য কোন বর্ণের সম্প্রদায় থেকে এবং/অথবা একটি সুবিধাবঞ্চিত জাতি, ধর্মীয় বা শ্রেণী পটভূমি থেকে, পুরুষ আধিপত্যের অধীনে একজন নারী, এবং/অথবা নিউরোডাইভার্স হয়ে থাকি এবং ঐতিহ্যগতভাবে ধনী, নিউরোটাইপিক্যাল, সংখ্যাগরিষ্ঠ জাতিগত বা ধর্মীয় পটভূমির লোকদের দ্বারা তৈরি চাকরি খোঁজার চেষ্টা করে থাকি, সেক্ষেত্রে সম্ভবত সফল হওয়ার জন্য আমাদের নীরব বা নিজেদেরকে সীমাবদ্ধ রাখতে হয়েছিল। এটি হতে পারে আমাদের কিছু আবেগ এবং আকাঙ্ক্ষাকে সংশোধন বা দমন করার চেষ্টা করে, বৈষম্যের শিকার হওয়ার গ্লানি এবং মানসিক আঘাতকে উপেক্ষা করে, অথবা এমনকি একটি প্রতিষ্ঠিত শক্তিশালী গোষ্ঠীর মতো করে কথা বলার এবং পোশাক পরার মাধ্যমে আমাদের চেহারা এবং আচরণকে ছদ্মবেশ দেওয়ার চেষ্টা করে।

আমরা যদি এমন কিশোর বা তরুণ প্রাপ্তবয়স্ক হয়ে থাকি যাঁরা কিনা বেশিরভাগ রক্ষণশীল সম্প্রদায়ের এবং আমরা আমাদের লিঙ্গ বা যৌন পরিচয় নিয়ে প্রশ্নবিদ্ধ থাকি, আমরা সম্ভবত নিজেদেরকে পুলিশিং এবং সেন্সর করছি কিংবা স্ব-উপস্থাপনার বিশেষ এক রুপান্তরে নিজেরা বাধ্য হচ্ছি। এটি সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ পরিবার বা কমিউনিটি স্পেসে ঘটতে পারে। এইসকল প্রত্যাশিত কাজগুলিকে না করা আসলে একেবারে “অপ্রত্যাশিতভাবে নিজেকে” তৈরি করা, চাকরি না পাওয়ার সম্ভাবনা বৃদ্ধি পাওয়া, গৃহহীনতা, বা চরম শারীরিক এবং মানসিক সহিংসতা, হতাশা এবং উদ্বেগের কারণ হতে পারে।

যদিও এই বিষয়টায় বেশি জোর দেওয়া অনেক বেশি সহজ হবে যে কোনো সাধারণ বা সচ্ছল মানুষ সোশ্যাল মিডিয়া ‘পাইল অন’-এ ধরা পড়েন না এবং অবশ্য আমরা সামাজিক এবং মূলধারার মিডিয়া নির্মিত ডিসকোর্সকে কম দোষযুক্ত করার জন্যও  তেমন খুব একটা কিছু করতে পারি না এবং একইভাবে এটা ভাবাটাও বিভ্রান্তিকর যে নীরবতার সংস্কৃতি (যাকে এখন বাতিল সংস্কৃতি বলা হয়) উদারপন্থী অনলাইন বা বামপন্থীদের বিশেষ অধিকার। ট্রলিং, ফ্লেমিং, ডক্সিং এবং সহিংসতার জন্য উসকানি হল সোশ্যাল মিডিয়া ঘৃণার কেবল কিছু উদাহরণ বা রুপ; যেটি কিনা অনেক নারী এবং জাতিগত বা ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের বিভিন্নভাবে চুপ করিয়ে রাখে বা তাঁদেরকে সামজিক কিংবা জনপরিসরের বাইরে ঠেলে দেয়। 

অগ্রণী পদক্ষেপ

আমি মনে করি না যে এর কোনো সহজ উপায় বা উত্তর আছে, এবং ভারসাম্যপূর্ণ বাক স্বাধীনতার লড়াইয়ের পাশাপাশাই জীবনের অধিকারের মতো অন্যান্য স্বাধীনতার জন্যও সবসময়ই আমাদেরকে লড়াই করার প্রয়োজন হবে। যাই হোক, আমরা অনেকেই আমাদের পরিচয়ের কিছু দিকের মাধ্যমে (যোগাযোগমূলক এবং অন্যান্য অঙ্গনে) যেসব সুযোগ-সুবিধা উপভোগ করি সে সম্পর্কে বোঝার ক্ষেত্রে আমাদের বেশ উদাসীনতা রয়েছে, যখন আমরা সাধারণত অন্যদের দ্বারা বিভিন্নভাবে দমনের শিকার হওয়ার উপায়গুলো সম্পর্কে গভীরভাবে সতর্ক থাকছি, উপায়গুলো বুঝতে চেষ্টা করছি। 

একটি অব্যক্ত কিংবা অনির্ধারিত গোষ্ঠীগত কুসংস্কার বা শোনার পরিবর্তে অন্যের জন্য কথা বলার প্রবণতার কারণে আমরা কাউকে ক্ষতি করেছি এমনটা আবিষ্কার করা কিন্তু গভীরভাবে অস্বস্তিকর হতে পারে। ব্যক্তিগতভাবে বা সোশ্যাল মিডিয়ার দ্রুত ও সর্বব্যাপী যানবাহনের মাধ্যমে এই বিষয়ে প্রকাশ্যে আহ্বান জানানো অপমানজনক হতে পারে এবং উদ্বেগ সৃষ্টি করতে পারে; চাকরি বা চুক্তি হারানোর ক্ষেত্রে এটি একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতার কারণ হতে পারে। কিন্তু লজ্জা এবং অস্বস্তি বা বিশ্বাসঘাতকতা এবং বিরক্তির সেই অভিজ্ঞতাগুলি কেবল ক্রমাগত বৈধ কাঠামোগত এবং ব্যক্তিগত কুসংস্কার, বৈষম্য এবং নিপীড়নের প্রাপক হওয়ার সমতুল্য হতে পারে না; এবং তাঁরা ক্ষমতার পদে থাকা ব্যক্তিদের এবং তাঁদের বিভিন্ন অনুসারীদের, যাঁরা কিনা স্পষ্টভাবে অন্যদের হেয় করেন, এই ধরনের কুসংস্কারকে সমর্থন করেন এবং/অথবা সহিংসতার ইন্ধন দিয়ে থাকেন, তাঁদের জবাবদিহিতা এবং পরিণতি এড়াতে অনুমতি দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো কারণ হতে পারে না।

আমরা যখন অন্যদের জন্য নিজেদের এবং ক্ষমতায় থাকা ব্যক্তিদের জবাবদিহি করার এবং সম্মিলিত মুক্তিমূলক পরিবর্তনের দিকে কাজ করার কথা বলি তখন আমরা সেটা অনেকেই আরও ভালো করতে শিখতে পারি। কিভাবে তাঁরা কথা বলতে পারেন এবং বলতে পারেন না তা অন্যদের না জানিয়ে বরং আমরা কীভাবে কথা বলি এবং আমরা যা বলি তা (অনলাইনে এবং অফলাইনে) কিভাবে অন্যদের ক্ষেত্রে মানসিক স্বাস্থ্যের উপর প্রভাব ফেলে এবং সেগুলো কতটা ফলপ্রসূ হয় কি হয় না সেদিকে বরং আমরা আরো বেশি করে মনোযোগ দিতে পারি। রাজনৈতিক তর্কযুদ্ধগুলো ইন্টারনেটের অনেক আগে থেকেই সংহতির জন্য ক্ষতিকর ছিল।

অন্য কোনো সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যদের প্রতি নির্দয়ভাবে, ইচ্ছাকৃতভাবে কিংবা ঠিক এমনভাবে আচরণ করা যা ধারাবাহিকভাবে তাঁদের বিভিন্নভাবে অমানবিকরণ বা হয়রানি ও অধিকার লঙ্ঘন করে এবং কারো ক্ষেত্রে আপেক্ষিক ধ্বংসাত্মকতা যেগুলোকে কিনা শেখার, সংগঠিত করার এবং মূল্যায়ন করার জন্য আমাদের পর্যাপ্ত সময় এবং স্থান প্রয়োজন। সহানুভূতিশীল, প্রেমময় এবং সমালোচনামূলক শ্রেণীকক্ষ যেখানে শিক্ষার্থীরা অবস্থান করবেন এবং যেটি তাঁদের জন্য বিদ্যমান এই ধরনের অস্বস্তিকর প্রচেষ্টাগুলোকে বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ স্থান হতে পারে, যেমন পাণ্ডিত্যপূর্ণ কাগজপত্র, কল্পনাশক্তিসম্পন্ন কথাসাহিত্য এবং সামাজিক আন্দোলন; গত তিন দশক ধরে আমি আমার শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে, পড়ার মাধ্যমে এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের কাছ থেকে প্রচুর পরিমাণে শিখেছি এবং তাঁদের সঙ্গে কাজও করেছি। 

সাংস্কৃতিক এবং রাজনৈতিক বয়কটের মাধ্যমে ব্যক্তি ও রাষ্ট্রকে জবাবদিহিমূলক হিসেবে দেখানোর প্রেরণা আসলে বর্ণবাদী, ঔপনিবেশিক, নারীবিদ্বেষী, চরম শ্রেণীবাদী, এবং সমকামবিদ্বেষী নীরবতার চলমান ইতিহাস থেকে উদ্ভূত হয়। তথাকথিত ‘বাতিল সংস্কৃতি’ দ্বারা ব্যক্তি এবং সামগ্রিকভাবে গণতন্ত্রের জন্য যে বিপদগুলি রয়েছে তার একটি ধারাবাহিক এবং সত্যিকারের প্রতিক্রিয়াশীল পরীক্ষা কিন্তু এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারে নাই যে এর ক্ষতি এবং বিপদগুলি অব্যাহত ইতিহাস এবং কাঠামোগত কুসংস্কার, বৈষম্য, অমানবিকরণ এবং সহিংসতার অভিজ্ঞতার বিপরীতে সচেতনভাবেই ক্ষতিকারক।

মূল লেখা

Related Articles

দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।...

বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

'বর্জন' কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য  এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস...

নৃবিজ্ঞান ও কতিপয় কেন্দ্রীয় প্রত্যয়

নৃবিজ্ঞান কী? সহজ ভাষায় বলতে গেলে 'মানুষ' (Humankind) এবং মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কিত অধ্যয়নই নৃবিজ্ঞান।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here

- Advertisement -

Latest Articles

দ্যা মেথডস অফ এথনোলোজি- ফ্রাঞ্জ বোয়াস

শেষ দশ বছরে ধরে সভ্যতার ঐতিহাসিক বিকাশের ব্যাপারগুলো পর্যালোচনা করার পদ্ধতিগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন এসেছে।...

বর্জন সংস্কৃতি এবং কণ্ঠরোধের ঐতিহাসিক চর্চা

'বর্জন' কী এবং শব্দটি ব্যবহারের তাৎপর্য  এপ্রিল ২০২১ সালে, ইউরো ২০২০ ফাইনালের মাত্র কয়েক মাস...

নৃবিজ্ঞান ও কতিপয় কেন্দ্রীয় প্রত্যয়

নৃবিজ্ঞান কী? সহজ ভাষায় বলতে গেলে 'মানুষ' (Humankind) এবং মানুষের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যত সম্পর্কিত অধ্যয়নই নৃবিজ্ঞান।

ফরেনসিক নৃবিজ্ঞানঃ সংক্ষিপ্ত পরিচয়

বিংশ শতাব্দীতে নৃবিজ্ঞানের যেসকল নব নব ক্ষেত্র বা উপশাখা পরিস্ফুটিত হয়েছে, তন্মধ্যে ফরেনসিক এন্থ্রোপোলজি বা ফরেনসিক নৃবিজ্ঞান অন্যতম।...

সামাজিক বাস্তবতা নির্মাণে প্রতীকী নৃতত্ত্বের ভূমিকা

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি যে এই প্রকৃতির সকল ঘটনাকে সকল মানুষ একইভাবে ধারণ করে কিনা? একজন সাহিত্যিক...