বিফলে যাওয়া ‘সাইন্টিফিক’ এক্সপেরিমেন্ট ও মুক্ত মানুষের ধারণা

[রাষ্ট্র ও মানবপ্রকৃতি নিয়ে একজন নৃবিজ্ঞানীর করা এক্সপেরিমেন্টের উপর লিখেছেন মোস্তফা মুশফিক।]

মানুষের ওপর কোনো শাসক বা কর্তা না থাকলে মানুষ আসলে কী করতে পারে, এই দার্শনিক[1]  প্রশ্নের উপর ভিত্তি করেই তৈরি হয়েছে আধুনিক রাষ্ট্রের ক্ষমতা কাঠামো। মানুষ তাকে নিরাপত্তা প্রদানের বিনিময়ে সরকারকে তার উপর কতটুকু কতৃত্ব আরোপ করতে দেবে তা-ই মূলত সামাজিক চুক্তি (Social Contract) এর মূল আলাপ।[2]  স্বাভাবিক ভাবে মনেই হতে পারে যে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে কঠোর আইন দরকার। বাংলাদেশে প্রচলিত কিছু রেটরিক—  “ধর তক্তা মারো বারি, ডান্ডা মারো ঠান্ডা করো,” কিংবা “মাইরের উপর ওষুধ নাই”—এগুলো শুনতে শুনতেই আমরা বড় হয়েছি। বাংলাদেশে বিভিন্ন সামাজিক-রাজনৈতিক ইস্যুতেই আমরা জনমনে সেনাবাহিনীর প্রতি একটা বিশ্বাস কিংবা প্রচ্ছন্ন সমর্থন দেখতে পাই। অনেকেই হয়তো ভাবেন, সেনার ‘কঠোর হস্তে দমন’ সমস্যার সমাধান নিয়ে আসতে পারে।।[3]  কিন্তু বাস্তবতা কী বলে? কর্তৃত্ব[4]  যত প্রকট হয়, সমাজে কী তত শান্তি প্রতিষ্ঠিত হয়? আসুন, এই কঠিন প্রশ্নগুলোর উত্তর খোঁজার চেষ্টা করি।

দার্শনিক থমাস হবস্ মনে করতেন মানুষ জন্মগত ভাবে অশান্তি প্রিয়। তারা সুযোগ পেলেই বিশৃঙ্খলা তৈরি করবে। তাই মানুষকে ঠান্ডা রাখার উপায় হলো তাদের ওপর শাসকের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করা। অন্যদিকে মানুষের উচিত তাদের মানবাধিকার বা ‘হিউম্যান রাইটস'[5]  কর্তার নিকট সোপর্দ করা। পরবর্তীতে দার্শনিক জন লক ও স্বীকার করেছিলেন যে সাধারণ মানুষের ওপর কর্তা থাকা প্রয়োজন, তা না হলে সমাজে শান্তি বিঘ্নিত হবে। যেখানে হবস্ মনে করতেন মানুষের উপর ‘এবসুলুট পাওয়ার’ নিয়ে কর্তার শাসন করা উচিত। অন্যদিকে লক সেই পাওয়ারের ধারণা কিছুটা লঘু করেন। তার মতে, জনগণের উপর কর্তা থাকবে, তবে সে কাজ করবে জনগনের ইচ্ছার (will) এর অনুগামী হয়ে। [6] কিন্তু এই পুরো দার্শনিক আলাপে পরবর্তীতে যুক্ত হয়েছিলেন বিখ্যাত জেনেভান দার্শনিক যাঁ যাক্ রুশো, যেটি ‘সামাজিক চুক্তি’র ধারণা নামে এখনো জগতবিখ্যাত। রুশোর মতে মানুষ স্বাভাবিকভাবে শান্তিপ্রিয় ও সাবলীল জীবনের অনুগামী। তিনি কার্ল মার্ক্স ও ফ্রেডরিক এঙ্গেলস এর মতই মনে করতেন সমাজে সভ্যতা ও ব্যক্তিগত সম্পদ সৃষ্টি করেছে অবিচার ও অসমতা। আর এই সু্যোগ নিয়ে পৃথিবীতে সৃষ্টি হয়েছে অত্যাচারী শাসন ব্যবস্থা, এসেছে স্বেচ্ছাচারী শাসক। তার মানে দার্শনিকভাবে আমরা মানুষের শান্তিপ্রিয় হওয়ার একটা শক্ত অবস্থান এখানে দেখতে পাই। কিন্তু দার্শনিক অবস্থানই কী যথেষ্ট? দার্শনিকেরা সাধারণত একটা প্রকল্প বা ‘হাইপোথিসিস’ তৈরি করেন। আর সে প্রকল্প পরীক্ষা করার জন্য আমাদের এখন দরকার একজন মাঠকর্মে পারদর্শী সামাজিক বিজ্ঞানের লোক। চলুন তাহলে এমন কাওকে খুঁজে বের করা যাক।

মারিয়া বিয়র্নস্টামের (মাঝখানে) নেতৃত্বে ১১ সদস্যের এক মিশ্র লিঙ্গ ও বহুজাতিক ক্রু দল।

১৯৭৩ সালে মেক্সিকান নৃবিজ্ঞানী সান্তিয়াগো জেনোভেস খুবই অদ্ভুত একটি ‘হাইপোথিসিস’ নিয়ে একটি এক্সপেরিমেন্ট করার পরিকল্পনা করেন। বানরদের মধ্যে অধিকাংশ সংঘাত হয়ে থাকে তাদের যৌনতাকে কেন্দ্র করে, বানরেরা যেহেতু প্রাইমেট অর্থাৎ আমাদের কাছাকাছি গোত্রের প্রাণী, সান্তিয়াগো তাই মনে করতেন মানুষের মধ্যে সংঘাতও মূলত যৌনতাকে কেন্দ্র করেই। আর এটির প্রকাশ তারা যদি সম্পূর্ণভাবে কতৃত্ব বা ‘অথোরিটি’ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের ভেতরকার উগ্রতা প্রকাশের সুযোগ পান শুধুমাত্র তবেই সম্ভব। যেই ভাবা সেই কাজ। একটি ১২x৭ মিটার নৌকা নিয়ে সান্তিয়াগো পাড়ি দিলেন আটলান্টিকের বুকে, ১০১ দিনের জন্যে ক্যারিবিয়ান অভিমুখে। নৌকায় ক্যাপ্টেন, চিকিৎসক, চালকের মত বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সব দায়িত্বে বসালেন নারীদের, যেন প্রচলিত সমাজের লিঙ্গব্যবস্থাকেও সেখানে বদলে দিতে পারেন। বিভিন্ন বর্ণ, ধর্ম ও পেশার দশজনকে নিয়ে সান্তিয়াগোর ‘যা ইচ্ছে তা’ এর নৌকার যাত্রা শুরু হলো। ধীরে ধীরে নৌকার বিভিন্ন সদস্যদের মধ্যে ‘রোমান্টিক’ সম্পর্ক অনুভূতিরও প্রকাশ পেল। ঘটছিলোনা শুধু যা সান্তিয়াগো দেখতে চেয়েছিলেন- সংঘাত, অশান্তি ও বর্বরতা।

আকালি রাফট্, তার ১০১ দিনের অভিযানে।

এর মাঝে অনেক গল্প। এই নৌকা নিয়ে গণমাধ্যমে গরম গরম বিভিন্ন খবর ও বেরুতে লাগলো। আমাদের আলোচনার গতিপথ ঠিক রাখতে সরাসরি এক্সপেরিমেন্টটার ফলাফলটা বলে দেই, নৌকায় আসলে কখনোই কোনো সম্পর্ক শেষপর্যন্ত সংঘাতে রূপ নেয়নি। তারা ভালোবাসা, সম্মান ও শান্তির মাধ্যমে উল্টো সুন্দর এক সম্পর্ক তৈরি করেছিলেন, পরবর্তীতে যা একটা অসাধারণ শক্ত বিশ্বাসের বন্ধুতের দলে পরিণত হয়। এমনকি সান্তিয়াগো তার আশানুরূপ ঘটনাপ্রবাহ না দেখায় যখন বিভিন্ন উপায়ে অশান্তি সৃষ্টির চেষ্টা করেন, তখন বাকি সদস্যরা শেষমেশ সান্তিয়াগোর উপরেই চড়াও হয়ে পড়েন। সান্তিয়াগোর পরিণতিও হয় করুন, সে যে বিশ্ববিদ্যালয়ের হয়ে গবেষণা করছিলো সেখান থেকেও ছাঁটাই করা হয় তাকে। পরবর্তীতে তার এ গবেষণা পদ্ধতি নিয়ে অনেক নৃবিজ্ঞানীরাই কঠোর সমালোচনা করেছেন, এই গবেষণা পদ্ধতিকে সম্পূর্ণ অবৈজ্ঞানিক বলেছেন। তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সান্তিয়াগোর এক্সপেরিমেন্ট বিফলে গেলেও আমাদের এই পুরো এক্সপেরিমেন্ট থেকে নেয়ার যায়গা এতটুকুই যে, মানুষ সত্যিই স্বাধীনতা ও অধিকার পেলে কেমন আচরণ করে তার একটা ধারণা পাওয়া। আর স্বাধীনতা একবার অনুভব করতে পারলে সেই স্বাধীনতা যে নষ্ট করতে চায় তার প্রতি মানুষের আচরণ কেমন করে তা ও এই এক্সপেরিমেন্টে দেখা যায়। 

‘ভাসমান লাভ আইল্যান্ড’ … আকালি রাফট, ১৯৭৩ সালে নৃবিজ্ঞানী সান্তিয়াগো জেনোভেসের (মাঝখানে, নোট নিচ্ছেন)

এতক্ষণ পুরোদস্তুর ‘একাডেমিক’ আলাপের পর আমরা আমাদের প্রতিদিনের জীবন থেকে কিছু ঘটনা এই এক্সপেরিমেন্টের সাথে রিলেট করে দেখতে পারি। ঢাকায় যখন আমি কলেজ জীবন থেকে মোটামুটি পুরোদস্তুর একা চলাফেরা শুরু করি তখন থেকে দেখেছি ঢাকায় ‘টেম্পু’ বা ‘লেগুনা’ নামের যে যানগুলো চলাচল করে তাতে অনেক শিশুশ্রমিকদের ‘হেল্পার’ হিসেবে কাজ করতে। অনেকে এগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়েছেন, কিন্তু তূলনামূলক কম বেতনের কর্মী হওয়ায় এ কাজে বেশিভাগ সময়ই শিশুদেরই দেখেছি। অনেকে বলেছেন এই ঝুঁকিপূর্ণ কাজটিতে শিশুদের ব্যবহার না করতে। অনেকে ভেবেছেন যদি একেবারেই কোনো ‘হেল্পার’ ব্যবহার না করা হয় তাহলে  যাত্রীরা হয়তো ভাড়া না পরিশোধ করেই চলে যাবে। কিন্তু গত কয়েকবছরে খেয়াল করে দেখলাম এই যানগুলোতে এখন আর কোনো হেল্পার নেই। মানুষ নিজেনিজেই ভাড়া তুলছে, ভাংতি না থাকলে সবাই মিলে ভাংতি করছে, যে যতটুকু ভ্রমণ করছে তার জন্য ঠিক ন্যায্য ভাড়াটাই গ্রহণ করছে। অর্থাৎ তদারকি করার মত কেউ না থাকলেও মানুষ নিজেরাই নিজেদের কাজ চালিয়ে নিচ্ছেন, সমস্যার সমাধান করছেন। অনেকের কাছে বিষয়টি ক্ষুদ্র মনে হলেও এর একটি একটি গূঢ় অর্থ আছে।

পাবলিক বাসে বহুবার দেখেছি, অচেনা লোকের ভাড়ার জন্য আরেকজন ঝগড়া করছেন। মাঝে মাঝে সবাই মিলে হেল্পারকে চাপ দিয়ে সঠিক ভাড়ায় ফেরত আনছেন। আপনারা হয়তো বলতে পারেন, এই উদাহরণগুলো সরাসরি মানুষের অর্থনৈতিক জীবনের সাথে জড়িত, তাই মানুষ এসবক্ষেত্রে বেশি সতর্ক। তবে বাংলাদেশের ইতিহাসেই আমরা দেখতে পাই, দেশে যতবার মানবিক বিপর্যয় হয়েছে, এমনকি যেখানে দুর্যোগকালে সরকারি কাঠামো যথাযথ সেবা প্রদানে ব্যর্থ হয়েছে সেসব জায়গায়ও মানুষই কাঁধে মূল দায়িত্বটা তুলে নিয়েছে। সম্পূর্ণ অজানা, অচেনা অনেক মানুষ ক্ষুদ্র থেকে জাতীয় পর্যায়ের দুর্যোগে, দেশের নানা ক্রান্তিলগ্নে, বিনা দ্বিধায় কাজ করে হাওয়ায় মিলিয়ে গেছেন। বিনিময়হীন অক্লান্ত শ্রম দিয়ে হুট করেই ঘটনাস্থল থেকে নিজের মত হারিয়ে গেছেন। খেয়াল রাখতে হবে, অন্য বা সামগ্রিকের ভালোর কাজ করা যে শুধু অন্যের ভালো করা তা নয়। আপনি একজন ভিক্ষুককে দশ টাকা দিলে আপনার ভেতর অনুভূত হয় আপনি ভালো কিছু করেছেন, আপনার নিজেকে ভালো মানুষ মনে হয়, হয়ত আপনার দিনটা একটু বেশি সুন্দর মনে হয়। চিন্তার যায়গায় অতিরিক্ত আশাবাদি মনে হলেও, আমি মনে করি এটাই মানুষের আসল ‘নেচার’। মানুষ শান্তিপ্রিয়, মানুষ পরোপকারী। তা না হলে মানবসভ্যতা কোনোক্রমেই এতদূর আসতে পারতো না।

তাহলে শেষ প্রশ্ন হলো, মানুষ যদি এতই ভালো হয়, তাহলে সমাজে এত অশান্তি আর অনাচার কেন। সান্তিয়াগো এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। তবে প্রিয় পাঠক, এই লেখাটি পড়া শেষ করে কী সরষের মধ্যে ভূত খুঁজে পেয়েছেন? যদি পেয়ে থাকেন, আপনাকে অভিবাদন।