‘এলিয়েনরা পিরামিড তৈরি করেছিল?’ এবং অন্যান্য বর্ণবাদী তত্ত্ব

[‘Did Aliens Build the Pyramids? And Other Racist Theories’ মূল লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিল সাপিয়েন্সের ওয়েবসাইটে। এনথ্রোসার্কেলের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন সারোয়ার রাফি।]

জুন মাসের এক বিকেলে আমার ইনবক্সে “আটলানটিস রাইজিংঃ দ্যা রিসার্চ গ্রুপ” থেকে একটা মেইল পেয়েছিলাম। উহাদের ব্লগ এবং ইউটিউব চ্যানেল “অর্থোডক্স চিন্তাকে চ্যালেঞ্জ” করার দাবি করবার পাশাপাশি প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে যা “এখনো একাডেমিয়া কর্তৃক বৃহৎভাবে উপেক্ষিত” সেই মানব ইতিহাস সম্পর্কিত প্রশ্নগুলো বিশ্লেষণ করে। প্রশ্নগুলোর নমুনা এমনঃ “এলিয়েনেরাও কি এতে জড়িত ছিলো?”

এ সমস্ত সংগঠনগুলিকে প্রত্যাখান করা সহজই যারা কিনা কাল্পনিক ষড়যন্ত্র তত্ত্ব প্রচার করে এবং নিজেদেরকে গোপন জ্ঞানের অনুসন্ধানকারী হিসাবে উপস্থাপন করে। কিন্তু ইমেইলের যে ব্যাপারটি আমার মনোযোগ আর্কষণ করেছিলো, তা হলো ফ্র্যাংক জোসেফের সাথে বিজ্ঞাপন বিভাগের ভিডিও সাক্ষাৎকারটি।

১৯৮৭ সাল থেকেই জোসেফের বের করা বইগুলোর মূল মনোযোগ ছিলো পৌরাণিক আটলানটিস মহাদেশ। ১৯৯৩ হতে ২০০৭ সাল পর্যন্ত, জোসেফ সিউডোআর্কিওলজিক্যাল ম্যাগাজিন “এনসিয়েন্ট আমেরিকান”-এর সম্পাদক ছিলো। সম্ভবত আরো গুরুত্ব দিয়ে বললে, ফ্র্যাঙ্ক জোসেফ হলো ফ্র্যাঙ্ক কলিনের ছদ্ম নাম, যে কিনা আমেরিকার নাজি পার্টির সাবেক কোর্ডিনেটর এবং আমেরিকান ন্যাশনাল সোসালিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন। তিনিই হলেন সেই যে কিনা দর্শকদের কাছে আটলানটিস রাইজিংয়ের সুপারিশ করেছিলেন। 

বহু সময় ধরেই, আর্কিওলজিস্টদের কাছে সিউডোআর্কিওলজির গুরুত্ব কিছু নেই বলে এটিকে একঘরে করে রাখা হয়েছিলো। কিন্তু সেই একঘরে থেকেই এর ধারণাগুলি ফুঁসে উঠার পাশাপাশি রীতিমতো বিপজ্জনকও হয়ে উঠে।

একটা ইলাস্ট্রেশনে দেখানো হয়েছে, প্রাচীন নীল এবং ধূসর জলের গভীরে সোনালি আভাযুক্ত ভবনের ধ্বংসাবশেষ রয়েছে। আর আটলানটিস নামের সেই হারানো শহর অথবা মহাদেশটি জনগণের কল্পনায় গেঁথে গিয়েছে। 

একজন আর্কিওলজিস্ট হিসাবে বর্তমানে আমি আমার ডক্টরেট ডিগ্রির কাজ করছি। গতবছর আমি বিভিন্ন গোষ্ঠী; যেমন, শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের বৈশ্বিক দৃষ্টিভঙ্গিতে সিউডোআর্কিওলজির ব্যবহার নিয়ে পরীক্ষা করে কাটিয়েছি। সম্প্রতি আমেরিকায় এমন গোষ্ঠীগুলোর বেড়ে যাওয়ার উপায় হিসাবে এই জ্ঞান বোঝা বিশেষত আজকের দিনের জন্যে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ২০১৯ সালে সাউদার্ন পোভার্টি ল সেন্টারের (এসপিএলসি) এক রিপোর্টের হিসাবে, ২০১৭ এবং ২০১৯ সালের মধ্যে আমেরিকায় শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদী বিদ্বেষী গোষ্ঠী প্রায় ৫৫ শতাংশ বেড়ে গিয়েছে। 

সিউডোআর্কিওলজির বিভিন্ন আকার এবং ধরণ উঠে এসেছে। কিন্তু এটির একটা মূল বির্তকে দাঁড়িয়ে আছেঃ অতীতের লোকেরা যা অর্জন করেছে বলে উল্লেখ করা হয়, সেই জ্ঞান, প্রযুক্তি এবং সামর্থ্য বলে আদৌ তাদের কিছুই ছিলো না। সুতরাং এতে অন্য কেউ বা কিছু তাহলে জড়িত ছিলো। প্রাচীন বিদেশি প্রবক্তারা আপনাকে মিশরের গ্রেট পিরামিডের কথা বলবে। উদাহরণস্বরূপ, পেরুর নাজকা লাইনগুলি এলিয়েনদের কারণেই টানা হয়েছিলো। যখন হাইপারডিফিউনিস্ট প্রবক্তারা আপনাকে বলবে যে, এগুলো আটলানটিসের অধিবাসী কর্তৃক নিমার্ণ করা হয়েছিলো, অথবা আরেকটি “অত্যন্ত পরিণত সভ্যতায়”; যেখানে তারা প্রায় তেরো হাজার বছর আগে বসবাস করেছিলো। আর্কিওলজিস্টদের প্রায়ই এসব ইতিহাসের “সত্য” লুকিয়ে রাখার ষড়যন্ত্রের অভিযোগে অভিযুক্ত করা হয়।

এইসমস্ত সিউডোআর্কিওলজিক্যাল বির্তকগুলো বিনোদনের খাতিরে বেশ মজার বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এগুলো অপরিবর্তনীয়ভাবে কালো মানুষ, আদিবাসী মানুষ এবং অন্যান্য রঙের মানুষদের (Black, Indigenous, People of Color, BIPOC) বিরুদ্ধে খুবই পক্ষপাতদুষ্ট হয়ে থাকে। যাদেরকে খোদ তাদের নিজস্ব ইতিহাসের জন্যে দায়ী বলে সন্দেহ করা হয়। বহিরাগতদের হস্তক্ষেপের প্রমাণ হিসাবে প্রায়ই আফ্রিকা, এশিয়া এবং আমেরিকার আর্কিওলজিকাল স্থানগুলোর কথা বলা হয়। অপরদিকে প্রাচীন গ্রীসে অথবা ইতালিতে সাফল্যের সাথে বসবাসকারীদের ব্যাপারে কদাচিৎ প্রশ্ন করা হয়।

অন্য কথায় বলা যায়, এইসমস্ত বির্তকগুলো প্রায়ই রেসিস্ট বা বর্ণবাদী ঘরানার হয়। যখন এলিয়েন অথবা আটলানটিয়ান পূর্বপুরুষদের নিয়ে বির্তককে অদ্ভুত বলে মনে করা হয়; তখন কিছু মানুষ এইসমস্ত বির্তকগুলোকেও বিশ্বাস করে থাকে। ক্যালিফোর্নিয়ার চ্যাপম্যান বিশ্ববিদ্যালয় ২০১৬ এবং ২০১৮ এর মধ্যে আমেরিকানদের শঙ্কা নিয়ে একটা জরিপ করেছিলো। সেখানে দেখা যায় ২০১৮ সালে জরিপের উত্তরদাতাদের মধ্যে ৫৭ শতাংশ মানুষ বিশ্বাস করে যে প্রাচীন সভ্যতা যেমন আটলানটিসের অস্তিত্ব ছিলো (২০১৬ থেকে যা ১৭ শতাংশ বেশি), এবং ৪১ শতাংশ বিশ্বাস করে যে এলিয়েনরা প্রাচীন অতীতে পৃথিবী ভ্রমণে এসেছিলো (যা ২০১৬ সাল হতে ১৪ শতাংশ বেশি)। এগুলো বিশ্বাসের থেকেও বেশি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো, তাদের জন্যেই এসমস্ত কিছু নিরেট বাস্তব; যারা এগুলোকে নির্দ্ধিধায় গ্রহণ করেছে। 

সিউডোআর্কিওলজি শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের জন্যে উপকারী। কারণ এটি বাইপোক সম্প্রদায়ের অর্জনের প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করতে পারে, আর এতে শ্বেতাঙ্গদের দৃষ্টিতে নতুন করে ইতিহাস পুর্নলিখনের দরজা খুলে যায়। এসপিএলসি এই বিষয়টা লক্ষ্য করেছে এবং সিউডোআর্কিওলজি এবং অতি-ডান মতাদর্শ যেমন ইহুদিবিদ্বেষ এবং শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে তারা লিখেছে। শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদ হলো একটা শ্বেতাঙ্গপন্থী জাতিগত মতাদর্শ। যেখানে বহু শ্বেতাঙ্গরা নিজেদের আধিপত্যের স্বার্থের পক্ষে জোটবদ্ধ অবস্থান গ্রহণ করে। যেমন অভিবাসনবিরোধী অবস্থান এবং জোটবদ্ধ বিশ্বাসের মাধ্যমে শ্বেতাঙ্গেরা নিজেদের স্বার্থকেই সবার প্রথমে রাখে।

শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা তাদেরকে সুরক্ষা এবং অধিকার রক্ষার ব্যাপারে মানুষদের অনুপ্রেরণা সংরক্ষণ এবং সংযোজন করে চলে। যেটাকে তারা শ্বেতাঙ্গ জাতির জন্যে “বিশুদ্ধ” হিসাবে দেখে, এবং তারা ইতিহাস ও জেনেটিক বংশপঞ্জিকা দৃষ্টিভঙ্গির উপরে অত্যন্ত পুনর্কল্পিত সিউডোসাইন্টিফিক ধারণা নির্মাণ করে। ষড়যন্ত্র তত্ত্ব হলো শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদের একটা মূল বিশ্বাসের জায়গা। যেটাকে তারা “বৃহৎ প্রতিস্থাপন” হিসাবে উল্লেখ করে। যেটি বলে যে “শ্বেতাঙ্গ গণহত্যা” ঘটে চলেছেঃ যার ফলে শ্বেতাঙ্গ মানুষেরা বিলুপ্তির দ্বারপ্রান্তে চলে এসেছে এবং এজন্যে তাদেরকে সুরক্ষিত করা প্রয়োজন।

যদিও নৃবিজ্ঞানী এবং জিনতত্ত্ববিদরা দীর্ঘদিন ধরেই উল্লেখ করে আসছেন যে, জাতি ব্যাপারটা জেনেটিক্যালি সজ্ঞায়িত কোনো ধারণা নয়। বরং এটি সামাজিকভাবে সজ্ঞায়িত একটি ধারণা, যেখানে শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীরা এর সজ্ঞা জেনেটিক্যালি খোঁজ করে এবং এরই ফলে “বিশুদ্ধ শ্বেত জাতির” ধারণাটিকে তারা সমর্থন করে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, বাড়িতে জেনেটিক বংশের পরীক্ষা শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের মাঝে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। যারা কিনা এই পরীক্ষার ফলাফলকে বিভিন্নভাবে পুনর্ব্যাখ্যা করে এই বিশ্বাসে সমর্থন দেওয়ার জন্যে যে “বিশুদ্ধ শ্বেতাঙ্গ জাতির” অস্তিত্ব রয়েছে। আর তাই এর সুরক্ষা ব্যতীত, এই বিশেষ জাতিটি প্রতিস্থাপিত হয়ে যেতে পারে। 

যদিও শ্বেত জাতীয়তাবাদী ওয়েবসাইটগুলোতে যেমন স্টর্মফ্রন্ট এবং রেনেগেড ট্রিবিউনে এই প্রাচীন বিদেশি তত্ত্বগুলো নিয়ে আলোচনা করা হয়। এটি একটি হাইপারডিফিউনিস্ট তত্ত্ব- যেটির মতে বিশাল দূরত্বে ছড়িয়ে থাকা মানুষদের মাঝে আটলানটিস, আর্য এবং সলোট্রিয়ানদের সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য বণ্টন হয়ে আসছে। যেগুলো আবার উত্তর আমেরিকার শ্বেতাঙ্গ জাতীয়তাবাদীদের কাছে বিশেষভাবে জনপ্রিয়।

হাইপারডিফিউনিস্ট তত্ত্ব হলো এইসব প্রতিস্থাপনের ষড়ষন্ত্র ধোপে টেকানোর সবচে সহজ উপায়ঃ প্রাচীন শ্বেত আটলানটিয়ান্সরা, আর্যরা অথবা সলোট্রিয়ানসরা প্রথম উত্তর আমেরিকায় ভ্রমণ করেছিলো এবং আদিবাসী মানুষদের দ্বারা “প্রতিস্থাপিত” হয়ে গিয়েছিলো। উদাহরণস্বরূপ, রেনেগেড ট্রিবিউনের নিয়মিত কন্ট্রিবিউটর ফ্র্যাঙ্ক জোসেফ এবং প্যাট্রিক চইনার্ড কর্তৃক লিখিত বই এবং আর্টিকেলগুলো। যারা কিনা বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকের নাজি বিশ্বাসের সাথে যুক্ত ছিলো। তারা সেখানে বলতো যে শ্বেত আর্যরা আটলানটিসের মানুষদের থেকে এসেছে। যারা কিনা তথাকথিত দশ হাজার বছর আগেই আমেরিকায় ছড়িয়ে গিয়েছিলো এবং তাদের সাথে প্রযুক্তি এবং জ্ঞানও নিয়ে এসেছিলো। জোসেফ এবং চইনার্ডের যুক্তি এটাই উত্তর আমেরিকার এইসমস্ত শ্বেত বংশধররা আদিবাসী মানুষদের দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়ে গিয়েছিলো।

একই যুক্তিতে স্টর্মফ্রন্টের লেখকরাও সলোট্রিয়ান হাইপোথিসিসকে সমর্থন করেছে। যে হাইপোথিসিসটাকে আর্কিওলজিস্টরা বৃহৎভাবে প্রত্যাখান করেছে; যার মতে, ইউরোপের উত্তরপশ্চিমের সলোট্রিয়ান সংস্কৃতির মানুষেরা উত্তর আমেরিকার পূর্ব উপকূলে ১৭,০০০ এবং ২০,০০০ বছরের মধ্যে প্রথম বসতি স্থাপন করেছিলো। স্টর্মফ্রন্টের ক্ষেত্রে বিজ্ঞান পরামর্শ দেয় যে, সলোট্রিয়ান মানুষদের কালো ত্বককে এড়িয়ে যাওয়া হয়েছে। এর পরিবর্তে অন্য যুক্তি দেয় যে, উত্তর আমেরিকার সাদা সলোট্রিয়ানদেরকে আচমকা এবং হিংস্রভাবে সেখানকার আদিবাসী মানুষদের দ্বারা বাস্তুচ্যুত করা হয়েছে।

আর্কিওলজিক্যাল প্রমাণ এইসমস্ত তত্ত্বগুলোকে সমর্থন করে না। যদিও আমেরিকার প্লাইসটোসিন সময়ের জীবনের গল্প এখনো বিকশিত হচ্ছে, তবুও উত্তর আমেরিকার সাদা সলোট্রিয়ানদের হিংসাত্মকভাবে বাস্তুচ্যুত করার কোথাও কোনো প্রমাণ মিলেনি। এই মহাদেশটি সর্বদাই আদিবাসী মানুষদের জমি ছিলো। 

সিউডোআর্কিওলজি তাদের ইতিহাসকে অস্বীকার করে এবং এর পরিবর্তে বাইপোক সম্প্রদায়ের পৌরাণিক মহাদেশ বা এমনকি এলিয়েনদের পুনরুত্থিত করে এদেরকে প্রান্তিয়করণে অবদান রাখে। শ্বেত জাতীয়তাবাদীরা এই অস্বীকারকে ব্যবহার করে নিজেদের ক্ষমতার কাঠামোকে শক্তিশালী করার জন্যে অথবা অধিকতর “শ্বেত” হিসাবে ইতিহাসকে পুনর্লিখন করে থাকে। 

জনসাধারণ এবং শাস্ত্রকে অবশ্যই এই সিউডোআর্কিওলজি ও সহিংস শ্বেত শক্তির কাঠামোকে চ্যালেঞ্জ করতে হবে। যেখানে তারা প্রায়শই তাদের নিজস্ব লক্ষ্যকে সমর্থন করার জন্য এটিকে ব্যবহার করে থাকে। এই চ্যালেঞ্জগুলির মাধ্যমেই আমরা সবাই তাদের নিজস্ব ইতিহাস বলার মাধ্যমে প্রান্তিক গোষ্ঠীর কণ্ঠস্বরকে নতুন করে সমর্থন করতে পারব। তাদেরকে নিশ্চিত করতে পারবো যে, তাদের ইতিহাসও সরব হয়ে উঠছে।

মূল লেখার লিংক