পুরুষ আধিপত্যের ভিত্তির খোঁজে নৃবিজ্ঞান

[পুরুষের আধিপত্য নিয়ে নৃবিজ্ঞানে আলোচিত বিভিন্ন ধরনের মতধারা নিয়ে লিখেছেন রিফাত হাসান আদর]

বর্তমানে সামাজিক বিজ্ঞানের প্রায় সকল শাখাতেই ‘লিঙ্গ বৈষম্য’ (gender discrimination) একটি আলোচ্য বিষয়। তবে লিঙ্গ বৈষম্যের আলাপে নৃবিজ্ঞানীরা প্রথমে পুরুষ আধিপত্যের সূচনা খোঁজার চেষ্টা করেছেন। পুরুষ আধিপত্যের সূচনা কবে এবং কীভাবে হলো সে আলাপ শুরু করবার আগে প্রথমে আমরা ‘সেক্স’ এবং ‘জেন্ডার’ শব্দ দুইটির অর্থগত পার্থক্য বুঝে নিই। ইংরেজি শব্দ ‘Sex’ এবং ‘Gender’ দুইটি ভিন্ন বিষয়কে ইঙ্গিত করলেও বাংলায় একই অর্থ প্রকাশ করে – লিঙ্গ। কিন্তু, ‘Sex’ বলতে মূলত বোঝায় মানুষের জৈবিক এবং প্রজননগত পরিচয়। অন্যদিকে, ‘Gender’ বলতে বোঝায় সেই জৈবিক বৈশিষ্ট্য অনুসারে সামাজিকভাবে নির্মিত লিঙ্গীয় পরিচয়।

ফেমিনিস্ট এন্থ্রোপলজি নৃবিজ্ঞানের একটি বিশেষ শাখা যা মূলত লিঙ্গ বৈষম্যের উপর আলোকপাত করে। ফেমিনিস্ট এন্থ্রোপোলোজির বিকাশ ঘটেছে বেশ কয়েকটি ধাপে। পলিটিক্যাল এন্থ্রোপোলোজির দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নারীর ক্ষমতা এবং রাজনীতিকে দেখলে এই বিকাশের মূলত তিনটি ওভারল্যাপিং পর্যায় দেখা যায়।

প্রথম যুগান্তকারী পর্যায়টির আবির্ভাব ঘটে ১৯৬০ সালে। নৃতাত্ত্বিকরা তখন প্রথমবারের মতো বিভিন্ন এথনোগ্রাফিক রচনায় এবং তত্ত্বে পুরুষ পক্ষপাতের বিষয়টিতে আলোকপাত করেন। তখন তাত্ত্বিক দিক থেকে নির্দিষ্ট কোনো  নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি ছিল না। খুব কম লেখাতেই নারীর দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হতো। তখনকার সময়ে বেশিরভাগ লেখাতেই ছিল পুরুষের পক্ষপাতিত্ব। ঠিক সেসময় আরো একটি আগ্রহের ক্ষেত্র ছিল মানুষের আচরণ কীভাবে  জৈবিক অস্তিত্ব দ্বারা নির্ধারিত হয় যা  ‘Biological determinism’ নামে পরিচিত। তখন মানুষের আচরণ এবং লিঙ্গিয় পরিচয় (gender) বোঝার জন্য যৌনাঙ্গকে (sex) নির্ধারক হিসেবে ধরা হতো। তাই সেসময়কার নৃতাত্ত্বিকরা যারা প্রথম নারীবাদী ধারায় চিন্তা করতে শুরু করেন, তারা মূলত জেন্ডারের সাংস্কৃতিক নির্মাণ প্রমাণ করতে জোর দিয়েছিলেন।

দ্বিতীয় পর্যায়ে নৃতাত্ত্বিকদের আগ্রহ ‘জেন্ডার কনস্ট্রাকশন’ এর দিকে সরে আসে। ‘anthropology of woman’ থেকে ‘anthropology of gender’ শাখাটি দুইটি দিক থেকে আলাদা ছিল। প্রথমত, ‘anthropology of gender’ জোর দেয় যে মানুষের ‘জেন্ডার’ এর নির্মাণ ঘটে সাংস্কৃতিকভাবে। দ্বিতীয়ত, এটি পুরুষের নিকট নারীর অধীনতার দিকটিতে আলোকপাত করে। একইসাথে ‘অধীনতা’ ধারণাটিকে একটি জটিল ধারণা হিসেবেও স্বীকার করে নেয়।

তৃতীয় পর্যায়ে ফেমিনিস্ট এন্থ্রোপোলোজির বিকাশ ঘটেছে তিনটি ভিন্ন ভিন্ন তত্ত্বের ভিত্তিতে – উত্তর-আধুনিকতাবাদ, উত্তর-ঔপনিবেশিকতাবাদ এবং বিশ্বায়ন তত্ত্ব।  এই তিনটি তত্ত্ব ভিন্ন হলেও তাত্ত্বিক পরিসরে এদের আন্তঃসংযোগ বিদ্যমান।

১৯৭০ সাল পর্যন্ত ‘নারীর সার্বজনীন রাজনৈতিক অধীনতা’ (Universal Political Subordination of Women) সাংস্কৃতিক নৃবিজ্ঞানের একটি মৌলিক আলোচনা হিসেবে গৃহীত ছিল। ইভান্স প্রিচার্ডের মতে, প্রায় সব ধরনের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোতেই সামাজিক কাঠামো নির্বিশেষে পুরুষের কর্তৃত্ব বিদ্যমান। আবার জ্ঞাতি সম্পর্ক অধ্যয়ন করতে গিয়ে রবিন ফক্স বলেন, পুরুষের আধিপত্য জ্ঞাতিসম্পর্কের একটি মৌলিক ভিত্তি। যদিও আদিম মাতৃতন্ত্রের ধারণা নিয়ে একটি প্রচলিত লোককথা আছে যে কৃষির সূচনা ঘটে নারীর হাত ধরে (বাকোফেন, ১৮৬১)। নারীর হাতে কৃষির সূচনার ফলে আদিম মানুষের মাঝে ‘Mother Goddess’ এর ধারণা জন্মে। এভাবে দীর্ঘদিন ধরে পৃথিবীতে নারীর কর্তৃত্ব ও আধিপত্য বিরাজমান ছিল। কিন্তু প্রত্নতাত্ত্বিক জ্ঞান ও এথনোগ্রাফিক রচনা মাতৃতন্ত্রের এই ধারণাটিকে সমর্থন করেনি।

আবার ‘Evolutionary Biology’ শাখায় একটি ধারণা বদ্ধমূল ছিল যে পুরুষই শিকারি (Man the hunter); কারণ জৈবিকভাবে পুরুষই কেবল শিকারের মতো কঠিন কাজে সামর্থ্য। আর পুরুষ যখন শিকার কাজে বের হতো, নারী তখন পারিপার্শ্বিক অঞ্চল থেকে খাবার সংগ্রহ করতো ও সন্তান লালন-পালন করতো। সন্তান জন্ম দেওয়া, লালন-পালন করা এবং গুহার বাইরে আগুন জ্বালিয়ে ক্যাম্পিং করাই ছিল নারীর মুখ্য কাজ। আদিম সমাজে নারী-পুরুষের কাজ নিয়ে বিজ্ঞানীদের এই ধারণার মাধ্যমে পুরুষের তুলনায় নারীকে অধিক সংযমী এবং নিষ্ক্রিয় হিসেবে ধরে নেওয়া হয়। এভ্যুলুশনারি বায়োলজি মতে, এভাবেই দুই মিলিয়ন বছর ধরে পুরুষের নিকট নারী অধীনতার শিকার হয়ে আছে।

এমনকি নৃবিজ্ঞানের শাখায়ও পুরুষ আধিপত্যের ধারণাটি ১৯৫০ সাল পর্যন্ত বদ্ধমূল ছিল। তবে, সেই সময়টিতেই ‘জেন্ডার’ এর বায়োলজিক্যাল নির্মাণের ধারণা খারিজ করে রুথ বেনেডিক্ট এবং মার্গারেট মীডের মতো নৃবিজ্ঞানীরা প্রচলিত ধারণার শিকল ভাঙতে শুরু করেন। তারা সাংস্কৃতিক আপেক্ষিকতাবাদের (Cultural Relativism) দৃষ্টিভঙ্গি থেকে জেন্ডার কনস্ট্রাকশনের সামাজিক ব্যাখা দেওয়ার চেষ্টা করেন। সেই থেকে পরবর্তী ৪০ বছর নারীবাদী নৃতাত্ত্বিকরা এথনোগ্রাফিক প্রমাণসাপেক্ষে জেন্ডারের প্রচলিত মৌলিক আলাপকে চ্যালেঞ্জ করতে শুরু করেন।

১৯৮০ সাল পর্যন্ত বিবর্তনের সাধারণ তত্ত্বগুলো আদিম সমাজের শিকার-পদ্ধতির দিকে গুরুত্ব আরোপ করে। আদিম সমাজে নারীদের প্রয়োজনীয়তা ঘরে বসে থেকে সন্তানের দেখাশোনা করা, খাবার কুড়ানো কিংবা সংগ্রহ করা পর্যন্তই সীমাবদ্ধ ছিল। অন্যদিকে আদিম সমাজের পুরুষদের মুখ্য কাজ ছিল শিকার করা এবং অন্যান্য সরঞ্জাম প্রস্তুত করা। বলা হয়ে থাকে শিকার-কৌশলের মধ্য দিয়ে ‘প্রারম্ভিক সভ্যতার’ সূচনা হয়। দীর্ঘদিন শিকারে থাকার ফলে একজন পুরুষ এবং একজন নারীর মধ্যে গভীর বন্ধন তৈরী হওয়ার সুযোগ ছিল না, যেটুকু ছিল সেটুকুও শিকার কার্যক্রম শেষ হবার পর। অন্যদিকে, সন্তানের প্রতি অতি-নির্ভরশীলতার ফলে নারী-পুরুষের জোড়া বন্ধন না হলেও নারী-সন্তানের মধ্যকার বন্ধন ভালোভাবেই তৈরী হয়। ভিন্ন একটি দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে নারী সংগ্রহকারীকে পুরুষ শিকারীর তুলনায় বেশি অথবা সমতুল্য মর্যাদা দেওয়া যায়। কারন নারীরা পুরুষদের শিকার থেকে ফিরে আসার অপেক্ষায় খাদ্য-সংকটে বসে থাকতো না। বরং তারা প্রাত্যহিকভাবে পরিবারের জন্য খাবার সংগ্রহ করতো। এই সংগ্রহের কাজের জন্য নারীর যে দক্ষতা লাগতো তা পুরুষ শিকারীর চেয়ে কোন অংশে কম নয়। সংগ্রহকারীকে একাধিক বিষয়ে বিবেচনা করতে হয় যেমন- খাবার খোঁজা, উপযুক্ত খাবার বাছাই করা, মৌসুম পরিবর্তন সম্বন্ধে জ্ঞান থাকা, ভূগোল ও আবহাওয়া সম্পর্কিত খবর রাখা ইত্যাদি। মাঝে মাঝে নারীর সংগৃহীত খাবারের পরিমাণ পুরুষ শিকারীর চেয়েও বেশি হতো। বর্তমান যুগে যেসব শিকার-সংগ্রহকারী সমাজ রয়েছে সেসব সমাজেও এই ব্যাপারটা লক্ষনীয়। অর্থাৎ বিবর্তনের ধারাবাহিকতায় নারীর ভূমিকা কেবল নিষ্ক্রিয় অংশীদারেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং নারীর ভূমিকা পুরুষের সমতুল্য।

Socio-biology-এর দৃষ্টিভঙ্গি থেকে আবার একটি ভিন্ন আলাপ টানা যায়। সোশিও-বায়োলজিস্টরা বিবর্তনের যাত্রায় নারী এবং পুরুষ উভয়ের সমান অবদানের কথা স্বীকার করেন। কিন্তু তারা দাবী করেন প্রাকৃতিক নির্বাচনের (Natural Selection) ফলে এই দুই লিঙ্গের বাহকদের মধ্যে ভিন্ন ভিন্ন বিবর্তনীয় কৌশল দেখা দেয় যার ফলে পুরুষ আধিপত্যের আবির্ভাব ঘটে। ‘Selfish Gene’ নামক এক থিওরেটিক্যাল স্কুল এক ধরনের বিবর্তনবাদী মতবাদ দেয় যে, প্রতিটি প্রজাতির (এমনকি মানুষের) পুরুষ সদস্যদের জেনেটিক প্রোগ্রামের একটি প্রবণতা হলো তাদের জিনকে বিস্তৃতভাবে ছড়িয়ে দেওয়া। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকে দেখলে বিবর্তনের যাত্রায় পুরুষদের একটি প্রধান কৌশল হলো যতো বেশি সংখ্যক সম্ভব যৌনসঙ্গী বানানো। ফলে তাদের মধ্যে আগ্রাসন এবং প্রতিযোগিতামূলক আচরণ দেখা যায়। অন্যদিকে, নারীদের জেনেটিক প্রোগ্রামের বড় অংশ কাজ করে সন্তানকে ঘিরে। ফলে তাদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী সম্পর্ক স্থাপনার প্রচেষ্টা এবং সহযোগিতামূলক আচরণ দেখা যায়। এই গতানুগতিক ধারণা অনুযায়ী পুরুষ শিকারিকে বিবর্তনের প্রাথমিক পরিচালক হিসেবে গণ্য করা হলেও, নারীর অবদানকে কম গুরুত্ব দেওয়া হয়। 

নারী এবং পুরুষের মধ্যকার সহজাত আচরণগত পার্থক্য কিসের উপর ভিত্তি করে প্রতিষ্ঠিত সেই আলাপ এখনো বেশ বিতর্কিত। ‘The Culturalogical School’ এর মতে, এই পার্থক্যের সূচনা মূলত শিশুর সামাজিকীকরণের প্রক্রিয়া থেকে শুরু। অর্থাৎ শিশু যে সংস্কৃতিতে বেড়ে ওঠে সেই সংস্কৃতির আদর্শ, মূল্যবোধ ও ব্যবহারিক চর্চার সাপেক্ষে শিশুর আচরণের বিন্যাস ঘটে। অন্যদিকে The Prepared Learning School এর মতে, শিশুর আচরণ নির্ধারিত হয় জৈবিক লিঙ্গ (sex) এর সাপেক্ষে। অর্থাৎ শিশুর লিঙ্গ যদি পুরুষ হয় তবে তা ‘পুরুষালি’ ব্যবহারকে তাড়িত করবে; আর শিশুর লিঙ্গ যদি নারী হয় তবে তা ‘মেয়েলি’ ব্যবহারকে তাড়িত করবে।

আবার কিছু কিছু জৈব-মনস্তাত্বিক ব্যাখাতেও পুরুষাধিপত্যের ভিত্তি খোঁজা হয়। এই ব্যাখ্যাগুলো পাওয়া যায় মূলত চারটি উৎস থেকে। প্রথমত, Cross-Cultural Study থেকে দেখা যায় যে তরুণ পুরুষ তরুণী নারীর তুলনায় বেশি আক্রমণাত্মক। (তবে এই ক্রস-কালচারাল স্টাডিতে যেসব তরুণ পুরুষের স্যাম্পল নেওয়া হয় তাদের মধ্যে ২০ শতাংশেরই সামাজিকীকরণ ঘটেছে এমনভাবে যে তারা আক্রমণাত্মক হিসেবে গড়ে উঠেছে।) দ্বিতীয়ত, ইসরাইলে একইসাথে বেড়ে ওঠা শিশুদের সামাজিকীকরণ পর্যবেক্ষন করে দেখা যায় তাদের সামাজিকীকরণ প্রক্রিয়া একই হলেও ছেলে শিশুরা মূলত বেশি আক্রমণাত্মক এবং মেয়ে শিশুরা তুলনামূলকভাবে সংহত। তৃতীয়ত, উচ্চস্তরের প্রাইমেটদের মধ্যে গবেষণা করেও দেখা যায় যে পুরুষ প্রাইমেটদের আধিপত্য লক্ষণীয়। চতুর্থত, মনস্তাত্বিক চরিত্রের উপর গবেষণা করে দেখা যায়, টেস্টোস্টেরন নামক এক ধরণের হরমোন পুরুষের আগ্রাসনী আচরণের সাথে সম্পর্কিত। নারীর মধ্যে এই হরমোনের তুলনামূলক কম অনুপস্থিতি নারীর আগ্রাসনী আচরণ কম থাকার কারণ।

কিন্তু এই আলোচনার মূল সমস্যা হলো জৈবিক ও প্রাকৃতিকভাবে স্থান-কাল নির্বিশেষে পুরুষ আধিপত্যের দিকে নির্দেশ করা। পুরুষ আধিপত্যের যেসকল জৈবিক ভিত্তি খোঁজা হয়েছে, সেই যুক্তি ধরে নিলে পুরুষের আধিপত্য সার্বজনীন হওয়ার কথা। কিন্তু কিছু কিছু সমমাত্রিক সমাজে এই পুরুষ আধিপত্য অনুপস্থিত।

যেমন- ইরোকোয়াদের মধ্যে পুরুষের তুলনায় নারীর ক্ষমতা এবং অবস্থান উপরে। ইরোকোয়া সমাজে পুরুষরা শিকার, বাণিজ্যের কিংবা যুদ্ধের জন্য বেশিরভাগ সময় নিজ সমাজে অনুপস্থিত থাকে। ফলে, স্থানীয় গ্রাম পর্যায়ে নারীরাই ক্ষমতার চর্চা করে। ইরোকোয়া সমাজ একইসাথে ‘Matrilineal’ ও ‘Matrilocal’। তাদের সমাজে কয়েদীদের শাস্তি প্রদানের ক্ষমতাও নারীদের হাতেই থাকে। এছাড়া পুরুষদের শিকার করে নিয়ে আসা মাংস, সংগৃহীত উদ্ভিদ ইত্যাদি খাবার বণ্টনের অধিকারও নারীর হাতেই ন্যস্ত থাকে।

প্রাক-শিল্প যুগের সমাজে নারীর কার্যকলাপ বেশিরভাগ ক্ষেত্রে পরিবারের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। ‘রাজনীতি’ তখন পুরুষের কর্মক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হতো আর নারীর কর্মক্ষেত্র ছিল গার্হস্থ্য কিংবা পরিবার। তবে নারী-পুরুষের এই কর্মক্ষেত্রের বিভাজন বেশিরভাগ সমাজে লক্ষণীয় হলেও, এই দ্বিধাবিভক্তি সার্বজনীন না। কোন কোন সমাজে নারীরা রাষ্ট্রীয় কর্মক্ষেত্রেও বিচরণ করে যেমন- বিভিন্ন দেশে নারী রাষ্ট্রপ্রধান।

এছাড়া পুরুষ আধিপত্যকে ব্যাখা করতে আরেকটি ডাইকোটোমির আলাপ উল্লেখযোগ্য। সেটি হলো প্রকৃতি বনাম সংস্কৃতি। এ দ্বৈত-বিপরীত দৃষ্টিভঙ্গি বিকশিত হয়েছে মূলত ক্লদ লেভি-স্ট্রস এবং ক্লিফোর্ড গিয়ার্টজ এর কাজ থেকে। এটি জেন্ডারকে এক ধরনের প্রতীকি নির্মাণ হিসেবে ব্যাখা করে। এই দৃষ্টিভঙ্গি মতে, নারী প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত ও পুরুষ সংযুক্ত সংস্কৃতির সাথে। নারীকে মূলত তার প্রজননশীলতার জন্য প্রকৃতির সাথে সংযুক্ত করে দেখা হয় এবং তুলনা করা হয় পৃথিবী, চাঁদ, রোপণ, উর্বরতা ইত্যাদি প্রাকৃতিক প্রতীকের মাধ্যমে। অন্যদিকে, পুরুষকে তুলনা করা হয় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক প্রতীক দিয়ে যেমন- সূর্য, ভাষা, আইন, স্থাপত্য, রাজনীতি ইত্যাদি।

এই আলোচনাকে বোঝার জন্য কানাডিয়ান নৃগোষ্ঠী চিপেওয়াইনদের উদাহরণ দেওয়া যায়। তাদের সমাজে নারীকে ‘অবমূল্যায়ন’ করা হয়। এই নিম্ন অবস্থানের জন্য নারীকে এক ধরনের অসম শ্রম-বিভাজনের অন্তর্ভুক্ত হতে হয়। এছাড়া তাদের সমাজে নারী এবং পুরুষকে আধ্যাত্মিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে ধরা হয়। মনে করা হয়, শিকার কাজের মধ্য দিয়ে পুরুষ তার এই আধ্যাত্মিক ক্ষমতা লাভ করে এবং অন্যদিকে পুরুষের এই ক্ষমতাকে দূষিত করার মাধ্যমে নারীর আধ্যাত্মিক ক্ষমতা প্রকাশ পায়। তাদের কাছে নারী মানে ‘ক্ষমতা’ আর পুরুষ হলো সেই ক্ষমতা অর্জনকারী। তাদের কাছে পুরুষ শক্তির প্রতীক এবং নারী হলো সেই শক্তি ধ্বংসের প্রতীক।

লেভিস্ট্রস এবং গিয়ার্টজের এই প্রতীকি ব্যাখ্যা কিছু সুনির্দিষ্ট সংস্কৃতিকে অধ্যয়নের জন্য এবং ‘লিঙ্গের সাংস্কৃতিক নির্মাণ’- কে বিশ্লেষনের জন্য এক বিশেষ পদ্ধতি। নৃবিজ্ঞানের শাখায় পরবর্তীকালে লিঙ্গ এবং লিঙ্গিয় বৈষম্য নিয়ে আরো অনেক আলাপ বিদ্যমান। বর্তমানে নৃতত্ত্ব চর্চায় নারীবাদী দৃষ্টিভঙ্গি জনপ্রিয় একটা আদিকল্প। জ্ঞানকাণ্ডের পাশাপাশি ভাবাদর্শ হিসেবেও এখন জেন্ডারকে ঘিরে ক্ষমতাচর্চার আলাপ হয়ে থাকে। আদিম যুগ থেকে পুরুষ আধিপত্য কোথায় কতোটা চর্চা হয়েছে এবং এর বিবর্তন কীভাবে ঘটেছে সেই আলাপ এখন নৃবিজ্ঞানের বিদ্যায়তনের মুখ্য বিষয়। তবে কোন কোন সামাজিক পরিবর্তন এই পুরুষ আধিপত্যকে হটিয়ে নারী-পুরুষ সমতা প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে বা আদৌ পারবে কিনা তা নিয়ে নৃবিজ্ঞানীদের রয়েছে মতভেদ।

রেফারেন্সঃ Lewellen, T.C., 2003. ‘Gender and Power’ in ‘Political anthropology: An introduction’. ABC-CLIO. Pp. 131-158.