তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ (তৃতীয় কিস্তি)
| [তালাল আসাদের ‘বাকস্বাধীনতা, ব্লাসফেমি আর সেক্যুলার ক্রিটিসিজম’ লেখাটি নেওয়া হয়েছে ২০০৯ সালে প্রকাশিত ‘Is Critic Secular? Blasphemy, Injury, and Free Speech’ বইটি থেকে। এই লেখাটিতে তালাল আসাদ ধর্মনিরপেক্ষতাবাদ, ক্রিটিক আর প্রাশ্চাত্যের উদারনৈতিক গণতন্ত্রকে নতুনভাবে দেখতে চেয়েছেন। লেখাটি এনথ্রোসার্কেলের জন্য অনুবাদ করেছেন সাদিয়া শান্তা। এই অনুবাদটি কয়েকটি কিস্তিতে এনথ্রোসার্কেলে প্রকাশিত হবে। আজকে প্রকাশিত হল তৃতীয় কিস্তি] ব্লাসফেমির ইসলামিক ধারণা কি? অবশ্যই সব মুসলমান একইভাবে চিন্তা করে না, তবে ব্লাসফেমি সম্পর্কে ইসলামিক ধারণাকে প্রথাভিত্তিক একটি নৈতিক প্রশ্ন হিসেবে ধরা হয়ে থাকে। যদিও এই প্রথায় রয়েছে বিচ্ছিন্নতা, অস্থিরতা, উত্তেজনা যা পুরোপুরি ‘সভ্য মানুষের সমাজ’ এর সাথে মানানসই নয়। তবুও, স্বাধীনতা সম্পর্কে উদার ধারণার (liberal ideas) অন্বেষণে আমি এই প্রথার কিছু দিক চিত্রিত করবো। এর মধ্যে একটি হলো ইসলামিক ঐতিহ্য সম্পর্কে এমন একটি ধারণা যে এই ঐতিহ্য নীতিশাস্ত্রের বিধিনিষেধমূলক ব্যবস্থার আরো গভীরে নিহিত যেখানে উদার সমাজ কর্তৃক সরবরাহকৃত স্বাধীনতা (বিশেষ করে বাকস্বাধীনতা) অনুমিত নয়। যদিও এমন কিছু ব্যাপার আছে, তবে সাধারণভাবে স্বাধীনতার ধারণা, হোক তা উপস্থিত কিংবা অনুপস্থিত, আমার কাছে তা অসন্তুষ্টজনক বলে মনে হয়। এটা সত্য যে, ইসলামিক ধর্মীয় আইন ব্যক্তির স্বেচ্ছাচারী আচরণ করার অধিকারকে গণ-নিষেধাজ্ঞা জারির মাধ্যমে সীমাবদ্ধ করে ফেলে; যাতে করে নৈতিকতা ও শিষ্টাচারের মধ্যকার সূক্ষ্ণ পার্থক্য (পার্থিক সমালোচকদের পক্ষে এই পার্থক্য অতি গুরুত্বপূর্ণ) মুছে যায় ও বাছাইয়ের সুযোগ কমে আসে। পার্থিব সমালোচকেরা চায় সবকিছু দেখতে ও শুনতে: কোন কিছুই ট্যাবু (taboo) নয়, সবই সমালোচনার অন্তর্ভুক্ত। যদি বচন ও আচরণকে সীমাবদ্ধ করতেই হয়, তার কারণ হবে নাগরিকতা মেনে চলা (স্বেচ্ছায়?)। ভাল আচরণ ভক্তির জায়গা করে নেয় আর গণপরিসর আর ব্যক্তিগত পরিসর পুরোপুরি আলাদা হয়ে যায়। কিন্তু পছন্দের/বাছাইয়ের উপস্থিতি কিংবা অনুপস্থিতি- এই সাধারণ দ্বৈত সমস্যাটির চেয়ে তলানির সমস্যা আরো জটিল। নিম্নলিখিত সামাজিক-আইনি পরিস্থিতিটি বিবেচনা করা যাক। উদার-গনতান্ত্রিক আইন নাগরিকের গোপনীয়তা রক্ষার নিশ্চয়তা দেয়, যাতে করে ব্যক্তির নৈতিক ও নাগরিক স্বাধীনতা নিশ্চিত হয়। তবে সমৃদ্ধশালী রাষ্ট্রের আবির্ভাবের সাথে সাথে এক উদ্বেগের সৃষ্টি হয়; এই উদ্বেগ বিরাজ করে আইনের অধীনে সাম্যের বিমূর্ত আদর্শ ও আইন প্রয়োগের নির্দিষ্ট উপায়ের মধ্যে। আপাতদৃষ্টিতে বিপরীত মনে হলেও, ‘নৈতিকতা’ সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত বিষয় এবং যা ব্যক্তিমালিকানাধীন তাতে আইনের হস্তক্ষেপ উচিত নয় – এ জাতীয় দৃষ্টিভঙ্গি ‘ব্যক্তিগত’ সমস্যা মোকাবিলার ক্ষেত্রে আইনকানুন এড়িয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে অবদান রেখেছে। এইসব আইনকানুন বিচারক ও জনকল্যাণে নিয়োজিত প্রশাসকদের পরিবার সম্পর্কিত বিষয়ে আরো বিচক্ষণতা দিয়েছে (যেমন- অভিভাবকত্ব, সন্তানের দেখাশোনা, বিবাহ বিচ্ছেদ, ভরনপোষণ, বিবাহ সংক্রান্ত সম্পত্তি ও উত্তরাধিকার)। এই পদক্ষেপ পরিচালনা করার পেছনে যে মনোভাব কাজ করে তা হচ্ছে, সংঘাত মোকাবিলায় আরো মানবিক উপায় প্রয়োজন, যেখানে ব্যক্তিগত আবেগ, বিশ্বাস ও পরিস্থিতির ভিন্নতা বিবেচনায় নেওয়া যায়। ব্যক্তির স্বতন্ত্রতাকে অবশ্যই সম্মান করতে হবে, এর অর্থ হচ্ছে স্বতন্ত্রতাকে পুরোপুরি শনাক্ত করতে হবে। তাই বিচক্ষণতা ও ব্যক্তিগত শুনানির (private hearing) প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। অবশ্যই সংবেদনশীলতা ও হিস্টিরিয়ার (ব্যক্তির শরীরে আবেগের পরিস্ফুটন) প্রদর্শনকে পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন করা উচিত। যার ফলে ন্যায়বিচারকে স্বতন্ত্রকরণ (individualize) করা হয়। সুতরাং, অজাচার, শিশু অবহেলা কিংবা সঙ্গী নির্যাতনের অভিযোগের ক্ষেত্রে পারিবারিক (ব্যক্তিগত) জীবনে সমাজকর্মীদের হস্তক্ষেপকে দেখা হয় ‘ব্যক্তিগত’ পরিসরে ‘সর্বজনীন’ আইনের আমলাতান্ত্রিক পদক্ষেপের অনুমতি হিসেবে। সংক্ষেপে, ধর্মীয় নৈতিকতায় (ধার্মিকতায়) ব্যক্তির উপর কথা বলা ও ব্যবহারের যথার্থ নিয়ম চাপানো অনুমিত না হলেও (যেমনটা মুসলিম নীতিশাস্ত্রে), আইনের বিকাশ ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমানা পুনরায় চিত্রিত করে। ব্যক্তিগত সম্পর্কে তদন্ত ও হস্তক্ষেপমূলক অধিকার দ্বারা জনকল্যাণ সংস্থাগুলো কর্তার (subject) সাথে সন্তানের সম্পর্কিত হওয়ার অধিকারকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। শালীনতা ও অশ্লীলতা সম্বন্ধে নতুন চেতনা তৈরী হয়, বিশেষত যৌন সম্পর্কের ক্ষেত্রে। ইসলামিক আইনে গৃহ-অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অনধিকারচর্চা নিষিদ্ধ, যা ‘ব্যক্তিগত’ কার্যক্ষেত্রে অনধিকারপ্রবেশ হিসেবে পরিগণিত। সুতরাং, ‘ব্যক্তিগত’ ও ‘সর্বজনীন’ সম্পর্কের জায়গা থেকে স্বাধীনতার সীমাবদ্ধতাকে বিভিন্নভানে বর্ণনা করা যায় এবং এর বিরোধীতা নিয়ে সমাজে অনেক রকম আলাপ প্রচলিত; কখনো সে আলাপ পার্থিব, কখনো বা অপার্থিব। এটা আমাকে ইসলামিক শব্দভান্ডারের দিকে টেনে নেয় যা ব্লাসফেমির সাথে ওভারল্যাপ (overlap) করে।২২ খ্রিস্টিয় প্রথা অনুযায়ী তা এক ভয়ানক ‘ধর্মীয়’ লঙ্ঘনকে ইঙ্গিত করে। আরবের খ্রিস্টানরা যদিও আরবি শব্দ ‘তাজদিফ’কে ইংরেজি ভাষায় ‘ব্লাসফেমি’ বলে অভিহিত করে এবং এর মাধ্যমে ইউরোপের ধর্মীয় ইতিহাসে ‘ব্লাসফেমি’র সংজ্ঞায়ন নির্ধারণ করে, কিন্তু ড্যানিশ কার্টুন কেলেঙ্কারির ঘটনায় আরবি ভাষাভাষী মানুষদের এই শব্দটির প্রয়োগ করতে দেখা যায় নি (যতদূর আমি জানি)। ধর্মীয় আখ্যা ‘তাজদিফ’ বলতে বোঝায় ‘ইশ্বরের অনুগ্রহের প্রতি উপহাস করা।’ অবশ্যই, এমন আরো শব্দ রয়েছে যা ইংরেজী শব্দ ‘ব্লাসফেমি’র সাথে ওভারল্যাপ (overlap) করে; যেমন- ‘কুফর’ বলতে বোঝায় ধর্মত্যাগ, ধর্মনিন্দা, নাস্তিকতা, ‘রিদ্দা’ বলতে বোঝায় ‘ধর্মত্যাগ (apostasy)’, ‘ফিসক’ বলতে বোঝায় ‘নৈতিক অবক্ষয়’ এবং ‘ইলহাদ’ বলতে বোঝায় ‘বৈধর্ম কিংবা ধর্মত্যাগ।’ তবে আমার জানা মতে, ড্যানিশ কার্টুনের ঘটনায় এই শব্দগুলোর ব্যবহার প্রয়োগ করা হয় নি। অমুসলিম সাংবাদিকদের বিরূদ্ধে অভিযোগ টানতে এর কোন শব্দই উপযুক্ত নয়। ইসলামিক পন্ডিতদের বিশ্ব সংস্থা (World Union) থেকে ড্যানিশ কার্টুন কেলেঙ্কারির অভিযোগ নিয়ে যখন বিবৃতি দেওয়া হয়, সেখানে ‘ইস’সাহ’ (isā’ah) শব্দের ব্যবহার করা হয়েছিল, ‘তাজদিফ’ (tajdīf) শব্দের নয়। ইস’সাহ শব্দটির বিভিন্ন অর্থ রয়েছে; যেমন ‘অপমান, ক্ষতি, অপরাধ’ যেগুলো ধর্মনিরপেক্ষ প্রসঙ্গের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য।২৩ (কার্টুনগুলির মধ্যে একটিতে নবী মুহম্মদকে অযৌক্তিক ও বর্বরতার প্রতীক হিসেবে ‘আত্মঘাতী বোমা’ ইঙ্গিত করে চিত্রিত করা হয়েছে।) বিশ্ব সংস্থার মতে, এই ঘটনার প্রেক্ষিতে অভিব্যক্তি প্রকাশে অনুমতি পাওয়ার জন্য বেশ কিছু রাষ্ট্র, ইসলামী সংস্থা ও আরব সংস্থার দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে । তবে সেই অপেক্ষার কোন ফল পাওয়া যায়নি। সুতরাং “সংস্থাটি বিশ্বের লক্ষ লক্ষ মুসলিমকে ড্যানিশ ও নরওয়েজিয়ান পণ্য বয়কট করার আহবান জানাতে বাধ্য হবে।”২৪ নির্দিষ্ট ভোক্তা সামগ্রীর বিরূদ্ধে নিষেধাজ্ঞা প্রচারের এই স্বাধীনতা কোন বিশ্বাসের প্রতি প্রকাশ্য সমালোচনা করার বিরোধিতা করে; অর্থাৎ স্বাধীনতা সম্পর্কিত আধুনিক ধারণার ভিন্ন দিক প্রয়োগের মাধ্যমে একটি সামাজিক অস্ত্র অন্য একটি সামাজিক অস্ত্রের মুখোমুখি হয়ে উঠেছিল। বয়কটের পক্ষে অবস্থানকারীরা যদিও কোন কোন ক্ষেত্রে শারীরিক সহিংসতায় জড়িয়েও যায়, তবে এই বিষয়টিও মাথায় রাখা উচিত যে বাণিজ্যিক বয়কটও একপ্রকার সহিংস আচরণের মধ্যেই পড়ে, বিশেষত তা যদি ক্রোধবশত হয়। কারণ বাণিজ্যিক বয়কট মানুষের জীবিকা নির্বাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। আধুনিক অধিকার আদায়ের ক্ষেত্রে ইউরোপে সকল সহিংসতার পাশাপাশি বয়কট (পণ্য বর্জন) ও ধর্মঘটের (শ্রমরোধ) ইতিহাস এখন গল্প হয়ে দাঁড়িয়েছে। তা সত্ত্বেও ইউরোপীয় মন্তব্যকারীরা বর্তমানে এই দু’টিকে ভিন্নভাবে বর্ণনা করছেন: একটা যদি হয় স্বাধীনতার অভিব্যক্তি, অন্যটা হবে স্বাধীনতা সীমাবদ্ধতার প্রয়াস; ফলে তা তৈরী করে দুটি সভ্যতার মধ্যে বিপরীত রাজনৈতিক বিন্যাসের দ্বন্দ্ব। উদার গণতান্ত্রিক ধারণায় বাকস্বাধীনতা চর্চার অপরাধ দ্বারা বাকস্বাধীনতার নীতি সংকীর্ণ করা যায় না – যতক্ষণ না তা সামাজিক শৃঙখলার ক্ষেত্রে মানহানিকর বা হুমকিমূলক হয়। বাকস্বাধীনতার ব্যাপারে রাজনৈতিক প্রতিরোধ থেকে দার্শনিক যুক্তিগুলোই ছিল বেশি আকর্ষনীয়। সেখানে ধার্মিক ব্যক্তির আহত হওয়ার বিষয়টিকেও ভাল লক্ষ্মণ হিসেবে বিবেচনা করা হতো, কেননা সমালোচনা দ্বারা ব্যক্তির বিশ্বাস আঘাতপ্রাপ্ত হলে ব্যক্তি সেই বিশ্বাস পুনর্বিবেচনার সুযোগ পেতো, যা গণতান্ত্রিক বিতর্ক ও নৈতিক সিদ্ধান্ত গঠন- উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। প্রথম যুক্তির বিপরীতে, এই যুক্তিটি স্বয়ং বাকস্বাধীনতা চর্চার তুলনায় বাকস্বাধীনতার ফলাফলকে অধিক গুরুত্ব দেয়। এই প্রশ্নবিদ্ধ (ধর্মীয়) বিশ্বাসের সমালোচনা বাকস্বাধীনতার বাধ্যবাধকতা হিসেবে উপস্থাপিত, যা ‘সত্যই শক্তি’ বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত। এমনকি খ্রিস্টান-পরবর্তী পশ্চিমা সমাজেও অনেকে খ্রিস্টান দাবীর সাথে একমত পোষণ করে যে ‘সত্যই মুক্তি দেয়।’ (জন ৮ঃ৩২) এটা এমন কোন ইসলামি সূত্র নয় যা ধর্মত্যাগের (রিদ্দা) জন্য কায়রো বিশ্ববিদ্যালয়ের বহুল আলোচিত অধ্যাপক নাসর হামিদ আবু জায়িদের বিচার প্রক্রিয়া থেকে উদ্ভূত হয়েছে; তিনি কোরানের বাণীর পুরোপুরি এক নতুন ব্যাখ্যার পক্ষে অবস্থান করেছিলেন।২৫ ইসলামী প্রথায় ‘সত্য’ ও ‘স্বাধীনতা’ উভয়ই অবশ্য মূল্যবান, তবে খ্রিস্টান ধর্মের মতো ইসলামে তারা একসাথে আবদ্ধ নয়। এই ব্যাপারে লক্ষণীয় যে সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ধর্মত্যাগের যে ঘটনাগুলো পশ্চিমে আলোচিত হচ্ছে, এগুলো বেশিরভাগই আধুনিক রাষ্ট্র, আধুনিক আইন বা আধুনিক রাজনীতির বিকাশের সাথে সম্পর্কিত। এই প্রসঙ্গে, পূর্বোল্লিখত, উনিশ শতকে ব্লাসফেমির বিচারে ফেটে পড়া ইংল্যান্ডের কথা কারো মনে পড়তে পারে। তবে বিবেচনা করার মতো প্রশ্ন হলো, এই বিচারগুলো কেবল স্বাধীনতা দমনের আঙ্গিকেই দেখা উচিত কিনা; মানুষের কর্তাস্বত্তার (human subject) উদার ধারণা বলতে আমরা আসলে কি বুঝি? আবু জায়েদ মামলা সম্পর্কিত একটি বইয়ে, ইসলামপন্থী আইনজীবী সালিম আল-আওয়া জোর দিয়ে বলেন যে, শরীয়ত (ধর্মীয় আইন) মোতাবেক বিশ্বাসের স্বাধীনতা রয়েছে।২৬ “বিশ্বাসের স্বাধীনতা বলতে ব্যক্তির সেই স্বাধীনতাকে বোঝায়, যাতে করে ব্যক্তি ইচ্ছানুযায়ী তার সম্প্রদায়ে বসবাসকারী অন্য সকলের বিশ্বাসের সাথে সাংঘর্ষিক এমন কোন বিশ্বাস গ্রহণ করতে পারে।”২৭ তিনি আরো বলেন যে, কারো ধর্মীয় বিশ্বাস প্রকাশের জন্য কেউ কাউকে চাপ দিতে পারে না, অর্থাৎ শরীয়তে তদন্ত/জেরা পদ্ধতি (inquisitorial methods) নিষিদ্ধ।২৮ তবে যাইহোক, অন্যকে ভ্রান্ত প্রতিশ্রুতি দেওয়ার উদ্দেশ্যে জনসম্মুখে ধর্মীয় ও নৈতিক বিশ্বাস প্রকাশের অধিকার, ইচ্ছানুযায়ী ব্যক্তির চিন্তার অধিকারের বিষয়টির মধ্যে অন্তর্ভুক্ত নয়। এই ধরনের সীমাবদ্ধতা আধুনিক উদারমনাদের কাছে অদ্ভূত ঠেকতে পারে (যদিও তা কান্টের কাছে অদ্ভূত ছিল না),২৯ তাদের মতে কারো বিশ্বাস সম্পর্কে প্রকাশ্যে কথা বলার অধিকার স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠায় প্রয়োজনীয়। সর্বোপরি, এটা ‘ধর্মীয় স্বাধীনতা’র একটা দিক যা ধর্মনিরপেক্ষ উদার গণতন্ত্র দ্বারা প্রতিশ্রুত। আল-আওয়া এ ব্যাপারে অবগত আছেন এবং তিনি কোরানের দুটি আয়াত তুলে ধরেছেন যেগুলোকে ধর্মীয় স্বাধীনতার নিশ্চয়তা বলে মনে হয়: ‘লা ইকরাহা ফিদ্দিন’ অর্থাৎ, “ধর্মে কোন জবরদস্তি নেই” (২ঃ২৫৬) এবং ‘ফামান শা’আ ফালিয়ুমিন ওয়ামান শা’আ ফালিয়াকফুর’ অর্থাৎ, “যে বিশ্বাস করার করুক, এবং যে প্রত্যাখ্যান করে করুক” (১৮ঃ২৯)। তবে বিশ্বাসের ক্ষেত্রে মুসলিম বিষয়াদির সামাজিক চর্চা এবং ব্যক্তির মৌখিক বক্তব্য বিবেচিত হয়; ব্যক্তির অন্তরের চিন্তা নয়, তা যেমনই হোক। বিপরীতভাবে, খ্রিস্টান প্রথায় মেনে নেওয়া হয় যে ব্যক্তির চিন্তা দ্বারা ব্লাসফেমির মতো পাপ হয়ে থাকে এবং এই প্রেক্ষিতে বলা হয়ে থাকে: চিন্তামাত্রই স্বীকারোক্তির বিষয়।৩০ আল-আওয়ার মতে, চিন্তাভাবনা প্রকাশের মাধ্যমে ব্যক্তির চারিত্রিক পরিবর্তন ঘটে, তারা প্রকাশ্যে অভিগম্য (accessible) হয়। একটি পুরনো উক্তি উদ্ধৃতি করে তিনি বলেন, “কিছু প্রকাশ করা হলো জনসম্মুখে নিজেকে উন্মুক্ত করা।”৩১ তিনি যুক্তি দেখান যে, ব্যক্তির ইচ্ছানুযায়ী চিন্তাভাবনা পোষন করাই হলো এক ব্যাপার, এবং নৈতিক শৃঙখলা পরিপন্থী কোন প্রতিশ্রুতি গ্রহণের জন্য কাউকে প্রলুব্ধ করা হলো অন্য ব্যাপার। সিরিয়ার দার্শনিক জালাল সাদিক আল-আজম তার বিখ্যাত বই ‘The Critique of Religious Thought (1969)’ প্রকাশ করলে তার বিরূদ্ধে ধর্মত্যাগের (apostasy) অভিযোগ উঠে। ১৯৭০ সালে লেবাননে সেই অভিযোগের প্রতিক্রিয়া স্বরূপ একটি বই প্রকাশিত হয়। সেখানে শেখ উসমান শাফির লেখনীতেও সূক্ষ্ম পার্থক্যসহ একই বিষয় উঠে আসে, তবে তিনি ইসলাম ধর্মের কর্তৃত্বের কোন উল্লেখ করেন নি। পরিবর্তে, তিনি ‘প্রাকৃতিক সহজাত (innate) স্বাধীনতা’ ও ‘আইন দ্বারা গঠিত সীমাবদ্ধ স্বাধীনতা’ এই দুইয়ের মধ্যে একটি স্পষ্ট পার্থক্য দেখাতে চেয়েছেন। কোন ব্যক্তি গ্রহণ কিংবা প্রত্যাখ্যানের ব্যাপারে যে সীমানা মেনে চলে সেই সীমার মধ্যে ব্যক্তি ইচ্ছানুযায়ী তার চিন্তাভাবনা কিংবা কল্পনাশক্তিকে চালিত করতে পারে। ব্যক্তিস্বাধীনতার সম্ভাবনা যখন ব্যক্তির আত্মায় বিরাজ করে, তখন বিশেষ করে আইন তাতে নাক গলাতে পারে না। তবে বিশ্বাস যখন গোপনীয়তা ভেদ করে আলোতে প্রকাশ হয়ে পড়ে তখন ব্যতিক্রমই ঘটে (মিন আস-সির ইলা আল-যহর)।৩২ আবু জায়েদের ঘটনায় মিশরে আপিলের সর্বোচ্চ আদালত ব্যক্তিগত বিশ্বাসে উপভোগ করা অদম্যতা (inviolability) ও কুফরে (apostasy, blasphemy, infidelity) অভিযুক্ত প্রকাশিত বিবৃতির দূর্বলতার মধ্যে পার্থক্য টানে। আদালত তখন বলে যে এখানে কুফরে অভিযুক্তের বিষয়টি কোন নির্দিষ্ট লেখকের অভিপ্রায় অনুসারে হয়নি, বরং সামাজিক সম্পর্কের ভূমিকা দ্বারা হয়েছে। এই বিষয়টিকে জনসম্মুখে আনাটাই হল তার দায়। আধুনিক উদার দৃষ্টিভঙ্গির সাথে এর অবস্থান কাছাকাছি, তা দিয়ে একে সংজ্ঞায়িত করা যায়না। সাধারণভাবে, এই প্রসঙ্গে উদার দৃষ্টিভঙ্গি মনে করে যে দুটি বিষয়ের মধ্যে চূড়ান্ত সম্পর্ক কাজ করে; যার একটি ব্যক্তি এবং অন্যটি ব্যক্তির পক্ষে সত্য বলে ধরে নেওয়া তার ব্যক্ত কিংবা লিখিত কথা। অন্যসব গবেষণামূলক বিবৃতির মতো এইসব বিবৃতিও যাচাইয়ের মানদন্ড সাপেক্ষ। অভ্যন্তরীণ কিংবা বাহ্যিক যেভাবেই হোক বিশ্বাসের রয়েছে এক অস্পষ্ট রূপ। বেশিরভাব আধুনিক পশ্চিমারা এই অভ্যন্তরীণ রূপটাকে প্রাথমিকভাবে গ্রহণ করেছে, যদিও সাধারণভাবে এটা স্বীকৃত যে একে বাহ্যিক হিসেবে বিবেচনা করাও সম্ভব। কিলিয়াম বালজ লিখেছিলেন, “বিশ্বাস এক আধ্যাত্মিক ব্যাপার যা আদালতের কক্ষে তদন্তের জন্য খুব একটা সহজগম্য নয়।”৩৩ তিনি তার এই কথার মাধ্যমে ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে ‘ধর্মীয় বিশ্বাস’ বোঝার ধর্মনিরপেক্ষ ধারণাটি মূলত পুনরুদ্ধার করতে চেয়েছেন। তবে আমার মতে বালজের সেই উক্তিটি আদালতে পরম সত্য প্রকাশের কার্যকর দক্ষতার নীতিগত সংশয় হিসেবে নয়, বরং নিরাপত্তার দাবী হিসেবেই বোঝা উচিত (যেহেতু আদালতের অনধিকারচর্চার অধিকার নেই)। অন্য কথায়, এটা চিরায়ত শরিয়ত প্রথা থেকে একেবারেই আলাদা। শরিয়ত প্রথায় ইসলামিক আইনজীবিরা জ্ঞানতত্ব বিষয়ক সংশয়ের নীতি গ্রহণ করেন। তারা মনে করেন, সংবেদনশীল অভিজ্ঞদের দ্বারা অসমর্থিত হলে বিচারক সত্য ও মিথ্যাকে পরম নিশ্চয়তা সহকারে পৃথক করতে পারে না। নবীর প্রথা ও ইসলামী আইনজ্ঞদের একতা- উভয় স্বর্গীয় উদঘাটন মুসলিমদের ‘অকাট্য ও নির্দিষ্ট বাণী/জ্ঞান’ (ইলম ইয়াকিন) সরবরাহ করে। আইনজ্ঞরা মনে করেন তাদের প্রতিষ্ঠিত আইনী ও নৈতিক বিধিগুলোর সাথে এই নির্দিষ্টতা সম্পর্কযুক্ত; প্রদত্ত মামলায় ব্যক্তির দাবী করা সত্যের সাথে নয়।৩৪ বিপরীতে, একটা ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রকে নির্ধারণ করতে হবে যে কোন চর্চা কিংবা মতবাদ কোন নির্দিষ্ট ধর্মের সাথে সম্পর্কিত কিনা; এবং সে রাষ্ট্রকে এক ধর্মের বিশ্বাসীকে অন্য ধর্মের সদস্যদের সাথে সমান মর্যাদা দেওয়ার পরিস্থিতি তৈরি করতে হয়।৩৫ সুতরাং স্বেচ্ছায় হোক কিংবা জোর করেই হোক, বিশ্বাস অবশ্যই মতবাদ হিসেবে মূর্ত। আবু জায়েদের মামলার বিষয়টি এই অর্থে যথার্থতা বা “বিশ্বাস”-এর ব্যাপার নয়; এটা একজন মুসলিম অধ্যাপক হয়ে ইসলাম বিরোধী মতবাদ শেখানোর আইনী ও সামাজিক পরিণতি।৩৬ (আরবি শব্দ “ইমান” কে ইংরেজিতে প্রায়ই “বিশ্বাস (belief)” হিসেবে অনুবাদ করা হয়ে থাকে। যেমন- কুরানে বহুল ব্যবহৃত বাক্যাংশ “আইয়্যুহাল মুমিনিন” এর অর্থ “হে মুমিনগন!” তবে “বিশ্বাসী” হিসেবে এর অর্থ আরো ভালোভাবে উপস্থাপিত হয়েছে যেমন- “আমি আপনার প্রতি বিশ্বস্ত।” সাধারণত “বিশ্বাস”(belief) বোঝাতে ব্যবহৃত আরেকটি শব্দ হলো ” ইতিকাদ” (i‘tiqād)। এটি এসেছে “আকদা” (aqada) শব্দ থেকে যার অর্থ “একত্রে রাখা” (to put together)। এই মূল থেকে পাওয়া যায় “আকদ” শব্দটি যার অর্থ “চুক্তি”। এই মূল থেকে আরো অনেক শব্দ পাওয়া যায় এবং এর মাধ্যমে সামাজিক সম্পর্কের বোধগুলো সনাক্ত করা যায়।৩৭ শাস্ত্রীয় আরবিতে এর প্রাথমিক জ্ঞানটা হলো বন্ধন যা বিশ্বাসীকে ইশ্বরের সাথে মিলিত করে। প্রচলিত শরীয়ত মোতাবেক, ব্যক্তিগত বিশ্বাসের দৃঢ়তার ব্যাপারটি ব্যক্তি ও তার ইশ্বরের মধ্যকার বিষয় হিসেবে দেখা হয় (বায়নাহু ওয়া বায়না রাব্বিহ)। এই ক্ষেত্রে বিশ্বাসকে “বাইনারি” (বিশ্বাস/অবিশ্বাস বা, নিশ্চয়তা/সন্দেহ) হিসেবে না দেখে ‘কন্টিনিউয়াম’ (continuum) হিসেবে দেখা হয়, যাতে করে কাউকে ‘দুর্বল বিশ্বাসী’ হিসেবে আখ্যা দেওয়া সম্ভব হয়। অবিশ্বাসের কোন আইনি দন্ডবিধি নেই; এমনকি কুরানেও অবিশ্বাসের কারণে কোন পার্থিব শাস্তি নির্ধারিত নেই। শাস্ত্রীয় আইনে ধর্মত্যাগের (apostasy) শাস্তির ন্যায্যতা তার সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিণতির ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়, কোন মিথ্যা মতবাদ পোষণ করে নয়। আইনত, বাহ্যিক কর্মকান্ডের (যেমন- প্রকাশ্য বক্তৃতা, লেখনী বা জনসম্মুখে দৃশ্যমান ব্যবহার) ভিত্তিতে ‘ধর্মত্যাগের ব্যাপারটি’ (রিদ্দা, কুফর) প্রতিষ্ঠিত হয়ে থাকে, অনুমান নির্ভর কিংবা জোরপূর্বক প্রকাশিত অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়।৩৮ সমসাময়িক মিশরে, আদালতে কোন মুসলিমকে ধর্মত্যাগের (Apostasy) অভিযোগে সাব্যস্ত করলে তার দন্ডবিধি নাগরিক মর্যাদার পরিণামস্বরূপ হতো, কারণ শরিয়ত সেখানে ব্যক্তিমর্যাদার আইন নির্ধারণ করতো। এর একটি পরিণতি হলো ধর্মত্যাগীর (apostate) বিবাহের স্বতঃস্ফূর্ত বিচ্ছেদ, যদি সে বিয়ে শরিয়তের আইন অনুসারে হয়ে থাকে। এছাড়াও রয়েছে কিছু সামাজিক পরিণতি; যার একটি হলো ইসলামী চিন্তাধারা শিক্ষাদানে দায়িত্বপ্রাপ্ত কোন ধর্মত্যাগী (apostate) বিষয়ে উদ্বেগ কেননা বেসামাল কথিত এবং লিখিত প্রকাশনার মাধ্যমে তিনি সত্যক বদলে দিতে পারেন। (এই যুক্তিটিকে আবু জায়েদের মামলায় আদালতের বিচারের সাথে মিশিয়ে বিভ্রান্ত হওয়া উচিত নয়। সেই মামলার শুনানিতে ঘোষিত হয়েছিল যে মুসলিম রাষ্ট্র হিসেবে ইসলামের উপর হামলা মানে মিশরের ভিত্তিতে হামলা। এই পরিণামস্বরূপ যুক্তির পাশাপাশি মুসলিমদের অনুভূতিতে আঘাত লাগার দাবিটিও একেবারেই আলাদা।) উদার চিন্তায় প্রলোভন ও জবরদস্তিমূলক বশ্যতার যে পার্থক্য আমি পূর্বেই উল্লেখ করেছি, যেখানে প্রলোভন আইনত অনুমিত এবং জবরদস্তি শাস্তিযোগ্য, আল-আওয়ার যুক্তিতে এই বিষয়টির উল্লেখ নেই। কাউকে প্রলুব্ধ করা মানে হলো কারো বিশ্বাসঘাতকতাকে উপস্থাপন করা, অন্যদের বিদ্যমান সামাজিক দায়বদ্ধতা ভঙ্গ করা। এমনকি খ্রিস্টিয় মধ্যযুগে কাফির বলতে কোন ব্যক্তির অনুমোদিত বিশ্বাস কিংবা মতবাদ থেকে সরে যাওয়াকেই কেবল বোঝানো হতো না; ধর্মনিরপেক্ষ অর্থে কাফির বলতে চুক্তি ভঙ্গও বোঝানো হতো।৩৯ পার্থিব জ্ঞানে এখন আধুনিক উদারপন্থী সমাজে ‘অবিশ্বস্ততা’র এক অদ্ভূত চক্র (quaint ring) রয়েছে যা কেবল যৌন প্রলোভনের সাথেই সম্পর্কযুক্ত। ইসলাম ধর্মতত্ত্বে প্রলোভন (seduction) অত্যন্ত উদ্বেগের বিষয়; কেবল যৌনতাতেই তা সীমাবদ্ধ নয়। কুরানে এমন অনেক অর্থ শব্দ রয়েছে যেগুলোকে ‘প্রলোভন’ (seducing) বা ‘বিমোহিত’ (deluding) হিসেবে ব্যাখ্যা করা হয়; সেসব শব্দের মূলে রয়েছে ” fatana, rāwada, gharra”। ফাতানা (যা থেকে ”ফিতনা” শব্দটি এসেছে) বলতে বোঝায় “ব্যক্তিকে যাচাইয়ের জন্য প্রলোভন ও পরিতাপ।”৪০ তবে এই শব্দটি দ্বারা কুরান যা বুঝিয়েছে তা যৌনতার প্রলোভনকে ইঙ্গিত করে না। (এমনকি আধুনিক আরবিতেও ফিতনা কেবল যৌন অর্থেই ব্যবহৃত হয়না; এটা সাধারণত মোহ কিংবা মুগ্ধতা অর্থেও ব্যবহৃত হতে পারে।) কুরানে স্পষ্টভাবে যৌন প্রলোভন বোঝাতে যে শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে তা হলো “রেওয়াদা”। ” ঘররা” বলতে বোঝায় নিজেকে প্রতারিত করে কল্পনার সাথে সম্পর্কযুক্ত বিভ্রান্তি। “ইঘরা” বলতে “অতিরিক্ত সংযুক্তি, স্বীয়প্রেম, আকাঙ্ক্ষা বা প্ররোচনা” বোঝানো হয়; আবার “অস্থিরতা কিংবা সামাজিক অস্থিরতা” ও বোঝানো যেতে পারে। মুসলিম ধর্মতাত্ত্বিক ও আইনজ্ঞতা ধরে নিয়েছিলেন, যে রূপেই হোক প্রলোভন কেবল ব্যক্তির পক্ষেই বিপদজনক নয়, বরং সামাজিক শৃঙ্খলার জন্যও তা বিপদজনক (প্রলোভন কেবল ব্যক্তির আত্মনিয়ন্ত্রণ হারানোর জন্যই দায়ী নয়, এটা নাগরিক সহিংসতা ও বিভেদ সৃষ্টির জন্যেও দায়ী)। তবে তাঁরা ছিলেন ভুল। কারণ বাজার গণতন্ত্র পদ্ধতি সম্পর্কে তাঁদের কোন ধারণা ছিল না যেখানে গ্রাহকের আত্ম-নিয়ন্ত্রন হারানোর ফলে উন্নতি সম্ভব হয় এবং যে পদ্ধতিতে রাজনৈতিক অবস্থা স্থিতিশীল রেখে রাজনীতিবিদরা শ্রোতাদের প্রলুব্ধ করতে শেখে। তাহলে কোন পরিস্থিতিতে এটা বোঝা যাবে যে মানুষ সত্যই যা বিশ্বাস করছে তাই কি সে বেছে নিচ্ছে? নাকি কেউ যখন কেউ স্বাধীনভাবে বেছে নিতে পারে তখনই তার সত্যিকারের বিশ্বাস প্রকাশিত হয়? সুসান মেন্ডুসের মতে,৪১ জন লক তার রাজনৈতিক সহনশীলতার তত্ত্বটি প্রস্তাব করেছিলেন একটা মনস্তাত্ত্বিক নীতির ভিত্তিতে যে বিশ্বাস কখনো ইচ্ছানুযায়ী নির্ধারণ করা যায় না। এখন নীতিটি নির্ভর করে বিশ্বাসের এক নতুন বোঝাপড়া এবং ইচ্ছার এক নতুন মনস্তত্ত্বের উপর, ইউরোপে যার আবির্ভাব ঘটেছিল সতেরো শতকে। মধ্যযুগে একটি বিপরীত মতবাদ প্রচলিত ছিল। থমাস একুইনাস নিশ্চিতভাবে ধরে নিয়েছিলেন যে বিশ্বাস (একটি প্রতিশ্রুতি, একটি প্রিয় ধারণা) হতে পারে ইচ্ছা নির্ভর। আধুনিক মনস্তত্ত্বের ভিতিকে জন লক জোর দিয়ে বলতে পেরেছিলেন যে ধর্মীয় বিশ্বাসের উপর কিংবা ধর্মীয় চর্চার মাধ্যমে মুক্তিপ্রাপ্তির বিশ্বাসের উপর রাজ্যের (Prince) বল প্রয়োগের চেষ্টা ছিল অযৌক্তিক। (এখানে Prince বলতে রাজ্য, রাষ্ট্রের শক্তি বা শক্তিধরকে বুঝানো হয়েছে। অনুবাদের সুবিধার্তে আমরা রাজ্য উল্লেখ করছি)। যে সকল বলপ্রয়োগ সেই সুরক্ষার বিধান করতে পেরেছিল তা ছিল বিশ্বাসের অন্তর্নিহিত জীবিকা (insincere profession)। মুক্তিলাভের চেয়ে বরং রাজ্যের বিষয়াদির উপর প্রথা আরোপ করা, যেমন- আইনশৃঙ্খলা রক্ষা করা ইত্যাদির জন্য রাজ্যের নিশ্চয় আরো কিছু কারণ ছিল যাতে রাজ্যের বলপ্রয়োগের প্রচেষ্টাটি অযৌক্তিক না দেখায়। বিশ্বাসে জোর খাটানোর রাজনৈতিক প্রচেষ্টা যে অযৌক্তিক এই ধারণাটি ছিল মেন্ডাসের সংক্ষিপ্তসারিত অনেকগুলো বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু। মুসলিমদের অবস্থান সম্পর্কে আল-আওয়ার ব্যাখ্যা জন লকের ব্যাখ্যার চেয়ে আলাদা। জন লকের ব্যাখ্যা অনুসারে বিশ্বাসের উপর যেহেতু জোর খাটানো সম্ভব নয়, সুতরাং মনই ধর্মের প্রকৃত অন্তর্নিহিত স্থান; এবং গাঠনিক শক্তি হিসেবে নাগরিক সরকার বাহিনীর উচিত নাগরিক স্বার্থ তথা নাগরিকের জীবন, অঙ্গ ও সম্পত্তির সুরক্ষার মধ্যেই নিজেকে সীমাবদ্ধ রাখা। আল আওয়ার ব্যাখ্যানুসারে, ধর্মীয় বিশ্বাসকে পৃথক রেখে ধর্মীয় অন্যান্য বিষয়ের উপর প্রলোভন বা বলপ্রয়োগ সম্ভব; তবে তা হবে অবৈধ। এই ব্যাপারটি ঘটনাক্রমে ইসলাম , খ্রিষ্টান আর ইহুদীবাদের সাথে মিলে যায়, যেখানে ঐশ্বরিক ব্যাপারগুলোর কুলুজি সন্ধান করাকে একটি বিকৃতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। মেন্ডুসের মতে, লকের ধারণা সত্যই ছিল যে জোরপূর্বক ধর্মীয় বিশ্বাস চাপানো অসম্ভব এবং এই বিষয়ে তিনি লকের সমালোচকদের থেকে তাঁকে রক্ষা করেন ব্যক্তি চেতনার সূক্ষ্ম পার্থক্যের দ্বারা; যা মূলত ব্যক্তির অংশগ্রহণমূলক বিশ্বাস (sincere belief) ও খাঁটি বিশ্বাসের (authentic belief) পার্থক্য। মেন্ডুস এই পার্থক্যের ধারণা বার্নার্ড উইলিয়ামসের কাছ থেকে ধার করেছেন। এটা তাঁকে যুক্তি দিতে সহায়তা করে যে জোরপূর্বক (ধর্ম) রূপান্তরকরণে অংশগ্রহণমূলক বিশ্বাস অর্জিত হলেও খাঁটি বিশ্বাস অর্জন করা যায় না। কিন্তু আমি মনে করি মেন্ডুসের উত্থাপিত শর্তগুলো তথাকথিত গ্রহণযোগ্যতার শর্ত (so-called acceptance conditions) থেকেই প্রশ্নবিদ্ধ। মেন্ডুসের দাবি অনুযায়ী বিশ্বাস খাঁটি নাকি অংশগ্রহণমূলক তা নির্ধারণ করার জন্য ইচ্ছাকৃত স্বল্পভাষীতা/reticence (যা সত্য বলে বিশ্বাস করে তা প্রকাশ না করা) এবং কপটতার/insincerity (যা বিশ্বাস করে না তার সমর্থন করা) বিকল্পগুলি সর্বদা সম্ভাবনা হিসেবে কাজ করে। তাঁর এই দাবীর যথার্থতার পক্ষে আমি সংশয়প্রকাশ করি। এই ইস্যুর বিকল্পগুলি বিমূর্ত সম্ভাবনার চেয়ে নিশ্চয় আরো বেশি কিছু বোঝায়; তবে তাই যদি হয়, তাহলে কিছু কিছু ধর্মীয় আচরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া উচিত নয়। যেমন- প্রকাশ্যে “সাক্ষ্য দেওয়া” যখন ক্রোধে কিংবা করুণায় একজন অনুভব করে সত্য বলা ছাড়া আর কোন উপায় নেই তখন তা “কৃত্রিম” বলে বিবেচিত হয়।৪২ এই পরিস্থিতিতে ব্যক্তি নৈতিকভাবে সত্য বলে যা বিশ্বাস করে তা স্বীকার করতে নীরব থাকার অসম্ভবতা কিংবা ব্যক্তি যা বিশ্বাস করে না তা স্বীকার করার অসম্ভবতা কি ব্যক্তির বিশ্বাসের “কৃত্রিমতা” বোঝায়? এরফলে, ‘প্রকৃত বিশ্বাস’কে নির্ধারন করার দার্শনিক মানদন্ডগুলো মানুষের বেছে নেওয়ার পেছনে কার্যকর থাকা আবেগকে উপেক্ষা করে। এই অবমূল্যায়নের একটি পরিণতি হলো এই যে, ধর্মনিরপেক্ষ উদারপন্থীদের পক্ষে সেসব মানুষের আবেগ বোঝা মুশকিল হয়ে উঠে যাদের পক্ষে আবেগে অনুপ্রাণিত হয়ে সঠিকভাবে হোক কিংবা ভুলভাবে ব্লাসফেমির মুখোমুখি নীরব থাকা অসম্ভব হয়ে উঠে, যাদের কাছে ব্লাসফেমি “বাকস্বাধীনতা” নয়, আবার নতুন সত্যের দাবিও নয়, বরং এমন একটি বিষয় যা অধিষ্ঠিত (living) সম্পর্ককে বিঘ্নিত করার চেষ্টা করে। লক্ষ্যনীয় যে, ধর্ম অবমাননাকারীদের প্রতি আবেগী প্রতিক্রিয়া সাধারণত অবমাননাকারীদের অবিশ্বাসের ভিত্তিতে পরিচালিত নয়, বরং তাদের কথিত সহিংসতার দিকে পরিচালিত হয়। আমি জোর দিয়ে বলছি, ব্লাসফেমির বিরূদ্ধে যারা প্রতিবাদ করে তাদের আসল উদ্দেশ্য জানতে পারার কোন দাবী আমি এখানে করছি না। আমার যুক্তি হলো আমরা যদি ব্লাসফেমির মধ্যে স্বাধীনতার হুমকিই কেবল দেখি তবে আমরা ব্লাসফেমির অর্থ বুঝতে পারবো না; যদিও তা ঐতিহাসিকভাবে সত্য যে শক্তিশালী বিতর্কিত মন্তব্যগুলোই (apparatuses) সাধারণত ‘ব্লাসফেমি’ হিসেবে অভিযুক্ত হয়। ২২. দ্রষ্টব্য এডওয়ার্ড উইলিয়াম লেন এর ‘এ্যারাবিক ইংলিশ লেক্সিকন’ (লন্ডন, ১৮৬৩)। এছাড়া এ. দি বিবারস্টেইন কাজিমিরস্কি এর ‘Dictionnaire Arabe-Français’ (কায়রো, ১৮৭৫) দ্রষ্টব্য, যাতে আছে ‘Blasphémer Dieu, et faire nargue de ses bienfaits’ ২৩. এই ক্ষেত্রে, তা ‘শাতিমা’, ‘সাব’, ‘ইসতিহানা’ (shatīma, sabb, istihāna) কতিপয় শব্দের সাথে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে যায়। ২৪. ‘Bayān al-ittihād hawl nashr suwar masī’a li-rrasūl’ (নবীকে অপমানের উদ্দেশ্যে ব্যঙ্গচিত্র প্রকাশের ব্যাপারে ইসলামিক পন্ডিতদের বিশ্ব সংঘের বিবৃতি), কায়রো, ২৩ই জানুয়ারি, ২০০৬: www.qaradawi.net/site/topics/article.asp?cu_no=4143&version=1&template_id=116&parent_id=114 ২৫. যে বইয়ের জন্য নাসের হামিদ আবু জায়িদকে মুরতাদ (স্বধর্মত্যাগী) ঘোষণা করা হয় (অতঃপর স্ত্রীর সাথে তার বৈবাহিক সম্পর্ককে অবৈধ বলে ঘোষণা করা হয়) সেটি হলো ‘Mafhūm al-nass: Dirāsah fi ‘ulūmal-Qur’ān’ (পবিত্র বাণীর বোঝাপড়াঃ কুরানের বৈজ্ঞানিক গবেষণা), বৈরুত, ১৯৯০। আবু জায়েদের পদ্ধতির উপর দুটি মজার প্রবন্ধ উল্লেখ করা উচিত: চার্ল হির্শকিন্দ এর ‘হেয়ারস্যে এন্ড হার্মেনটিক্স: দ্য কেইস অফ নাসের হামিদ আবু জায়েদ’, স্টানফর্ড হিউম্যানিটিস রিভিউ ৫, নং-১ (১৯৯৬); এবং সাবা মাহমুদের ‘সেক্যুলারিজম, হার্মেনটিক্স এন্ড এম্পায়ার: দ্য পলিটিক্স অফ ইসলামিক রিফর্মেশন’, পাবলিক কালচার ১৮, নং-২ (২০০৬)। অন্যান্য ইসলামিক সংস্কারকের মধ্যে আবু জায়েদকে নিয়ে সাবা মাহমুদ কাজ করেন। ২৬. মামলার বিস্তারিত বিবরণ দেওয়া আছে কিল্লান বালজে, ‘সাবমিটিং ফেইথ টু জুডিশিয়াল স্ক্রুটিনি থ্রো দ্য ফ্যামিলি ট্রায়েল: দ্য আবু জায়েদস কেইস’ Die Welt des Islams, নিউ সিরিজ ৩৭, নং-২, ১৯৯৭। আরো চমৎকার বিবরণ দেওয়া আছে হুসেইন আগ্রামার পিএইচডি প্রবন্ধের প্রথম অধ্যায়ে ‘ল কোর্টস এন্ড ফতওয়া কাউন্সিল ইন মডার্ন ইজিপ্ট: এন এথনোগ্রাফি অফ ইসলামিক লিগ্যাল প্র্যাকটিস’ (দ্য লেজিসলেশন অফ ‘হিসবা’ ইন দ্য কেইস অফ আবু জায়েদ), জন্স হপকিন্স বিশ্ববিদ্যালয়, ২০০৫। Extended extracts from the judgments in the court of first instance, the court of appeals, and the court of cassation, are given (in French translation) in “Jurisprudence Abu Zayd,” ‘Egypte/Monde Arabe’, no. 34 (1998). The original Arabic judgments are contained in Muhammad Salim al-‘Awwa, al-haq fi al-ta‘bīr (The right to free speech), (Cairo, 1998). ২৭. আল-আওয়া, আল-হাকফি আল-তা’বির, পৃষ্ঠা-২৩। আরো দ্রষ্টব্য, আহমাদ রাশাদ তাহুন এর ‘হুররিয়াত আল-আকিদা ফি-শাররিয়া আল-ইসলামিয়া’ (কায়রো, ১৯৯৮), তিনি রাজনৈতিক ব্যাপারে, বিশেষ করে ‘উম্মা’র ঐক্যের ব্যাপারে আল-আওয়ার চেয়েও বেশি উদ্বিগ্ন। ২৮. একটি সাম্প্রতিক প্রবন্ধে বাবের জোহানসেন ‘জবরদস্তিমূলক স্বীকারোক্তি’র ব্যাপারে ইবনে তাইমিইয়ার অবস্থান পরিষ্কার করেছেন। জোহানসেন লক্ষ্য করেছেন, “যেখানে রোমান আইনে ও ইউরোপের মধ্যযুগীয় বিচার ব্যবস্থায় সাক্ষ্যদাতার উপর নির্যাতন একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতো, সেখানে মুসলিম আইনি মতবাদে এই ব্যাপারটি ছিল অপরিচিত।” কিন্তু আইনের ভূমিকা সম্পর্কে ইবনে তাইমিইয়ার ছিল ব্যতিক্রমী রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি, যার ফলশ্রুতিতে তিনি পক্ষপাতিত্ব করেছিলেন জোরপূর্বক সাক্ষ্যদানের বৈধ অনুমোদনের জন্য। দ্রষ্টব্য, “সাইনস এন্ড এভিডেন্স: দ্য ডকট্রিন অফ ইবনে তাইমিইয়া (১২৬৩-১৩২৮) এবং ইবনে কাইয়িন আল-জাওজিইয়া (১৩৫১)”, ইসলামিক ল’ এন্ড সোসাইটি ৯, নং-২ (২০০২), পৃষ্ঠা-১৭১। ২৯. কান্ট তার “হোয়াট ইজ এনলাইটেনমেন্ট” রচনায় ‘সর্বজনীন যুক্তি/কারণ’ ও ‘ব্যক্তিগত যুক্তি/কারণ’ নিয়ে কথা বলার সময় এই দুইয়ের মধ্যে সূক্ষ্ম পার্থক্য তৈরী করেছেন। যদিও ‘ব্যক্তিগত যুক্তি/কারণ’ নির্ভর করে রাষ্ট্রের ধারণার উপর যা সর্বজনীন বিতর্ক পরিচালনা করার জন্য একটি অঙ্গনের সাথে সম্পর্কিত। আল-আওয়ার এমন কোন যুক্তি নেই। তার উদ্বেগ কেবল ব্যক্তির অন্তরজগতের দশা হিসেবে তার বিশ্বাসের প্রকাশ্য উপস্থাপন নিয়ে। ৩০. উল্লেখ্য যে, সংজ্ঞা অনুযায়ী, (১) চিন্তা বা কর্মের মাধ্যমে ব্লাসফেমি সংঘটিত হলেও সাধারণত বক্তৃতায় উচ্চারিত শব্দ থেকেই ব্লাসফেমি নির্ধারণ করা হয়। এটি জিহ্বার পাপ হিসেবে সংঘটিত হয় বলে একে সরাসরি ইশ্বরের ইবাদাত করার বিপরীত ক্রিয়া হিসেবেই চিহ্নিত করা হয়। (২) It is said to be against God, though this may be only mediately, as when the contumelious word is spoken of the saints or of sacred things, because of the relationship they sustain to God and His service.” ‘দ্য ক্যাথোলিক এনসাইক্লোপিডিয়া’ (নিউইয়র্ক, ১৯০৭), ২ঃ৫৯৫। ৩১. আল-আওয়া, আল-হাকফি আল-তা’বির, পৃষ্ঠা-১৩। ৩২. আল-শেখ ‘উথমান সাফি, আলা হামিশ “নাকাদ আল-ফিকর আদ-দিনি” (‘দ্য ক্রিটিক অফ রিলিজিয়াস থট’ এর পাদটীকা) (বৈরুত, ১৯৭০), পৃষ্ঠা-৮৭। ৩৩. বালজ, “সাবমিটিং ফেইথ”, পৃষ্ঠা-১৪৩। ৩৪. জোহানসেন, ”সাইনস এন্ড এভিডেন্স” (Signs and Evidence)। ৩৫. উইনিফ্রেড ফেলারস স্যুলিভান এর চমৎকার এথনোগ্রাফিক গবেষণা “The Impossibility of Religious Freedom” (প্রিন্সটন, ২০০৫)। ৩৬.ibid, পৃষ্ঠাঃ ১২-১৩। ৩৭. এটা ইংরেজী শব্দ “Belief” (বিশ্বাস) এর প্রাকআধুনিক অর্থের সদৃশ এবং অন্যান্য ইউরোপীয় ভাষার সমতুল্য নয়। শব্দটির চমৎকার ব্যুৎপত্তিগত অর্থের জন্য উইলফ্রেড কান্টওয়েল স্মিথ এর ‘ফেইথ এন্ড বিলিফ’ (অক্সফোর্ড, ১৯৯৮) বইটির অধ্যায়-৬ দ্রষ্টব্য। ৩৮. মুরতাদ বা ধর্মত্যাগী নির্ধারণ এবং এর প্রাপ্য শাস্তি নির্ধারণের মানদন্ড নিয়ে আধুনিক ইসলামি ইতিহাসে যথেষ্ট মতবিরোধ রয়েছে। বুখারি রচিত একটি মধ্যযুগীয় হাদিস গ্রন্থে নবী মোহাম্মদের বিবৃতি পাওয়া যায় যে মুরতাদের শাস্তি অবশ্যই মৃত্যুদন্ড; কিন্তু মুসলিম সংগৃহীত আরেকটি হাদিস এই বিবৃতি অসত্য বলে ঘোষণা দেয়। এই বিতর্কটি আধুনিক যুগেও চলমান। ৩৯. ডোরোথি ওয়েলটেকের সূক্ষ্ম বিশ্লেষণ, “বেয়ন্ড রিলিজিওন: অন দ্য ল্যাক অফ বিলিফ ডিউরিং দ্য সেন্ট্রাল এন্ড লেট মিডল এইজেস”, ‘রিলিজিওন এন্ড ইটস আদার: সেক্যুলার এন্ড স্যাক্রাল কনসেপ্টস এন্ড প্র্যাকটিসেস ইন ইনটারেকশন’, জোরা ফেচার, মিচি নেচ ও হেইক বোক (শিকাগো, ২০০৮)। ৪০. একটি সাধারণ বাক্যঃ ওয়া-ল-ফিতনাতু আশাদ্দু মিন আল-গাতলি (২ঃ১৯১), “নিপীড়ন হত্যার চেয়েও ভয়াবহ।” ৪১. সুসান মেন্ডুস, ‘টোলারেশন এন্ড দ্য লিমিটস অফ লিবারেলিজম’ (আটলান্টিক হাইল্যান্ড, এনজে, ১৯৮৯)। ৪২. “আমি এখানে অবস্থান করছি: আমি অন্য কিছু করতে পারি না” (Here I stand: I can do no other) মার্টিন লুথারের উপর আরোপিত এই শব্দগুলো কখনো উচ্চারিত না হলেও উওর্মস এর ডায়েটে (Diet of Worms) তার মূল বক্তব্যের ভাবার্থ বেশ জোরালোভাবে প্রকাশ করে। দ্রষ্টব্য ও. চ্যাডউইক, ‘দ্য রিফর্মেশন’ (হার্মন্ডসোর্থ, ১৯৭২), পৃষ্ঠা-৫৬। যাই হোক না কেন, সেই বিখ্যাত অনুষ্ঠানে তিনি যা বলেছিলেন তা আন্তরিক (sincere) হলেও অসত্য (inauthentic) বলে গ্রহণ করতে হবে। যদিও তা সঠিক বলে মনে হচ্ছে না। প্রথম কিস্তি দ্বিতীয় কিস্তি |
