নৃবিজ্ঞান এবং ডেটা সায়েন্সঃ একটি সমন্বয়ী ভঙ্গি

[ এনথ্রোসার্কেলে এবার প্রকাশিত হলো ব্যতিক্রমী একটি লেখা। ডেটা সায়েন্স কিভাবে নৃবিজ্ঞানে কাজে লাগতে পারে সেটি নিয়েই এস্ট্রিড কাউন্টির এই লেখাটি।  এস্ট্রিড কাউন্টি একজন সফটওয়ার ইঞ্জিনিয়ার এবং ডেটা এনালিস্ট। তিনি বেইলর বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মনোবিজ্ঞানে স্নাতক সম্পন্ন করলেও, স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন নৃবিজ্ঞানে, হাস্টন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তবে পরবর্তীতে ডেটা বিষয়ক প্রযুক্তিতেও তিনি আগ্রহী হতে থাকেন। তিনি তার কাজের মধ্যে নৃবিজ্ঞানের সাথে ডেটা সায়েন্সের সমন্বয় ঘটানোর চেষ্টা করেন।

এনথ্রোসার্কেলের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন তারানাথ তান্ত্রিক।]

কোয়ান্টিটেটিভ এনালিটিক্স (সংখ্যাত্মক বিশ্লেষণ), বিগ ডেটা এবং পরিসংখ্যান, ইত্যাদি বিষয়গুলো নিয়ে ভাবতে গেলে আমরা একজন নৃবিজ্ঞানীর কথা তেমন একটা মাথায় আনিনা। তবে আসল সত্যটি হচ্ছে, গুনগত ডেটা সংগ্রহের প্রেক্ষাপটে  নৃবিজ্ঞান  একটি সুপরিচিত জ্ঞানকাণ্ড হলেও, একজন নৃবিজ্ঞানীর জন্য  যেকোনো ধরনের ডেটাই তার বোঝাপড়ার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে। স্নাতক পর্যায়ের বহুবিধ নৃবিজ্ঞান বিভাগেই গবেষণা প্রণালি কোর্সগুলোতে প্রচুর পরিমানে পরিসংখ্যানগত শিক্ষা প্রদান করা হয়ে থাকে সংখ্যাত্মক ডেটাসমূহকে বোঝার সুবিধার্থে।

আপাতদৃষ্টিতে নৃবিজ্ঞানকে গবেষণাগার কেন্দ্রিক বিজ্ঞানের থেকে সমাজবিজ্ঞানের অংশ বলেই অধিক গ্রহনযোগ্য মনে করা হয়ে থাকে। তবে নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণাকালে গুনগত এবং সংখ্যাত্মক উভয় ধরনের ডেটা নিয়েই বৈজ্ঞানিক গবেষণা সম্পাদিত হয়ে থাকে, যেটিকে মিশ্রপদ্ধতির বিশ্লেষণও(মিক্সড মেথড এনালিসিস) বলা হয়ে থাকে। এমনকি আমাদের নৃবৈজ্ঞানিক গবেষণাগুলা যদি অনেকটাই গুনগত কেন্দ্রিক হয়েও থাকে, তারপরেও এটি নিশ্চিত করে বলা যায় যে, সংগৃহীত ডেটাগুলোর মধ্যে গুনগত এবং সংখ্যাত্মক উভয় ধরনের ডেটাই নিহিত রয়েছে। তবে তা সত্ত্বেও, আমরা যারা নিজেদেরকে সক্রিয় নৃবিজ্ঞানী বলে দাবি করি, তারা নিজেদেরকে গুনগত ডেটা নিয়ে কাজ করতে পারদর্শী ভেবেই স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে থাকি। সংখ্যাত্মক ডেটা বিশ্লেষণেও যে আমরা সমান পারদর্শী হতে পারি, সেটি একেবারেই ভুলে যাই। গুনগত গবেষণা পদ্ধতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি, একইসাথে সংখ্যাত্মক গবেষণা পদ্ধতিতে পারদর্শিতাও আমাদের জন্য অতীব প্রয়োজনীয় হয়ে পড়ছে দিনকেদিন। আমরা এখন যে দুনিয়ায় বাস করি, সেখানে কর্পোরেশন থেকে শুরু করে প্রশাসনিক সরকার, সকলেই ডেটাকেন্দ্রিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের দিকে ঝুকে পড়ছে। এমতাবস্থায় এসব ডেটাসমূহকে নানাবিধ প্রেক্ষিতের(কনটেক্সট) আঙ্গিকে বিচার করার জন্য, একজন নৃবিজ্ঞানীর থেকে পারদর্শী আর কে হতে পারে?  

নৃবিজ্ঞান এবং ডেটা এনালিসিস

ডেটা এনালিসিসের গুরুত্বের সাথে আমার পরিচয় অনেকটা আকস্মাৎ বা বলা চলে দৈবাৎক্রমেই। নৃবিজ্ঞানে স্নাতক করার পাশাপাশি আমি একটি ফুলটাইম চাকরিও করতাম। ২০০৬ সনে আমি একজন ডেটা কো-অর্ডিনেটর হিসেবে একটি  আন্তর্জাতিক সাবকন্ট্রাক্টর প্রতিষ্ঠানে কাজ শুরু করি। অর্থনৈতিক অবস্থা তখন বেশ সুবিধার ছিল না, যেকারনে স্নাতক অধ্যয়নের পাশাপাশি আমি চাকরিও চালিয়ে যাচ্ছিলাম। ফলত, চাকরির সুবাদে দিনের বেশিরভাগ সময়ই ডেটাবেজ তৈরী, বিপুল পরিমানে সংখ্যাত্মক ডেটা বিশ্লেষণ এসব করেই কাটতো, অন্যদিকে রাতের বেলা পরিসংখ্যান, গবেষণা প্রণালী এবং এথনোগ্রাফিক মাঠকর্মের মত বিষয়গুলো পড়ে সময় কেটে যেত।

সেই সময়টিতে, নতুন কারও সাথে পরিচয় হলে তারা প্রায়শই আমাকে প্রশ্ন করতো চাকরির পাশাপাশি আমি কী নিয়ে পড়ালেখা করছি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বেশিরভাগই ধরে নিত আমি কোন তথ্যপ্রযুক্তি বিষয়ক কিংবা কোন এমবিএ বিষয়ক বিভাগে পড়ালেখা করছি। ডেটা কো-অর্ডিনেটর হিসেবে এবং পরবর্তীতে ডেটা এনালিস্ট হিসেবে আমি যেসব কাজ করেছি, সেগুলোর সাথে নৃবিজ্ঞানের কোন সম্পর্কই নেই এমনটাই ভেবে নেয়া হতো। এক কথায় যেটি একেবারেই সত্য নয়। বরং আমার চাকরির ক্ষেত্রে নৃবৈজ্ঞানিক জ্ঞানের ব্যবহার এবং নৃবিজ্ঞান পাঠের ক্ষেত্রে আমার ডেটা এনালিসিসের দক্ষতাসমূহকে আমি মিথস্ক্রিয়ভাবে প্রয়োগ করতে সক্ষম হয়েছিলাম। উভয় জ্ঞানকান্ডই আদতে একে অপরের জন্য পরিপূরক ভূমিকা পালন করেছিল।  

নৃবিজ্ঞান নিজেই একটি অনন্য এবং বিস্তৃত জ্ঞানকাণ্ড বটে। লোকজ সংস্কৃতি থেকে শুরু করে জেনেটিক্স পর্যন্ত, সবকিছুই আমাদের অধ্যয়নক্ষেত্র। আন্তঃজ্ঞানকাণ্ডীয় অধ্যয়ন এবং প্রয়োগ আমাদের নৃবৈজ্ঞানিক চর্চার একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তবে এত বৈচিত্রের মধ্যেও কেন আমরা সকলেই একই জ্ঞানকান্ড অর্থাৎ নৃবিজ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত তা নির্ধারিত হয়ে থাকে কিছু মুখ্য বৈশিষ্ট্যের মধ্য দিয়ে। আমাদের গবেষণা ও চর্চা সামগ্রিক, প্রেক্ষিতকরণের মধ্য দিয়ে আমরা যে বিষয়টিকেই পাঠ করে থাকিনা কেন, সেটিকে সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে অধ্যয়ন এবং স্থাপিত করাও আমাদের পদ্ধতিই বটে। মাঠকর্ম থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতালব্ধ ডেটাসমূহকে বিশ্লেষণ করার জন্যই আমাদের নানাবিধ তত্ত্ব একেকটি সরঞ্জাম হিসেবে ভূমিকা পালন করে থাকে(Strange 2009, 1-3)।

আমরা এমন একটি যুগে কাজ করে চলেছি যা প্রতিনিয়ত রূপান্তরিত হচ্ছে ডেটার মাধ্যমে। কম্পিউটার, মোবাইল এবং অন্তর্জালের মাধ্যমে সংযুক্ত সমাজ দ্বারা উৎপন্ন বিপুল পরিমানে ডেটাসমূহকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার জন্য ডেটা সায়েন্সের মত নতুন জ্ঞানকান্ডসমূহের উদ্ভব চোখে পড়ার মত। ডেটাসমূহকে বিশ্লেষণের জন্য বিবিধ গাণিতিক মডেল ব্যবহার করা, বয়ান ও দৃশ্যায়নের মাধ্যমে  ব্যাখ্যা করা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে পরামর্শ প্রদান করার মত কাজগুলো করাই একজন ডেটা সায়েন্টিস্টের লক্ষ্য। কেবলমাত্র ডেটা পয়েন্ট তৈরী করাই যে যথেষ্ট নয় তা প্রতিনিয়ত উপলব্ধি করে চলেছে বিবিধ কোম্পানিসমূহ। প্রেক্ষিতেরও(কনটেক্সট) প্রয়োজন হয় তাদের, একটি ডেটার অর্থ কী দাঁড়ায় এবং সেটিকে কোন কৌশলে কাজে লাগিয়ে সামনে আগানো যায়, এই বিষয়গুলো অতীব গুরুত্বপূর্ণ। ব্যাপারটি অনেকটা নৃবিজ্ঞান চর্চার মতই শোনাচ্ছে তাই না?

কম্পিউটেশনাল এন্থ্রোপোলজি

ডেটা সায়েন্স এবং এন্থ্রোপোলজির মধ্যকার এই পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ে আমিই প্রথম আলোচনা করছি এমনটি নয়। ডেটা এনালিসিস, কম্পিউটেশন এবং এন্থ্রোপোলজির মধ্যে সমন্বয়কারী বিবিধ উপশাখা ইতোমধ্যেই মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। সবথেকে নজরকাড়া ব্যাপার হচ্ছে কম্পিউটেশনাল এন্থ্রোপোলজির মত একটি উপশাখার বিকাশ। যেখানে মূলত বিপুল পরিমানে ডেটাসমষ্টিকে সাংস্কৃতি নৃবিজ্ঞানের বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে প্রেক্ষিতকরণ করা হয়ে থাকে। একটি নিদির্ষ্ট প্রেক্ষিতের মধ্য দিয়ে সংগৃহীত ডেটাকে আবার কোন প্রেক্ষিতের মধ্য দিয়ে কাজে লাগানো হবে, যেমন ব্যবসায়িক প্রেক্ষিত, মেটা ডেটা কিংবা অন্যান্য প্রভাবক, সেটির উপর নির্ভর করেই ডেটার প্রেক্ষিতকরণ প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে; যা মূলত ডেটাকে অর্থবোধক ও তাৎপর্যপূর্ণ করে তোলে। কেবলমাত্র তথ্য সংগ্রহ করলেই তথ্যের বোঝাপড়া সম্ভব নয়। কোন পরিপ্রেক্ষিতে একটি ডেটার উদ্ভব হলো সেই পরিপ্রেক্ষিত বিচারের জন্যও একটি দৃষ্টিভঙ্গি দরকার। সম্পূর্ণভাবে ডেটার অর্থ বুঝতে গেলে এর মানবিকীকরণের প্রয়োজন হয়, যেটিকে প্রায়শই নৃবিজ্ঞানীরা থিক ডেটা নামে অভিহিত করে থাকেন।

বৃহৎ ডেটাসেটের ওপর ডেটা মাইনিং কৌশল অবলম্বন করে  আচরণগত এবং সাংস্কৃতিক বিবিধ অন্তর্নিহিত বিষয়গুলোকে উন্মোচন করার যে সুযোগ রয়েছে, সেটিই মূলত কম্পিউটেশনাল এন্থ্রোপোলজি উপশাখা বিস্তারের পেছনে প্রধান প্রভাবক। বর্তমান সময়ে প্রায় সকল ইন্ডাস্ট্রিতে থেকেই উৎপাদিত বিপুল সংখ্যাক ডেটার প্রাদুর্ভাবের ফলে থিক ডেটার প্রয়োজনীতাও বৃদ্ধি পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ এখানে এমআইটি’র একটি গ্রুপের গবেষণার কথা উল্লেখ্য। উক্ত গবেষণায় তারা ভিন্ন ভিন্ন সংস্কৃতিতে সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের একটি তালিকা বের করেছিল। কোয়ান্টিটেটিভ বা সংখ্যাত্মক পদ্ধতির মাধ্যমে ডেটা সংগ্রহ করে সংস্কৃতির বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিক আবিষ্কার করার ব্যাপারটি কোন নতুন ধারণাও নয়। ১৯৯০ এর দশক থেকেই এই ক্ষেত্রটির চর্চাকারীরা কম্পিউটেশনাল  এন্থ্রোপোলজিকে মূলধারায় উপস্থাপনের প্রয়াস চালিয়ে যাচ্ছেন। জ্ঞানকান্ডীয় ব্যবস্থাসমূহ, পরিচয় ও আত্মপরিচয়ের শরিকানা এবং সংস্কৃতির অন্তর্নিহিত বিষয়গুলোকে বৃহৎ ডেটাসেটের মধ্য দিয়ে উন্মোচন করাই কম্পিউটেশনাল এন্থ্রোপোলজির লক্ষ্য।

মোবাইল ফোনের মত প্রযুক্তিগত বিপ্লবের ফলেও আমরা প্রতিনিয়ত নিজেদেরকে ভিন্ন আঙ্গিকে দেখা ও বোঝার সুযোগ পাচ্ছি। বিশ্বব্যাংকের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে বৈশ্বিক জনসংখ্যার চারভাগের তিনভাগই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে। অর্থাৎ, এত এত মোবাইল ব্যবহারকারী সবাইই প্রতিনিয়ত অসংখ্য ডেটা উৎপাদন করে চলেছে। যার বেশিরভাগটিই আসে স্মার্টফোনের ইন্টারনেট ব্যবহার এবং বিশেষ করে সোসাল মিডিয়া ব্যবহারের মধ্য দিয়ে। এটি আমাদের সামনে মানব আচরণের এমন এক তথ্যের সাগর হাজির করে, যা অতীতে সম্ভব ছিল না।

লোকেশনভিত্তিক যে অ্যাপগুলো আমরা ব্যবহার করে থাকি। তার মাধ্যমে উৎপাদতি ডেটাসমূহকে কাজে লাগিয়ে আচরণ, চলাফেরা ও আমাদের মতিগতিকে অধ্যয়ন করা হয়ে থাকে। যাতে করে এই বিপুল তথ্যকে সঠিকভাবে কাজে লাগানো যায়। এসব তথ্য কাজে লাগিয়ে মানব মতিগতিকে অধ্যয়নের ক্ষেত্রে ব্যাপক জোর দেয়া হচ্ছে বর্তমান সময়ে। যাতে করে কোনো অ্যাপ্লিকেশন ডেভেলপার অথবা ডেটা সায়েন্টিস্ট পরবর্তী আচরণ বা মতিগতি কী হতে পারে তা অনুমান করতে পারে। এক্ষেত্রে জিমো নামক একটা চায়নিজ কোম্পানির উদাহরণ দেয়া যেতে পারে যারা কিছুদিন আগে মাইক্রোসফট রিসার্চ গ্রুপের সাথে একটি গবেষণায় চুক্তিবদ্ধ হয়েছে। বেইজিং শহরে পর্যটকরা ঠিক কোন কোন স্থান পরিদর্শন করে থাকে সেই প্যাটার্ন আবিষ্কার করাই উক্ত গবেষণার লক্ষ্য। এখানেও লোকেশনভিত্তিক অ্যাপ ব্যবহারের মধ্য দিয়ে আচরণকে প্রেক্ষাপটের ভিত্তিতে বিশ্লেষণ করা হয়ে থাকে। জিমো’র অ্যাপটি স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটক, এই দুই ধরণের ব্যবহারকারীকে আলাদা করে, তাদের ঘোরাফেরা নিয়ে ডেটা সংগ্রহ করে থাকে মোবাইলের চেক-ইন অপশনটির সাহায্যে। স্থানীয় বাসিন্দা এবং পর্যটক, এই দুই ধরনের লোকজন আদতে শহরে কোন কোন স্থানে বেশি ঘোরাঘুরি করে, কখন করে, এই বিষয়গুলো বুঝতে সাহায্য করে জিমো অ্যাপের সংগ্রহকৃত ডেটা। ডেটা এবং প্যাটার্ন এই দুইয়ের সাহায্যে সংগঠিত এই গবেষণার ফলে ট্রাফিক কন্ট্রোল, লোকেশনভিত্তিক বিজ্ঞাপন, এমনকি রোগ নিয়ন্ত্রণের ব্যাপারটিও সহজ করে তোলে।

কীভাবে শুরু করবেন?

প্রযুক্তির অগ্রগতির ফলে প্রতিটি ইন্ডাস্ট্রিরই প্রক্রিয়াসমূহ এবং পণ্য-সেবা উৎপাদনের পদ্ধতিগুলো পাল্টে যাচ্ছে। নৃবিজ্ঞানী হিসেবে আমরা এই পরিবর্তনের সাথে খাপ খাইয়ে নিতে প্রস্তুত রয়েছি। আপনি যদি একজন নৃবিজ্ঞানী হয়ে থাকেন, তাহলে কোয়ান্টিটেটিভ বা সংখ্যাত্মক বিশ্লেষণের এই পদ্ধতিগুলো ব্যবহার করা ফলদায়ক। তবে একলাফে কোনকিছুই হয় না। কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র পদক্ষেপের মাধ্যমে এদিকে এগিয়ে যেতে পারেনঃ

১) ডেটা এনালিসিসের দক্ষতা অর্জনঃ বেশিরভাগ নৃবিজ্ঞানীই SPSS নামক সফটওয়ারটির সাথে পরিচিত। কিন্তু আরও দুইটি শক্তিশালী সফটওয়ার রয়েছে ডেটা এনালিসিসের জন্য, যেমন,STATA এবং R। পরিসংখ্যানভিত্তিক বিশ্লেষণ চালানোর জন্য এই সফটওয়ার দুইটি একাডেমিয়া এবং অন্যান্য ক্ষেত্রে প্রচুর পরিমানে ব্যবহার হয়ে থাকে। এরকম কোন একটি সফটওয়ারে বাড়তি দক্ষতা অর্জন করতে পারলে সংখ্যাত্মক বিশ্লেষণের দিকে পা বাড়ানো সহজ হয়ে উঠবে। বর্তমানে সকল ক্ষেত্রেই কোন সিদ্ধান্ত নেয়ার জন্য কিছু না কিছু পরিমানে ডেটা এনালিসিস এবং ডেটা ভিজুয়ালাইজেশনের মত পদ্ধতি অবলম্বন করা হয়ে থাকে।

২) ডেটাবেজ ম্যানেজমেন্টের ব্যাপারটিও মাথায় রাখতে পারেনঃ এই দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে যে দুইটি প্রোগ্রাম সবথেকে জরুরী, তার একটি হচ্ছে মাইক্রোসফট এক্সেল এবং SQL ডেটাবেজ। সত্যি কথা বলতে, সকল কোম্পানিতেই কোন না কোন ডেটাভিত্তিক সমস্যা বিদ্যমান থাকে। ডেটাবেজের ডেটাসমূহ ম্যানেজমেন্ট স্কিল আপনাকে একজন দক্ষ রিসার্চ এনালিস্ট হিসেবে গড়ে তুলতে সহায়ক। এমনকি আপনি যদি স্নাতক পর্যায়ের কোন শিক্ষার্থী হয়ে থাকেন সেক্ষত্রেও এটি কার্যকরী। এরকম একটি দক্ষতা অর্জন করতে পারলে, এটি কোয়ালিটেটিভ রিসার্চের ক্ষেত্রে খুব সহজে ডেটা সংগ্রহ করে রাখা এবং ফলাফল অনুসন্ধানে আপনাকে সহায়তে করবে।

৩) ডিজিটাল মার্কেটিং নিয়ে জানাশোনা বাড়ানোঃ নৃবৈজ্ঞানিক শিক্ষা এবং মার্কেটিং- এই দুইটি ব্যাপার প্রায়শই খুব সহজে একে অপরের সাথে খাপ খেয়ে যায়। বর্তমান সময়ে একটি সুচতুর মার্কেটিং প্ল্যান নির্মাণে এনালিটিক্স অধিক ব্যবহৃত হচ্ছে। SEO, ওয়েব এনালিটিক্স এবং ওয়েবসাইট গুলোর বেসিক ফাংশনিং জানা থাকলে আপনি একধাপ এগিয়ে থাকতে পারবেন। এছাড়াও আপনি যদি ডিজিটাল ক্ষেত্রে ইউজার এক্সপেরিয়েন্স সংক্রান্ত কোন কাজে জড়িত হতে চান, সেক্ষেত্রে এই ধরনের দক্ষতা অর্জন আপনাকে স্বাভাবিকভাবেই এগিয়ে দিতে পারে অনেকখানি এবং এর মাধ্যমে আপনি একজন গুরুত্বপূর্ণ কর্মী হিসেবে চিহ্নিত হতে পারেন।

৪) কিছু প্রোগ্রামিং ফান্ডামেন্টাল্‌স জেনে রাখুনঃ প্রোগ্রামিং মানেই আপনাকে একদম তলা থেকে উপর পর্যন্ত একটি সফটওয়ার বা অ্যাপ্লিকেশন জানতে হবে এমন নয়। কিন্তু কিছু বেসিক প্রোগ্রামিং জেনে রাখা আপনাকে অনেক দূর এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে। বৈজ্ঞানিক গবেষণার ক্ষেত্রে সবথেকে জনপ্রিয় প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ হচ্ছে পাইথন। যার একটি নিজস্ব পরিসংখ্যান ভিত্তিক লাইব্রেরি রয়েছে ডেটা এনালিসিস কাজের জন্য। এমনকি আপনার যদি প্রোগ্রামিং নিয়ে ব্যক্তিগত আগ্রহও থাকে, তাহলে আমি বলবো, পাইথন সবথেকে উপযোগী। ছোট ছোট কিছু প্রোগ্রাম লিখে এনালিসিস রান করানোর মত দক্ষতা খুবই মূল্যবান। এছাড়াও, কোন কোড পড়তে পারা এবং সেটি বুঝতে পারা আপনাকে ভবিষ্যতে অন্যান্য টেকনিকাল শাস্ত্রের ব্যক্তিদের সাথে মিলিতভাবে কাজ করতে সহায়তে করবে।

উপরোক্ত যেকোন একটি স্কিলও যদি অর্জন করা যায়, তাহলে সেটি আপনাকে একজন গবেষক হিসেবে অনন্য করে তুলতে পারে। পাশাপাশি ডেটা ভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেও কাজ করার নতুন দ্বার উন্মোচন হতে পারে। কারন ডেটাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলো বর্তমান সময়ে নৃবৈজ্ঞানিক দৃষ্টিকোণকে নিজস্ব বাতাবরণে ব্যবহারের জন্য মুখিয়ে রয়েছে। তবে সুখবর এই যে, এই দক্ষতা অর্জনের জন্য আপনাকে পুনরায় বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু করে ব্যাচেলর্স করার দরকার নেই। অনলাইনে শত শত কোর্স ও প্রতিষ্ঠান রয়েছে এই স্কিলগুলো অর্জন করার জন্য। এছাড়াও প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অফিস থেকেও এই ধরনের স্কিল অর্জনের সুযোগ করে দেয়া হয়ে থাকে আগ্রহীদের জন্য। একেবারে ছোট ও সহজ জায়গা থেকেই শুরু করতে পারেন এবং ধীরে ধীরে দক্ষ হয়ে উঠতে পারেন নতুন স্কিল অর্জনের মধ্য দিয়ে।

ডেটা সায়েন্স কমিউনিটির বোঝাপড়া প্রতিনিয়তই পাল্টে যাচ্ছে। বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে ডেটার ব্যবহার অনুধাবন করার জন্য সামাজিক বিজ্ঞানকে অন্তর্ভুক্ত করা জরুরী হয়ে পড়েছে। মানব আচরণকে আরও সুচারুভাবে বোঝার জন্যই কেবল নয়, বৃহত্তর সামাজিক কল্যাণেও এই বিজ্ঞানের প্রয়োগ সম্ভব। Urban Wire দ্বারা প্রকাশিত সামাজিক বিজ্ঞান গবেষণার ভবিষ্যত সম্পর্কিত একটি আর্টিকেল এখানে উল্লেখ্য। বড় বড় শহরগুলো ডেটা সায়েন্সের ব্যবহার করে নাগরিকদের জীবনযাপন পাল্টে দিতে ইতোমধ্যেই সক্ষম হচ্ছে। দুয়েকটি উদাহরণ দিলে পরিষ্কার হতে পারে আরও। শিকাগো শহরে কোন কোন বাড়িতে শিশু রয়েছে এবং সেসব বাড়িতে সীসাযুক্ত রঙ ব্যবহার করা হয় কিনা তা চিহ্নায়িত করেছিল ডেটা সায়েন্সের ব্যবহার করে। বোস্টন শহরে কোন কোন রেস্টুরেন্ট স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের মান নিশ্চিত করতে পারছে সেটিও একই পদ্ধতিতে চিহ্নায়িত করেছে তারা। এমনকি ইবোলার মত মহামারির গতিপথও জানতে পারা যায় এই ডেটা সায়েন্স ব্যবহারের মধ্য দিয়েই।

 বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির এক যুগের মধ্যেই আমরা বাস করছি। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিই আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিনিয়ত পাল্টে দিচ্ছে। নৃবিজ্ঞানী হিসেবে, আমরা কেবলমাত্র এই পরিবর্তনগুলোকে অধ্যয়নেই সীমাবদ্ধ না থেকে সরাসরি এই পরিবর্তনে অংশগ্রহনও করতে পারি। অংশগ্রহন করার মত যথেষ্ট প্রশিক্ষন আমরা নৃবিজ্ঞান থেকেই পেয়ে থাকি। সামনে দুনিয়া কেবলমাত্র যে বৈজ্ঞানিক পেশাদারী কিংবা প্রকৌশলীদের হাত ধরেই বদলাবে এমন কোন বাধ্যবাধকতা নেই। নিজেদের দক্ষতা ও গবেষণা পদ্ধতিকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যাওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। আসন্ন সামাজিক ও কাঠামোগত আমূল পরিবর্তনে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য প্রস্তুতি নেয়াই কাম্য।

নজিরঃ

Bhatia, Loveleen (2014). “Data Science as an emerging career.” Deccan Herald. http://www.deccanherald.com/content/414438/data-science-emerging-career.html

Computational Anthropology Section (1998). Human Complex Systems. http://hcs.ucla.edu/companth/cas-aaa.html

Engler, Alex C. (2015). “The future of social science research: A data science perspective.” Urban Institute. http://www.urban.org/urban-wire/future-social-science-research-data-science-perspective

Emerging Technology From the arXiv (2014) “The emerging science of computational anthropology.” MIT Technology Review. http://www.technologyreview.com/view/528216/the-emerging-science-of-computational-anthropology/

Emerging Technology From the arXiv (2015). “Computational Anthropology reveals the most important people in History.” MIT Technology Review. http://www.technologyreview.com/view/535356/computational-anthropology-reveals-how-the-most-important-people-in-history-vary-by/

Strange, Victoria (2009). What Anthropologists Do. New York City: Berg

Wade, Nicolas (2010). “Anthropology a Science? Statement deepens a rift.” New York Times. http://www.nytimes.com/2010/12/10/science/10anthropology.html?_r=0

World Bank (2012). “Mobile Phone access reaches three quarters of the world.” World Bank. www.worldbank.org/en/news/press-release/2012/07/17/mobile-phone-access-reaches-three-quarters-planets-population

মূল লেখার লিংকঃ